alt

উপ-সম্পাদকীয়

তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর যৌতুক মামলা ও আইনি বাস্তবতা

সিরাজ প্রামাণিক

: বুধবার, ১৭ মে ২০২৩

তালাকের পর স্ত্রী কর্তৃক যৌতুক কিংবা নারী নির্যাতনের মামলা হলে সেই মামলায় আইনি ফলাফল ও বাস্তবতা নিয়ে আজকের নিবন্ধ। স্বামীর সাথে দাম্পত্য কলহ হলেই স্ত্রীরা স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় মামলা করে থাকেন। আরেকটি রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ১১(গ) ধারার মামলা। এ ধারগুলোর সংজ্ঞার সারমর্ম হচ্ছে- যদি কোন নারীর স্বামী অথবা স্বামীর বাবা, মা, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করে কিংবা অত্যাচার নির্যাতন করে, তাহলে এ ধারগুলোতে মামলা হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় যে, দাম্পত্য কলহে স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে গেছে। স্বামী বারবার আনতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। এরপর স্বামী একপর্যায়ে তালাক দিয়েছেন

স্ত্রী তালাকের নোটিশ প্রাপ্তির পর প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে থানা কিংবা আদালতে গিয়ে এ ধরনের মিথ্যা যৌতুকের মামলা করে থাকেন। যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় শাস্তির বিষয়ে বলা আছে- স্ত্রীর অভিযোগ প্রমাণিত হলে অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কিন্তু ন্যূনতম ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ১১(গ) ধারার শাস্তির বিষয়ে বলা আছে- তিন বৎসর কিন্তু ন্যূনতম এক বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।

এক্ষেত্রে আসামি গ্রেপ্তার হলে কিংবা সমন প্রাপ্তির পর আসামিপক্ষ আদালতে নিবেদন করেন যে, বাদিনী তালাকের নোটিশ প্রাপ্তির এতদিন পর আসামির প্রতি রাগান্বিত ও প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ বক্তব্যের সমর্থনে আদালতের সামনে ফিরিস্তি আকারে তালাক প্রদানের নোটিশ, ডাক রশিদ, প্রাপ্তি স্বীকারসহ উপযুক্ত প্রমাণ পেশ করে থাকেন।

আদালত সার্বিক দিক বিবেচনা করে এবং তালাকের পর মামলা সম্পর্কিত উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে আসামিকে জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়ে থাকেন। এরপর মামলাটির পরবর্তী ধাপ থাকে সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ গঠন বিষয়ে। চার্জ গঠন বিষয়ে শুনানির সময় আসামিপক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী বিচারকের নিকট অব্যহতি চেয়ে আবেদন পেশ করেন। যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন তালাকের পরে যদি মামলা দায়ের করা হয় তবে সেই ক্ষেত্রে মামলাটি অচল হবে এবং আসামি অব্যাহতি বা খালাস পাবেন।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেন, যা রওশন আরা বেগম বনাম মো. মিজানুর রহমান ও অন্যান্য, হাইকোর্ট বিভাগ, ১২ এডিসি, পৃষ্ঠা-৯৬ এবং রাষ্ট্র বনাম মো. রফিজুল হক, ৬ এএলআর (এডি), ভলিউম-২, পৃষ্ঠা-৯০। হাইকোর্ট এ মামলায় পর্যবেক্ষণে বলছেন-বিবাহ বিচ্ছেদ আগেই হয়েছে। কাজেই কজ অব অ্যাকশনের দিনে ভিকটিমকে তার স্বামীর বাড়িতে থাকার কথা নয়; কিন্তু এ জাতীয় একটি মামলায় ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫(সি) ধারামতে অব্যাহতির আদেশ চেয়ে করা আবেদনটি খারিজ করে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।

আসামিপক্ষ উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন দাখিল করেন। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে উক্ত অভিযোগ গঠন বাতিল করে আসামিকে অব্যাহতি দেন। এরপর বাদী (রাষ্ট্র) পক্ষ হাইকোর্টের উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান। আপিল বিভাগ সাক্ষ্য ও তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেয় যে, অভিযুক্ত স্বামীকে খালাস দেয়ার হাইকোর্টের আদেশ সঠিক। কাজেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একেবারেই বনিবনা না হলে স্ত্রীকে সঠিক নিয়ম মেনে তালাক দেয়ার পর স্ত্রী কর্তৃক মিথ্যা যৌতুকের মামলার ফলাফল বাদীর পক্ষে প্রমাণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

কাজেই আপনি যদি স্ত্রী কর্তৃক মিথ্যা মামলার শিকার হয়েই যান, তাহলে আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মামলাটি লড়ে যেতে হবে। এজাহারের কপিটি সংগ্রহের চেষ্টা করুন। যদি এমন হয় যে, আপনি জানতে পারলেন না আর হঠাৎ পুলিশ এসে আপনাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেল, তাহলে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে আদালতে প্রেরণ করা হবে। তখন আপনার আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করতে হবে। যদি দলিলপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ ঠিক থাকে, তাহলে মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই মিলবে। মামলা থেকে পালিয়ে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে আপনার অনুপস্থিতিতেই সাজা হয়ে যেতে পারে।

আরেকটি কেস স্টাডি থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সালমা সুলতানা নামের এক নারীর সঙ্গে শফিকুর রহমানের বিয়ে হয়। সালমা ২০০৯ সালের ১৬ নভেম্বর স্বামীর বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনের ৪ ধারায় মামলা করেন। মামলায় বাদী পক্ষে উল্লেখ করেন, বিয়ের কিছুদিন পরই সালমা বুঝতে পারেন তার স্বামী মানসিকভাবে অসুস্থ ও হতাশাগ্রস্ত। তিনি (সালমা) শ্বশুর-শাশুড়িকে বিষয়টি জানান এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলেন।

কিন্তু শফিকুর জানান, তিনি অসুস্থ কিংবা হতাশাগ্রস্ত নন। সালমা মনে করেন, তার স্বামী পরধন লোভী। সে জন্যই ব্যবসার কথা বলে তার (সালমা) কাছে পাঁচ লাখ টাকা চান। বাবার বাড়ি থেকে ওই টাকা এনে দিতে অস্বীকার করায় তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে সালমা বাবার বাড়ি চলে যান। কিছুদিন পর তাকে ফিরিয়ে আনেন শফিকুর। কিন্তু তার (শফিকুর) স্বভাব পরিবর্তন হয় না। ২০০৯ সালের ২০ মে আবার পাঁচ লাখ টাকা এনে দিতে চাপ দেন। এবার শফিকুর বলেন, তিনি ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনতে চান।

সালমা ফের টাকা এনে দিতে অস্বীকার করেন। এতে তাকে নির্যাতন করা হয়। সালমা স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করে বাবার বাড়ি যেতে বাধ্য হন। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর সালমার বাবার বাড়ি গিয়ে একই পরিমাণ টাকা দাবি করেন শফিকুর। টাকা না দিলে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দেন। পরে বাধ্য হয়ে সালমা তার (শফিকুর) বিরুদ্ধে মামলা করেন।

নিম্নআদালত শফিকুরের বিরুদ্ধে মামলটি আমলে নেন। পরে মামলা বিচারের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১৮-তে স্থানান্তর করলে বিচারক আসামি শফিকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। শফিকুর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা বেআইনি হয়েছে উল্লেখ করে মামলা কার্যক্রম বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট কেন মামলার কার্যক্রম বাতিল ঘোষণা করা হবে না, সেই মর্মে রুল জারি করেন। সেই রুলের শুনানি শেষে আদালত রায় দেয়। আদালত রায়ে বলেছেন-আইনে স্পষ্ট রয়েছে, বিয়ের সময়কার শর্ত হিসেবে বিয়ের মজলিসে কিংবা বিয়ের আগে অথবা পরে কোনো সময় অর্থ-সম্পদ দাবি করা হলে তবে তা যৌতুক হিসেব গণ্য হবে। (এনএম শফিকুর রহমান বনাম রাষ্ট্র, ৭ এএলআর, পৃষ্ঠা ৩১৩)।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস

জমা-খরচের খাতায় মায়ের কী সঞ্চয়

বাজেট কি সাধারণ মানুষের চাওয়া পূরণ করতে পারবে

আগামী বাজেট কিছু বিবেচ্য বিষয়

পরিবেশ রক্ষায় বনায়নের বিকল্প নেই

জলাশয় রক্ষায় নজর দিন

রামকৃষ্ণ মিশন নিয়েও রাজনীতি

স্মার্ট দেশ গড়তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রচেষ্টা

আদিবাসী সার্টিফিকেট দিতে গড়িমসি কেন

কুলুপ আঁটা মুখ, আনবে সব সুখ

ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন ও আমাদের জাতীয় কবি

লালনের গান ও ধর্মীয় অনুভূতি

দূষণ প্রতিরোধ করা জরুরি

স্মরণ : নারী সাংবাদিকতার অগ্রপথিক নূরজাহান বেগম

কৃষকের দুঃখ-কষ্ট বোঝার কি কেউ আছে

বিশ্ব মেডিটেশন দিবস

চাই খেলার মাঠ ও পার্ক

এখন দ্রব্যমূল্য কমবে কীভাবে

ছবি

অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এমসি কলেজের ঐতিহ্য সংরক্ষণ

তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে

ফের চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু : আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন জনসচেতনতা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও গ্রীষ্মের তন্দ্রাচ্ছন্ন স্বপ্ন-দুপুর

ছবি

লোকসভা নির্বাচন : কী হচ্ছে, কী হবে

জমির বায়না দলিল কার্যকর কিংবা বাতিলের আইনি প্রক্রিয়া

জনসেবায় পেশাদারিত্ব

খাদ্য কেবল নিরাপদ হলেই হবে না, পুষ্টিকরও হতে হবে

উচ্চশিক্ষাতেও আদিবাসীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে

ছবি

যুদ্ধটা এখনো শেষ হয়নি রনো ভাই

টাকার অবমূল্যায়ন কি জরুরি ছিল

পরিবার : বিশ্বের প্রাচীন প্রতিষ্ঠান

তাপপ্রবাহে ঝুঁকি এড়াতে করণীয়

ডলারের মূল্যবৃদ্ধি : দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলতে পারে

ছবি

কী আছে ট্রাম্পের ভাগ্যে?

ছবি

বাংলার ‘ভাশুর কথাশিল্পী’ শওকত ওসমান

রাজধানীকে বসবাসযোগ্য করুন

সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়

tab

উপ-সম্পাদকীয়

তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর যৌতুক মামলা ও আইনি বাস্তবতা

সিরাজ প্রামাণিক

বুধবার, ১৭ মে ২০২৩

তালাকের পর স্ত্রী কর্তৃক যৌতুক কিংবা নারী নির্যাতনের মামলা হলে সেই মামলায় আইনি ফলাফল ও বাস্তবতা নিয়ে আজকের নিবন্ধ। স্বামীর সাথে দাম্পত্য কলহ হলেই স্ত্রীরা স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় মামলা করে থাকেন। আরেকটি রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ১১(গ) ধারার মামলা। এ ধারগুলোর সংজ্ঞার সারমর্ম হচ্ছে- যদি কোন নারীর স্বামী অথবা স্বামীর বাবা, মা, অভিভাবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করে কিংবা অত্যাচার নির্যাতন করে, তাহলে এ ধারগুলোতে মামলা হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় যে, দাম্পত্য কলহে স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে গেছে। স্বামী বারবার আনতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। এরপর স্বামী একপর্যায়ে তালাক দিয়েছেন

স্ত্রী তালাকের নোটিশ প্রাপ্তির পর প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে থানা কিংবা আদালতে গিয়ে এ ধরনের মিথ্যা যৌতুকের মামলা করে থাকেন। যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় শাস্তির বিষয়ে বলা আছে- স্ত্রীর অভিযোগ প্রমাণিত হলে অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কিন্তু ন্যূনতম ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ এর ১১(গ) ধারার শাস্তির বিষয়ে বলা আছে- তিন বৎসর কিন্তু ন্যূনতম এক বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।

এক্ষেত্রে আসামি গ্রেপ্তার হলে কিংবা সমন প্রাপ্তির পর আসামিপক্ষ আদালতে নিবেদন করেন যে, বাদিনী তালাকের নোটিশ প্রাপ্তির এতদিন পর আসামির প্রতি রাগান্বিত ও প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ বক্তব্যের সমর্থনে আদালতের সামনে ফিরিস্তি আকারে তালাক প্রদানের নোটিশ, ডাক রশিদ, প্রাপ্তি স্বীকারসহ উপযুক্ত প্রমাণ পেশ করে থাকেন।

আদালত সার্বিক দিক বিবেচনা করে এবং তালাকের পর মামলা সম্পর্কিত উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে আসামিকে জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়ে থাকেন। এরপর মামলাটির পরবর্তী ধাপ থাকে সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ গঠন বিষয়ে। চার্জ গঠন বিষয়ে শুনানির সময় আসামিপক্ষে বিজ্ঞ আইনজীবী বিচারকের নিকট অব্যহতি চেয়ে আবেদন পেশ করেন। যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন তালাকের পরে যদি মামলা দায়ের করা হয় তবে সেই ক্ষেত্রে মামলাটি অচল হবে এবং আসামি অব্যাহতি বা খালাস পাবেন।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেন, যা রওশন আরা বেগম বনাম মো. মিজানুর রহমান ও অন্যান্য, হাইকোর্ট বিভাগ, ১২ এডিসি, পৃষ্ঠা-৯৬ এবং রাষ্ট্র বনাম মো. রফিজুল হক, ৬ এএলআর (এডি), ভলিউম-২, পৃষ্ঠা-৯০। হাইকোর্ট এ মামলায় পর্যবেক্ষণে বলছেন-বিবাহ বিচ্ছেদ আগেই হয়েছে। কাজেই কজ অব অ্যাকশনের দিনে ভিকটিমকে তার স্বামীর বাড়িতে থাকার কথা নয়; কিন্তু এ জাতীয় একটি মামলায় ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫(সি) ধারামতে অব্যাহতির আদেশ চেয়ে করা আবেদনটি খারিজ করে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।

আসামিপক্ষ উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন দাখিল করেন। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে উক্ত অভিযোগ গঠন বাতিল করে আসামিকে অব্যাহতি দেন। এরপর বাদী (রাষ্ট্র) পক্ষ হাইকোর্টের উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান। আপিল বিভাগ সাক্ষ্য ও তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেয় যে, অভিযুক্ত স্বামীকে খালাস দেয়ার হাইকোর্টের আদেশ সঠিক। কাজেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একেবারেই বনিবনা না হলে স্ত্রীকে সঠিক নিয়ম মেনে তালাক দেয়ার পর স্ত্রী কর্তৃক মিথ্যা যৌতুকের মামলার ফলাফল বাদীর পক্ষে প্রমাণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।

কাজেই আপনি যদি স্ত্রী কর্তৃক মিথ্যা মামলার শিকার হয়েই যান, তাহলে আইন ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মামলাটি লড়ে যেতে হবে। এজাহারের কপিটি সংগ্রহের চেষ্টা করুন। যদি এমন হয় যে, আপনি জানতে পারলেন না আর হঠাৎ পুলিশ এসে আপনাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেল, তাহলে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে আদালতে প্রেরণ করা হবে। তখন আপনার আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করতে হবে। যদি দলিলপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ ঠিক থাকে, তাহলে মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই মিলবে। মামলা থেকে পালিয়ে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে আপনার অনুপস্থিতিতেই সাজা হয়ে যেতে পারে।

আরেকটি কেস স্টাডি থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সালমা সুলতানা নামের এক নারীর সঙ্গে শফিকুর রহমানের বিয়ে হয়। সালমা ২০০৯ সালের ১৬ নভেম্বর স্বামীর বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনের ৪ ধারায় মামলা করেন। মামলায় বাদী পক্ষে উল্লেখ করেন, বিয়ের কিছুদিন পরই সালমা বুঝতে পারেন তার স্বামী মানসিকভাবে অসুস্থ ও হতাশাগ্রস্ত। তিনি (সালমা) শ্বশুর-শাশুড়িকে বিষয়টি জানান এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বলেন।

কিন্তু শফিকুর জানান, তিনি অসুস্থ কিংবা হতাশাগ্রস্ত নন। সালমা মনে করেন, তার স্বামী পরধন লোভী। সে জন্যই ব্যবসার কথা বলে তার (সালমা) কাছে পাঁচ লাখ টাকা চান। বাবার বাড়ি থেকে ওই টাকা এনে দিতে অস্বীকার করায় তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে সালমা বাবার বাড়ি চলে যান। কিছুদিন পর তাকে ফিরিয়ে আনেন শফিকুর। কিন্তু তার (শফিকুর) স্বভাব পরিবর্তন হয় না। ২০০৯ সালের ২০ মে আবার পাঁচ লাখ টাকা এনে দিতে চাপ দেন। এবার শফিকুর বলেন, তিনি ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনতে চান।

সালমা ফের টাকা এনে দিতে অস্বীকার করেন। এতে তাকে নির্যাতন করা হয়। সালমা স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করে বাবার বাড়ি যেতে বাধ্য হন। সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর সালমার বাবার বাড়ি গিয়ে একই পরিমাণ টাকা দাবি করেন শফিকুর। টাকা না দিলে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দেন। পরে বাধ্য হয়ে সালমা তার (শফিকুর) বিরুদ্ধে মামলা করেন।

নিম্নআদালত শফিকুরের বিরুদ্ধে মামলটি আমলে নেন। পরে মামলা বিচারের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১৮-তে স্থানান্তর করলে বিচারক আসামি শফিকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। শফিকুর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা বেআইনি হয়েছে উল্লেখ করে মামলা কার্যক্রম বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে ফৌজদারি বিবিধ মামলা করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট কেন মামলার কার্যক্রম বাতিল ঘোষণা করা হবে না, সেই মর্মে রুল জারি করেন। সেই রুলের শুনানি শেষে আদালত রায় দেয়। আদালত রায়ে বলেছেন-আইনে স্পষ্ট রয়েছে, বিয়ের সময়কার শর্ত হিসেবে বিয়ের মজলিসে কিংবা বিয়ের আগে অথবা পরে কোনো সময় অর্থ-সম্পদ দাবি করা হলে তবে তা যৌতুক হিসেব গণ্য হবে। (এনএম শফিকুর রহমান বনাম রাষ্ট্র, ৭ এএলআর, পৃষ্ঠা ৩১৩)।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

back to top