চপল বাশার
‘সংবাদ’-এর ৭৫তম প্রতিষ্ঠা-বার্ষিকী উপলক্ষে কিছু লিখতে গিয়ে বারবার পত্রিকার সাবেক সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীর কথা মনে পড়ছে। সংবাদপত্র জগতের কিংবদন্তি জহুর হোসেন চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ৪৫ বছর আগে। ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে তাঁর কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। ২৩ বছর বয়সে ১৯৪৫ সালে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১-এর মার্চ পর্যন্ত ১৭ বছরের বেশি তিনি ‘সংবাদ’-এর সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮০ সালের নভেম্বরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত তাঁর সাংবাদিকতা অব্যাহত ছিল। অসুস্থ শরীরেও তিনি একটানা প্রায় পাঁচ বছর লিখে গেছেন তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’।
সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জহুর হেসেন চৌধুরীর জন্ম ১৯২২ সালের ২৭ জুন বর্তমান ফেনি জেলার দাগনভুঁইয়া উপজেলার রামনগর গ্রামে। তাঁর পিতা সাদাত হোসেন চৌধুরী ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কর্মস্থল ছিলো সিরাজগঞ্জ। সেখানেই এক উচ্চ বিদ্যালয়ে জহুর হোসেন চৌধুরী শিক্ষাগ্রহণ করেন ও ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৪০ সালে আই.এ ও ১৯৪২ সালে ইতিহাসে অনার্সসহ বি.এ পাস করেন।
জহুর হোসেন চৌধুরীর সাংবাদিক জীবনের সূচনা হয় হাবীবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত ‘বুলবুল’ পত্রিকায় ১৯৪৫ সালে। এরপর তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেটসম্যান’, ‘কমরেড’, ও ‘স্টার অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং কিছুকাল সরকারি চাকরি করেন। পরে আবার তিনি সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন এবং ‘উপাত্ত’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা এবং ইংরেজি দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন। ১৯৫১ সালে দৈনিক ‘সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা শুরু হওয়ার পর বংশাল রোডে ‘সংবাদ’ কার্যালয় পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং পত্রিকার প্রকাশনা ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আজীবন ‘সংবাদ’-এর অন্যতম পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ‘সংবাদ’-এর সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি নেন এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ‘কাউন্টার পয়েন্ট’ নামে একটি ইংরেজি সাময়িকীর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে তিনি ‘সংবাদ’-এ তাঁর বিখ্যাত কলাম ‘দরবার-ই-জহুর’ লিখতে শুরু করেন। কলামটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, যার ফলে পাঠকদের কাছে পত্রিকার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। প্রথমদিকে কলামটি সপ্তাহে একবার প্রকাশিত হতো, পরে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে জহুর হোসেন চৌধুরী সপ্তাহে দুই দিন কলামটি লিখতেন এবং শেষ পর্যন্ত তাই লিখে গেছেন। এই কলামে তিনি জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ে লিখতেন। তাঁর সংবাদ বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও মন্তব্য পাঠকদের মুগ্ধ করতো। তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে যে কোনো বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও মন্তব্য প্রকাশ করতেন। এর মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছিলো। মৃত্যুর বছরখানেক আগে তাঁর কোনো একটি নিবন্ধের কারণে তৎকালীন সরকার অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। রমনা থানার পুলিশ রাত ১২টায় তাঁকে ধানম-ির বাসা থেকে গ্রেফতার করে থানায় এনে বসিয়ে রাখে এবং পরদিন জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। অসুস্থ জহুর হোসেন চৌধুরী এই ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন এবং তাঁর স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হয়।
জহুর হোসেন চৌধুরী ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১, প্রায় ১৭ বছর সংবাদ-এর সম্পাদক ছিলেন। এই সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের খবর পত্রিকার পাতায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হতো। সে কারণে পত্রিকাটি রাজনৈতিক মহলে ও জনগণের কাছে প্রিয় ছিলো। ১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পুরোটাই সংবাদ-এর প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিলো। খবরটির শিরোনাম ছিল, “এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এই শিরোনাম আর কোনো পত্রিকা দেয়নি। এই সাহসী শিরোনাম সাহসী সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীর কারণেই সম্ভব হয়েছিলো। সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ জহুর হোসেন চৌধুরী অবিস্মরণীয়।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন ও পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন জহুর হোসেন চৌধুরী। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তিনি প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম অবৈতনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ক্লাবের নাম হয় ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব’। তাঁর স্মরণে ক্লাব ভবনের দোতলায় প্রধান মিলনায়তনের নাম রাখা হয়েছে ‘জহুর হোসেন চৌধুরী হল’।
সমাজসচেতন মানুষ জহুর হোসেন চৌধুরী প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। ছাত্রজীবন শেষে তিনি বাম রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন এবং কমিউনিস্ট নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায় (এম.এন. রায়)-এর র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দেন। বেশ কিছুকাল এই দলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। পঞ্চাশের দশকের শেষভাগে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর প্রাদেশিক কমিটির সদস্য ছিলেন।
প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও জহুর হোসেন চৌধুরী বিশেষ সক্রিয় ছিলেন। তিনি পাক-চীন মৈত্রী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং পাক-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তিনি আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের আন্দোলন কর্মসূচিতে সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
সাংবাদিকদের মধ্যে জহুর হোসেন চৌধুরী খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। নবীন ও প্রবীণ- সব সাংবাদিক তাঁকে জহুর ভাই বলে ডাকতেন। বয়সে ছোট অথবা বড়, সবার সঙ্গেই তাঁর ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। স্বাধীনতার পর আমি যখন ‘সংবাদ’-এর বার্তা বিভাগে যোগ দেই, তখন থেকেই জহুর ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং এই সম্পর্ক তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বজায় ছিলো। আমার সঙ্গে তিনি মন খুলে কথা বলতেন। অনেক কিছু তাঁর কাছে শিখেছি, অনেক কিছু জেনেছি। আমি সাংবাদিকতা ও লেখালেখির জগতেই আছি। তাঁর চিন্তাধারা আমাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে।
সংবাদপত্র জগতের জন্য যে অবদান জহুর ভাই রেখে গেছেন, সেজন্য সাংবাদিকরা তাঁর কাছে চিরঋণী। এই ঋণ আমরা শোধ করতে পারবো না। জহুর ভাইয়ের জন্য আমাদের বিন¤্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিলো, রয়েছে এবং থাকবে। এছাড়া তাঁকে দেবার মতো আমাদের তো আর কিছু নেই। ‘সংবাদ’-এর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি আমাদের প্রিয় জহুর ভাইকে।