গৌতম রায়
সিপিআই (এম) দলের সর্বভারতীয় পার্টি কংগ্রেস মাদুরাইতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে সিপিআই (এম) দলের এই পার্টি কংগ্রেস বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। কংগ্রেস থেকেই এই দলটি তাদের আগামী তিন বছরের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটা অভিমুখ নির্ধারণ করে। তবে এই তিন বছর সময়কালের মধ্যে যদি বিশেষ কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা পরিস্থিতির উদয় হয়, সেক্ষেত্রে তারা বিশেষ প্লেনাম ডেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্তগুলোর পুনঃবিবেচনা বা পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন- সবকিছুই করে থাকেন।
আজ ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভিযান গোটা দেশকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অপরপক্ষে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার বিষয়গুলিকে সম্পূর্ণ অবহেলার মধ্যে রেখে, উপেক্ষার মধ্যে রেখে, যেভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের মূল নিয়ন্ত্রক আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, অরাজনৈতিক বিষয়গুলিকেই রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে টেনে আনবার অভিপ্রায়ে সব রকম শক্তি নিয়োগ করছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বামপন্থি দলের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
গোটা ভারতে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী রাজনীতি আজ ভারতে যেভাবে তার নখদন্ত্র বিস্তার করেছে তার জের যে কেবলমাত্র ভারতে পড়েছে তা নয়। গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই যে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের পদ শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের আগামী দিনের রাজনৈতিক অভিক্ষেপ, বিশেষ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার দাবি রাখে। ভারত যদি হিন্দু সম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, ভারত যদি হিন্দু মৌলবাদ এবং তার হাত ধরে যে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে, তার মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার সুফল যে কেবলমাত্র ভারত বা ভারতের জনগণের উপরে পড়বে তা নয়। তার সুফল গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই প্রসারিত হবে। এই আস্থা রেখেই সিপিআই (এম) দলের আসন্ন পার্টি কংগ্রেস ঘিরে ভারতের অভ্যন্তরে এবং ভারতের বাইরে একটা বিশেষ রকমের উৎসাহ দেখা দিয়েছে।
ভারতে সমাজ বিজ্ঞানীদের মধ্যে বামপন্থিদের সাম্প্রতিক অতীত ঘিরে একটি বিতর্ক আছে। একাংশের সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রথম ইউপিএ সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের বিষয়ে বামপন্থিরা যদি সেদিন খুব কট্টরপন্থি অবস্থান গ্রহণ না করতেন, তাহলে আজকে পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা ভারতে হিন্দু সম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি এবং তাদের নানা ধরনের সহযোগী শক্তিগুলো, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তৃণমূল কংগ্রেস, তারা এতখানি ফ্যাসিস্ট আদলে নখদন্ত বিস্তার হয়তো করতে পারতো না।
এক্ষেত্রে অবশ্য সমাজবিজ্ঞানীরা কংগ্রেস দলের ভূমিকা কথাও বিশেষভাবে বলেন। কারণ প্রথম ইউপিএ সরকারের উপর থেকে বামপন্থিরা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, তাতে ড. মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউ পি এ সরকারকে টিকিয়ে রাখবার জন্যে এমন কিছু পদক্ষেপ কংগ্রেস নিয়েছিল, যার দরুন বামপন্থিদের প্রতি তাদের একটা বিশেষ রকমের বৈরিতা তৈরি হয়ে। আর কংগ্রেসের সেই সময়ের নেতিবাচক অবস্থান, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামপন্থিদের উৎখাত করতে প্রত্যক্ষভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বা তার পরবর্তী সময় সমর্থন দেওয়া --এই গোটা পরিস্থিতিটাই ভারতে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটা সুযোগ এনে দিয়েছিল।
পরবর্তী সময় বামপন্থিরা রাজনৈতিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনেক নতুন আধুনিক এবং সময়োপযোগী ভাবনার দ্বারা নিজেদের পরিচালিত করেছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সঙ্গে ভোট রাজনীতির কিছু বোঝাপড়া, সেটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি ইঙ্গিত হিসেবে নির্ধারণ করতে পারা যায়। যদিও সেই বোঝাপড়া নিরিখে ভোট রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো দলই অর্থাৎ; কংগ্রেস বা বামপন্থিরা কেউ ই সেভাবে লাভবান হননি।
এখানে অবশ্য একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপির যতখানি তৎপরতা, তার শতগুণ বেশি তৎপরতা হচ্ছে তাদের মূল মস্তিষ্ক আরএসএসের। তারা সরাসরি রাজনীতি করে না বলে নিজেদের সম্পর্কে দাবি করলেও সামাজিক ক্ষেত্রকে কলুষিত করে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পালে বাতাস ঢুকিয়ে, যেভাবে মানুষের বিভাজনের পরিবেশ- পরিস্থিতি তৈরি করে, সামগ্রিকভাবে একটা ঘৃণার রাজনীতির পরিবেশ তারা উৎপাদন করে, তাদের সেই সামাজিক প্রযুক্তির কাছে, ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থিরা বা মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেও বহু ক্ষেত্রে কার্যক্ষেত্র, কার্যক্রমে সাম্প্রদায়িকতার পথে হাঁটা কংগ্রেস বা বিভিন্ন রাজ্যের কিছু কিছু আঞ্চলিক দল, যেমন উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টি বা বিহারের লালুর দল, অনেকদিন বিজেপি শিবিরে থেকেও পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব রাখা উড়িষ্যার বিজু জনতা দলÑ এরা শেষ পর্যন্ত আরএসএসের এই সামাজিক প্রযুক্তিজনিত যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সামাজিক মেরুকরণ, তার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না।
ফলশ্রুতিতে নির্বাচনী সংগ্রামে তারা শেষপর্যন্ত পিছিয়ে পড়ে। জিতে যায় ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি। জিতে যায় ধর্মান্ধ সম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপির সহযোগী প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িকতার ধারক বাহক তৃণমূল কংগ্রেসের মতো আঞ্চলিক দলগুলো।
বিগত তিন বছর আগে সিপিআইয়ের (এম) যে পার্টি কংগ্রেস হয়, সেই সময় থেকে পরবর্তী তিন বছরে ভারতের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মান্ধ হিন্দু সাম্প্রদায়িক ঝোঁক আরো প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাব এবং প্রয়োগের প্রতিপত্তি বাড়াবার লক্ষ্যে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে একটা ভয়ংকর প্রতিযোগিতা চলছে। খোদ আইনসভার কক্ষকে যেমন কেন্দ্রে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দলীয় প্রচারের একটা যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন, ঠিক সেই ভাবেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা তে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আইনসভায় বিরোধী নেতা, প্রকৃত অর্থে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতিতে যার বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই, সেই শুভেন্দু অধিকারী, হিন্দু সম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ধরনের পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন, পশ্চিমবঙ্গের আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, তার থেকে একটা কথাই বলতে পারে যে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে একটা ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
মোদি, অমিত শাহের মুখে যেমন ভারতের অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে, বে রোজগারি ঘিরে, ভয়াবহ দুর্নীতি ঘিরে একটা শব্দ উচ্চারিত হচ্ছে না, ঠিক সেই ভাবেই মমতা-শুভেন্দুর কন্ঠ থেকেও একটিবারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূলের সীমাহীন দুর্নীতি ঘিরে কোনো সুনির্দিষ্ট পথ নির্দেশিকা নেই। পথ নির্দেশিকা নেই পশ্চিমবঙ্গের ভয়াবহ বেকারত্ব, আর্থিক সংকট, নারী নির্যাতন ঘিরে। কোনো কিছুর দিশা নেই। কেবল রয়েছে, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের নামে তৃণমূল আর বিজেপির পারস্পরিক দরকষাকষি।
ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে, বহু ভাষা-ধর্ম-জনগোষ্ঠীর সম্মিলন যেখানে রয়েছে, এখানে কোনো ব্যক্তি যদি তার মতাদর্শের নিরিখে নাস্তিকতার পথে হাঁটেন, সেক্ষেত্রে তার ধর্মপ্রাণ মানুষকে আঘাত করবার কোনো অধিকার নেই। ধর্মান্ধতার সঙ্গে নাস্তিকতার, সভ্যতার, সংস্কৃতির সংঘাত আছে। দ্বন্দ্ব আছে।
কিন্তু ধর্মপ্রাণতার সঙ্গে ধর্মান্ধতার যেমন কোনো সম্পর্ক নেই, একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ মাত্রই যে তিনি ধর্মান্ধÑ এই সরলীকরণ যেমন অত্যন্ত ভুল। ঠিক তেমনিই ধর্মপ্রাণতার সঙ্গে নাস্তিকতারও কোনো সংঘাত নেই। একজন প্রকৃত ধর্মপ্রাণ মানুষ,কখনো ধর্মান্ধতার কবলে পড়েন না। আবার নাস্তিকতার সঙ্গেও তার কোনরকম সংঘাত নেই। তিনি তার নিজের বিশ্বাস, নিজের বোধ নিয়ে চলেন। সেই বোধ কখনোই পরমত,পর ধর্মের প্রতি সংঘাত মূলক হয় না।
ভারতে অতীতে ধর্ম কে কেন্দ্র করে অতীতে কমিউনিস্ট নেতৃত্বেদের যে বোধ এবং ধ্যান ধারণার জায়গা ছিল,তাকে সময়োপযোগী করে তোলবার ক্ষেত্রে সিপিআইয়ের (এম) বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্বের ভূমিকা ঐতিহাসিক। এ প্রসঙ্গে বিশেষ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয় প্রয়াত সিপিআই (এম ) নেতা সীতারাম ইয়েচুরি এবং মোহাম্মদ সেলিমকে। আর তাদের পূর্বসূরী হিসেবে এই বোধের উন্মিলন ঘটানোর ক্ষেত্রে একজন স্তম্ভ হিসেবে স্মরণ করতে হয় প্রয়াত ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদকে।
জ্যোতি বসুর মতো ব্যক্তিত্ব, যার বাস্তববোধ ভারতের রাজনীতিতে একমাত্র তুলনীয় প-িত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে। তিনি কখনোই ধর্ম ঘিরে কোনোরকম অতিরিক্ত উৎসাহ একটি বারের জন্য দেখান নি। যাপনচিত্রে তিনি ছিলেন নাস্তিক। কিন্তু যিনি ধর্মপ্রাণ, তাকে ঘিরে জ্যোতিবাবুর কোনোদিনও কোনোরকম ব্যক্তিঅসুয়া কাজ করেনি। আবার কোনো ধর্মান্ধ,সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ব্যক্তি বা সম্প্রদায় ঘিরে কোনোদিন কোনো রকম দুর্বলতার প্রকাশও জ্যোতি বাবু করেননি। ধর্মান্ধতা ঘিরে জ্যোতিবাবুর যে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক অবস্থান, সেটি শুধু কমিউনিস্টদের কৃতিত্ব হিসেবে পরিগণিত হয় না। সার্বিকভাবে ভারতীয় রাজনীতিকদের ধর্মান্ধতা রোখবার ক্ষেত্রে কৃতিত্বের যে খতিয়ান, তাতে জ্যোতিবাবুর নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ইএমএসের তাত্ত্বিক অবস্থান, জ্যোতিবাবুর বাস্তববোধ এই দুইয়ের সম্মিলিত ধারা স্রোতের সঙ্গে সীতারাম বা সেলিমের রাজনৈতিক বোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে হরকিষাণ সিং সুরজিতের রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সবাইকে নিয়ে চলবার বাস্তব প্রতিমূর্তির প্রভাব। সেদিক থেকে বলতে পারা যায় যে, জর্জি দিমিট্রভেল যে যুক্ত ফ্রন্টের তত্ত্ব, তার জন্য এক বাস্তব সম্মেলন ঘটেছিল সুরজিতের সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে।
এই ধারাটির নির্যাস সিপিআই (এম) তাদের পার্টি কংগ্রেস উপলক্ষের যে নিজেদের দলের নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত খসড়া কর্মসূচি প্রকাশ করেছে, তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি। ধর্ম নিরপেক্ষতার সঠিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের মধ্যে মতো বৈচিত্র্যময় দেশে ধর্মপ্রাণ মানুষদেরও যে সেন্টিমেন্ট, তাকে সঠিকভাবে মর্যাদা না দিলে সেটা যে ধর্মান্ধ শক্তির দিকে প্রসারিত হতে পারেÑ এই বাস্তববোধের অপূর্ব প্রকাশ সিপিআই (এম) দলটির খসড়া কর্মসূচির মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই ভাবনা হলো; বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত ধরনের ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, মৌলবাদী মানসিকতা এবং ফ্যাসিস্ট প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সব থেকে উত্তম কার্যকরী মহৌষধ।
[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]
গৌতম রায়
শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫
সিপিআই (এম) দলের সর্বভারতীয় পার্টি কংগ্রেস মাদুরাইতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখে সিপিআই (এম) দলের এই পার্টি কংগ্রেস বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। কংগ্রেস থেকেই এই দলটি তাদের আগামী তিন বছরের রাজনৈতিক কর্মসূচির একটা অভিমুখ নির্ধারণ করে। তবে এই তিন বছর সময়কালের মধ্যে যদি বিশেষ কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা পরিস্থিতির উদয় হয়, সেক্ষেত্রে তারা বিশেষ প্লেনাম ডেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্তগুলোর পুনঃবিবেচনা বা পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন- সবকিছুই করে থাকেন।
আজ ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভিযান গোটা দেশকে ধ্বংসের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অপরপক্ষে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার বিষয়গুলিকে সম্পূর্ণ অবহেলার মধ্যে রেখে, উপেক্ষার মধ্যে রেখে, যেভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের মূল নিয়ন্ত্রক আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, অরাজনৈতিক বিষয়গুলিকেই রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে টেনে আনবার অভিপ্রায়ে সব রকম শক্তি নিয়োগ করছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বামপন্থি দলের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
গোটা ভারতে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী রাজনীতি আজ ভারতে যেভাবে তার নখদন্ত্র বিস্তার করেছে তার জের যে কেবলমাত্র ভারতে পড়েছে তা নয়। গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই যে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের পদ শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের আগামী দিনের রাজনৈতিক অভিক্ষেপ, বিশেষ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার দাবি রাখে। ভারত যদি হিন্দু সম্প্রদায়িকতার মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, ভারত যদি হিন্দু মৌলবাদ এবং তার হাত ধরে যে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে, তার মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার সুফল যে কেবলমাত্র ভারত বা ভারতের জনগণের উপরে পড়বে তা নয়। তার সুফল গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই প্রসারিত হবে। এই আস্থা রেখেই সিপিআই (এম) দলের আসন্ন পার্টি কংগ্রেস ঘিরে ভারতের অভ্যন্তরে এবং ভারতের বাইরে একটা বিশেষ রকমের উৎসাহ দেখা দিয়েছে।
ভারতে সমাজ বিজ্ঞানীদের মধ্যে বামপন্থিদের সাম্প্রতিক অতীত ঘিরে একটি বিতর্ক আছে। একাংশের সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রথম ইউপিএ সরকারের থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের বিষয়ে বামপন্থিরা যদি সেদিন খুব কট্টরপন্থি অবস্থান গ্রহণ না করতেন, তাহলে আজকে পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা ভারতে হিন্দু সম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি এবং তাদের নানা ধরনের সহযোগী শক্তিগুলো, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তৃণমূল কংগ্রেস, তারা এতখানি ফ্যাসিস্ট আদলে নখদন্ত বিস্তার হয়তো করতে পারতো না।
এক্ষেত্রে অবশ্য সমাজবিজ্ঞানীরা কংগ্রেস দলের ভূমিকা কথাও বিশেষভাবে বলেন। কারণ প্রথম ইউপিএ সরকারের উপর থেকে বামপন্থিরা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, তাতে ড. মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউ পি এ সরকারকে টিকিয়ে রাখবার জন্যে এমন কিছু পদক্ষেপ কংগ্রেস নিয়েছিল, যার দরুন বামপন্থিদের প্রতি তাদের একটা বিশেষ রকমের বৈরিতা তৈরি হয়ে। আর কংগ্রেসের সেই সময়ের নেতিবাচক অবস্থান, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামপন্থিদের উৎখাত করতে প্রত্যক্ষভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বা তার পরবর্তী সময় সমর্থন দেওয়া --এই গোটা পরিস্থিতিটাই ভারতে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটা সুযোগ এনে দিয়েছিল।
পরবর্তী সময় বামপন্থিরা রাজনৈতিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনেক নতুন আধুনিক এবং সময়োপযোগী ভাবনার দ্বারা নিজেদের পরিচালিত করেছেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সঙ্গে ভোট রাজনীতির কিছু বোঝাপড়া, সেটা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি ইঙ্গিত হিসেবে নির্ধারণ করতে পারা যায়। যদিও সেই বোঝাপড়া নিরিখে ভোট রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো দলই অর্থাৎ; কংগ্রেস বা বামপন্থিরা কেউ ই সেভাবে লাভবান হননি।
এখানে অবশ্য একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপির যতখানি তৎপরতা, তার শতগুণ বেশি তৎপরতা হচ্ছে তাদের মূল মস্তিষ্ক আরএসএসের। তারা সরাসরি রাজনীতি করে না বলে নিজেদের সম্পর্কে দাবি করলেও সামাজিক ক্ষেত্রকে কলুষিত করে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পালে বাতাস ঢুকিয়ে, যেভাবে মানুষের বিভাজনের পরিবেশ- পরিস্থিতি তৈরি করে, সামগ্রিকভাবে একটা ঘৃণার রাজনীতির পরিবেশ তারা উৎপাদন করে, তাদের সেই সামাজিক প্রযুক্তির কাছে, ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থিরা বা মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেও বহু ক্ষেত্রে কার্যক্ষেত্র, কার্যক্রমে সাম্প্রদায়িকতার পথে হাঁটা কংগ্রেস বা বিভিন্ন রাজ্যের কিছু কিছু আঞ্চলিক দল, যেমন উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টি বা বিহারের লালুর দল, অনেকদিন বিজেপি শিবিরে থেকেও পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব রাখা উড়িষ্যার বিজু জনতা দলÑ এরা শেষ পর্যন্ত আরএসএসের এই সামাজিক প্রযুক্তিজনিত যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সামাজিক মেরুকরণ, তার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না।
ফলশ্রুতিতে নির্বাচনী সংগ্রামে তারা শেষপর্যন্ত পিছিয়ে পড়ে। জিতে যায় ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি। জিতে যায় ধর্মান্ধ সম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপির সহযোগী প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িকতার ধারক বাহক তৃণমূল কংগ্রেসের মতো আঞ্চলিক দলগুলো।
বিগত তিন বছর আগে সিপিআইয়ের (এম) যে পার্টি কংগ্রেস হয়, সেই সময় থেকে পরবর্তী তিন বছরে ভারতের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মান্ধ হিন্দু সাম্প্রদায়িক ঝোঁক আরো প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ঘটনাবলীর প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাব এবং প্রয়োগের প্রতিপত্তি বাড়াবার লক্ষ্যে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে একটা ভয়ংকর প্রতিযোগিতা চলছে। খোদ আইনসভার কক্ষকে যেমন কেন্দ্রে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দলীয় প্রচারের একটা যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন, ঠিক সেই ভাবেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা তে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আইনসভায় বিরোধী নেতা, প্রকৃত অর্থে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতিতে যার বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই, সেই শুভেন্দু অধিকারী, হিন্দু সম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ধরনের পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন, পশ্চিমবঙ্গের আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, তার থেকে একটা কথাই বলতে পারে যে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে একটা ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
মোদি, অমিত শাহের মুখে যেমন ভারতের অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে, বে রোজগারি ঘিরে, ভয়াবহ দুর্নীতি ঘিরে একটা শব্দ উচ্চারিত হচ্ছে না, ঠিক সেই ভাবেই মমতা-শুভেন্দুর কন্ঠ থেকেও একটিবারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূলের সীমাহীন দুর্নীতি ঘিরে কোনো সুনির্দিষ্ট পথ নির্দেশিকা নেই। পথ নির্দেশিকা নেই পশ্চিমবঙ্গের ভয়াবহ বেকারত্ব, আর্থিক সংকট, নারী নির্যাতন ঘিরে। কোনো কিছুর দিশা নেই। কেবল রয়েছে, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের নামে তৃণমূল আর বিজেপির পারস্পরিক দরকষাকষি।
ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে, বহু ভাষা-ধর্ম-জনগোষ্ঠীর সম্মিলন যেখানে রয়েছে, এখানে কোনো ব্যক্তি যদি তার মতাদর্শের নিরিখে নাস্তিকতার পথে হাঁটেন, সেক্ষেত্রে তার ধর্মপ্রাণ মানুষকে আঘাত করবার কোনো অধিকার নেই। ধর্মান্ধতার সঙ্গে নাস্তিকতার, সভ্যতার, সংস্কৃতির সংঘাত আছে। দ্বন্দ্ব আছে।
কিন্তু ধর্মপ্রাণতার সঙ্গে ধর্মান্ধতার যেমন কোনো সম্পর্ক নেই, একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ মাত্রই যে তিনি ধর্মান্ধÑ এই সরলীকরণ যেমন অত্যন্ত ভুল। ঠিক তেমনিই ধর্মপ্রাণতার সঙ্গে নাস্তিকতারও কোনো সংঘাত নেই। একজন প্রকৃত ধর্মপ্রাণ মানুষ,কখনো ধর্মান্ধতার কবলে পড়েন না। আবার নাস্তিকতার সঙ্গেও তার কোনরকম সংঘাত নেই। তিনি তার নিজের বিশ্বাস, নিজের বোধ নিয়ে চলেন। সেই বোধ কখনোই পরমত,পর ধর্মের প্রতি সংঘাত মূলক হয় না।
ভারতে অতীতে ধর্ম কে কেন্দ্র করে অতীতে কমিউনিস্ট নেতৃত্বেদের যে বোধ এবং ধ্যান ধারণার জায়গা ছিল,তাকে সময়োপযোগী করে তোলবার ক্ষেত্রে সিপিআইয়ের (এম) বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্বের ভূমিকা ঐতিহাসিক। এ প্রসঙ্গে বিশেষ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয় প্রয়াত সিপিআই (এম ) নেতা সীতারাম ইয়েচুরি এবং মোহাম্মদ সেলিমকে। আর তাদের পূর্বসূরী হিসেবে এই বোধের উন্মিলন ঘটানোর ক্ষেত্রে একজন স্তম্ভ হিসেবে স্মরণ করতে হয় প্রয়াত ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদকে।
জ্যোতি বসুর মতো ব্যক্তিত্ব, যার বাস্তববোধ ভারতের রাজনীতিতে একমাত্র তুলনীয় প-িত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে। তিনি কখনোই ধর্ম ঘিরে কোনোরকম অতিরিক্ত উৎসাহ একটি বারের জন্য দেখান নি। যাপনচিত্রে তিনি ছিলেন নাস্তিক। কিন্তু যিনি ধর্মপ্রাণ, তাকে ঘিরে জ্যোতিবাবুর কোনোদিনও কোনোরকম ব্যক্তিঅসুয়া কাজ করেনি। আবার কোনো ধর্মান্ধ,সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ব্যক্তি বা সম্প্রদায় ঘিরে কোনোদিন কোনো রকম দুর্বলতার প্রকাশও জ্যোতি বাবু করেননি। ধর্মান্ধতা ঘিরে জ্যোতিবাবুর যে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক অবস্থান, সেটি শুধু কমিউনিস্টদের কৃতিত্ব হিসেবে পরিগণিত হয় না। সার্বিকভাবে ভারতীয় রাজনীতিকদের ধর্মান্ধতা রোখবার ক্ষেত্রে কৃতিত্বের যে খতিয়ান, তাতে জ্যোতিবাবুর নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ইএমএসের তাত্ত্বিক অবস্থান, জ্যোতিবাবুর বাস্তববোধ এই দুইয়ের সম্মিলিত ধারা স্রোতের সঙ্গে সীতারাম বা সেলিমের রাজনৈতিক বোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে হরকিষাণ সিং সুরজিতের রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সবাইকে নিয়ে চলবার বাস্তব প্রতিমূর্তির প্রভাব। সেদিক থেকে বলতে পারা যায় যে, জর্জি দিমিট্রভেল যে যুক্ত ফ্রন্টের তত্ত্ব, তার জন্য এক বাস্তব সম্মেলন ঘটেছিল সুরজিতের সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে।
এই ধারাটির নির্যাস সিপিআই (এম) তাদের পার্টি কংগ্রেস উপলক্ষের যে নিজেদের দলের নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত খসড়া কর্মসূচি প্রকাশ করেছে, তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি। ধর্ম নিরপেক্ষতার সঠিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের মধ্যে মতো বৈচিত্র্যময় দেশে ধর্মপ্রাণ মানুষদেরও যে সেন্টিমেন্ট, তাকে সঠিকভাবে মর্যাদা না দিলে সেটা যে ধর্মান্ধ শক্তির দিকে প্রসারিত হতে পারেÑ এই বাস্তববোধের অপূর্ব প্রকাশ সিপিআই (এম) দলটির খসড়া কর্মসূচির মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই ভাবনা হলো; বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত ধরনের ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, মৌলবাদী মানসিকতা এবং ফ্যাসিস্ট প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সব থেকে উত্তম কার্যকরী মহৌষধ।
[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]