শেখর ভট্টাচার্য
রাজনীতির ভাষাতে টীকা-টিপ্পনী, রসিকতা, রঙ্গব্যঙ্গ ছিল সবসময়। তবে শব্দ ব্যবহারের একটি মান ছিল। প্রতিপক্ষের মতামতের সমালোচনা ছিল, অন্যপক্ষের আদর্শ যে ঠুনকো কিংবা দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক নয় এসব বিষয়ে জাতীয় নেতাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তৃতায় নানা ভাবে উঠে আসতো।
আজ ভাষার রাজনীতি অনেকাংশে কৌশলগত বিভাজনের রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে। শব্দচয়ন দিয়ে প্রতিপক্ষকে অমানবিক, অযোগ্য বা দেশবিরোধী প্রমাণের প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে; সংক্ষিপ্ত, তীব্র এবং উত্তেজনাপূর্ণ বাক্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যুক্তিনির্ভর দীর্ঘ বক্তব্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষা ক্রমে স্লোগাননির্ভর, আবেগপ্রবণ এবং কখনো কখনো বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে উঠছে
তবে শ্লীলতা, সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করতে দেখা যেত না; এমনকি পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শাসন, শোষণ, সাংস্কৃতিক আগ্রসনের প্রতি ক্রোধ ছিল, অসুন্তুষ্টি ছিল কিন্তু এর প্রতিবাদেও কোন অশ্লীলতা ছিল না। রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা বক্তৃতাতে কখনো খিস্তি-খেউড় শোনা যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির ভাষা যে দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, এটি অনেকেই অনুধাবন করতে পারলেও খুব কমসংখ্যক মানুষ এ নিয়ে কথা বলছেন। সহস্রাব্দের শুরুর দিক পর্যন্ত রাজনীতির ভাষার সঙ্গে হাল আমলের রাজনীতির ভাষার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান এখন কোন পর্যায়ে আছে। রাজনীতিতে বাদ প্রতিবাদ, বহু মত, বহু পথ সব সময়েই ছিল। ভিন্ন আদর্শ, ভিন্নমত থাকলেও সহাবস্থানও ছিল। রাজনৈতিক সৌজন্য, ভদ্রতা ছিল বলতে গেলে সহস্রাব্দের গোড়ার দিক পর্যন্ত। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক স্লোগান, বক্তৃতাতে ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য, দেহভঙ্গি যে স্তরে নেমেছে মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবর রহমান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, জিয়াউর রহমানের মতো মতো নেতারা বেঁচে থাকলে বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে যেতেন।
মফস্বলে বেড়ে উঠেছি। প্রাকযৌবন পর্যন্ত কেটেছে সিলেট শহরে। সিলেটের ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি মাঠের খুব কাছে ছিল বসবাস। মওলানা আবুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মোজফফর আহমদ, কমরেড মনিসিংসহ সমসাময়িক সব নেতার বক্তব্য সরাসরি শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। স্বাধীনতা-পূর্ব কিংবা স্বাধীনতা-উত্তরকালে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়নি ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি মাঠে। সময় ও সুযোগ কোন কারণে মিলে যায়নি তাই হয়তো তার বক্তব্য সরাসরি রেজেস্ট্রি মাঠে শোনা হয়নি। ন্যাপ নেতা মোজাফফর আহমেদ ছিলেন সোভিয়েতপন্থী জাতীয় নেতা। তার রসবোধ ছিল প্রবল। মওলানা ভাসানীও কম যান না। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে কোন বিপর্যয়ে কিংবা বাংলাদেশে সোভিয়েত বিরোধী যে কোন আন্দোলনে তিনি উদ্বিগ্ন হতেন। মেঠো বক্তৃতায় তিনি তার যৌক্তিক অবস্থান তুলে ধরতেন। মওলানা ভাসানী, মোজাফফর আহমদকে টিপ্পনী কেটে বলতেন ‘অধ্যাপক মোজাফফর সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে বৃষ্টি পড়লে, ছাতা ধরেন ঢাকাতে বসে। বৃষ্টির সব পানি ঢাকাতে ঢেলে দিয়ে তিনি বন্যার সৃষ্টি করেন।’ ভাসানীর ভারত বিরোধিতার জবাব দিতে গিয়ে মেঠো বক্তৃতায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলতেন, ‘মাওলানা সাহেবকে একটি মশা কামড় দিলেই তিনি অভিযোগ করেন, মশাটি ইন্দিরা গান্ধী পাঠিয়েছে। মাওলানা সাহেবের চোখের সামনে ভারত থাকে। তিনি বড় ভারতপ্রেমিক।’ বক্তৃতার ভাষা অধিকাংশ সময় ছিল আঞ্চলিক, গণমানুষের বোধগম্য ভাষা। মেঠো বক্তৃতায় প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহার করতেন তারা তবে খুব সীমিত পরিসরে। এই যে পরস্পরের মতামতের বিরোধিতায় উচ্চ রসবোধের পরিচয় তারা রাখতেন, বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে কিন্তু তা বিরল। রস করতে গিয়ে যে নিম্ন স্তরের ভাড়ামি, অশ্লীলতার আশ্রয় নেয়া হয় তা শুনলে কানে তুলো গুজে দিতে হয়। স্বাধীনতা-পূর্ব থেকে দুহাজার সালের প্রারম্ভ পর্যন্ত রাজনীতির ভাষায় উচ্চ রসের মাধ্যমে ভিন্ন মতের যুক্তির খ-ন করা হলেও দেহভঙ্গি শব্দ, বাক্যে কখনো হিংসা, বিদ্বেসের প্রকাশ ছিল না। সময়ের আবর্তে সব কিছুর পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন অনিবার্য। পরিবর্তনে যদি অশ্লীলতা অসৌজন্যতা অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে এটি একটি দেশের সামগ্রিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব যে ফেলবে এ কথা বলাই বাহুল্য।
এক সময় বিতর্ক ছিল, রাজনীতির ভাষা প্রমিত হবে নাকি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হবে। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক খুব যৌক্তিক। সাম্প্রতিক সময়ে মুখের ভাষা, সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে অশ্রাব্য, শ্রুতিকটু যে সব শব্দ এবং বাক্য যে হারে অনুশীলিত হচ্ছে মনে হয় রাজনীতির ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতির ভাষাকেও প্রভাবিত করবে। সাহিত্য সংস্কৃতির ভাষা নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। এ নিয়ে ভিন্ন মত গুলোর মধ্যে সৌন্দর্য আছে। ভিন্ন মতগুলোতে আছে ভাষার প্রমিতকরণ নিয়ে বিতর্ক। সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন নিয়ে হতাশা। বাংলার চেয়ে ইংরেজি, হিন্দি ভাষার প্রতি বাঙালির আকর্ষণ ও মোহ ক্রমান্বয়য়ে বেড়ে চলা। এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ সুশীল সমাজের মধ্যে থাকা খুব স্বাভাবিক। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা নিয়েও আমাদের অনাগ্রহ আছে; সঠিক ইতিহাস রচনা ও প্রচারে প্রতিবন্ধকতা ও অস্পষ্ট আছে।ভাষা নিয়ে রাজনীতি খুব দৃশ্যমান। যে ভাষা একদিন রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই ভাষাই আজ রাজনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
এই বাস্তবতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, রাজনীতির ক্ষেত্রে ভাষা শুধু রাজনীতির যোগাযোগ মাধ্যম নয়; ভাষা ক্ষমতারও হাতিয়ার। যে ভাষায় একদিন মওলানা আবুল হামিদ খান ভাসানী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উচ্চারণ করেছিলেন, যে ভাষায় শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের ডাক দিয়েছিলেন, যে ভাষায় মোজাফফর আহমেদ সমাজতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন কিংবা জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করেছিলেনÑ সেই ভাষার ভেতর ছিল আত্মমর্যাদা, ছিল দায়বদ্ধতা। মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু ব্যক্তিহানির প্রতিযোগিতা ছিল না।
আজ ভাষার রাজনীতি অনেকাংশে কৌশলগত বিভাজনের রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে। শব্দচয়ন দিয়ে প্রতিপক্ষকে অমানবিক, অযোগ্য বা দেশবিরোধী প্রমাণের প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে; সংক্ষিপ্ত, তীব্র এবং উত্তেজনাপূর্ণ বাক্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যুক্তিনির্ভর দীর্ঘ বক্তব্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষা ক্রমে স্লোগাননির্ভর, আবেগপ্রবণ এবং কখনো কখনো বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাজনীতির ভাষার এই বিপর্যয় কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিক্ষাঙ্গন, গণমাধ্যম, এমনকি পারিবারিক আলাপচারিতাকেও প্রভাবিত করে। যখন নেতারা শালীনতার সীমা অতিক্রম করেন, তখন অনুসারীরাও সেটিকে বৈধতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এতে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা কমে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়।
রাজনীতির ভাষার পুনর্মূল্যায়ন খুব জরুরি। প্রমিত না আঞ্চলিক, সেই বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো শালীনতা ও দায়িত্ববোধ। রাজনৈতিক ভাষা হতে পারে তীক্ষè, কিন্তু তা যেন শিষ্টাচারবর্জিত না হয়; হতে পারে ব্যঙ্গাত্মক, কিন্তু তা যেন মানবিক মর্যাদা ক্ষুণœ না করে। কারণ ভাষাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির আয়না। ভাষা যদি সংযত, যুক্তিনিষ্ঠ ও সম্মাননির্ভর হয়, তবে রাজনীতিও সেই পথে পরিচালিত হবে। আর ভাষা যদি বিদ্বেষে কলুষিত হয়, তবে তার প্রতিফলন সমাজজীবনের সর্বত্র অনিবার্য হয়ে উঠবে। তবে, সকল বিপন্নতার মধ্যেও থাকে সম্ভাবনা, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাঙালি তার ভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত করতে আগ্রহী হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা নতুন দিনে, নতুন প্রত্যয়ে আলো ছড়াবে দুনিয়াজুড়ে। ইতিবাচক মানুষ হিসেবে আমাদের শুধু প্রত্যাশা করলেই হবেনা। প্রয়োজন সময়ের দাবি মিটিয়ে নতুন পরিকল্পনা এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শেখর ভট্টাচার্য
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
রাজনীতির ভাষাতে টীকা-টিপ্পনী, রসিকতা, রঙ্গব্যঙ্গ ছিল সবসময়। তবে শব্দ ব্যবহারের একটি মান ছিল। প্রতিপক্ষের মতামতের সমালোচনা ছিল, অন্যপক্ষের আদর্শ যে ঠুনকো কিংবা দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক নয় এসব বিষয়ে জাতীয় নেতাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বক্তৃতায় নানা ভাবে উঠে আসতো।
আজ ভাষার রাজনীতি অনেকাংশে কৌশলগত বিভাজনের রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে। শব্দচয়ন দিয়ে প্রতিপক্ষকে অমানবিক, অযোগ্য বা দেশবিরোধী প্রমাণের প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে; সংক্ষিপ্ত, তীব্র এবং উত্তেজনাপূর্ণ বাক্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যুক্তিনির্ভর দীর্ঘ বক্তব্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষা ক্রমে স্লোগাননির্ভর, আবেগপ্রবণ এবং কখনো কখনো বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে উঠছে
তবে শ্লীলতা, সৌজন্যের সীমা অতিক্রম করতে দেখা যেত না; এমনকি পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শাসন, শোষণ, সাংস্কৃতিক আগ্রসনের প্রতি ক্রোধ ছিল, অসুন্তুষ্টি ছিল কিন্তু এর প্রতিবাদেও কোন অশ্লীলতা ছিল না। রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা বক্তৃতাতে কখনো খিস্তি-খেউড় শোনা যায়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির ভাষা যে দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, এটি অনেকেই অনুধাবন করতে পারলেও খুব কমসংখ্যক মানুষ এ নিয়ে কথা বলছেন। সহস্রাব্দের শুরুর দিক পর্যন্ত রাজনীতির ভাষার সঙ্গে হাল আমলের রাজনীতির ভাষার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান এখন কোন পর্যায়ে আছে। রাজনীতিতে বাদ প্রতিবাদ, বহু মত, বহু পথ সব সময়েই ছিল। ভিন্ন আদর্শ, ভিন্নমত থাকলেও সহাবস্থানও ছিল। রাজনৈতিক সৌজন্য, ভদ্রতা ছিল বলতে গেলে সহস্রাব্দের গোড়ার দিক পর্যন্ত। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক স্লোগান, বক্তৃতাতে ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য, দেহভঙ্গি যে স্তরে নেমেছে মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবর রহমান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, জিয়াউর রহমানের মতো মতো নেতারা বেঁচে থাকলে বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে যেতেন।
মফস্বলে বেড়ে উঠেছি। প্রাকযৌবন পর্যন্ত কেটেছে সিলেট শহরে। সিলেটের ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি মাঠের খুব কাছে ছিল বসবাস। মওলানা আবুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মোজফফর আহমদ, কমরেড মনিসিংসহ সমসাময়িক সব নেতার বক্তব্য সরাসরি শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। স্বাধীনতা-পূর্ব কিংবা স্বাধীনতা-উত্তরকালে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়নি ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি মাঠে। সময় ও সুযোগ কোন কারণে মিলে যায়নি তাই হয়তো তার বক্তব্য সরাসরি রেজেস্ট্রি মাঠে শোনা হয়নি। ন্যাপ নেতা মোজাফফর আহমেদ ছিলেন সোভিয়েতপন্থী জাতীয় নেতা। তার রসবোধ ছিল প্রবল। মওলানা ভাসানীও কম যান না। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে কোন বিপর্যয়ে কিংবা বাংলাদেশে সোভিয়েত বিরোধী যে কোন আন্দোলনে তিনি উদ্বিগ্ন হতেন। মেঠো বক্তৃতায় তিনি তার যৌক্তিক অবস্থান তুলে ধরতেন। মওলানা ভাসানী, মোজাফফর আহমদকে টিপ্পনী কেটে বলতেন ‘অধ্যাপক মোজাফফর সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে বৃষ্টি পড়লে, ছাতা ধরেন ঢাকাতে বসে। বৃষ্টির সব পানি ঢাকাতে ঢেলে দিয়ে তিনি বন্যার সৃষ্টি করেন।’ ভাসানীর ভারত বিরোধিতার জবাব দিতে গিয়ে মেঠো বক্তৃতায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলতেন, ‘মাওলানা সাহেবকে একটি মশা কামড় দিলেই তিনি অভিযোগ করেন, মশাটি ইন্দিরা গান্ধী পাঠিয়েছে। মাওলানা সাহেবের চোখের সামনে ভারত থাকে। তিনি বড় ভারতপ্রেমিক।’ বক্তৃতার ভাষা অধিকাংশ সময় ছিল আঞ্চলিক, গণমানুষের বোধগম্য ভাষা। মেঠো বক্তৃতায় প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহার করতেন তারা তবে খুব সীমিত পরিসরে। এই যে পরস্পরের মতামতের বিরোধিতায় উচ্চ রসবোধের পরিচয় তারা রাখতেন, বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে কিন্তু তা বিরল। রস করতে গিয়ে যে নিম্ন স্তরের ভাড়ামি, অশ্লীলতার আশ্রয় নেয়া হয় তা শুনলে কানে তুলো গুজে দিতে হয়। স্বাধীনতা-পূর্ব থেকে দুহাজার সালের প্রারম্ভ পর্যন্ত রাজনীতির ভাষায় উচ্চ রসের মাধ্যমে ভিন্ন মতের যুক্তির খ-ন করা হলেও দেহভঙ্গি শব্দ, বাক্যে কখনো হিংসা, বিদ্বেসের প্রকাশ ছিল না। সময়ের আবর্তে সব কিছুর পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন অনিবার্য। পরিবর্তনে যদি অশ্লীলতা অসৌজন্যতা অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে এটি একটি দেশের সামগ্রিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব যে ফেলবে এ কথা বলাই বাহুল্য।
এক সময় বিতর্ক ছিল, রাজনীতির ভাষা প্রমিত হবে নাকি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হবে। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক খুব যৌক্তিক। সাম্প্রতিক সময়ে মুখের ভাষা, সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে অশ্রাব্য, শ্রুতিকটু যে সব শব্দ এবং বাক্য যে হারে অনুশীলিত হচ্ছে মনে হয় রাজনীতির ভাষা সাহিত্য, সংস্কৃতির ভাষাকেও প্রভাবিত করবে। সাহিত্য সংস্কৃতির ভাষা নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। এ নিয়ে ভিন্ন মত গুলোর মধ্যে সৌন্দর্য আছে। ভিন্ন মতগুলোতে আছে ভাষার প্রমিতকরণ নিয়ে বিতর্ক। সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন নিয়ে হতাশা। বাংলার চেয়ে ইংরেজি, হিন্দি ভাষার প্রতি বাঙালির আকর্ষণ ও মোহ ক্রমান্বয়য়ে বেড়ে চলা। এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ সুশীল সমাজের মধ্যে থাকা খুব স্বাভাবিক। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চা নিয়েও আমাদের অনাগ্রহ আছে; সঠিক ইতিহাস রচনা ও প্রচারে প্রতিবন্ধকতা ও অস্পষ্ট আছে।ভাষা নিয়ে রাজনীতি খুব দৃশ্যমান। যে ভাষা একদিন রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই ভাষাই আজ রাজনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
এই বাস্তবতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, রাজনীতির ক্ষেত্রে ভাষা শুধু রাজনীতির যোগাযোগ মাধ্যম নয়; ভাষা ক্ষমতারও হাতিয়ার। যে ভাষায় একদিন মওলানা আবুল হামিদ খান ভাসানী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উচ্চারণ করেছিলেন, যে ভাষায় শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের ডাক দিয়েছিলেন, যে ভাষায় মোজাফফর আহমেদ সমাজতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন কিংবা জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদের নতুন ব্যাখ্যা হাজির করেছিলেনÑ সেই ভাষার ভেতর ছিল আত্মমর্যাদা, ছিল দায়বদ্ধতা। মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু ব্যক্তিহানির প্রতিযোগিতা ছিল না।
আজ ভাষার রাজনীতি অনেকাংশে কৌশলগত বিভাজনের রাজনীতিতে রূপ নিয়েছে। শব্দচয়ন দিয়ে প্রতিপক্ষকে অমানবিক, অযোগ্য বা দেশবিরোধী প্রমাণের প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে; সংক্ষিপ্ত, তীব্র এবং উত্তেজনাপূর্ণ বাক্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যুক্তিনির্ভর দীর্ঘ বক্তব্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষা ক্রমে স্লোগাননির্ভর, আবেগপ্রবণ এবং কখনো কখনো বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাজনীতির ভাষার এই বিপর্যয় কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিক্ষাঙ্গন, গণমাধ্যম, এমনকি পারিবারিক আলাপচারিতাকেও প্রভাবিত করে। যখন নেতারা শালীনতার সীমা অতিক্রম করেন, তখন অনুসারীরাও সেটিকে বৈধতা হিসেবে গ্রহণ করেন। এতে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা কমে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়।
রাজনীতির ভাষার পুনর্মূল্যায়ন খুব জরুরি। প্রমিত না আঞ্চলিক, সেই বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো শালীনতা ও দায়িত্ববোধ। রাজনৈতিক ভাষা হতে পারে তীক্ষè, কিন্তু তা যেন শিষ্টাচারবর্জিত না হয়; হতে পারে ব্যঙ্গাত্মক, কিন্তু তা যেন মানবিক মর্যাদা ক্ষুণœ না করে। কারণ ভাষাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির আয়না। ভাষা যদি সংযত, যুক্তিনিষ্ঠ ও সম্মাননির্ভর হয়, তবে রাজনীতিও সেই পথে পরিচালিত হবে। আর ভাষা যদি বিদ্বেষে কলুষিত হয়, তবে তার প্রতিফলন সমাজজীবনের সর্বত্র অনিবার্য হয়ে উঠবে। তবে, সকল বিপন্নতার মধ্যেও থাকে সম্ভাবনা, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাঙালি তার ভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত করতে আগ্রহী হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা নতুন দিনে, নতুন প্রত্যয়ে আলো ছড়াবে দুনিয়াজুড়ে। ইতিবাচক মানুষ হিসেবে আমাদের শুধু প্রত্যাশা করলেই হবেনা। প্রয়োজন সময়ের দাবি মিটিয়ে নতুন পরিকল্পনা এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন।
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]