alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

শহীদুল ইসলাম

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট : বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প বর্তমানে দেশের অর্থনীতির অন্যতম দ্রুত বিকাশমান ও সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হয়েছে। কৃষিনির্ভর উৎপাদন কাঠামো, দ্রুত নগরায়ণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ এবং ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে এই শিল্প নতুন গতি অর্জন করেছে।

কোল্ড-চেইন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। খাদ্যনিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নের জটিলতা, পরীক্ষাগার সুবিধার অভাব এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনের সীমাবদ্ধতা রপ্তানি সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি তৈরি করছে

বর্তমানে দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বাজারমূল্য প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৮৬ হাজার কোটি টাকা। খাতটি গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ বার্ষিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই শিল্প সরাসরি কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন করে, শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগকে শক্তিশালী করে। কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প (অ্যাগ্রো-প্রসেসিং) খাত একাই দেশের জিডিপিতে প্রায় ১.৫-২ শতাংশ অবদান রাখে এবং কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য বাজারে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। নগরায়ণ, কর্মজীবী নারী-পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যস্ততা এবং আয়ের বৃদ্ধি-এসব কারণ ভোক্তাদের দ্রুত প্রস্তুত ও সুবিধাজনক খাদ্যের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্যাকেটজাত খাদ্য বাজারের আকার প্রায় ৪৮-৫৪ হাজার কোটি টাকা, যা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নুডলস, বিস্কুট, বেকারি পণ্য, চিপস ও স্ন্যাকস, জুস, দুগ্ধজাত পণ্য, মসলা, রেডি-টু-কুক খাবার এবং হিমায়িত খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এই খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮-৯ শতাংশ বজায় থাকতে পারে। বাংলাদেশের খাদ্য ও পানীয় খাত সামগ্রিকভাবে একটি বৃহৎ ভোক্তা বাজারে পরিণত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, নগর বিস্তার এবং আধুনিক খুচরা বাজারব্যবস্থার বিকাশের ফলে ২০২৫-২০৩১ সময়কালে এই খাত প্রায় ৪-৫ শতাংশ যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। একই সঙ্গে হিমায়িত খাদ্যবাজার ইতোমধ্যে প্রায় ১০-১২ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি দ্রুত সম্প্রসারণশীল উপখাতে পরিণত হয়েছে। উন্নত কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা, সুপারশপ সংস্কৃতি এবং দ্রুত প্রস্তুত খাবারের চাহিদা এই খাতের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের খাদ্যসেবা ও রেস্তোরাঁ খাতও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নগর মধ্যবিত্তের বিস্তার, তরুণ জনগোষ্ঠীর জীবনধারা পরিবর্তন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এই খাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৫ সালে খাদ্যসেবা খাতের বাজার আকার প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৮৬ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করতে পারে এবং বছরে প্রায় ১২-১৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। অনলাইন খাবার সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম, ক্লাউড কিচেন এবং আন্তর্জাতিক ফ্রাঞ্চাইজি ব্রান্ডের প্রবেশ এই প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বাংলাদেশের শক্তিশালী কৃষি উৎপাদন খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে। দেশ বছরে বিপুল পরিমাণ ধান, সবজি, ফল, মাছ, মাংস ও মসলা উৎপাদন করে, যা মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে বাজারজাত করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশ ১৪০টিরও বেশি দেশে ৭০০-এর বেশি ধরনের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে। বিশেষ করে হিমায়িত মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, সবজি, মসলা, বিস্কুট, স্ন্যাকস এবং হালাল খাদ্য আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। বিশ্ববাজারে হালাল খাদ্য, এথনিক ফুড এবং প্রস্তুত রান্নার উপকরণের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী এ বাজারের একটি বড় অংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং আধুনিক প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ এই বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়েছে। সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প পার্ক, আধুনিক কোল্ড-স্টোরেজ এবং লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আধুনিক প্রক্রিয়াজাত কারখানা এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ বাড়ছে। বহুজাতিক কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক খাদ্য ব্রান্ডগুলোর জন্য বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার খাদ্যশিল্পকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, খাদ্যের ট্রেসেবিলিটি, স্মার্ট কোল্ড-চেইন এবং ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থাপনা খাদ্যের অপচয় কমাতে এবং মান নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে ই-কমার্স, অনলাইন গ্রোসারি এবং সরাসরি কৃষক-থেকে-ভোক্তা সরবরাহ ব্যবস্থা খাদ্য বিপণন ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। তবে এই খাতের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোল্ড-চেইন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। খাদ্যনিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নের জটিলতা, পরীক্ষাগার সুবিধার অভাব এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনের সীমাবদ্ধতা রপ্তানি সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, টেকসই জল ব্যবস্থাপনা, খাদ্য অপচয় হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। একই সঙ্গে টেকসই মৎস্যচাষ, আধুনিক পশুপালন এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা খাদ্যশিল্পের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধিশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার, বৈশ্বিক রপ্তানি সুযোগ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের শক্তিশালী ভিত্তি-সব মিলিয়ে এই শিল্প ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যথাযথ নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]

মহাকাশ অর্থনীতি

কুষ্ঠ : নতুন সরকার ও একটি জাতীয় বিষয়ে প্রত্যাশা

ভাষার রাজনীতি এবং রাজনীতির ভাষা

ছবি

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ছবি

মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষায় সমতা নিশ্চিতের আহ্বান

কৃষিপণ্যের মূল্য শৃঙ্খলে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

ছবি

নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার

মানুষ কি বদলেছে, নাকি শুধু রং বদলিয়েছে?

সময় জীবনে চলার পথ দেখিয়ে দেয়

কালো ও সবুজ চা : জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্ব

বাঙালিরা ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়

অন্তর্বর্তী সরকার জাতিকে কী দিল

ভালোবাসা, সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য বাস্তবতা

ভালোবাসার দিনে সুন্দরবন: উদযাপনের আড়ালে অস্তিত্বের সংকট

ছবি

তিরাশির সেই দিন

অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নতুন সরকারকে

সবুজ অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সম্ভাবনা, সংকট ও করণীয়

গণতন্ত্র: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা

‘ভোট দিছি ভাই, ছিল দিছি...’

নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

কার হাতে উঠবে শাসনের রাজদণ্ড

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প

শহীদুল ইসলাম

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প বর্তমানে দেশের অর্থনীতির অন্যতম দ্রুত বিকাশমান ও সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হয়েছে। কৃষিনির্ভর উৎপাদন কাঠামো, দ্রুত নগরায়ণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্প্রসারণ এবং ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে এই শিল্প নতুন গতি অর্জন করেছে।

কোল্ড-চেইন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। খাদ্যনিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নের জটিলতা, পরীক্ষাগার সুবিধার অভাব এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনের সীমাবদ্ধতা রপ্তানি সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি তৈরি করছে

বর্তমানে দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বাজারমূল্য প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৮৬ হাজার কোটি টাকা। খাতটি গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ বার্ষিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই শিল্প সরাসরি কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন করে, শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করে এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে শিল্প খাতের সংযোগকে শক্তিশালী করে। কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প (অ্যাগ্রো-প্রসেসিং) খাত একাই দেশের জিডিপিতে প্রায় ১.৫-২ শতাংশ অবদান রাখে এবং কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য বাজারে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। নগরায়ণ, কর্মজীবী নারী-পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যস্ততা এবং আয়ের বৃদ্ধি-এসব কারণ ভোক্তাদের দ্রুত প্রস্তুত ও সুবিধাজনক খাদ্যের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্যাকেটজাত খাদ্য বাজারের আকার প্রায় ৪৮-৫৪ হাজার কোটি টাকা, যা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নুডলস, বিস্কুট, বেকারি পণ্য, চিপস ও স্ন্যাকস, জুস, দুগ্ধজাত পণ্য, মসলা, রেডি-টু-কুক খাবার এবং হিমায়িত খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এই খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮-৯ শতাংশ বজায় থাকতে পারে। বাংলাদেশের খাদ্য ও পানীয় খাত সামগ্রিকভাবে একটি বৃহৎ ভোক্তা বাজারে পরিণত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, নগর বিস্তার এবং আধুনিক খুচরা বাজারব্যবস্থার বিকাশের ফলে ২০২৫-২০৩১ সময়কালে এই খাত প্রায় ৪-৫ শতাংশ যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। একই সঙ্গে হিমায়িত খাদ্যবাজার ইতোমধ্যে প্রায় ১০-১২ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি দ্রুত সম্প্রসারণশীল উপখাতে পরিণত হয়েছে। উন্নত কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা, সুপারশপ সংস্কৃতি এবং দ্রুত প্রস্তুত খাবারের চাহিদা এই খাতের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের খাদ্যসেবা ও রেস্তোরাঁ খাতও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নগর মধ্যবিত্তের বিস্তার, তরুণ জনগোষ্ঠীর জীবনধারা পরিবর্তন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এই খাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৫ সালে খাদ্যসেবা খাতের বাজার আকার প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৮৬ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করতে পারে এবং বছরে প্রায় ১২-১৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। অনলাইন খাবার সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম, ক্লাউড কিচেন এবং আন্তর্জাতিক ফ্রাঞ্চাইজি ব্রান্ডের প্রবেশ এই প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বাংলাদেশের শক্তিশালী কৃষি উৎপাদন খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে। দেশ বছরে বিপুল পরিমাণ ধান, সবজি, ফল, মাছ, মাংস ও মসলা উৎপাদন করে, যা মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে বাজারজাত করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশ ১৪০টিরও বেশি দেশে ৭০০-এর বেশি ধরনের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে। বিশেষ করে হিমায়িত মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, সবজি, মসলা, বিস্কুট, স্ন্যাকস এবং হালাল খাদ্য আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। বিশ্ববাজারে হালাল খাদ্য, এথনিক ফুড এবং প্রস্তুত রান্নার উপকরণের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী এ বাজারের একটি বড় অংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং আধুনিক প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ এই বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়েছে। সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প পার্ক, আধুনিক কোল্ড-স্টোরেজ এবং লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আধুনিক প্রক্রিয়াজাত কারখানা এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ বাড়ছে। বহুজাতিক কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক খাদ্য ব্রান্ডগুলোর জন্য বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার খাদ্যশিল্পকে আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, খাদ্যের ট্রেসেবিলিটি, স্মার্ট কোল্ড-চেইন এবং ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থাপনা খাদ্যের অপচয় কমাতে এবং মান নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে ই-কমার্স, অনলাইন গ্রোসারি এবং সরাসরি কৃষক-থেকে-ভোক্তা সরবরাহ ব্যবস্থা খাদ্য বিপণন ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। তবে এই খাতের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোল্ড-চেইন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ও সংরক্ষণ সমস্যার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। খাদ্যনিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নের জটিলতা, পরীক্ষাগার সুবিধার অভাব এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন অর্জনের সীমাবদ্ধতা রপ্তানি সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, টেকসই জল ব্যবস্থাপনা, খাদ্য অপচয় হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। একই সঙ্গে টেকসই মৎস্যচাষ, আধুনিক পশুপালন এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা খাদ্যশিল্পের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প একটি উচ্চ প্রবৃদ্ধিশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজার, বৈশ্বিক রপ্তানি সুযোগ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের শক্তিশালী ভিত্তি-সব মিলিয়ে এই শিল্প ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যথাযথ নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]

back to top