alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে গাছ লাগানোর গুরুত্ব

মতিউর রহমান

: বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এটি আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার আধিক্য, প্লাবনভূমি, উচ্চ দারিদ্রের হার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অত্যাধিক নির্ভরতার কারণে। এটি এখন ক্রমাগত দৃশ্যমান যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে, বৈশ্বিক উষ্ণতা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসঙ্গে খাদ্য উৎপাদনশীলতা এবং সুপেয় পানির প্রাপ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও পরিবেশগত বিপর্যয় ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী ব্যাপক অভিবাসন বাড়ছে। বিভিন্ন সংক্রামক রোগ-ব্যাধি বাড়ছে। আমরা ইতোমধ্যে করোনা মহামারীর মতো সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলা করছি। এছাড়াও ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং কলেরার মতো অসুখও ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা, খরা, দাবানল ইত্যাদি ঘটনা আমরা নিয়মিত প্রত্যক্ষ করছি।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র মানব উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে প্রভাবিত করছে না বরং মানব নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে অন্য কোনো দেশ এর প্রভাব ভালো জানে না, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ভুগছে। বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়া বা আকস্মিক, মারাত্মক বিপর্যয়মূলক বন্যা হওয়া এবং তাপমাত্রার তীব্রতা সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ক্ষয়, ঘূর্ণিঝড়, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, কৃষি জমি সঙ্কুচিত হওয়া এবং স্থানীয় অভিবাসনের মতো নির্মম প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ। বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিজমিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের কারণে, আগামীতে পরিবেশগত উদ্বাস্তু ক্রমেই বাড়বে।

সুতরাং পরিবেশগত এ বিপর্যয়ের মুখে আমাদের ভবিষ্যত পরিবেশগত, প্রতিবেশগত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াতে গ্রামীণ এবং শহর অঞ্চলে বেশি করে গাছ লাগানোর জন্য আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত। বলা হয়ে থাকে প্রতিটি জীব কোন না কোন উপায়ে গাছের ওপর নির্ভর করে। গাছপালা এবং বনের অভাব আমাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আমরা যে ক্রমবর্ধমান জনাকীর্ণ কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করি তার পরিপ্রেক্ষিতে, আরও গাছ লাগানো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এবং এটি আমাদের অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচও বাঁচাতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন- ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি গাছ ৩১,৫০০ টাকা মূল্যের অক্সিজেন তৈরি করতে পারে, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ৬২,০০০ টাকা সাশ্রয় করতে পারে, ৩৭,৫০০ টাকা মূল্যের পানির পুনর্ব্যবহার করতে পারে এবং ৩১,৫০০ টাকা মূল্যের মাটির ক্ষয়রোধ করতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.৭৪% বনভূমির অবদান।

গাছ সেচ ও পানিবাহী কাঠামো রক্ষা করে এবং নদী ও বন্দরকে চলাচলের উপযোগী রাখে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের অবদান অপরিসীম। বনায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সভ্যতার শুরু থেকেই বন সম্পদের একাধিক ব্যবহার স্বীকৃত। গাছ একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসাবে কাজ করে, বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। তারা খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করার পাশাপাশি বনে আশ্রয় খুঁজতে থাকা বন্যপ্রাণীদের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার অনুভূতি প্রদান করে। গাছ বায়ুমন্ডলের অতিরিক্ত পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং বায়ু দূষণকারী পদার্থকে সরিয়ে দেয়, যার মধ্যে সালফার ডাই-অক্সাইড, ওজোন এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড রয়েছে। বিনিময়ে তারা আমাদের জীবন-যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেয়। এমনকি জীববৈচিত্র্যও পালাক্রমে সমৃদ্ধ হয়। গাছ সূর্য, বাতাস এবং বৃষ্টির প্রভাবকে পরিমিত করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে। গাছ ছায়া প্রদান করে গ্রীষ্মের তাপমাত্রাকে প্রশমিত করে এবং শীতকালে বাডড়র জন্য উষ্ণনায়ন হিসাবে কাজ করে। গাছ মাটির ক্ষয় কমায় এবং মাটির উর্বরতা বাড়াতেও সাহায্য করে এবং সমৃদ্ধ মাটি খাদ্যে পুষ্টি তৈরি করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যে অবদান রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু মানব উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে প্রভাবিত করছে না বরং মানব নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে

গাছের সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায়। বাড়ির চারপাশে লাগানো গাছ এবং গুল্মগুলো বাষ্পীভবন শীতল করার সুবিধা প্রদান করে এবং এটি চমৎকার শব্দ শোষণকারী। ফলজ গাছ বিভিন্ন প্রকার ফল দিয়ে আমাদের খাদ্যের অভাব পূরণ করে। বেশি বেশি গাছ লাগিয়ে শব্দ দূষণ অনেকাংশে কমানো যায়। গাছ লাগানোর ফলে বন্যার পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধা হয় এবং গাছ বৃষ্টির পানিকে মাটির উপর দিয়ে প্রবাহিত না করে মাটিতে প্রবেশ করতে দিয়ে বন্যার ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়।

নতুন গাছ লাগিয়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলের চাহিদাও মেটানো যায়। বন এবং গাছপালা প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানির প্রবাহকে ধীর করে দেয়, যার ফলে এটি ফিল্টার হয়। বৃষ্টির পানি ভূগর্ভস্থ স্টোরেজ ট্যাঙ্ক বা জলাশয়ে সংরক্ষণ করে আমরা নিরাপদ পানির ব্যবহার বাড়াতে পারি। এছাড়াও গাছ সমুদ্রের নোনা জলের সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির মিশ্রিত হতে বাধা দেয়। বাংলাদেশে স্থানীয় জনসংখ্যার বনজ পণ্যের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে এবং পরিবেশগত ও জলবায়ুগত অবক্ষয় রোধ করতে তৃণমূল পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালু শক্তিশালী করতে হবে। এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা মাটি ও পানির সম্পদ সংরক্ষণের জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারি এবং আমাদের জনসংখ্যার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে পারি। বিশেষ করে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করতে পারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে বেশি করে বৃক্ষরোপণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

[লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

নির্বাচন ও সাধারণ ভোটারের ‘অসাধারণ’ সামাজিক চাপ

মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক

মহাকাশের ভূত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

নির্বাচনী হাওয়ার ভেতরে করুণ মৃত্যুর সংবাদ

দেশকে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে!

দক্ষিণপন্থার রাজনীতি: অগ্রগতি নাকি অবনমন?

সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পুনর্নির্ধারণ

ছবি

নির্বাচনের স্বপ্ন ও স্বপ্নের নির্বাচন

সরিষার চাষে সমৃদ্ধি ও ভোজ্যতেলের নিরাপত্তা

জমি কেনার আইনি অধিকার ও বাস্তবতা

‘ঐতিহাসিক’ নির্বাচনে জামায়াত

‘মাউশি’ বিভাজন : শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি?

নির্বাচনের ফুলের বাগানে আদিবাসী ফুল কোথায়!

ডিজিটাল থেকে এআই বাংলাদেশ: অন্তর্ভুক্তির নতুন চ্যালেঞ্জ ও বৈষম্যের ঝুঁকি

ক্যানসার সেবা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেখে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার

রহমান ভার্সেস রহমান

যেভাবে আছেন, সেভাবে থাকবেন!

ইরান সংকটের শেষ কোথায়?

বিশ্ব রাজনীতির অস্বস্তিকর অধ্যায়

প্লাস্টিকনির্ভর জীবনযাপন ও জনস্বাস্থ্য সংকট

চক্রে চক্রে আন্ধাচক্র

‘বাংলাদেশপন্থী’ এক অস্পষ্ট ধারণা: রাষ্ট্র না মানুষ আগে

গুরু রবিদাস: সমতার বার্তা ও মানবতাবাদী শিক্ষার প্রতিধ্বনি

অপরাধ দমন না অধিকার সুরক্ষা?

ভোটের মাস, ভাষার মাস

ব্যর্থতা নৈতিক নয় কাঠামোগত: দুর্নীতি ও বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা

জমি ভুলে খাস হয়ে গেলে সহজে ফেরত আনবেন কীভাবে?

আমরা কি জালিয়াত জাতি?

মন্ত্রীদের জন্য বিলাসী ফ্ল্যাট

ধর্মান্ধ আর প্রতিযোগিতা: দুই সাম্প্রদায়িকের খেলা

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী: সমাজের নতুন ব্যাধি

ছবি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

বাড়ি ভাড়া নির্দেশিকা: ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সুরক্ষা নাকি দুর্ভোগের নতুন দরজা

ক্ষমতা যখন নিজেকেই তোষামোদ করে

‘খাল কেটে কুমির আনা...’

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে গাছ লাগানোর গুরুত্ব

মতিউর রহমান

বৃহস্পতিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২

জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এটি আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার আধিক্য, প্লাবনভূমি, উচ্চ দারিদ্রের হার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অত্যাধিক নির্ভরতার কারণে। এটি এখন ক্রমাগত দৃশ্যমান যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে, বৈশ্বিক উষ্ণতা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেইসঙ্গে খাদ্য উৎপাদনশীলতা এবং সুপেয় পানির প্রাপ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়াও পরিবেশগত বিপর্যয় ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী ব্যাপক অভিবাসন বাড়ছে। বিভিন্ন সংক্রামক রোগ-ব্যাধি বাড়ছে। আমরা ইতোমধ্যে করোনা মহামারীর মতো সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলা করছি। এছাড়াও ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং কলেরার মতো অসুখও ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা, খরা, দাবানল ইত্যাদি ঘটনা আমরা নিয়মিত প্রত্যক্ষ করছি।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধুমাত্র মানব উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে প্রভাবিত করছে না বরং মানব নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে অন্য কোনো দেশ এর প্রভাব ভালো জানে না, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ভুগছে। বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়া বা আকস্মিক, মারাত্মক বিপর্যয়মূলক বন্যা হওয়া এবং তাপমাত্রার তীব্রতা সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে জলাবদ্ধতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ক্ষয়, ঘূর্ণিঝড়, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, কৃষি জমি সঙ্কুচিত হওয়া এবং স্থানীয় অভিবাসনের মতো নির্মম প্রভাবের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ। বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, গ্রীষ্মম-লীয় ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিজমিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের কারণে, আগামীতে পরিবেশগত উদ্বাস্তু ক্রমেই বাড়বে।

সুতরাং পরিবেশগত এ বিপর্যয়ের মুখে আমাদের ভবিষ্যত পরিবেশগত, প্রতিবেশগত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াতে গ্রামীণ এবং শহর অঞ্চলে বেশি করে গাছ লাগানোর জন্য আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত। বলা হয়ে থাকে প্রতিটি জীব কোন না কোন উপায়ে গাছের ওপর নির্ভর করে। গাছপালা এবং বনের অভাব আমাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আমরা যে ক্রমবর্ধমান জনাকীর্ণ কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করি তার পরিপ্রেক্ষিতে, আরও গাছ লাগানো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এবং এটি আমাদের অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচও বাঁচাতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন- ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি গাছ ৩১,৫০০ টাকা মূল্যের অক্সিজেন তৈরি করতে পারে, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ৬২,০০০ টাকা সাশ্রয় করতে পারে, ৩৭,৫০০ টাকা মূল্যের পানির পুনর্ব্যবহার করতে পারে এবং ৩১,৫০০ টাকা মূল্যের মাটির ক্ষয়রোধ করতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.৭৪% বনভূমির অবদান।

গাছ সেচ ও পানিবাহী কাঠামো রক্ষা করে এবং নদী ও বন্দরকে চলাচলের উপযোগী রাখে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের অবদান অপরিসীম। বনায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সভ্যতার শুরু থেকেই বন সম্পদের একাধিক ব্যবহার স্বীকৃত। গাছ একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসাবে কাজ করে, বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। তারা খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করার পাশাপাশি বনে আশ্রয় খুঁজতে থাকা বন্যপ্রাণীদের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার অনুভূতি প্রদান করে। গাছ বায়ুমন্ডলের অতিরিক্ত পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং বায়ু দূষণকারী পদার্থকে সরিয়ে দেয়, যার মধ্যে সালফার ডাই-অক্সাইড, ওজোন এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড রয়েছে। বিনিময়ে তারা আমাদের জীবন-যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেয়। এমনকি জীববৈচিত্র্যও পালাক্রমে সমৃদ্ধ হয়। গাছ সূর্য, বাতাস এবং বৃষ্টির প্রভাবকে পরিমিত করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে। গাছ ছায়া প্রদান করে গ্রীষ্মের তাপমাত্রাকে প্রশমিত করে এবং শীতকালে বাডড়র জন্য উষ্ণনায়ন হিসাবে কাজ করে। গাছ মাটির ক্ষয় কমায় এবং মাটির উর্বরতা বাড়াতেও সাহায্য করে এবং সমৃদ্ধ মাটি খাদ্যে পুষ্টি তৈরি করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যে অবদান রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু মানব উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে প্রভাবিত করছে না বরং মানব নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে

গাছের সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায়। বাড়ির চারপাশে লাগানো গাছ এবং গুল্মগুলো বাষ্পীভবন শীতল করার সুবিধা প্রদান করে এবং এটি চমৎকার শব্দ শোষণকারী। ফলজ গাছ বিভিন্ন প্রকার ফল দিয়ে আমাদের খাদ্যের অভাব পূরণ করে। বেশি বেশি গাছ লাগিয়ে শব্দ দূষণ অনেকাংশে কমানো যায়। গাছ লাগানোর ফলে বন্যার পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধা হয় এবং গাছ বৃষ্টির পানিকে মাটির উপর দিয়ে প্রবাহিত না করে মাটিতে প্রবেশ করতে দিয়ে বন্যার ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়।

নতুন গাছ লাগিয়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলের চাহিদাও মেটানো যায়। বন এবং গাছপালা প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানির প্রবাহকে ধীর করে দেয়, যার ফলে এটি ফিল্টার হয়। বৃষ্টির পানি ভূগর্ভস্থ স্টোরেজ ট্যাঙ্ক বা জলাশয়ে সংরক্ষণ করে আমরা নিরাপদ পানির ব্যবহার বাড়াতে পারি। এছাড়াও গাছ সমুদ্রের নোনা জলের সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির মিশ্রিত হতে বাধা দেয়। বাংলাদেশে স্থানীয় জনসংখ্যার বনজ পণ্যের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে এবং পরিবেশগত ও জলবায়ুগত অবক্ষয় রোধ করতে তৃণমূল পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালু শক্তিশালী করতে হবে। এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা মাটি ও পানির সম্পদ সংরক্ষণের জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে পারি এবং আমাদের জনসংখ্যার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি করতে পারি। বিশেষ করে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করতে পারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।

সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা ও অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে বেশি করে বৃক্ষরোপণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

[লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী]

back to top