এক্সক্লেইমার
ছায়ামন্ত্রিসভা কোনো অলঙ্কারিক রাজনৈতিক ধারণা নয়, কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যেখানে সরকারের সমান্তরালে নীতিতে, দক্ষতায়, দায়বদ্ধতায় একটি প্রস্তুত বিকল্পও থাকতে হয়। বাংলাদেশে ছায়ামন্ত্রিসভাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গেলে শুধু বিরোধী দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সাংবিধানিক স্বীকৃতি, সংসদীয় বিধি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন করতে হবে।
সবার আগে প্রয়োজন কাঠামোগত স্বীকৃতি। কেননা সংবিধানে সরাসরি ছায়ামন্ত্রিসভার কথা বলা বা উল্লেখ নেই। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের চেতনায় বিরোধী দলের “বিকল্প সরকার” হিসেবে ভূমিকা সুস্পষ্ট করা যেতে পারে। সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধিতে এ-সংক্রান্ত বিধান যুক্ত করতে হবে। যেখানে বিরোধী দলের ছায়ামন্ত্রীরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতি, বাজেট ও কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের অধিকার পাবেন।
দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে ছায়া অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবের পাল্টা বিশ্লেষণ দেবেন। স্বরাষ্ট্রের বিপরীতে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিকল্প পরিকল্পনা উপস্থাপন করবেন। এতে সমালোচনা হবে তথ্যভিত্তিক, ব্যক্তিনির্ভর নয়।
দ্বিতীয়ত, তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকতে হবে। কার্যকর ছায়ামন্ত্রিসভার জন্য রাষ্ট্রীয় তথ্যপ্রবাহে ন্যূনতম প্রবেশাধিকার জরুরি হতে হবে। সংসদীয় কমিটিগুলোতে বিরোধী সদস্যদের প্রকৃত ক্ষমতা, নিরপেক্ষ গবেষণা সহায়তা আর নীতিগত নথি পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। না হলে ছায়ামন্ত্রীরা আটকে থাকবেন কেবল বক্তব্যনির্ভর রাজনীতির বৃত্তে।
সেজন্য ব্রিটিশ তথা যুক্তরাজ্যের আদলে সংসদীয় গবেষণা সেল শক্তিশালী করতে হবে। বাজেট বিশ্লেষণের জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল রাখতে হবে। যেসব কাঠামো বিরোধী পক্ষকে প্রস্তাবনামূলক রাজনীতিতে উৎসাহিত করবে। তারা আরও প্রাণবন্ত আর কার্যকর করে তুলতে পারবেন সংসদকে।
তৃতীয়ত, দলীয় গণতন্ত্রের অনুশীলন বা চর্চা বাড়াতে হবে। ছায়ামন্ত্রিসভা গঠনের আগে বিরোধী দলগুলোর ভেতরেই নীতি ও নেতৃত্ব নির্ধারণে স্বচ্ছতা দরকার। ছায়া মন্ত্রিত্ব কেবল আনুগত্যের পুরস্কার হয়ে উঠলে জনআস্থা হারাবে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট খাতে জ্ঞানের ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যাতে রাজনীতি এগোবে দারুণ পেশাদারিত্বের দিকে। “ক্ষমতা পেলেই কেবল শেখা যাবে” এমন মানসিকতার বদলে “ক্ষমতার আগেই প্রস্তুতি”র চর্চা উৎসাহিত হবে।
চতুর্থত, ছায়ামন্ত্রিসভার প্রাণ হলো নীতিনির্ভর বিতর্ক। যে কারণে সংসদে কার্যকর বিতর্কের পরিবেশ আর জায়গা রাখতে হবে। প্রশ্নোত্তর পর্ব, স্থায়ী কমিটি ও বিশেষ অধিবেশনগুলোতে বিরোধী দলের প্রস্তাব ও সমালোচনাকে গুরুত্ব না দিলে কাঠামো কাগজে-কলমেই বন্দি হয়ে থাকবে। স্পিকার ও সংসদ সচিবালয়ের নিরপেক্ষ ভূমিকা, বিতর্কে সময় বণ্টনের ন্যায্যতা থাকতে হবে। সরকারি-বিরোধী উভয় পক্ষের বক্তব্য প্রচারে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের ভারসাম্যও অপরিহার্য।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর। বাংলাদেশে রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতা হিসেবে দেখেছে। ছায়ামন্ত্রিসভা এই মনস্তত্ত্ব ভাঙার এক প্রাতিষ্ঠানিক উপায় হতে পারে। সরকারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী নীতির ধারক হিসেবে দেখা—এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে উভয় পক্ষকেই ব্যক্তিগত আক্রমণ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে আসতে হবে। ছায়া মন্ত্রীরা সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরবেন, কিন্তু একই সঙ্গে সম্ভাব্য সমাধানও দেবেন—এমন প্রত্যাশা তৈরি করতে হবে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে।
ষষ্ঠত, গণমাধ্যম ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে কার্যকর ছায়ামন্ত্রিসভা জনপরিসরে বিকল্প নীতির ধারাবাহিক উপস্থিতি নিশ্চিত হবে। টেলিভিশন বিতর্ক, নীতি-সংলাপ, থিঙ্কট্যাঙ্কের সঙ্গে যৌথ কর্মশালা, এসবের মাধ্যমে ছায়া মন্ত্রীরা জনগণের সামনে তাদের প্রস্তুতি তুলে ধরতে পারেন। এতে ভোটাররা কেবল সরকার নয়, বিকল্পের সক্ষমতাও যাচাই করতে পারবেন। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হবে দুই পক্ষের নীতিগত তুলনা তুলে ধরা; ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ি নয়।
সপ্তমত, ছায়ামন্ত্রিসভা যেন কেবল নির্বাচনের আগমুহূর্তে সক্রিয় না হয়, সেজন্য ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাঁচ বছরজুড়ে নীতিপত্র প্রকাশ, বাজেটের বিকল্প খসড়া দেওয়া, সংকটকালে সমন্বিত প্রস্তাব উপস্থাপন- এসব চর্চা স্থায়ী হলে জনগণ বুঝবে, এটি ক্ষমতার লড়াইয়ের অস্ত্র নয়; বরং শাসনের প্রস্তুতি।
দেশের গণতন্ত্র বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী। এখানে ক্ষমতার পালাবদল প্রায়ই শূন্যতা ও অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করে। একটি প্রাতিষ্ঠানিক ছায়ামন্ত্রিসভা সেই শূন্যতা কমাতে পারে, কারণ এতে সরকার পরিবর্তন মানেই নীতির আকস্মিক ভাঙন নয়; বরং পূর্বপ্রস্তুত বিকল্পের ধারাবাহিকতা। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই- ক্ষমতা সাময়িক, প্রতিষ্ঠান স্থায়ী। ছায়ামন্ত্রিসভা সেই স্থায়িত্বেরই অনুশীলন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কাঠামোর নয়, মানসিকতার। যদি আমরা সত্যিই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গণতন্ত্রের প্রাণ মনে করি। তবে ছায়ামন্ত্রিসভা হবে তার শৃঙ্খলিত রূপ। আর যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেবল ক্ষমতার সিঁড়ি ভাবি, তবে যে কাঠামোই বানাই, তা হবে নামমাত্র। বাংলাদেশে একটি পরিণত গণতন্ত্র গড়তে হলে তাই প্রয়োজন প্রস্তুত বিকল্প, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা আর নীতিনিষ্ঠ প্রতিযোগিতা-যার প্রাতিষ্ঠানিক রূপই হতে পারে ছায়ামন্ত্রিসভা।