alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ: ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা

সাজেদুল ইসলাম

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট : রোববার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
image

ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা নিছক একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের একটি অপরিহার্য অংশ

বাংলাদেশকে ডিজিটাল থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশে রূপান্তরের মূল চেতনা হলো প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা এবং ন্যায়সঙ্গত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। একটি রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে একটি ডিজিটালভাবে উন্নত দেশ হিসেবে বিবেচিত হয় যখন তার সমস্ত ডিজিটাল পরিষেবাগুলো সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়। প্রযুক্তি যখন কোনো সম্প্রদায়ের জন্য অব্যবহারযোগ্য বা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন এই ধরনের প্রযুক্তি শুধু বৈষম্যই বাড়ায় না, জাতীয় অগ্রগতিকেও কঠিন করে তোলে। আমাদের ডিজিটাল রূপান্তরের বাস্তবতা নির্দেশ করে যে, মোবাইল আর্থিক পরিষেবা থেকে শুরু করে ই-কমার্স, ই-গভর্নেন্স, হেলথটেক, এডটেক, টেলিকম অপারেশন এবং ব্যাংকিং সেক্টরের অনলাইন পরিষেবাগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমাদের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ। যে প্রযুক্তি, তাদের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নয়, সেটা শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধাই তৈরি করে না, জাতীয় উন্নয়ন, ডিজিটাল পরিষেবার গ্রহণযোগ্যতা এবং সামাজিক সমতার লক্ষ্য অর্জনে গুরুতর বাধাও তৈরি করে। সুতরাং, যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং এ-সম্পর্কিত পরিষেবা দেয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের শুধু প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানবাধিকার, ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিকমানের দৃষ্টিকোণ থেকেও ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

তাই সমস্ত ডিজিটাল বিষয়বস্তু পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি, নীতি প্রণয়ন এবং কৌশলগত নির্দেশনা প্রদান করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী রয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০২২) তথ্য অনুসারে, তাদের মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ লোক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তারা প্রযুক্তি ব্যবহারে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। আমাদের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন স্মার্টফোন, মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট এবং অনলাইন সরকারি পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল। যদি এই প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিবন্ধীদের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত না হয়, তাহলে এটি মানবাধিকার, সমতাভিত্তিক পরিষেবা এবং সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে, আমরা যদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমস্ত মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই, তবে আমাদের ডিজিটাল অ্যাক্সেসকে কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, বরং এটিকে নাগরিক অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা নিছক একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের একটি অপরিহার্য অংশ। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন আইন, নীতি এবং মান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, তথ্য, প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল পরিষেবাগুলোতে সবার অ্যাক্সেস সমানভাবে নিশ্চিত করা রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠান উভয়েরই বাধ্যতামূলক কর্তব্য। আন্তর্জাতিক পরিম-লে, জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার-সংক্রান্ত কনভেনশন (সিআরপিডি) জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে সবার জন্য আইসিটি এবং অনলাইন পরিষেবাগুলোতে অ্যাক্সেস নিশ্চিত করতে বলেছে। বাংলাদেশ আইসিটি নীতি ২০১৮ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোর দিয়েছে। এছাড়া এসডিজি-৯, এসডিজি-১০, এবং এসডিজি-১৬ ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটির বিষয়টিকে মৌলিক উন্নয়ন সূচক হিসেবে বিবেচনা করেছে। ডব্লিওসিএজি ২.২ হলো একটি আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক ব্যবহৃত নির্দেশিকা যার লক্ষ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে প্রযুক্তিগতভাবে প্রবেশগম্য করে তোলা। এটি সমস্ত ধরনের লোকের জন্য ওয়েব সামগ্রী প্রবেশগম্য করার জন্য একটি মান দিয়েছে।

যদিও বাংলাদেশ তার ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়ে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, প্রতিবন্ধীসহ সব মানুষের জন্য মৌলিক অ্যাক্সেসিবিলিটি এখনও বেশির ভাগ অ্যাপ, ওয়েবসাইট এবং অনলাইন সরকারি পরিষেবাগুলোতে নিশ্চিত করা হয়নি। স্ক্রিন রিডার সমর্থনের মতো প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবের কারণে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ডিজিটাল পরিষেবাগুলোতে অ্যাক্সেস যোগ্যতার অভাবের কারণে নাগরিক জীবনে গভীর, বহুমাত্রিক এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। যখন প্রতিবন্ধীরা সরকারি পরিষেবা, ব্যাঙ্কিং অ্যাপ, টেলিকম অপারেটরের মোবাইল অ্যাপ, ই-কমার্স, স্বাস্থ্য পরিষেবা বা আর্থিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা মূলত মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থনৈতিক লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায় এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলস্বরূপ, সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং ডিজিটাল রূপান্তরের গতি শ্লথ হয়ে যায়, যা জাতীয় উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সীমাবদ্ধতার প্রভাব শুধু ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে বাধ্য।

একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল সহজলভ্যতার অভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকাংশে তাদের গ্রাহক হারায়। সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ১২ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত না হলে একটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অ্যাক্সেসযোগ্য ডিজাইন মানে শুধু একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়, এটি বৃহত্তর বাজার, কম ঝুঁকি, আরও গ্রাহক এবং উচ্চ লাভের সম্ভাবনা নিশ্চিত করে। বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে জড়িত প্রায় চার কোটি মানুষ এবং ই-কমার্সের সঙ্গে জড়িত পাঁচ কোটি মানুষ, এবং মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে ১৩ কোটির বেশি অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রয়েছে। সহজলভ্যতার অভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেবা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাজার ও রাজস্ব হারাবে। এই তথ্যটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, অ্যাক্সেসিবিলিটি একটি দাতব্য বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক এবং ব্যবসা-সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় বিষয়, যা ভবিষ্যতের বাজারে প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই, প্রতিযোগিতামূলক এবং লাভজনক রাখতে সরাসরি ভূমিকা পালন করবে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, সবার জন্য ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে অতিরিক্ত ২০% থেকে ২৫% গ্রাহক বেস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতিটি ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাক্সেসিবিলিটি নীতি প্রণয়ন করা এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অ্যাপ্লিকেশন এবং ওয়েবসাইটগুলোকে সবার সমান ব্যবহারের উপযোগী করা হয়, তখন এটি প্রযুক্তির ব্যবহার-সংক্রান্ত বৈষম্য দূর করে, সমাজের সব মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ায়। বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযুক্তিতে প্রবেশগম্যতার গুরুত্বের বিষয়টা তুলে ধরতে ভিজুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি (ভিপস) এবং বালাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়ার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেসিস অফিসে সিবিএম গ্লোবাল বাংলাদেশ এর সহায়তায় যৌথভাবে ‘ন্যাশনাল লেভেল স্টেকহোল্ডার ওয়ার্কশপ’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই সেক্টরে কর্মরত অধিকারকার কর্মীরা ওই অনুষ্ঠানে আলোচনার সময় বলেন, জাতীয় স্বার্থে সবার জন্য ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া দরকার যাতে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনের পথে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারি।

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

ছবি

খালেদা জিয়া, কাছে ও দূর থেকে দেখা

মানবসভ্যতা ও প্রাণিকল্যাণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাবনা

ছবি

ইরানের ধর্মভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী

ফুল ও মৌমাছির গণিতে কৃষির প্রতিচ্ছবি

দুর্নীতির ঐকিক নিয়ম

‘বিয়ার রাতেই বিড়াল মারো...’

তেল-উত্তর আরব: অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক রূপান্তর

ভোটের মনস্তত্ত্ব: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ ও ভোটার মানস

প্রতিবেশী যদি বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দেন

চাপে অর্থনীতি, সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্র

মনোনয়নপত্র বাতিলের পরে বৈধতা পাওয়া

চিকিৎসাসেবায় ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট

রেশম: এক ঐতিহ্য, এক সম্ভাবনার অবসান

প্রযুক্তিযুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

যেভাবে বদলেছে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা

ছবি

খোলা হাওয়া, তেজি বৃষ্টি এবং ঝকঝকে রোদ

কৃষি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

তেলের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার সুস্পষ্ট রূপরেখা চাই

মহাকাশে বিস্ময়কর মহাকাশ

টেংরাটিলা ট্র্যাজেডি : ক্ষতিপূরণহীন এক বিপর্যয়

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ -এর নমুনা

শীতের নীরব আঘাত

ভোটে ইসলামী জোট

আইনের শাসন কি উপেক্ষিতই থাকবে?

মাঠের মাইক নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই নির্ধারিত হচ্ছে নেতৃত্ব

ভূমিকম্প ঝুঁকি, নিরাপত্তা ও আমাদের করণীয়

“ফিজ-না-ফিজ...”

বনসাই জীবনের অদৃশ্য শোকগাথা

এলপিজি সংকট

ছবি

তবে কি আমরা প্রতারিত হলাম

প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক

নতুন বছরে অর্থনীতি ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা

শীতের নতুন বিষদাঁত: জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের বৈষম্যের খেরোখাতা

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ: ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা

সাজেদুল ইসলাম

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট
image

ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা নিছক একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের একটি অপরিহার্য অংশ

রোববার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশকে ডিজিটাল থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশে রূপান্তরের মূল চেতনা হলো প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা এবং ন্যায়সঙ্গত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। একটি রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে একটি ডিজিটালভাবে উন্নত দেশ হিসেবে বিবেচিত হয় যখন তার সমস্ত ডিজিটাল পরিষেবাগুলো সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়। প্রযুক্তি যখন কোনো সম্প্রদায়ের জন্য অব্যবহারযোগ্য বা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন এই ধরনের প্রযুক্তি শুধু বৈষম্যই বাড়ায় না, জাতীয় অগ্রগতিকেও কঠিন করে তোলে। আমাদের ডিজিটাল রূপান্তরের বাস্তবতা নির্দেশ করে যে, মোবাইল আর্থিক পরিষেবা থেকে শুরু করে ই-কমার্স, ই-গভর্নেন্স, হেলথটেক, এডটেক, টেলিকম অপারেশন এবং ব্যাংকিং সেক্টরের অনলাইন পরিষেবাগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমাদের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ। যে প্রযুক্তি, তাদের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নয়, সেটা শুধু ব্যক্তিগত অসুবিধাই তৈরি করে না, জাতীয় উন্নয়ন, ডিজিটাল পরিষেবার গ্রহণযোগ্যতা এবং সামাজিক সমতার লক্ষ্য অর্জনে গুরুতর বাধাও তৈরি করে। সুতরাং, যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং এ-সম্পর্কিত পরিষেবা দেয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের শুধু প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানবাধিকার, ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিকমানের দৃষ্টিকোণ থেকেও ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

তাই সমস্ত ডিজিটাল বিষয়বস্তু পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি, নীতি প্রণয়ন এবং কৌশলগত নির্দেশনা প্রদান করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী রয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০২২) তথ্য অনুসারে, তাদের মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ লোক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তারা প্রযুক্তি ব্যবহারে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। আমাদের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন স্মার্টফোন, মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট এবং অনলাইন সরকারি পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল। যদি এই প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিবন্ধীদের ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত না হয়, তাহলে এটি মানবাধিকার, সমতাভিত্তিক পরিষেবা এবং সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে, আমরা যদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমস্ত মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই, তবে আমাদের ডিজিটাল অ্যাক্সেসকে কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, বরং এটিকে নাগরিক অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা নিছক একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের একটি অপরিহার্য অংশ। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন আইন, নীতি এবং মান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, তথ্য, প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল পরিষেবাগুলোতে সবার অ্যাক্সেস সমানভাবে নিশ্চিত করা রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠান উভয়েরই বাধ্যতামূলক কর্তব্য। আন্তর্জাতিক পরিম-লে, জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার-সংক্রান্ত কনভেনশন (সিআরপিডি) জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে সবার জন্য আইসিটি এবং অনলাইন পরিষেবাগুলোতে অ্যাক্সেস নিশ্চিত করতে বলেছে। বাংলাদেশ আইসিটি নীতি ২০১৮ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোর দিয়েছে। এছাড়া এসডিজি-৯, এসডিজি-১০, এবং এসডিজি-১৬ ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটির বিষয়টিকে মৌলিক উন্নয়ন সূচক হিসেবে বিবেচনা করেছে। ডব্লিওসিএজি ২.২ হলো একটি আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক ব্যবহৃত নির্দেশিকা যার লক্ষ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে প্রযুক্তিগতভাবে প্রবেশগম্য করে তোলা। এটি সমস্ত ধরনের লোকের জন্য ওয়েব সামগ্রী প্রবেশগম্য করার জন্য একটি মান দিয়েছে।

যদিও বাংলাদেশ তার ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়ে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, প্রতিবন্ধীসহ সব মানুষের জন্য মৌলিক অ্যাক্সেসিবিলিটি এখনও বেশির ভাগ অ্যাপ, ওয়েবসাইট এবং অনলাইন সরকারি পরিষেবাগুলোতে নিশ্চিত করা হয়নি। স্ক্রিন রিডার সমর্থনের মতো প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাবের কারণে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ডিজিটাল পরিষেবাগুলোতে অ্যাক্সেস যোগ্যতার অভাবের কারণে নাগরিক জীবনে গভীর, বহুমাত্রিক এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। যখন প্রতিবন্ধীরা সরকারি পরিষেবা, ব্যাঙ্কিং অ্যাপ, টেলিকম অপারেটরের মোবাইল অ্যাপ, ই-কমার্স, স্বাস্থ্য পরিষেবা বা আর্থিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা মূলত মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থনৈতিক লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায় এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলস্বরূপ, সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং ডিজিটাল রূপান্তরের গতি শ্লথ হয়ে যায়, যা জাতীয় উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সীমাবদ্ধতার প্রভাব শুধু ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে বাধ্য।

একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল সহজলভ্যতার অভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকাংশে তাদের গ্রাহক হারায়। সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে প্রায় ১২ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত না হলে একটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অ্যাক্সেসযোগ্য ডিজাইন মানে শুধু একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়, এটি বৃহত্তর বাজার, কম ঝুঁকি, আরও গ্রাহক এবং উচ্চ লাভের সম্ভাবনা নিশ্চিত করে। বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে জড়িত প্রায় চার কোটি মানুষ এবং ই-কমার্সের সঙ্গে জড়িত পাঁচ কোটি মানুষ, এবং মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারে ১৩ কোটির বেশি অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রয়েছে। সহজলভ্যতার অভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেবা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাজার ও রাজস্ব হারাবে। এই তথ্যটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, অ্যাক্সেসিবিলিটি একটি দাতব্য বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক এবং ব্যবসা-সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় বিষয়, যা ভবিষ্যতের বাজারে প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসই, প্রতিযোগিতামূলক এবং লাভজনক রাখতে সরাসরি ভূমিকা পালন করবে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, সবার জন্য ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে অতিরিক্ত ২০% থেকে ২৫% গ্রাহক বেস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতিটি ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাক্সেসিবিলিটি নীতি প্রণয়ন করা এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অ্যাপ্লিকেশন এবং ওয়েবসাইটগুলোকে সবার সমান ব্যবহারের উপযোগী করা হয়, তখন এটি প্রযুক্তির ব্যবহার-সংক্রান্ত বৈষম্য দূর করে, সমাজের সব মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ায়। বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযুক্তিতে প্রবেশগম্যতার গুরুত্বের বিষয়টা তুলে ধরতে ভিজুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি (ভিপস) এবং বালাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়ার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেসিস অফিসে সিবিএম গ্লোবাল বাংলাদেশ এর সহায়তায় যৌথভাবে ‘ন্যাশনাল লেভেল স্টেকহোল্ডার ওয়ার্কশপ’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই সেক্টরে কর্মরত অধিকারকার কর্মীরা ওই অনুষ্ঠানে আলোচনার সময় বলেন, জাতীয় স্বার্থে সবার জন্য ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া দরকার যাতে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনের পথে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারি।

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

back to top