জিয়াউদ্দীন আহমেদ
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অথচ আমার লেখায় নির্বাচনের কথা থাকবে না, থাকবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলনামা। আজই (বৃহস্পতিবার) আমার লেখা পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিতে হবে বিধায় ভোটের পরিবেশ ও ফল নিয়ে কোন মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে সেনাবাহিনী বিগত সময়ের মতো স্ট্রাইকিং ফোর্স না হয়ে কেন্দ্রে কেন্দ্রে অবস্থান করায় নির্বাচনে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হওয়ার আশঙ্কা নেই। চাঁদাবাজির বদনাম থাকা সত্ত্বেও বিএনপির প্রতি দৃশ্যমান জনসমর্থন বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তুলে সেই লাশকে পিটিয়ে-পুড়িয়ে অবমাননা করা হয়েছে, ‘বেশ্যা’ নাম দিয়ে জনসম্মুখে নারীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করা হয়েছে, বিরুদ্ধ মতের লোকদের ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে কোপানো হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কান ধরে উঠবস করানো হয়েছে, শিক্ষককে গাছের সঙ্গে বেঁধে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের জীবনধারা ও অভিরুচির সঙ্গে এই ঘটনাগুলো ছিল বেমানান। দুঃখের বিষয় এগুলো দেখেও ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকার ছিল উদাসীন ও নির্বিকার
অন্যদিকে নির্বাচনের আগের দিন মিডিয়ায় জামায়াতের টাকা বিতরণের বিভিন্ন ঘটনা এবং ‘জান্নাতের টিকেট’ বিক্রির ব্যাপক প্রচারণা জামায়াতের ইমেজ নষ্ট করেছে। আমার লেখায় ভোটের ফলাফলের পূর্বাভাস দেয়া নিরর্থক, কারণ আমার লেখা পৌঁছার আগেই পাঠকের কাছে নির্বাচনের ফল পৌঁছে যাবে। আশ্চার্যের বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগ আমলেও ভোট দেয়ার গরজ বোধ করেনি, তাদের ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে। কারণ একটাই, ৫ আগস্টের পর থেকে অদ্যাবধি তারা যে ভয়-ভীতির ট্রমার মধ্যে আছে তা থেকে রেহাই পাওয়ার প্রয়াস। ভোট দিয়ে তারা আবার বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের আঙুলে অমোচনীয় কালি দেখিয়ে সাক্ষী রেখেছে, যাতে ভোট না দেয়ার অভিযোগে নির্যাতন থেকে বেঁচে যায়। ‘না’ ভোটের সংখ্যাধিক্য থেকেই আওয়ামী লীগের উপস্থিতি আন্দাজ করা সম্ভব হবে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পরবর্তী সরকারকে অনেকগুলো কঠিন সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। আওয়ামী লীগের আমলে দেশের যে অবস্থা ছিল সেই অবস্থায়ও এখন আর নেই, অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনায় দেশের অবস্থা নড়বড় হয়ে গেছে।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই দেশের আলেম সমাজ মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘সুদখোর’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের অনেকেই আবার তাদের পূর্ব অবস্থান থেকে সরে এসেছিলেন। ইসলামিক বক্তা মুফতি কাজী ইব্রাহীম তার এক ওয়াজে বলেছেন, ‘ইউনূস আল্লাহ প্রদত্ত নবীদের মতো। আল্লাহ তা’আলা যেভাবে কারও পরামর্শ ছাড়া নিজেই বাছাই করে নবীদের পাঠিয়েছেন, সেভাবেই ইউনূসকেও পাঠিয়েছেন আমাদের জন্য। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হারাম’। মুফতি কাজি ইব্রাহীমের মতো মিজানুর রহমান আজাহারীও মুহাম্মদ ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, তার কথা অনুযায়ী ‘আমাদের বর্তমান নেতা ইউনূস জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’। মিজানুর রহমান আজহারীর এই কথাটির মধ্যে কিছুটা সত্য অবশ্যই আছে, নতুবা পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতারা সকাল-বিকাল মুহাম্মদ ইউনূসের ডাকে যমুনায় ছুটে যেতেন না। তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐক্যের ঘোর বিরোধী মনে হয়েছে ইউনূসকে।
৫ আগস্টের পর দেশে এমন একটি অবস্থার উদ্ভব হয়েছে যেখানে মুফতি কাজি ইব্রাহীমেরাও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন প্রত্যাশা করেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ মুহাম্মদ ইউনূসও আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বাম ও ইসলামপন্থী দলগুলোকে খোশমেজাজে রাখার সব কৌশল প্রয়োগ করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস একজন নির্ভেজাল অসম্প্রদায়িক ব্যক্তি, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে তাকে কেউ কখনো দেখেনি। অথচ তার শাসনামলে দেশ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভস্মিভূত হয়েছে, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ভাঙচুর হয়েছে, ভাঙ্গা হয়েছে হিন্দুদের প্রতিমা, পিটিয়ে-পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে সংখ্যালঘুদের। শুধু সংখ্যালঘু নয়, ভিন্ন তরিকার মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপরও উগ্র ইসলামপন্থীদের আক্রমণে নরকতুল্য ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তুলে সেই লাশকে পিটিয়ে-পুড়িয়ে অবমাননা করা হয়েছে, ‘বেশ্যা’ নাম দিয়ে জনসম্মুখে নারীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভ-ুল করা হয়েছে, বিরুদ্ধ মতের লোকদের ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে কোপানো হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কান ধরে উঠবস করানো হয়েছে, শিক্ষককে গাছের সঙ্গে বেঁধে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের জীবনধারা ও অভিরুচির সঙ্গে এই ঘটনাগুলো ছিল বেমানান। দুঃখের বিষয় এগুলো দেখেও ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকার ছিল উদাসীন ও নির্বিকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ধর্মের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে, বিশেষ করে হিজাব এবং টুপির ব্যবহার বেড়েছে, বেড়েছে ধর্মীয় উগ্রপন্থারও। আওয়ামী লীগ না থাকায় এখন নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। অথচ ৫ আগস্টের পূর্বে এমন একটি অবস্থার কথা কেউ কল্পনাও করেনি। আওয়ামী লীগ পুনরুত্থানের ভয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বদা আতঙ্কিত ছিল, এমন কী আওয়ামী লীগের অদৃশ্য উপস্থিতির কল্পনাও তাদের মানসিক শক্তিকে অহর্নিশ তাড়িত করেছে এবং এই তাড়না থেকেই তারা আওয়ামী লীগ বিরোধী উগ্র ধর্মপন্থাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, এবং এই প্রশ্রয়েই ‘মব সন্ত্রাস’ হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য। মব সন্ত্রাসকে নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টাই করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগের নিশ্চিহ্নকরণে অন্তর্বর্তী সরকার এতবেশি সক্রিয় ছিল যে, মব সন্ত্রাসের আইনবিরোধী ধ্বংসাত্মক কর্মকা-কে নীরবে নিভৃতে অন্তর্বর্তী সরকার শুধু হজম করেনি, ইনডেমনিটির মাধ্যমে অনুমোদনও দিয়েছে। মব সন্ত্রাসের ইতিবাচক দিক হচ্ছে, ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগারদের কল্পনাতীত উপস্থিতি। আওয়ামী লীগ সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও অভ্যুত্থানে অংশভোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মামলা নির্বিচারে প্রত্যাহার করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসৃত নীতি-পদ্ধতি বহির্ভূত নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের কোন একটি ভালো নজির জনগণের নিকট দৃশ্যমান হয়নি, নতুন বন্দোবস্ত গড়ার পরিবর্তে পুরাতন বন্দোবস্তে দেশকে আবদ্ধ রেখে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে।
ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তী সরকারের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব-সংবলিত জুলাই সনদ গণভোটে পাস হয়েছে। কারণ নির্বাচনে যে দলগুলো অংশগ্রহণ করেছে তার সবগুলো দলই জুলাই সনদের পক্ষে। সম্ভবত আওয়ামী লীগের ভোটাররা ‘না’-তে ভোট দিয়েছে। সরকার সংসদ নির্বাচনে তত আগ্রহী নয়, যত আগ্রহী গণভোটে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলেই অন্তর্বর্তী সরকার এই নির্বাচনে জিতে যাবে, সংসদে কে জিতলো তা সরকারের নিকট মুখ্য নয়, কারণ বিএনপি এবং জামায়াত উভয় দলই অভ্যুত্থানের অংশভোগী, যে দলই জিতুক সেই দলই ইউনূসের অনুরাগী থাকবে। তবে জুলাই সনদ দিয়ে স্বৈরশাসনের উদ্ভব ঠেকানো যাবে না, কারণ আইনের বাধ্যবাধকতা দিয়ে শাসকের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। জুলাই সনদে অনেকগুলো ভালো প্রস্তাব রয়েছে, আবার কতগুলো অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল প্রস্তাবও রয়েছে। যে দেশে এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদকে সক্রিয় করা যায় না, দলের শীর্ষ নেতা না থাকলে সাংসদদের অনুপিস্থিতি বেড়ে যায়, আর সংসদে থাকলে শীর্ষ নেতার গুণগানে সাংসদগণ মুখর হয়ে ওঠেন, সেই সংসদকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করার উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় অর্থের শ্রাদ্ধ করার সামিল। জুলাই সনদ নিয়ে সম্ভব হলে আরেকটি লেখা লিখব।
বিগত দেড় বছর ধরে ইউনূস বাংলাদেশের জনগণকে শুধু স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু তা ছিল দিবাস্বপ্ন। তিনি অবাস্তব স্বপ্নে জাতিকে উজ্জীবিত করেছেন সত্য, কিন্তু নিজে উজ্জীবিত হননি। তিনি সংস্কারে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে ৮৪টি প্রস্তাব-সংবলিত জুলাই সনদ তৈরি করেছেন। কিন্তু দেড় বছরাধিক কালে তিনি বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা বন্ধ করতে পারেননি, পিস্তল আর মাদক গুঁজিয়ে দিয়ে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করার পুরানো নীতি অব্যাহত রয়েছে, নিরীহ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করার স্বৈরচারি কূটকৌশল অনবচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলা-উপজেলায় ডাক্তারদের অনুপস্থিতর ছেদ টানা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছাত্রদের লেজুড়বৃত্তি শিক্ষার মানকে এখনো কলুষিত করছে। আমলা-মন্ত্রীর অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ অপ্রতিহত গতিতে চলছে। ঘুষ-দুর্নীতি আগের মতোই চলছে। অর্থ পাচারের কথাও শোনা যাচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে গণভোট প্রাসঙ্গিক নয়, প্রশাসনিক আদেশ এবং নিরপেক্ষ মনিটরিংই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু জনসম্পৃক্ত এই সব সংস্কার করার কোন গরজই বোধ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। মুহাম্মদ ইউনূস তার বিখ্যাত ‘তিন শূন্য’র তত্ত্বের কথা বাংলাদেশে বাস্তবায়নের কথা একেবারেই ভুলে গেলেন। ইউনূসের কথিত সারা পৃথিবী বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসেনি, বরং বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টের অভিগম্যতা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমে গেল, আমেরিকা তাদের পণ্য বেশি দামে কিনতে অন্তর্বর্তী সরকারকে বাধ্য করল। আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির ফলশ্রুতিতে অনুরূপ চুক্তি সম্পাদনের চাপ ইউরোপ থেকেও আসার সম্ভাবনা তৈরি হলো।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ এলো না, অধিক সুদহারনীতি দিয়ে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকেও রুদ্ধ করা হলো। দেশের সব প্রায় সব সেক্টরের বিমর্ষ চেহারাÑ রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বহু কারখানা ধ্বংস হলো, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হলো, দেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্রের সংখ্যা বাড়ল, পাচার করা একটি টাকাও ফেরত আনা সম্ভব হলো না। আসছে রমযানে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ইদ উদযাপনের সুযোগ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি প্রধান উপদেষ্টা দিয়েছিলেন, সেই রোহিঙ্গাদের একজনকেও মায়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আরও ১ লাখ ৩৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে এবং ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার অনুকূলে পাসপোর্ট ইস্যু করে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করলো। গত রমজানে জাতিসংঘের মহাসচিবের উপস্থিতিতে আয়োজিত রোহিঙ্গাদের জনসভায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুঝিয়ে দিলেন যে, রোহিঙ্গারা চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোক। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপে সব রোহিঙ্গার অনুকূলে জাতীয় পরিচয়পত্র দিলেও আশ্চর্য হব না।
ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে মামলা হয়েছে, মামলা হয়েছে সাংবাদিক, খেলোয়াড়, অভিনয় শিল্পী, সংগীত শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের নামে, এবং প্রায় সব মামলাই খুনের মামলা। আওয়ামী লীগকে শাস্তি দিতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জাতির বিভাজনের ফাটলকে আরও গভীর ও সম্প্রসারিত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, একে অপরের শত্রু। এই বিভাজনে জাতিও মতদ্বৈধতায় বিভাজিত, বহিঃশত্রুর আক্রমণেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে বলে মনে হয় না। ইউনূস জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার একটা সুযোগ পেয়েছিলেন, পারষ্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ এড়িয়ে সমন্বয়ের শক্তিশালী ব্যুহ রচনা করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তার ধারেকাছেও গেলেন না। ইউনূসের কথিত নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুবর্ণ সুযোগ তার হাতেই ভেস্তে গেল। তাদের যৎসামান্য সাফল্যও প্রেস সেক্রেটারির উপস্থাপনের রূঢ়তায় ম্লান হয়ে গেছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ইতিহাসে এক ভয়ংকর আতঙ্কের প্রতীক হয়ে থাকবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অথচ আমার লেখায় নির্বাচনের কথা থাকবে না, থাকবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলনামা। আজই (বৃহস্পতিবার) আমার লেখা পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিতে হবে বিধায় ভোটের পরিবেশ ও ফল নিয়ে কোন মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে সেনাবাহিনী বিগত সময়ের মতো স্ট্রাইকিং ফোর্স না হয়ে কেন্দ্রে কেন্দ্রে অবস্থান করায় নির্বাচনে সন্ত্রাসী কার্যক্রম হওয়ার আশঙ্কা নেই। চাঁদাবাজির বদনাম থাকা সত্ত্বেও বিএনপির প্রতি দৃশ্যমান জনসমর্থন বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তুলে সেই লাশকে পিটিয়ে-পুড়িয়ে অবমাননা করা হয়েছে, ‘বেশ্যা’ নাম দিয়ে জনসম্মুখে নারীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করা হয়েছে, বিরুদ্ধ মতের লোকদের ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে কোপানো হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কান ধরে উঠবস করানো হয়েছে, শিক্ষককে গাছের সঙ্গে বেঁধে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের জীবনধারা ও অভিরুচির সঙ্গে এই ঘটনাগুলো ছিল বেমানান। দুঃখের বিষয় এগুলো দেখেও ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকার ছিল উদাসীন ও নির্বিকার
অন্যদিকে নির্বাচনের আগের দিন মিডিয়ায় জামায়াতের টাকা বিতরণের বিভিন্ন ঘটনা এবং ‘জান্নাতের টিকেট’ বিক্রির ব্যাপক প্রচারণা জামায়াতের ইমেজ নষ্ট করেছে। আমার লেখায় ভোটের ফলাফলের পূর্বাভাস দেয়া নিরর্থক, কারণ আমার লেখা পৌঁছার আগেই পাঠকের কাছে নির্বাচনের ফল পৌঁছে যাবে। আশ্চার্যের বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগ আমলেও ভোট দেয়ার গরজ বোধ করেনি, তাদের ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে। কারণ একটাই, ৫ আগস্টের পর থেকে অদ্যাবধি তারা যে ভয়-ভীতির ট্রমার মধ্যে আছে তা থেকে রেহাই পাওয়ার প্রয়াস। ভোট দিয়ে তারা আবার বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের আঙুলে অমোচনীয় কালি দেখিয়ে সাক্ষী রেখেছে, যাতে ভোট না দেয়ার অভিযোগে নির্যাতন থেকে বেঁচে যায়। ‘না’ ভোটের সংখ্যাধিক্য থেকেই আওয়ামী লীগের উপস্থিতি আন্দাজ করা সম্ভব হবে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পরবর্তী সরকারকে অনেকগুলো কঠিন সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। আওয়ামী লীগের আমলে দেশের যে অবস্থা ছিল সেই অবস্থায়ও এখন আর নেই, অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনায় দেশের অবস্থা নড়বড় হয়ে গেছে।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই দেশের আলেম সমাজ মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘সুদখোর’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের অনেকেই আবার তাদের পূর্ব অবস্থান থেকে সরে এসেছিলেন। ইসলামিক বক্তা মুফতি কাজী ইব্রাহীম তার এক ওয়াজে বলেছেন, ‘ইউনূস আল্লাহ প্রদত্ত নবীদের মতো। আল্লাহ তা’আলা যেভাবে কারও পরামর্শ ছাড়া নিজেই বাছাই করে নবীদের পাঠিয়েছেন, সেভাবেই ইউনূসকেও পাঠিয়েছেন আমাদের জন্য। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হারাম’। মুফতি কাজি ইব্রাহীমের মতো মিজানুর রহমান আজাহারীও মুহাম্মদ ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, তার কথা অনুযায়ী ‘আমাদের বর্তমান নেতা ইউনূস জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’। মিজানুর রহমান আজহারীর এই কথাটির মধ্যে কিছুটা সত্য অবশ্যই আছে, নতুবা পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতারা সকাল-বিকাল মুহাম্মদ ইউনূসের ডাকে যমুনায় ছুটে যেতেন না। তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐক্যের ঘোর বিরোধী মনে হয়েছে ইউনূসকে।
৫ আগস্টের পর দেশে এমন একটি অবস্থার উদ্ভব হয়েছে যেখানে মুফতি কাজি ইব্রাহীমেরাও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন প্রত্যাশা করেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ মুহাম্মদ ইউনূসও আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বাম ও ইসলামপন্থী দলগুলোকে খোশমেজাজে রাখার সব কৌশল প্রয়োগ করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস একজন নির্ভেজাল অসম্প্রদায়িক ব্যক্তি, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে তাকে কেউ কখনো দেখেনি। অথচ তার শাসনামলে দেশ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভস্মিভূত হয়েছে, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ভাঙচুর হয়েছে, ভাঙ্গা হয়েছে হিন্দুদের প্রতিমা, পিটিয়ে-পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে সংখ্যালঘুদের। শুধু সংখ্যালঘু নয়, ভিন্ন তরিকার মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপরও উগ্র ইসলামপন্থীদের আক্রমণে নরকতুল্য ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তুলে সেই লাশকে পিটিয়ে-পুড়িয়ে অবমাননা করা হয়েছে, ‘বেশ্যা’ নাম দিয়ে জনসম্মুখে নারীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভ-ুল করা হয়েছে, বিরুদ্ধ মতের লোকদের ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে কোপানো হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কান ধরে উঠবস করানো হয়েছে, শিক্ষককে গাছের সঙ্গে বেঁধে, গলায় জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের জীবনধারা ও অভিরুচির সঙ্গে এই ঘটনাগুলো ছিল বেমানান। দুঃখের বিষয় এগুলো দেখেও ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকার ছিল উদাসীন ও নির্বিকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ধর্মের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে, বিশেষ করে হিজাব এবং টুপির ব্যবহার বেড়েছে, বেড়েছে ধর্মীয় উগ্রপন্থারও। আওয়ামী লীগ না থাকায় এখন নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। অথচ ৫ আগস্টের পূর্বে এমন একটি অবস্থার কথা কেউ কল্পনাও করেনি। আওয়ামী লীগ পুনরুত্থানের ভয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বদা আতঙ্কিত ছিল, এমন কী আওয়ামী লীগের অদৃশ্য উপস্থিতির কল্পনাও তাদের মানসিক শক্তিকে অহর্নিশ তাড়িত করেছে এবং এই তাড়না থেকেই তারা আওয়ামী লীগ বিরোধী উগ্র ধর্মপন্থাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, এবং এই প্রশ্রয়েই ‘মব সন্ত্রাস’ হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য। মব সন্ত্রাসকে নিয়ন্ত্রণের কোন চেষ্টাই করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগের নিশ্চিহ্নকরণে অন্তর্বর্তী সরকার এতবেশি সক্রিয় ছিল যে, মব সন্ত্রাসের আইনবিরোধী ধ্বংসাত্মক কর্মকা-কে নীরবে নিভৃতে অন্তর্বর্তী সরকার শুধু হজম করেনি, ইনডেমনিটির মাধ্যমে অনুমোদনও দিয়েছে। মব সন্ত্রাসের ইতিবাচক দিক হচ্ছে, ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগারদের কল্পনাতীত উপস্থিতি। আওয়ামী লীগ সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও অভ্যুত্থানে অংশভোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মামলা নির্বিচারে প্রত্যাহার করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসৃত নীতি-পদ্ধতি বহির্ভূত নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের কোন একটি ভালো নজির জনগণের নিকট দৃশ্যমান হয়নি, নতুন বন্দোবস্ত গড়ার পরিবর্তে পুরাতন বন্দোবস্তে দেশকে আবদ্ধ রেখে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে।
ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তী সরকারের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব-সংবলিত জুলাই সনদ গণভোটে পাস হয়েছে। কারণ নির্বাচনে যে দলগুলো অংশগ্রহণ করেছে তার সবগুলো দলই জুলাই সনদের পক্ষে। সম্ভবত আওয়ামী লীগের ভোটাররা ‘না’-তে ভোট দিয়েছে। সরকার সংসদ নির্বাচনে তত আগ্রহী নয়, যত আগ্রহী গণভোটে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলেই অন্তর্বর্তী সরকার এই নির্বাচনে জিতে যাবে, সংসদে কে জিতলো তা সরকারের নিকট মুখ্য নয়, কারণ বিএনপি এবং জামায়াত উভয় দলই অভ্যুত্থানের অংশভোগী, যে দলই জিতুক সেই দলই ইউনূসের অনুরাগী থাকবে। তবে জুলাই সনদ দিয়ে স্বৈরশাসনের উদ্ভব ঠেকানো যাবে না, কারণ আইনের বাধ্যবাধকতা দিয়ে শাসকের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। জুলাই সনদে অনেকগুলো ভালো প্রস্তাব রয়েছে, আবার কতগুলো অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল প্রস্তাবও রয়েছে। যে দেশে এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদকে সক্রিয় করা যায় না, দলের শীর্ষ নেতা না থাকলে সাংসদদের অনুপিস্থিতি বেড়ে যায়, আর সংসদে থাকলে শীর্ষ নেতার গুণগানে সাংসদগণ মুখর হয়ে ওঠেন, সেই সংসদকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করার উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় অর্থের শ্রাদ্ধ করার সামিল। জুলাই সনদ নিয়ে সম্ভব হলে আরেকটি লেখা লিখব।
বিগত দেড় বছর ধরে ইউনূস বাংলাদেশের জনগণকে শুধু স্বপ্ন দেখিয়েছেন, কিন্তু তা ছিল দিবাস্বপ্ন। তিনি অবাস্তব স্বপ্নে জাতিকে উজ্জীবিত করেছেন সত্য, কিন্তু নিজে উজ্জীবিত হননি। তিনি সংস্কারে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে ৮৪টি প্রস্তাব-সংবলিত জুলাই সনদ তৈরি করেছেন। কিন্তু দেড় বছরাধিক কালে তিনি বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা বন্ধ করতে পারেননি, পিস্তল আর মাদক গুঁজিয়ে দিয়ে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করার পুরানো নীতি অব্যাহত রয়েছে, নিরীহ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করার স্বৈরচারি কূটকৌশল অনবচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলা-উপজেলায় ডাক্তারদের অনুপস্থিতর ছেদ টানা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছাত্রদের লেজুড়বৃত্তি শিক্ষার মানকে এখনো কলুষিত করছে। আমলা-মন্ত্রীর অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ অপ্রতিহত গতিতে চলছে। ঘুষ-দুর্নীতি আগের মতোই চলছে। অর্থ পাচারের কথাও শোনা যাচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে গণভোট প্রাসঙ্গিক নয়, প্রশাসনিক আদেশ এবং নিরপেক্ষ মনিটরিংই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু জনসম্পৃক্ত এই সব সংস্কার করার কোন গরজই বোধ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। মুহাম্মদ ইউনূস তার বিখ্যাত ‘তিন শূন্য’র তত্ত্বের কথা বাংলাদেশে বাস্তবায়নের কথা একেবারেই ভুলে গেলেন। ইউনূসের কথিত সারা পৃথিবী বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসেনি, বরং বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টের অভিগম্যতা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমে গেল, আমেরিকা তাদের পণ্য বেশি দামে কিনতে অন্তর্বর্তী সরকারকে বাধ্য করল। আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির ফলশ্রুতিতে অনুরূপ চুক্তি সম্পাদনের চাপ ইউরোপ থেকেও আসার সম্ভাবনা তৈরি হলো।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ এলো না, অধিক সুদহারনীতি দিয়ে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকেও রুদ্ধ করা হলো। দেশের সব প্রায় সব সেক্টরের বিমর্ষ চেহারাÑ রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বহু কারখানা ধ্বংস হলো, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন হলো, দেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্রের সংখ্যা বাড়ল, পাচার করা একটি টাকাও ফেরত আনা সম্ভব হলো না। আসছে রমযানে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ইদ উদযাপনের সুযোগ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি প্রধান উপদেষ্টা দিয়েছিলেন, সেই রোহিঙ্গাদের একজনকেও মায়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আরও ১ লাখ ৩৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে এবং ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার অনুকূলে পাসপোর্ট ইস্যু করে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করলো। গত রমজানে জাতিসংঘের মহাসচিবের উপস্থিতিতে আয়োজিত রোহিঙ্গাদের জনসভায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুঝিয়ে দিলেন যে, রোহিঙ্গারা চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোক। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপে সব রোহিঙ্গার অনুকূলে জাতীয় পরিচয়পত্র দিলেও আশ্চর্য হব না।
ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে মামলা হয়েছে, মামলা হয়েছে সাংবাদিক, খেলোয়াড়, অভিনয় শিল্পী, সংগীত শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের নামে, এবং প্রায় সব মামলাই খুনের মামলা। আওয়ামী লীগকে শাস্তি দিতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জাতির বিভাজনের ফাটলকে আরও গভীর ও সম্প্রসারিত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, একে অপরের শত্রু। এই বিভাজনে জাতিও মতদ্বৈধতায় বিভাজিত, বহিঃশত্রুর আক্রমণেও ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে বলে মনে হয় না। ইউনূস জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার একটা সুযোগ পেয়েছিলেন, পারষ্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ এড়িয়ে সমন্বয়ের শক্তিশালী ব্যুহ রচনা করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তার ধারেকাছেও গেলেন না। ইউনূসের কথিত নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুবর্ণ সুযোগ তার হাতেই ভেস্তে গেল। তাদের যৎসামান্য সাফল্যও প্রেস সেক্রেটারির উপস্থাপনের রূঢ়তায় ম্লান হয়ে গেছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ইতিহাসে এক ভয়ংকর আতঙ্কের প্রতীক হয়ে থাকবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক]