শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
শেষ হলো বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসি (ইলেকশন কমিশন) ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। ইসির প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন।
গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে মোট ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। গত শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জনসংযোগ শাখা থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে ৫০টি দল। দলগুলোর ১,৭৫৫ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে লড়েছেন। এর বাইরে ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। সব মিলিয়ে ২৯৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ২,০২৮ জন। এবার সর্বোচ্চ ২৯১ জন প্রার্থী ছিল দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির। এরপর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-২৫৮ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-২২৮ জন, জাতীয় পার্টি-২০০ জন।
অন্যান্য দলের মধ্যে ছিল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-১৩ জন, জাতীয় পার্টি (জেপি)-১০ জন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-৬৫ জন, গণতন্ত্রী পার্টি-১ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-২৮ জন, জাকের পার্টি-৫ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-৩৫ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-২ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন-৮ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-১৬ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)-২২ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-৪ জন, গণফোরাম-২০ জন, গণফ্রন্ট-৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)-১ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-৬ জন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ-২০ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি-২ জন, ইসলামী ঐক্যজোট-২ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-৩৪ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট-২৫ জন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-১ জন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি-৭ জন, খেলাফত মজলিস-২০ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল)-৪ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট)-২০ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)-৮ জন, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)-৮ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস-১৮ জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ-৪২ জন, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ)-১৫ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)-১৮ জন, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)-৩০ জন, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি)-৯৪ জন, নাগরিক ঐক্য-১১ জন, গণসংহতি আন্দোলন-১৭ জন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি-২ জন, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি)-৮ জন, বাংলাদেশ লেবার পার্টি-১৭ জন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি)-১৪ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-৩২ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-৩২ জন, জনতার দল-২০ জন, আমজনতার দল-১৫ জন, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি)-১ জন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি-৩ জন।
তবে এই নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১টি মৌলবাদী দল একটি জোট গঠন করে। জোটবদ্ধ দলগুলো নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়। এই জোটে হাসিনা সরকার পতন আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত এনসিপিও ছিল।
অনেকেরই ধারণা ছিল, ১১-দলীয় জোট এই নির্বাচনে ভূমিধস জয় লাভ করবে। কারণ এই দেশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। তাই জোটটি নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ইসলাম ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। নির্বাচনের মাঠে তারা নিজেদের ইসলামের ‘সোল এজেন্ট’ হিসেবে দাবি করে। তারা এ কথাও বলেছিল যে, তাদের ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়ার টিকিট পাওয়া যাবে। অর্থাৎ তাদের ভোট দেয়া মানে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কাজ।
এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে লড়েছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন প্রার্থী মাঠে লড়াই করলেও ফলাফলে তাদের অবস্থান দৃশ্যমান ছিল না।
এবারের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একমাত্র শক্তি হিসেবে মাঠে লড়েছে বিএনপি। আর তার বিপক্ষে ছিল পাকিস্তানি ভাবাদর্শসম্পন্ন ও ধর্মীয় মৌলবাদের সূতিকাগার জামায়াত ও তার সহযোগীরা।
এই নির্বাচনে জামায়াত বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে। ১৩তম জাতীয় নির্বাচনে ধর্ম, অর্থ ও পেশিশক্তি-সবই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে তারা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বিভিন্ন দপ্তরে জামায়াত মতাদর্শের সরকারি কর্মীদের বসানো হয়েছিল। দেশের প্রায় সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে অধিষ্ঠিত হয় প্রাক্তন শিবির কর্মীরা। তাছাড়া প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদেও জামায়াতি মতাদর্শের ব্যক্তিদের দেখা গেছে।
এত কিছুর পরও জামায়াত টাকা দিয়ে ভোট কেনার জন্য মাঠে নামে। ঢাকা থেকে আকাশপথে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে আসার পর নগদ ৭৪ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিনকে আটক করে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটে ১১ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ নির্বাচনের আগের দিন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে বিশেষ অভিযান চালায় পুলিশ। ঢাকা থেকে আসা নভোএয়ারের একটি ফ্লাইটে তিনি সৈয়দপুরে অবতরণ করেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই টাকা উত্তরাঞ্চলের ভোট কেনার জন্য কেন্দ্র থেকে পাঠানো হয়েছিল। তবে জামায়াত বিষয়টি অস্বীকার করে।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টাকা দিয়ে ভোট কেনা এবং ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ঘুষ দেওয়ার সময় জামায়াত কর্মীরা হাতেনাতে ধরা পড়ে। এত কিছু করেও জামায়াত বৈতরণী পার হতে পারেনি। কারণ বাংলা জনপদের মানুষ ধর্মভীরু, তবে ধর্মান্ধ নয়।
তাই এখানে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের ধাঁচে ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সহজ নয়। হাসিনা সরকারও চেষ্টা করেছিল মৌলবাদকে কাছে নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখতে, কিন্তু তা পারেনি। হাসিনা মৌলবাদকে নিজের বৃত্তে নিয়েছিলেন; তিনি কওমি মা উপাধিও পেয়েছিলেন। তার শাসনকালে মৌলবাদী কওমি শিক্ষা (ভারতের দেওবন্দি ধারার) বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতুল্য মর্যাদা পায়।
হাসিনা একদিকে ধর্ম, অন্যদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধ-দুইকে ব্যবহার করে স্বৈরাতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই তাসের ঘর ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ভেঙে পড়ে। এরপরই উত্থান ঘটতে শুরু করে জামায়াতি মৌলবাদী ধারার। দীর্ঘ ১৭ মাস এই ধারার মাধ্যমে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা চলে।
অনেকের আশঙ্কা ছিল, জামায়াত শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হতে দেবে না। কিন্তু তা পারেনি। তারা আশা করেছিল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করবে। জামায়াতের বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে-অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের এত আর্থিক প্রতিষ্ঠান নেই বলে তাদের ধারণা। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে তারা জয়ী হবে-এমন প্রত্যাশাই ছিল। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো-ভূমিধস পরাজয়।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি তারেক জিয়ার নেতৃত্বে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। এই নির্বাচনে বিএনপি পায় ২১২টি আসন, যা পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পায় ৭৬টি আসন, স্বতন্ত্র ও অন্যান্যরা পায় ৭টি; বাকি ৪টি আসনের ফল পৃথক।
এই নির্বাচনে প্রমাণ হয়, বাংলা জনপদে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সিদ্ধি লাভ সহজ নয়।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
শেষ হলো বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসি (ইলেকশন কমিশন) ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। ইসির প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন।
গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে মোট ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। গত শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জনসংযোগ শাখা থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে ৫০টি দল। দলগুলোর ১,৭৫৫ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে লড়েছেন। এর বাইরে ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। সব মিলিয়ে ২৯৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ২,০২৮ জন। এবার সর্বোচ্চ ২৯১ জন প্রার্থী ছিল দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির। এরপর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-২৫৮ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-২২৮ জন, জাতীয় পার্টি-২০০ জন।
অন্যান্য দলের মধ্যে ছিল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-১৩ জন, জাতীয় পার্টি (জেপি)-১০ জন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-৬৫ জন, গণতন্ত্রী পার্টি-১ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-২৮ জন, জাকের পার্টি-৫ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-৩৫ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-২ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন-৮ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-১৬ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)-২২ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-৪ জন, গণফোরাম-২০ জন, গণফ্রন্ট-৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)-১ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-৬ জন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ-২০ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি-২ জন, ইসলামী ঐক্যজোট-২ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-৩৪ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট-২৫ জন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-১ জন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি-৭ জন, খেলাফত মজলিস-২০ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল)-৪ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট)-২০ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)-৮ জন, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)-৮ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস-১৮ জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ-৪২ জন, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ)-১৫ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)-১৮ জন, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)-৩০ জন, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি)-৯৪ জন, নাগরিক ঐক্য-১১ জন, গণসংহতি আন্দোলন-১৭ জন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি-২ জন, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি)-৮ জন, বাংলাদেশ লেবার পার্টি-১৭ জন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি)-১৪ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-৩২ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-৩২ জন, জনতার দল-২০ জন, আমজনতার দল-১৫ জন, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি)-১ জন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি-৩ জন।
তবে এই নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১টি মৌলবাদী দল একটি জোট গঠন করে। জোটবদ্ধ দলগুলো নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়। এই জোটে হাসিনা সরকার পতন আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত এনসিপিও ছিল।
অনেকেরই ধারণা ছিল, ১১-দলীয় জোট এই নির্বাচনে ভূমিধস জয় লাভ করবে। কারণ এই দেশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। তাই জোটটি নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ইসলাম ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। নির্বাচনের মাঠে তারা নিজেদের ইসলামের ‘সোল এজেন্ট’ হিসেবে দাবি করে। তারা এ কথাও বলেছিল যে, তাদের ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়ার টিকিট পাওয়া যাবে। অর্থাৎ তাদের ভোট দেয়া মানে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কাজ।
এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে লড়েছে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন প্রার্থী মাঠে লড়াই করলেও ফলাফলে তাদের অবস্থান দৃশ্যমান ছিল না।
এবারের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একমাত্র শক্তি হিসেবে মাঠে লড়েছে বিএনপি। আর তার বিপক্ষে ছিল পাকিস্তানি ভাবাদর্শসম্পন্ন ও ধর্মীয় মৌলবাদের সূতিকাগার জামায়াত ও তার সহযোগীরা।
এই নির্বাচনে জামায়াত বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে। ১৩তম জাতীয় নির্বাচনে ধর্ম, অর্থ ও পেশিশক্তি-সবই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে তারা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বিভিন্ন দপ্তরে জামায়াত মতাদর্শের সরকারি কর্মীদের বসানো হয়েছিল। দেশের প্রায় সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে অধিষ্ঠিত হয় প্রাক্তন শিবির কর্মীরা। তাছাড়া প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদেও জামায়াতি মতাদর্শের ব্যক্তিদের দেখা গেছে।
এত কিছুর পরও জামায়াত টাকা দিয়ে ভোট কেনার জন্য মাঠে নামে। ঢাকা থেকে আকাশপথে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে আসার পর নগদ ৭৪ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিনকে আটক করে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটে ১১ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ নির্বাচনের আগের দিন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে বিশেষ অভিযান চালায় পুলিশ। ঢাকা থেকে আসা নভোএয়ারের একটি ফ্লাইটে তিনি সৈয়দপুরে অবতরণ করেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই টাকা উত্তরাঞ্চলের ভোট কেনার জন্য কেন্দ্র থেকে পাঠানো হয়েছিল। তবে জামায়াত বিষয়টি অস্বীকার করে।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টাকা দিয়ে ভোট কেনা এবং ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ঘুষ দেওয়ার সময় জামায়াত কর্মীরা হাতেনাতে ধরা পড়ে। এত কিছু করেও জামায়াত বৈতরণী পার হতে পারেনি। কারণ বাংলা জনপদের মানুষ ধর্মভীরু, তবে ধর্মান্ধ নয়।
তাই এখানে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের ধাঁচে ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সহজ নয়। হাসিনা সরকারও চেষ্টা করেছিল মৌলবাদকে কাছে নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখতে, কিন্তু তা পারেনি। হাসিনা মৌলবাদকে নিজের বৃত্তে নিয়েছিলেন; তিনি কওমি মা উপাধিও পেয়েছিলেন। তার শাসনকালে মৌলবাদী কওমি শিক্ষা (ভারতের দেওবন্দি ধারার) বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতুল্য মর্যাদা পায়।
হাসিনা একদিকে ধর্ম, অন্যদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধ-দুইকে ব্যবহার করে স্বৈরাতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই তাসের ঘর ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ভেঙে পড়ে। এরপরই উত্থান ঘটতে শুরু করে জামায়াতি মৌলবাদী ধারার। দীর্ঘ ১৭ মাস এই ধারার মাধ্যমে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা চলে।
অনেকের আশঙ্কা ছিল, জামায়াত শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হতে দেবে না। কিন্তু তা পারেনি। তারা আশা করেছিল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করবে। জামায়াতের বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে-অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের এত আর্থিক প্রতিষ্ঠান নেই বলে তাদের ধারণা। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে তারা জয়ী হবে-এমন প্রত্যাশাই ছিল। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো-ভূমিধস পরাজয়।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি তারেক জিয়ার নেতৃত্বে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। এই নির্বাচনে বিএনপি পায় ২১২টি আসন, যা পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পায় ৭৬টি আসন, স্বতন্ত্র ও অন্যান্যরা পায় ৭টি; বাকি ৪টি আসনের ফল পৃথক।
এই নির্বাচনে প্রমাণ হয়, বাংলা জনপদে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সিদ্ধি লাভ সহজ নয়।
[লেখক: প্রাবন্ধিক]