শহীদুল ইসলাম
চা বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত একটি পানীয়, যা পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কালো চা ও সবুজ চা-এই দুই ধরনের চা একই উদ্ভিদ ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস থেকে উৎপন্ন হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এনজাইমজনিত জারণের তারতম্যের কারণে এদের রাসায়নিক গঠন, জৈব সক্রিয় উপাদান ও স্বাস্থ্যগত কার্যকারিতা ভিন্ন হয়ে থাকে। চা পানি-এর পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত পানীয় এবং এটি বহু সংস্কৃতিতে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চা কেবল একটি সামাজিক পানীয় নয়, বরং বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদানে সমৃদ্ধ একটি কার্যকরী খাদ্য। কালো চা ও সবুজ চা বাণিজ্যিকভাবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও, প্রক্রিয়াজাতকরণের ভিন্নতার কারণে এদের স্বাস্থ্যগত প্রভাব ভিন্ন হয়ে থাকে।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো কালো চা ও সবুজ চায়ের একটি সুসংহত ও তুলনামূলক একাডেমিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা। সবুজ চা ও কালো চা উভয়ই একই উদ্ভিদ ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস-এর পাতা থেকে উৎপন্ন। তবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময় এনজাইমজনিত জারণের মাত্রার পার্থক্যের কারণে এদের বৈশিষ্ট্যে মৌলিক ভিন্নতা দেখা যায়। সবুজ চা এমন একটি চা, যেখানে চা পাতায় এনজাইমজনিত জারণ প্রায় সম্পূর্ণরূপে রোধ করা হয়। পাতা সংগ্রহের পর দ্রুত তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে জারণকারী এনজাইম নিষ্ক্রিয় করা হয়। এর ফলে পাতার প্রাকৃতিক সবুজ রং ও অ-জারিত পলিফেনল সংরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে, কালো চা সম্পূর্ণ এনজাইমজনিত জারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় চা পাতার ক্যাটেচিন যৌগ জারণের মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে থিয়াফ্লাভিন ও থিয়ারুবিজিনে পরিণত হয়, যা কালো চায়ের গাঢ় রং, তীব্র স্বাদ ও সুবাসের জন্য দায়ী। চায়ের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা মূলত এতে উপস্থিত জৈব সক্রিয় উপাদানের ধরন ও পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল, যা এনজাইমজনিত জারণের মাত্রা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ২০০ মিলিলিটার প্রস্তুতকৃত সবুজ চায়ে মোট ক্যাটেচিনের পরিমাণ প্রায় ৮০-১২০ মিলিগ্রাম, যার মধ্যে এপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালেটের পরিমাণ আনুমানিক ৩০-৬০ মিলিগ্রাম। এছাড়া সবুজ চায়ে মোট পলিফেনলের পরিমাণ প্রায় ১৫০-২০০ মিলিগ্রাম, ক্যাফেইন ২৫-৪০ মিলিগ্রাম এবং এল-থিয়ানিন ৬-১০ মিলিগ্রাম বিদ্যমান থাকে। এই উপাদানগুলো সম্মিলিতভাবে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা প্রদর্শন করে এবং কোষগত ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়তা করে। অপরদিকে, প্রতি ২০০ মিলিলিটার প্রস্তুতকৃত কালো চায়ে থিয়াফ্লাভিনের পরিমাণ প্রায় ৮-১৫ মিলিগ্রাম এবং থিয়ারুবিজিনের পরিমাণ আনুমানিক ৬০-১০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
কালো চায়ে অবশিষ্ট ক্যাটেচিনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় ৫-১৫ মিলিগ্রাম, তবে এতে মোট পলিফেনলের পরিমাণ ১২০-১৮০ মিলিগ্রাম এবং ক্যাফেইনের পরিমাণ ৪০-৭০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এই জৈব সক্রিয় উপাদানসমূহ কালো চায়ের হৃদ্?স্বাস্থ্য রক্ষাকারী, প্রদাহনাশক ও উদ্দীপক কার্যকারিতার জন্য দায়ী। সবুজ চা উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা প্রদর্শন করে। নিয়মিত সবুজ চা গ্রহণ অক্সিডেটিভ চাপ হ্রাস, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কালো চা হৃদ্?যন্ত্রের কার্যক্ষমতা উন্নত করা, রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, হজম শক্তি বৃদ্ধি এবং মানসিক সতেজতা প্রদানে কার্যকর। এতে ক্যাফেইনের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এর উদ্দীপক প্রভাবও বেশি। স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে সবুজ চা দিনে ২-৪ কাপ এবং কালো চা দিনে ২-৩ কাপ গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত। অতিরিক্ত চা গ্রহণ ক্যাফেইনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও লৌহ শোষণ হ্রাসের কারণ হতে পারে। উন্নত স্বাস্থ্য উপকারিতা নিশ্চিত করতে কৃত্রিম রং ও সুগন্ধিমুক্ত, ভালো মানের চা নির্বাচন অপরিহার্য। সবুজ চা সাধারণত দুধ ও চিনি ছাড়া পান করা হয় এবং এটি রোগ প্রতিরোধমূলক পানীয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কালো চা দুধ ও চিনি সহ পান করা হলেও অতিরিক্ত চিনি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সচেতন ও পরিমিত চা গ্রহণ জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়ক। সবুজ চা প্রায় চার হাজার বছর আগে চীনে প্রথম ঔষধি পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
কালো চা সপ্তদশ শতকে জনপ্রিয়তা লাভ করে, যখন এনজাইমজনিত জারণ নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি উন্নত হয় এবং বৈশ্বিক চা বাণিজ্যের সূচনা ঘটে। কালো চা ও সবুজ চা একই উদ্ভিদ থেকে উৎপন্ন হলেও এনজাইমজনিত জারণের পার্থক্যের কারণে এদের জৈব সক্রিয় উপাদান, রাসায়নিক গঠন ও স্বাস্থ্যগত কার্যকারিতা ভিন্ন। সবুজ চা রোগ প্রতিরোধে অধিক কার্যকর, অন্যদিকে কালো চা হৃদ্স্বাস্থ্য ও উদ্দীপক কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ। পরিমিত গ্রহণ ও গুণগত মান বজায় রাখাই সর্বোত্তম স্বাস্থ্য উপকারিতা নিশ্চিত করে।
[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
শহীদুল ইসলাম
শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
চা বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত একটি পানীয়, যা পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কালো চা ও সবুজ চা-এই দুই ধরনের চা একই উদ্ভিদ ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস থেকে উৎপন্ন হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এনজাইমজনিত জারণের তারতম্যের কারণে এদের রাসায়নিক গঠন, জৈব সক্রিয় উপাদান ও স্বাস্থ্যগত কার্যকারিতা ভিন্ন হয়ে থাকে। চা পানি-এর পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত পানীয় এবং এটি বহু সংস্কৃতিতে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চা কেবল একটি সামাজিক পানীয় নয়, বরং বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদানে সমৃদ্ধ একটি কার্যকরী খাদ্য। কালো চা ও সবুজ চা বাণিজ্যিকভাবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও, প্রক্রিয়াজাতকরণের ভিন্নতার কারণে এদের স্বাস্থ্যগত প্রভাব ভিন্ন হয়ে থাকে।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো কালো চা ও সবুজ চায়ের একটি সুসংহত ও তুলনামূলক একাডেমিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা। সবুজ চা ও কালো চা উভয়ই একই উদ্ভিদ ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস-এর পাতা থেকে উৎপন্ন। তবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময় এনজাইমজনিত জারণের মাত্রার পার্থক্যের কারণে এদের বৈশিষ্ট্যে মৌলিক ভিন্নতা দেখা যায়। সবুজ চা এমন একটি চা, যেখানে চা পাতায় এনজাইমজনিত জারণ প্রায় সম্পূর্ণরূপে রোধ করা হয়। পাতা সংগ্রহের পর দ্রুত তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে জারণকারী এনজাইম নিষ্ক্রিয় করা হয়। এর ফলে পাতার প্রাকৃতিক সবুজ রং ও অ-জারিত পলিফেনল সংরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে, কালো চা সম্পূর্ণ এনজাইমজনিত জারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় চা পাতার ক্যাটেচিন যৌগ জারণের মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে থিয়াফ্লাভিন ও থিয়ারুবিজিনে পরিণত হয়, যা কালো চায়ের গাঢ় রং, তীব্র স্বাদ ও সুবাসের জন্য দায়ী। চায়ের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা মূলত এতে উপস্থিত জৈব সক্রিয় উপাদানের ধরন ও পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল, যা এনজাইমজনিত জারণের মাত্রা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ২০০ মিলিলিটার প্রস্তুতকৃত সবুজ চায়ে মোট ক্যাটেচিনের পরিমাণ প্রায় ৮০-১২০ মিলিগ্রাম, যার মধ্যে এপিগ্যালোক্যাটেচিন গ্যালেটের পরিমাণ আনুমানিক ৩০-৬০ মিলিগ্রাম। এছাড়া সবুজ চায়ে মোট পলিফেনলের পরিমাণ প্রায় ১৫০-২০০ মিলিগ্রাম, ক্যাফেইন ২৫-৪০ মিলিগ্রাম এবং এল-থিয়ানিন ৬-১০ মিলিগ্রাম বিদ্যমান থাকে। এই উপাদানগুলো সম্মিলিতভাবে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা প্রদর্শন করে এবং কোষগত ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়তা করে। অপরদিকে, প্রতি ২০০ মিলিলিটার প্রস্তুতকৃত কালো চায়ে থিয়াফ্লাভিনের পরিমাণ প্রায় ৮-১৫ মিলিগ্রাম এবং থিয়ারুবিজিনের পরিমাণ আনুমানিক ৬০-১০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
কালো চায়ে অবশিষ্ট ক্যাটেচিনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় ৫-১৫ মিলিগ্রাম, তবে এতে মোট পলিফেনলের পরিমাণ ১২০-১৮০ মিলিগ্রাম এবং ক্যাফেইনের পরিমাণ ৪০-৭০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এই জৈব সক্রিয় উপাদানসমূহ কালো চায়ের হৃদ্?স্বাস্থ্য রক্ষাকারী, প্রদাহনাশক ও উদ্দীপক কার্যকারিতার জন্য দায়ী। সবুজ চা উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা প্রদর্শন করে। নিয়মিত সবুজ চা গ্রহণ অক্সিডেটিভ চাপ হ্রাস, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কালো চা হৃদ্?যন্ত্রের কার্যক্ষমতা উন্নত করা, রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, হজম শক্তি বৃদ্ধি এবং মানসিক সতেজতা প্রদানে কার্যকর। এতে ক্যাফেইনের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এর উদ্দীপক প্রভাবও বেশি। স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে সবুজ চা দিনে ২-৪ কাপ এবং কালো চা দিনে ২-৩ কাপ গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত। অতিরিক্ত চা গ্রহণ ক্যাফেইনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও লৌহ শোষণ হ্রাসের কারণ হতে পারে। উন্নত স্বাস্থ্য উপকারিতা নিশ্চিত করতে কৃত্রিম রং ও সুগন্ধিমুক্ত, ভালো মানের চা নির্বাচন অপরিহার্য। সবুজ চা সাধারণত দুধ ও চিনি ছাড়া পান করা হয় এবং এটি রোগ প্রতিরোধমূলক পানীয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কালো চা দুধ ও চিনি সহ পান করা হলেও অতিরিক্ত চিনি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সচেতন ও পরিমিত চা গ্রহণ জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়ক। সবুজ চা প্রায় চার হাজার বছর আগে চীনে প্রথম ঔষধি পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
কালো চা সপ্তদশ শতকে জনপ্রিয়তা লাভ করে, যখন এনজাইমজনিত জারণ নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি উন্নত হয় এবং বৈশ্বিক চা বাণিজ্যের সূচনা ঘটে। কালো চা ও সবুজ চা একই উদ্ভিদ থেকে উৎপন্ন হলেও এনজাইমজনিত জারণের পার্থক্যের কারণে এদের জৈব সক্রিয় উপাদান, রাসায়নিক গঠন ও স্বাস্থ্যগত কার্যকারিতা ভিন্ন। সবুজ চা রোগ প্রতিরোধে অধিক কার্যকর, অন্যদিকে কালো চা হৃদ্স্বাস্থ্য ও উদ্দীপক কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ। পরিমিত গ্রহণ ও গুণগত মান বজায় রাখাই সর্বোত্তম স্বাস্থ্য উপকারিতা নিশ্চিত করে।
[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]