alt

মুক্ত আলোচনা

দিদি, আপা, “বু” খালা

আসফাক বীন রহমান

: বুধবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৩

‘ শালিক শালিক টো টো ভাই/ আমার কোন দুঃখ নাই। ’

কোনো অজানা শংকায় আম্মা একটি শালিক পাখি দেখে এই ছড়াটি বলে ইতি উঁতি তাকাচ্ছেন । আমরা বুঝতে পারছি উনি আশেপাশে কলা গাছ খুঁজছেন । কলা গাছ দেখলে এক শালিকের কুফা কাটাকাটি ! আমরা সকালে স্কুলে যাবার পথে বিশাল বড় কমিউনিটি সেন্টার মাঠের দক্ষিণ-পূব কোণা অতিক্রম করছি । আমিও ভয়ে দুটি শালিকের জোড় খুঁজছি । দুই শালিক দেখা নাকি ভালো লক্ষণ ! পড়া না পারলেও শাস্তি হবার সম্ভাবনা কম ! আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয়ের গেটের কাছে বিরাট কদম ফুল গাছটির নিচে জোড়া শালিক দেখে আম্মার মুখের দুশ্চিন্তার রেখা উবে যায় । আমরা স্কুলের বিশেষ কৌণিক গম্বুজ আকৃতির ছাদের নিচে লাল বিল্ডিং দেখে দৌড়ে ভিতরে ঢুকে যাই । স্কুল মানে আনন্দ!

“ রুবী আপা ,ইমন কি আপনার ক্লাশে এসেছে ?”-- সাবিহা খালা । “রুবী আপা‘-- আম্মা এবং ’সাবিহা খালা‘-- সাবিহা বেগম আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয়ের ক্লাশ ওয়ান ও বেবী ক্লাশের ক্লাশটিচার । হন্তদন্ত হয়ে আসা সাবিহা খালার চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে আম্মা বললেন,”আজকেও হনুমানটা ক্লাশ থেকে পালিয়েছে ?“ একই ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠের কোনায় ইমনকে পাওয়া গেলো , সাথে বাবু ।উনারা ঢেঁকি খেলা খেলছেন , পাশের দোলনার দুলুনী দেখে বোঝাই যাচ্ছে কতক্ষণ সেখানেও সময় দিয়েছেন । বাবু আমাদের খালাতো ভাই, ইমনের সাথেই বেবী ক্লাশে পড়ে ।

আজিমপুর কলোনীর এক পাশে কমিউনিটি সেন্টার মাঠের উত্তর -পশ্চিমে এবং অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের দক্ষিনে আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয় । এই স্কুলের পশ্চিম বাউন্ডারির পিছনে আজিমপুর কবরস্থানের জংলা জায়গা । দিনের বেলাতেই অসংখ্য বড় বড় গাছের ছায়া এবং ঝোপঝাড়ের কারণে ভুতুড়ে নির্জন পরিবেশ থাকে । ১৯৫৬ সনে আজিমপুর কলোনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গৃহিণীদের রিক্রিয়েশনের জন্য এই লেডিস ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল । শুরুতে কলোনীর বিভিন্ন কর্মকর্তার মিসেসদের পদচারনায় মুখর হলেও একসময় এই লেডিস ক্লাবের সভ্যাগণ একটি সামাজিক -সাংস্কৃতিক পরোপকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করেন । একে একে বুটিক শেখানো , নাচ-গান- বাজনা শেখানো , বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজ শেখানো, চিত্রকলা শেখানোর মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির শিশু ও মহিলাদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন । একই সাথে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করেন যেটা নার্সারি থেকে ক্লাস থ্রী পর্যন্ত আশেপাশের শিশুদের শিক্ষার প্রাথমিক ভিত গড়ে তুলতে থাকে । কলোনীর অনেক বিদূষী ,পরোপকারী অফিসারপত্নীর আন্তরিক চেষ্টা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা ইনস্টিটিউট ও শিশু একাডেমির সম্মিলিত সহযোগিতায় খুব দ্রুত এই লেডিস ক্লাবের নাম পুরো ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে ।

আব্বার কলিগ বিশিষ্ট সমাজসেবী জোবেদা খানমের মাধ্যমে আম্মা বদরুন নাহার বেগম এই স্কুলে পড়াতে শুরু করেন । আমরা দুই ভাই একজন বেবী ক্লাশে, অন্যজন ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি হওয়ায় আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয়ে একইসাথে আমাদের মা-ছেলেদের পদচারণা শুরু হয় । শুরুতে প্রথমে শপথ , জাতীয় সংগীত ও প্রাথমিক কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমে শিশুদের মননে জাতীয়তাবোধ এবং আদর্শ ও নৈতিকতার বীজ বপন করা হয় । গানের শিক্ষক ফাতেমা বেগমের আন্তরিকভাবে শিশুদের গান শেখানোর চেষ্টা এখনো মনে পড়ে । মিষ্টি স্বভাবের ফাতেমা খালা অল্প বয়সে ডায়াবেটিস ও প্রেশারে ভুগলেও নিয়মিত হাসিমুখে বাচ্চাদের শেখাতে আসতেন ।

সবচেয়ে ছোট ক্লাশ নার্সারির শিক্ষক মরিয়ম বেগম (মেরী খালা) আজিমপুর চায়না বিল্ডিং এর গলির বাসা থেকে স্কুলে আসার পথে প্রায়ই স্কুলের তিন /সাড়ে তিন বছরের দু- তিনটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ক্লাসে ঢুকতেন ।”মেরী আপা নাক দিয়ে শিকনি বের হওয়া এই গুড়ি গুড়ি বাচ্চাদের কোলে নিতে অস্বস্তি লাগেনা ?“ আম্মার এই কথার জবাবে মেরি খালা বলেন,” বাচ্চারা ফুলের মতো , ওদেরকে আমার খুব ভালো লাগে।“ স্কুল থেকে রিটায়ার করে যাবার পরও বাধ্যর্কের শেষ সীমা পর্যন্ত প্রায়ই উত্তরা থেকে জ্যাম ঠেলে আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয়ে এসে বাচ্চাদের আদর করে যেতেন ; সাথে থাকতো ব্যাগভর্তি চকলেট, বিদেশী বিস্কিট ।

ক্লাস টু এর আনোয়ারা বেগম (আনু খালা ) আর প্লে- গ্রুপের লাইলি বেগমের (লাইলি খালা) চটপটে , হাসিমুখ দেখে বাচ্চারা আশ্বস্ত হতো । প্রত্যেকেই ছিলেন প্রাণোচ্ছ্বল আর আন্তরিক ।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মেয়ে সাবিহা খালা বড় বড় অনেক চাকুরীর অফার ফিরিয়ে এই ছোট্ট স্কুলটিতে সময় দেয়াকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বিষয়ের মাস্টার্স করা সাবিহা বেগম একসময় এই স্কুলের হেডমিষ্ট্রেস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ।

তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষিকা জমিদার জায়া বিজয়া রায় চৌধুরী রাসগম্ভীর একজন শিক্ষক ছিলেন । ফর্সা, ছিপছিপে গড়নের হেড মিষ্ট্রেসকে ছাত্র-ছাত্রীরা বেশ ভয় পেতো ; অভিভাবকেরা সমীহ করতেন । পড়া বুঝানোর পর আদায় করতে দরকার লাগলে হাতে দুই একটা স্কেলের বাড়ি মারতেন । স্কুলের সব শিক্ষক আম্মার কলিগ হওয়ায় উনাদেরকে আমরা খালা ডাকতাম । সবাই সবার নাম বললেও প্রধান শিক্ষিকাকে দিদি বলেই অন্যরা সম্বোধন করতেন । আমরা দুই ভাই ভাবতাম উনার ডাকনাম দিদি , তাই উনি ’ দিদি আপা’!

ষ্টাফ বাদশার মা,মোহন মিয়া ,ওয়াহিদ মিয়াদের আন্তরিকতায় স্কুলটিকে বাচ্চারা নিজেদের বাড়ীর মতোই ভাবতো । এনুয়াল স্পোর্টসে বস্তাদৌড়, বিস্কিট দৌড় , চামচ দৌড় ,মিউজিক্যাল চেয়ার ইত্যাদি প্রতিযোগিতায় উনাদের উৎসাহ শিশুদের তুলনায় কোন অংশেই কম ছিলো না ।

বছরের প্রথমে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে তিন দিনব্যাপী মিনা বাজার অনুষ্ঠানে ক্লাবের সভ্যা ও শিক্ষার্থীরা তাদের হাতের মিনাকারি করা জিনিস , নকল গয়না , বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের সামান নিয়ে বসেন। সাথে থাকে বিভিন্ন মুখরোচক আচার, চাটনি ,বিরিয়ানি , তেলে ভাজা পিঠা ও নাস্তার দোকান । সবাই নিজেদের হাতের কাজ দেখিয়ে অন্যদের মুগ্ধ করতে চান । প্রতিবছরই এক আন্টির শুকনো মরিচের টকটকে লাল মিষ্টি আচার কিনে দেওয়ার জন্য আম্মার কাছে অনুনয় বিনয় করতাম ।

আমার ও ইমনের মধ্যে ধৈর্য্যের টাগ অব ওয়ার চলছে । ‘মাহমুদাবু ’খালার বাসায় শাহানা আপার দেয়া বিস্কিট- চানাচুরের প্লেট সাবাড় করার পর অবশিষ্ট বিস্কিটটা কে নিবে সেটা নিয়ে । ভয়ে আম্মার দিকে তাকাচ্ছি না, চোখ দিয়ে ভষ্ম করে দিবেন ! এর মধ্যে দুই তিনবার গলাখাকাড়ি দিয়ে আম্মা আমাদের ১০ নাম্বার মহা-বিপদ সংকেত প্রেরণ করেছেন । ‘মাহমুদাবু ’ খালার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ভরসা পাই । হাত বাড়াতে গিয়েও গুটিয়ে নেই ,বাসায় যাবার পর ভদ্রতা কম শেখার কারণে আম্মার চুল টানা খাওয়ার ভয়ে ।

মাহমুদা বেগম, আম্মার খালাতো বোন । কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপনা ছেড়ে ডেপুটি সেক্রেটারি হয়েছেন । প্রচণ্ড জ্ঞানতৃষ্ণা উনার । আমাদের ৩২ নাম্বার বিল্ডিং এর পাশের ৪০ নম্বর বিল্ডিং-এর চার তলায় উনার বাসা । প্রায়ই আম্মার সাথে সন্ধ্যায় উনার বাসায় বেড়াতে আসি । বিকেলে প্রায়ই খালাকে পাওয়া যায় না ,একটার পর একটা বিদেশী ভাষা শিক্ষা করছেন । স্পেনিশ, জার্মান, জাপানি , মাঞ্চুরিয়ান ভাষা শেখার পর ধানমন্ডির অঁলিয়াস ফ্রাঁসে শিখছেন ফ্রেঞ্চ ভাষা । মাহমুদা খালা বাসায় না থাকলেও সমস্যা নাই ; শাহানা আপা ,নাফিজা আপা , নন্দন ভাই -বেদন ভাইদের কেউ না কেউ থাকলেই আমাদের আপ্যায়নে কোন সমস্যা নাই । আজকে নন্দন ভাইকে দেখতে এসেছি । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নন্দন ভাই প্রায় প্রতি পাঁচ-ছয় মাস পর পর কোন না কোন একটা অ্যাক্সিডেন্ট করে হয় মাথায় বা হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে থাকেন । এবার নাকে ও মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা নন্দন ভাইকে দেখে মিশরের মমীর মত লাগছে । এর মাঝেই কোঁ কোঁ করতে করতে আম্মার কাছে নালিশ দিলেন ,”খালা, এই দুইটা রাস্তায় আমাকে তুই- তোকারি করে দৌড় দেয় । নন্দা-গন্ধা বলে ক্ষেপায়। “

প্রায়ই টিলো- এক্সপ্রেস খেলতে গিয়ে নন্দন ভাইদের বাসায় পালিয়ে থাকি । বসে বসে টিভিতে কার্টুন দেখার ফাঁকে নাফিজা আপাকে অনুরোধ করি বারান্দা দিয়ে দেখতে -খেলার চোর এখন কোন দিকে ঘোরাফেরা করছে ! খালু লালবাগ বাজার থেকে প্রায় রোববারেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দুই তিন পাতি বাজার সদাই করে মিন্তির মাথায় উঠিয়ে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে ফেরেন । গতদিন বিকেলে টিলো-এক্সপ্রেস খেলার সময় দুধ খেতে দেয়ায় আম্মার কাছে অনুযোগ করেছি ,” মেহমানদের কেউ দুধ খেতে দেয় নাকি !“ আম্মা আমাদের প্রেস্টিজ পাংচার করে মাহমুদা খালার কাছে বলে দেন ,”মাহমুদাবু আপনারা মেহমানদের দুধ খেতে দেন কেন?“ খালা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন ।

কিছুদিন আগে পিচ্চি সাইজের আস্ত কাঁঠাল ভেঙে টেবিলে শাহানা আপা আমাদের খেতে ডাকেন । আমরা আপন মনে কাঁঠাল থেকে কোষ বের করে খাওয়ার সময় ওনারা চার ভাই -বোন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কর্মকান্ড দেখে মিটিমিটি হাসছিলেন । এটা দেখে তাড়াতাড়ি খাওয়া ফেলে লজ্জায় দৌড়ে মাঠে চলে আসি । নন্দন ভাই বারান্দা দিয়ে , ”ওই সুমইন্যা- ওই ইমইন্যা তাড়াতাড়ি আয় “ বলে আমাদের নিমন্ত্রণ করে কাঁঠাল খেতে দিয়েছিলেন।

আম্মা ‘মাহমুদাবু ’ ডাকেন ; আমরা কথা গুলিয়ে ‘মাহমুদাবু ’খালা ডাকি । এটা শুনে উনি খুব মজা পান। কিন্তু, আমরা ধরতে পারি না কেন হাসেন ? বাসায় পোলাও- কোর্মার আয়োজন থাকলে নন্দন ভাই -শাহানা আপা আমাদেরকে উনাদের বাসায় নিয়ে যাবেনই।

‘ জাহেদাবু’ খালার বাসায় পোর্টিকোতে ‘ব্যাঙ গাড়ি’ দেখে সতর্ক দৃষ্টিতে আমরা তানভীর -তানজিমকে খুঁজতে থাকি । ওরা বড় মামার ছেলে , কুমিল্লায় থাকে । মাঝে মাঝে ঢাকায় বেড়াতে এলে হারুন মামার ভক্স ওয়াগান গাড়িটি ব্যবহার করে । ‘জাহেদাবু’ খালা আমাদের আরেকজন ‘ বু খালা’ ! উনি মাহমুদা খালার বড় বোন কবি ও সমাজসেবী জাহেদা খাতুন । ধানমন্ডি ৯ নাম্বারের বিশাল বিশাল ছায়া ঢাকা গাছের মাঝখানে উনাদের লাল দুই তলা বাসা । মাঝে মাঝে সারাদিনের জন্য এই বাসায় বেড়াতে আসি । খালু ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল হক পূর্ত দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ; দেখতে অনেকটা সোভিয়েত নেতা গর্ভাচেভের মতো ! জাহেদা খালার দুই মেয়ে বেবী আপা আর হ্যাপী আপা নারী পক্ষ -একশন এইড নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন । উনারা প্রায়ই ইংল্যান্ড- আমেরিকা যাতায়াতের কারণে নিঃসঙ্গ খালা আমাদের দেখলেই খুব আনন্দিত হন । টেলিভিশনে ‘হাওয়াই ফাইভ ও ’ সিরিজে দেখা ‘ব্লেন্ডারের জুস খেতে না জানি কতো মজা ’ ভেবে আফসোস করতাম । বেশ কয়দিন আগে জাহেদা খালার বাসায় ব্লেন্ডারে করা তরমুজের জুস খেতে গিয়ে তরমুজের বন্য গন্ধের কারণে গ্লাসটি টেবিলে রেখে দেয়ায় খালু ব্যাপারটি বুঝতে পেরে তরমুজ টুকরা টুকরা করে আনার পরামর্শ দেন । বেবী আপার হাসবেন্ড ডাক্তার জাফরউল্লাহর ঝোঁপালো গোঁফ দেখে বেশ ভয় পাই , দুলামিয়া বোধহয় অনেক রাগী ! প্রায় প্রতি মাসেই ‘জাহেদাবু ’ খালা ঢাকায় থাকা উনার আত্মীয়- স্বজনদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ান । উনাদের সাজানো গোছানো বাসায় দুষ্টামি করার মতো বড় ভাই- বোন না পেলেও বিদেশি চকলেটের অফুরন্ত স্টক আমাদেরকে প্রায়ই হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালার মতো আকর্ষণ করতো ।

‘বু খালা ’-‘দিদি আপারা’ আজ আর কেউ নেই । ’সুমইন্যা-ইমইন্যা‘ বলে আন্তরিকতা নিয়ে ডাকার মতো স্বজনরা আজ প্রায় সবাই হারিয়ে গেছেন ।

-- যেদিন গেছে,/ সেদিন কি আর / ফিরিয়ে আনা যায় ।।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ]

একুশে ফেব্রুয়ারি আত্মপরিচয়ের দিন

হিজল-করচ-আড়াংবন

ছবি

শেখ হাসিনা, এক উৎসারিত আলোকধারা

মনমাঝি

সেই ইটনা

ছবি

আংকর ওয়াট : উন্নত সভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন যেখানে

নিয়ত ও নিয়তি

হারিয়ে যাওয়া ট্রেন

টম সয়ার না রবিনহুড

ছবি

‘ঝড়-বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে’

বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতা স্মারক: স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনন্য মাইলফলক

রাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনের পরিবর্তন আশু প্রয়োজন

কুয়েতের জীবনযাত্রার সাতকাহন: পর্ব-১-বিয়ে

বিবেকের লড়াই

ছবি

ছবি যেন শুধু ছবি নয়

বাত ব্যথার কারণ ও আধুনিক চিকিৎসা

ছবি

স্বাধীন স্বদেশে মুক্ত বঙ্গবন্ধু

ছবি

মহান নেতার স্বভূমিতে ফিরে আসা

ছবি

মেট্রোরেল : প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী চিন্তার ফসল

ছবি

আমার মা

ডিজিটাল বাংলাদেশ: প্রগতিশীল প্রযুক্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নতি

ছবি

৩ নভেম্বর: ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের ধারাবাহিকতা

দেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক দ্বিতীয় অধ্যায়

এইচ এস সি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের অনুশীলন

ছবি

ত্রিশ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

শিল্প কারখানার পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এনভায়রনমেন্টাল ইন্জিনিয়ারিং

অসুর: এক পরাজিত বিপ্লবী

অসুর জাতির ইতিহাস

বিশ্ব শিক্ষক দিবস : শিক্ষা পুনরুদ্ধারে শিক্ষকদের চ্যালেঞ্জ

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন দুই লেনে উন্নীত করার কাজ দ্রুত শেষ করুন

পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছে হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট

১৯৭১ : জোহরাতাজউদ্দীন ও বাঘাউরা ট্রাজেডি রহমান আতিক

কৃষি পর্যটনের বিকাশ এখন সময়ের দাবী

রণেশ মৈত্র: আপাদমস্তক সাংবাদিক

ছবি

উন্নয়নের রোল মডেল

ছবি

উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রতীক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

tab

মুক্ত আলোচনা

দিদি, আপা, “বু” খালা

আসফাক বীন রহমান

বুধবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৩

‘ শালিক শালিক টো টো ভাই/ আমার কোন দুঃখ নাই। ’

কোনো অজানা শংকায় আম্মা একটি শালিক পাখি দেখে এই ছড়াটি বলে ইতি উঁতি তাকাচ্ছেন । আমরা বুঝতে পারছি উনি আশেপাশে কলা গাছ খুঁজছেন । কলা গাছ দেখলে এক শালিকের কুফা কাটাকাটি ! আমরা সকালে স্কুলে যাবার পথে বিশাল বড় কমিউনিটি সেন্টার মাঠের দক্ষিণ-পূব কোণা অতিক্রম করছি । আমিও ভয়ে দুটি শালিকের জোড় খুঁজছি । দুই শালিক দেখা নাকি ভালো লক্ষণ ! পড়া না পারলেও শাস্তি হবার সম্ভাবনা কম ! আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয়ের গেটের কাছে বিরাট কদম ফুল গাছটির নিচে জোড়া শালিক দেখে আম্মার মুখের দুশ্চিন্তার রেখা উবে যায় । আমরা স্কুলের বিশেষ কৌণিক গম্বুজ আকৃতির ছাদের নিচে লাল বিল্ডিং দেখে দৌড়ে ভিতরে ঢুকে যাই । স্কুল মানে আনন্দ!

“ রুবী আপা ,ইমন কি আপনার ক্লাশে এসেছে ?”-- সাবিহা খালা । “রুবী আপা‘-- আম্মা এবং ’সাবিহা খালা‘-- সাবিহা বেগম আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয়ের ক্লাশ ওয়ান ও বেবী ক্লাশের ক্লাশটিচার । হন্তদন্ত হয়ে আসা সাবিহা খালার চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে আম্মা বললেন,”আজকেও হনুমানটা ক্লাশ থেকে পালিয়েছে ?“ একই ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠের কোনায় ইমনকে পাওয়া গেলো , সাথে বাবু ।উনারা ঢেঁকি খেলা খেলছেন , পাশের দোলনার দুলুনী দেখে বোঝাই যাচ্ছে কতক্ষণ সেখানেও সময় দিয়েছেন । বাবু আমাদের খালাতো ভাই, ইমনের সাথেই বেবী ক্লাশে পড়ে ।

আজিমপুর কলোনীর এক পাশে কমিউনিটি সেন্টার মাঠের উত্তর -পশ্চিমে এবং অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের দক্ষিনে আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয় । এই স্কুলের পশ্চিম বাউন্ডারির পিছনে আজিমপুর কবরস্থানের জংলা জায়গা । দিনের বেলাতেই অসংখ্য বড় বড় গাছের ছায়া এবং ঝোপঝাড়ের কারণে ভুতুড়ে নির্জন পরিবেশ থাকে । ১৯৫৬ সনে আজিমপুর কলোনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গৃহিণীদের রিক্রিয়েশনের জন্য এই লেডিস ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল । শুরুতে কলোনীর বিভিন্ন কর্মকর্তার মিসেসদের পদচারনায় মুখর হলেও একসময় এই লেডিস ক্লাবের সভ্যাগণ একটি সামাজিক -সাংস্কৃতিক পরোপকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করেন । একে একে বুটিক শেখানো , নাচ-গান- বাজনা শেখানো , বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজ শেখানো, চিত্রকলা শেখানোর মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির শিশু ও মহিলাদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন । একই সাথে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করেন যেটা নার্সারি থেকে ক্লাস থ্রী পর্যন্ত আশেপাশের শিশুদের শিক্ষার প্রাথমিক ভিত গড়ে তুলতে থাকে । কলোনীর অনেক বিদূষী ,পরোপকারী অফিসারপত্নীর আন্তরিক চেষ্টা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা ইনস্টিটিউট ও শিশু একাডেমির সম্মিলিত সহযোগিতায় খুব দ্রুত এই লেডিস ক্লাবের নাম পুরো ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে ।

আব্বার কলিগ বিশিষ্ট সমাজসেবী জোবেদা খানমের মাধ্যমে আম্মা বদরুন নাহার বেগম এই স্কুলে পড়াতে শুরু করেন । আমরা দুই ভাই একজন বেবী ক্লাশে, অন্যজন ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি হওয়ায় আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয়ে একইসাথে আমাদের মা-ছেলেদের পদচারণা শুরু হয় । শুরুতে প্রথমে শপথ , জাতীয় সংগীত ও প্রাথমিক কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমে শিশুদের মননে জাতীয়তাবোধ এবং আদর্শ ও নৈতিকতার বীজ বপন করা হয় । গানের শিক্ষক ফাতেমা বেগমের আন্তরিকভাবে শিশুদের গান শেখানোর চেষ্টা এখনো মনে পড়ে । মিষ্টি স্বভাবের ফাতেমা খালা অল্প বয়সে ডায়াবেটিস ও প্রেশারে ভুগলেও নিয়মিত হাসিমুখে বাচ্চাদের শেখাতে আসতেন ।

সবচেয়ে ছোট ক্লাশ নার্সারির শিক্ষক মরিয়ম বেগম (মেরী খালা) আজিমপুর চায়না বিল্ডিং এর গলির বাসা থেকে স্কুলে আসার পথে প্রায়ই স্কুলের তিন /সাড়ে তিন বছরের দু- তিনটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ক্লাসে ঢুকতেন ।”মেরী আপা নাক দিয়ে শিকনি বের হওয়া এই গুড়ি গুড়ি বাচ্চাদের কোলে নিতে অস্বস্তি লাগেনা ?“ আম্মার এই কথার জবাবে মেরি খালা বলেন,” বাচ্চারা ফুলের মতো , ওদেরকে আমার খুব ভালো লাগে।“ স্কুল থেকে রিটায়ার করে যাবার পরও বাধ্যর্কের শেষ সীমা পর্যন্ত প্রায়ই উত্তরা থেকে জ্যাম ঠেলে আজিমপুর লেডিস ক্লাব শিশু বিদ্যালয়ে এসে বাচ্চাদের আদর করে যেতেন ; সাথে থাকতো ব্যাগভর্তি চকলেট, বিদেশী বিস্কিট ।

ক্লাস টু এর আনোয়ারা বেগম (আনু খালা ) আর প্লে- গ্রুপের লাইলি বেগমের (লাইলি খালা) চটপটে , হাসিমুখ দেখে বাচ্চারা আশ্বস্ত হতো । প্রত্যেকেই ছিলেন প্রাণোচ্ছ্বল আর আন্তরিক ।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মেয়ে সাবিহা খালা বড় বড় অনেক চাকুরীর অফার ফিরিয়ে এই ছোট্ট স্কুলটিতে সময় দেয়াকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বিষয়ের মাস্টার্স করা সাবিহা বেগম একসময় এই স্কুলের হেডমিষ্ট্রেস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ।

তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষিকা জমিদার জায়া বিজয়া রায় চৌধুরী রাসগম্ভীর একজন শিক্ষক ছিলেন । ফর্সা, ছিপছিপে গড়নের হেড মিষ্ট্রেসকে ছাত্র-ছাত্রীরা বেশ ভয় পেতো ; অভিভাবকেরা সমীহ করতেন । পড়া বুঝানোর পর আদায় করতে দরকার লাগলে হাতে দুই একটা স্কেলের বাড়ি মারতেন । স্কুলের সব শিক্ষক আম্মার কলিগ হওয়ায় উনাদেরকে আমরা খালা ডাকতাম । সবাই সবার নাম বললেও প্রধান শিক্ষিকাকে দিদি বলেই অন্যরা সম্বোধন করতেন । আমরা দুই ভাই ভাবতাম উনার ডাকনাম দিদি , তাই উনি ’ দিদি আপা’!

ষ্টাফ বাদশার মা,মোহন মিয়া ,ওয়াহিদ মিয়াদের আন্তরিকতায় স্কুলটিকে বাচ্চারা নিজেদের বাড়ীর মতোই ভাবতো । এনুয়াল স্পোর্টসে বস্তাদৌড়, বিস্কিট দৌড় , চামচ দৌড় ,মিউজিক্যাল চেয়ার ইত্যাদি প্রতিযোগিতায় উনাদের উৎসাহ শিশুদের তুলনায় কোন অংশেই কম ছিলো না ।

বছরের প্রথমে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে তিন দিনব্যাপী মিনা বাজার অনুষ্ঠানে ক্লাবের সভ্যা ও শিক্ষার্থীরা তাদের হাতের মিনাকারি করা জিনিস , নকল গয়না , বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের সামান নিয়ে বসেন। সাথে থাকে বিভিন্ন মুখরোচক আচার, চাটনি ,বিরিয়ানি , তেলে ভাজা পিঠা ও নাস্তার দোকান । সবাই নিজেদের হাতের কাজ দেখিয়ে অন্যদের মুগ্ধ করতে চান । প্রতিবছরই এক আন্টির শুকনো মরিচের টকটকে লাল মিষ্টি আচার কিনে দেওয়ার জন্য আম্মার কাছে অনুনয় বিনয় করতাম ।

আমার ও ইমনের মধ্যে ধৈর্য্যের টাগ অব ওয়ার চলছে । ‘মাহমুদাবু ’খালার বাসায় শাহানা আপার দেয়া বিস্কিট- চানাচুরের প্লেট সাবাড় করার পর অবশিষ্ট বিস্কিটটা কে নিবে সেটা নিয়ে । ভয়ে আম্মার দিকে তাকাচ্ছি না, চোখ দিয়ে ভষ্ম করে দিবেন ! এর মধ্যে দুই তিনবার গলাখাকাড়ি দিয়ে আম্মা আমাদের ১০ নাম্বার মহা-বিপদ সংকেত প্রেরণ করেছেন । ‘মাহমুদাবু ’ খালার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ভরসা পাই । হাত বাড়াতে গিয়েও গুটিয়ে নেই ,বাসায় যাবার পর ভদ্রতা কম শেখার কারণে আম্মার চুল টানা খাওয়ার ভয়ে ।

মাহমুদা বেগম, আম্মার খালাতো বোন । কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপনা ছেড়ে ডেপুটি সেক্রেটারি হয়েছেন । প্রচণ্ড জ্ঞানতৃষ্ণা উনার । আমাদের ৩২ নাম্বার বিল্ডিং এর পাশের ৪০ নম্বর বিল্ডিং-এর চার তলায় উনার বাসা । প্রায়ই আম্মার সাথে সন্ধ্যায় উনার বাসায় বেড়াতে আসি । বিকেলে প্রায়ই খালাকে পাওয়া যায় না ,একটার পর একটা বিদেশী ভাষা শিক্ষা করছেন । স্পেনিশ, জার্মান, জাপানি , মাঞ্চুরিয়ান ভাষা শেখার পর ধানমন্ডির অঁলিয়াস ফ্রাঁসে শিখছেন ফ্রেঞ্চ ভাষা । মাহমুদা খালা বাসায় না থাকলেও সমস্যা নাই ; শাহানা আপা ,নাফিজা আপা , নন্দন ভাই -বেদন ভাইদের কেউ না কেউ থাকলেই আমাদের আপ্যায়নে কোন সমস্যা নাই । আজকে নন্দন ভাইকে দেখতে এসেছি । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নন্দন ভাই প্রায় প্রতি পাঁচ-ছয় মাস পর পর কোন না কোন একটা অ্যাক্সিডেন্ট করে হয় মাথায় বা হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে থাকেন । এবার নাকে ও মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা নন্দন ভাইকে দেখে মিশরের মমীর মত লাগছে । এর মাঝেই কোঁ কোঁ করতে করতে আম্মার কাছে নালিশ দিলেন ,”খালা, এই দুইটা রাস্তায় আমাকে তুই- তোকারি করে দৌড় দেয় । নন্দা-গন্ধা বলে ক্ষেপায়। “

প্রায়ই টিলো- এক্সপ্রেস খেলতে গিয়ে নন্দন ভাইদের বাসায় পালিয়ে থাকি । বসে বসে টিভিতে কার্টুন দেখার ফাঁকে নাফিজা আপাকে অনুরোধ করি বারান্দা দিয়ে দেখতে -খেলার চোর এখন কোন দিকে ঘোরাফেরা করছে ! খালু লালবাগ বাজার থেকে প্রায় রোববারেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দুই তিন পাতি বাজার সদাই করে মিন্তির মাথায় উঠিয়ে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে ফেরেন । গতদিন বিকেলে টিলো-এক্সপ্রেস খেলার সময় দুধ খেতে দেয়ায় আম্মার কাছে অনুযোগ করেছি ,” মেহমানদের কেউ দুধ খেতে দেয় নাকি !“ আম্মা আমাদের প্রেস্টিজ পাংচার করে মাহমুদা খালার কাছে বলে দেন ,”মাহমুদাবু আপনারা মেহমানদের দুধ খেতে দেন কেন?“ খালা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন ।

কিছুদিন আগে পিচ্চি সাইজের আস্ত কাঁঠাল ভেঙে টেবিলে শাহানা আপা আমাদের খেতে ডাকেন । আমরা আপন মনে কাঁঠাল থেকে কোষ বের করে খাওয়ার সময় ওনারা চার ভাই -বোন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কর্মকান্ড দেখে মিটিমিটি হাসছিলেন । এটা দেখে তাড়াতাড়ি খাওয়া ফেলে লজ্জায় দৌড়ে মাঠে চলে আসি । নন্দন ভাই বারান্দা দিয়ে , ”ওই সুমইন্যা- ওই ইমইন্যা তাড়াতাড়ি আয় “ বলে আমাদের নিমন্ত্রণ করে কাঁঠাল খেতে দিয়েছিলেন।

আম্মা ‘মাহমুদাবু ’ ডাকেন ; আমরা কথা গুলিয়ে ‘মাহমুদাবু ’খালা ডাকি । এটা শুনে উনি খুব মজা পান। কিন্তু, আমরা ধরতে পারি না কেন হাসেন ? বাসায় পোলাও- কোর্মার আয়োজন থাকলে নন্দন ভাই -শাহানা আপা আমাদেরকে উনাদের বাসায় নিয়ে যাবেনই।

‘ জাহেদাবু’ খালার বাসায় পোর্টিকোতে ‘ব্যাঙ গাড়ি’ দেখে সতর্ক দৃষ্টিতে আমরা তানভীর -তানজিমকে খুঁজতে থাকি । ওরা বড় মামার ছেলে , কুমিল্লায় থাকে । মাঝে মাঝে ঢাকায় বেড়াতে এলে হারুন মামার ভক্স ওয়াগান গাড়িটি ব্যবহার করে । ‘জাহেদাবু’ খালা আমাদের আরেকজন ‘ বু খালা’ ! উনি মাহমুদা খালার বড় বোন কবি ও সমাজসেবী জাহেদা খাতুন । ধানমন্ডি ৯ নাম্বারের বিশাল বিশাল ছায়া ঢাকা গাছের মাঝখানে উনাদের লাল দুই তলা বাসা । মাঝে মাঝে সারাদিনের জন্য এই বাসায় বেড়াতে আসি । খালু ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল হক পূর্ত দপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ; দেখতে অনেকটা সোভিয়েত নেতা গর্ভাচেভের মতো ! জাহেদা খালার দুই মেয়ে বেবী আপা আর হ্যাপী আপা নারী পক্ষ -একশন এইড নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন । উনারা প্রায়ই ইংল্যান্ড- আমেরিকা যাতায়াতের কারণে নিঃসঙ্গ খালা আমাদের দেখলেই খুব আনন্দিত হন । টেলিভিশনে ‘হাওয়াই ফাইভ ও ’ সিরিজে দেখা ‘ব্লেন্ডারের জুস খেতে না জানি কতো মজা ’ ভেবে আফসোস করতাম । বেশ কয়দিন আগে জাহেদা খালার বাসায় ব্লেন্ডারে করা তরমুজের জুস খেতে গিয়ে তরমুজের বন্য গন্ধের কারণে গ্লাসটি টেবিলে রেখে দেয়ায় খালু ব্যাপারটি বুঝতে পেরে তরমুজ টুকরা টুকরা করে আনার পরামর্শ দেন । বেবী আপার হাসবেন্ড ডাক্তার জাফরউল্লাহর ঝোঁপালো গোঁফ দেখে বেশ ভয় পাই , দুলামিয়া বোধহয় অনেক রাগী ! প্রায় প্রতি মাসেই ‘জাহেদাবু ’ খালা ঢাকায় থাকা উনার আত্মীয়- স্বজনদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ান । উনাদের সাজানো গোছানো বাসায় দুষ্টামি করার মতো বড় ভাই- বোন না পেলেও বিদেশি চকলেটের অফুরন্ত স্টক আমাদেরকে প্রায়ই হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালার মতো আকর্ষণ করতো ।

‘বু খালা ’-‘দিদি আপারা’ আজ আর কেউ নেই । ’সুমইন্যা-ইমইন্যা‘ বলে আন্তরিকতা নিয়ে ডাকার মতো স্বজনরা আজ প্রায় সবাই হারিয়ে গেছেন ।

-- যেদিন গেছে,/ সেদিন কি আর / ফিরিয়ে আনা যায় ।।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ]

back to top