alt

মুক্ত আলোচনা

ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতে সচেতন হতে হবে

রাশেদুর রহমান

: বুধবার, ১৬ জুন ২০২১

বিয়ানের বয়স ৭। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে সে। দোকানে কেক কিনতে যায় বাসার গৃহকর্মীর সাথে। টাকা দিয়ে বিয়ান দেখে কেকের মেয়াদ দুইদিন আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বিয়ান প্রতিবাদ করে, মেয়াদোত্তীর্ণ কেক নেব না আমাকে টাকা ফিরে দিন। টাকা ফেরত নিয়ে সে বাসায় ফিরে আসে। বিয়ান তার বাবা-মা’র কাছ থেকে এ বিষয়গুলো শিখেছে বলে সে সচেতন হয়েছে। দোকনদারের উচিত ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস নষ্ট করে ফেলা অথবা বিক্রয় না করা। এমন বহু দোকনদার আছে, যারা মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস বিক্রি করে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। অসচেতনতার কারণে অনেকেই না দেখে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেয়ে নানা ধরনের রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ভোক্তা শব্দটি ছোট, তবে এর পরিধি ব্যাপক। দেশের সবাই ভোক্তা। মাতৃগর্ভে যারা আছে তারাও ভোক্তা। কারণ তারাও মাতৃগর্ভ থেকে খাবার গ্রহণ করে। যিনি বিক্রেতা তিনিও ভোক্তা, তিনি একদিকে পণ্য বিক্রি করছেন, অন্য বিক্রেতার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ও করছেন। ভোক্তাদের অধিকার অনেক। অসেচেতনতার কারণে হয়তো আমরা সে অধিকারের কথা জানি না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের এ বিষয়ে জানা দরকার। উন্নত বিশ্বে ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে মানুষ অনেক সচেতন। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষিত হয়। তবে আমাদের দেশেও ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে মানুষ সচেতন হচ্ছে।

১৫ মার্চ, ১৯৬২ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এন এফ কেনেডি কংগ্রেসে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে বক্তৃতায় নিরাপদ পণ্য বা সেবা পাওয়ার অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, পছন্দের অধিকার এবং অভিযোগ প্রদান ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার- ভোক্তাদের এ চারটি মৌলিক অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করেন। পরবর্তীতে এটি ভোক্তা অধিকার আইন নামে পরিচিতি পায়। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ ভোক্তা অধিকার রক্ষার নীতিমালায় কেনেডি বর্ণিত চারটি মৌলিক অধিকারকে বিস্তৃত করে অতিরিক্ত আরো চারটি মৌলিক অধিকার সংযুক্ত করা হয়। চাহিদা পূরণের অধিকার, জানার অধিকার, শিক্ষা লাভের অধিকার এবং সুস্থ পরিবেশের অধিকারসহ মোট আটটি অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ভোক্তা অধিকার রক্ষায় ১২০টি দেশের ২৪০টির বেশি সংগঠন নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ‘কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল’ (সিআই) এই আটটি অধিকারকে সনদে আন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৯০ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশসমূহের সম্মেলনে ভোক্তা অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের নীতিমালা অনুসরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’ পাস করে। সে বছরই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’। ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’ এর উদ্দেশ্য হলো ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ প্রতিরোধ; ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনজনিত অভিযোগ নিষ্পত্তি; নিরাপদ পণ্য বা সেবা নিশ্চিতকরণ; পণ্য বা সেবা ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা; পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্রতারণারোধ এবং ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি।

মূল্য পরিশোধের বিনিময়ে কোনো পণ্য বা সেবা গ্রহণ করেন যিনি, তিনিই ভোক্তা। ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে- নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্যে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য প্রস্তাব করা; জেনেশুনে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বিক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য প্রস্তাব করা; স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নিষিদ্ধ দ্রব্য, খাদ্যপণ্যের সাথে মিশ্রণ ও বিক্রয় করা; মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা; প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা; ওজনে বা পরিমাণে কারচুপি করা; মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা; এমন কোনো কাজ করা যাতে, সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে; অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করা; মোড়কাবদ্ধ পণ্যের মোড়কের গায়ে পণ্যের উপাদান, খুচরা বিক্রয় মূল্য, প্রস্তুত, ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করা; আইনানুগ বাধ্যবাধকতা অমান্য করে দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা ইত্যাদি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার কাওরান বাজারে। দেশের প্রতিটি বিভাগ এবং জেলাসমূহে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। যে কোনো বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ করা যায়। অভিযোগ কেন্দ্রের ফোন নম্বর ০২-৫৫০১৩২১৮, মোবাইল ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮, হটলাইন : ১৬১২১ এবং ই-মেইল: nccc@dncrp.gov.bd। অধিদপ্তরের ওয়েব সাইট www.dncrp.gov.bd- থেকেও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। এছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়, জেলা কার্যালয় এবং জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করা যায়। এখন স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে গুগল প্লে-স্টোর থেকে ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’ অ্যাপ থেকে অভিযোগ করা যাচ্ছে।

অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই লিখিত হতে হবে; ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েব সাইট ইত্যাদি মাধ্যমে অথবা সশরীরে উপস্থিত হয়ে বা কারো মাধ্যমে প্রেরণ করা যাবে; অভিযোগের সাথে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রশিদ সংযুক্ত করতে হবে; অভিযোগকারীর পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স, ই-মেইল (যদি থাকে) উল্লেখ করতে হবে; কোনো কোর্ট ফি/রাজস্ব স্ট্যাম্প লাগবে না। কোনো ব্যক্তি প্রতারিত হলে ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ করা যাবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ লংঘনের জন্য বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। ধারা ৩৭: কোনো ব্যক্তি মোড়কাবদ্ধভাবে পণ্যের মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহার-বিধি, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের তারিখ এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে থাকলে তিনি অনুর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারা ৩৮: কোনো ব্যক্তি যদি কোনো আইন বা বিধি দ্বারা আরোপিত বাধ্যবাধকতা অমান্য করে তার দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করে তাহলে তিনি অনুর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারা ৪০: কোনো ব্যক্তি কোনো আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোনো পণ্য বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করলে তিনি অনুর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারা: ৪১ কোনো ব্যক্তি জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করলে বা প্রস্তাব করলে তিনি অনুর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারা: ৪২ মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো দ্রব্য, কোনো খাদ্যপণ্যের সাথে যার মিশ্রণ কোনো আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি উক্ত দ্রব্য কোনো খাদ্যপণ্যের সাথে মিশ্রিত করলে, তিনি অনুর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ভোক্তা অধিকার একটি সার্বজনীন অধিকার। এ অধিকার বাস্তবায়নে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের কর্মকর্তাগণ নিরলসভাবে কাজ করছেন। এখন ফলের মৌসুমে তাদের তৎপরতা আরো বেড়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছে। অসাধু বিক্রেতাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আইনের কঠোর বাস্তবায়ন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সুফল বয়ে আনছে।

ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ভোক্তারও কিছু দায়িত্ব আছে। ভোক্তাকে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে হবে। যাচাই-বাচাই করে উপযুক্ত পণ্য বা সেবা সঠিক মূল্যে ক্রয় করতে হবে। ভোক্তা অধিকার বাস্তবায়নে সোচ্চার হতে হবে। বাজার অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমেই নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাবিধান সম্ভব হবে।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)

ছবি

২১ বছরে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মার্কেটিং মাইওপিয়া

মানসিক সুস্থতা কতটা জরুরি?

ছবি

সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিকিম

মায়ের বুকের দুধ পানে অগ্রগতি

ছবি

গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে নারীর ক্ষমতায়ন

মাটি দূষণ ও প্রতিকার ভাবনা

ছবি

আলাউদ্দিন আল আজাদ

ছবি

অনিরাপদ খাদ্য সুস্থ জীবনের অন্তরায়

সাঁওতাল বিদ্রোহ

হিন্দু সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টা

ছবি

করোনাকালে নিরাপদ মাতৃত্ব

ছবি

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধ করতে চাই সচেতনতা

ছবি

আশ্রয়ণ : দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন

ছবি

ডিঙ্গাপোতা হাওরের হাতছানি

নারীর কর্মসংস্থান

আর নয় নারীর প্রতি সহিংসতা

কাপড়ের ফুল জীবনে রং ছড়ায়

ছবি

টিকাদানে বাংলাদেশের সাফল্য

ছবি

ডায়ানার সাক্ষাৎকার বিতর্ক : ঘটনা ও তদন্ত

সন্তানের বয়ঃসন্ধিকালে মা-বাবার করণীয়

পাঠাগার : প্রসঙ্গ শিশুদের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ

করোনায় হারিয়ে যাচ্ছে কৈশোর

ছবি

বঙ্গবন্ধু : অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশের হিমালয়

জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস ও পরিবেশ প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে চাই উন্নয়ন

কোভিডকালে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের গুরুত্ব

হাঁস পালন করে ভাগ্যের চাকা বদলেছে ফরিদাদের

ডায়াবেটিস গর্ভবতী মায়েদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ

পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে সেন্ট মার্টিন

শিশুদের বিকাশে চাই খেলার মাঠ

প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা জরুরি

করোনায় হারিয়ে যাচ্ছে কৈশোর

করোনার নতুন ধরণ: সরকারের উদ্যোগ ও আমাদের করণীয়

ব্যালকনি বাগান : প্রসঙ্গ প্রকৃতি ও পরিবেশ

বাংলাদেশের শিশু ও ওদের মায়ের ভাষা

ছবি

শিশুর ডায়রিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

tab

মুক্ত আলোচনা

ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতে সচেতন হতে হবে

রাশেদুর রহমান

বুধবার, ১৬ জুন ২০২১

বিয়ানের বয়স ৭। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে সে। দোকানে কেক কিনতে যায় বাসার গৃহকর্মীর সাথে। টাকা দিয়ে বিয়ান দেখে কেকের মেয়াদ দুইদিন আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বিয়ান প্রতিবাদ করে, মেয়াদোত্তীর্ণ কেক নেব না আমাকে টাকা ফিরে দিন। টাকা ফেরত নিয়ে সে বাসায় ফিরে আসে। বিয়ান তার বাবা-মা’র কাছ থেকে এ বিষয়গুলো শিখেছে বলে সে সচেতন হয়েছে। দোকনদারের উচিত ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস নষ্ট করে ফেলা অথবা বিক্রয় না করা। এমন বহু দোকনদার আছে, যারা মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস বিক্রি করে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। অসচেতনতার কারণে অনেকেই না দেখে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেয়ে নানা ধরনের রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ভোক্তা শব্দটি ছোট, তবে এর পরিধি ব্যাপক। দেশের সবাই ভোক্তা। মাতৃগর্ভে যারা আছে তারাও ভোক্তা। কারণ তারাও মাতৃগর্ভ থেকে খাবার গ্রহণ করে। যিনি বিক্রেতা তিনিও ভোক্তা, তিনি একদিকে পণ্য বিক্রি করছেন, অন্য বিক্রেতার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ও করছেন। ভোক্তাদের অধিকার অনেক। অসেচেতনতার কারণে হয়তো আমরা সে অধিকারের কথা জানি না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের এ বিষয়ে জানা দরকার। উন্নত বিশ্বে ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে মানুষ অনেক সচেতন। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষিত হয়। তবে আমাদের দেশেও ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে মানুষ সচেতন হচ্ছে।

১৫ মার্চ, ১৯৬২ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এন এফ কেনেডি কংগ্রেসে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে বক্তৃতায় নিরাপদ পণ্য বা সেবা পাওয়ার অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, পছন্দের অধিকার এবং অভিযোগ প্রদান ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার- ভোক্তাদের এ চারটি মৌলিক অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করেন। পরবর্তীতে এটি ভোক্তা অধিকার আইন নামে পরিচিতি পায়। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ ভোক্তা অধিকার রক্ষার নীতিমালায় কেনেডি বর্ণিত চারটি মৌলিক অধিকারকে বিস্তৃত করে অতিরিক্ত আরো চারটি মৌলিক অধিকার সংযুক্ত করা হয়। চাহিদা পূরণের অধিকার, জানার অধিকার, শিক্ষা লাভের অধিকার এবং সুস্থ পরিবেশের অধিকারসহ মোট আটটি অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ভোক্তা অধিকার রক্ষায় ১২০টি দেশের ২৪০টির বেশি সংগঠন নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ‘কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল’ (সিআই) এই আটটি অধিকারকে সনদে আন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৯০ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশসমূহের সম্মেলনে ভোক্তা অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের নীতিমালা অনুসরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’ পাস করে। সে বছরই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’। ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯’ এর উদ্দেশ্য হলো ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ প্রতিরোধ; ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনজনিত অভিযোগ নিষ্পত্তি; নিরাপদ পণ্য বা সেবা নিশ্চিতকরণ; পণ্য বা সেবা ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা; পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্রতারণারোধ এবং ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি।

মূল্য পরিশোধের বিনিময়ে কোনো পণ্য বা সেবা গ্রহণ করেন যিনি, তিনিই ভোক্তা। ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে- নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্যে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য প্রস্তাব করা; জেনেশুনে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বিক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য প্রস্তাব করা; স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নিষিদ্ধ দ্রব্য, খাদ্যপণ্যের সাথে মিশ্রণ ও বিক্রয় করা; মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা; প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা; ওজনে বা পরিমাণে কারচুপি করা; মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা; এমন কোনো কাজ করা যাতে, সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে; অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করা; মোড়কাবদ্ধ পণ্যের মোড়কের গায়ে পণ্যের উপাদান, খুচরা বিক্রয় মূল্য, প্রস্তুত, ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করা; আইনানুগ বাধ্যবাধকতা অমান্য করে দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা ইত্যাদি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার কাওরান বাজারে। দেশের প্রতিটি বিভাগ এবং জেলাসমূহে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। যে কোনো বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ করা যায়। অভিযোগ কেন্দ্রের ফোন নম্বর ০২-৫৫০১৩২১৮, মোবাইল ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮, হটলাইন : ১৬১২১ এবং ই-মেইল: nccc@dncrp.gov.bd। অধিদপ্তরের ওয়েব সাইট www.dncrp.gov.bd- থেকেও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। এছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়, জেলা কার্যালয় এবং জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করা যায়। এখন স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে গুগল প্লে-স্টোর থেকে ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’ অ্যাপ থেকে অভিযোগ করা যাচ্ছে।

অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই লিখিত হতে হবে; ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েব সাইট ইত্যাদি মাধ্যমে অথবা সশরীরে উপস্থিত হয়ে বা কারো মাধ্যমে প্রেরণ করা যাবে; অভিযোগের সাথে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রশিদ সংযুক্ত করতে হবে; অভিযোগকারীর পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স, ই-মেইল (যদি থাকে) উল্লেখ করতে হবে; কোনো কোর্ট ফি/রাজস্ব স্ট্যাম্প লাগবে না। কোনো ব্যক্তি প্রতারিত হলে ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ করা যাবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ লংঘনের জন্য বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। ধারা ৩৭: কোনো ব্যক্তি মোড়কাবদ্ধভাবে পণ্যের মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহার-বিধি, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের তারিখ এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে থাকলে তিনি অনুর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারা ৩৮: কোনো ব্যক্তি যদি কোনো আইন বা বিধি দ্বারা আরোপিত বাধ্যবাধকতা অমান্য করে তার দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করে তাহলে তিনি অনুর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারা ৪০: কোনো ব্যক্তি কোনো আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোনো পণ্য বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করলে তিনি অনুর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারা: ৪১ কোনো ব্যক্তি জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করলে বা প্রস্তাব করলে তিনি অনুর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারা: ৪২ মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো দ্রব্য, কোনো খাদ্যপণ্যের সাথে যার মিশ্রণ কোনো আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি উক্ত দ্রব্য কোনো খাদ্যপণ্যের সাথে মিশ্রিত করলে, তিনি অনুর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ভোক্তা অধিকার একটি সার্বজনীন অধিকার। এ অধিকার বাস্তবায়নে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের কর্মকর্তাগণ নিরলসভাবে কাজ করছেন। এখন ফলের মৌসুমে তাদের তৎপরতা আরো বেড়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছে। অসাধু বিক্রেতাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আইনের কঠোর বাস্তবায়ন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সুফল বয়ে আনছে।

ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ভোক্তারও কিছু দায়িত্ব আছে। ভোক্তাকে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে হবে। যাচাই-বাচাই করে উপযুক্ত পণ্য বা সেবা সঠিক মূল্যে ক্রয় করতে হবে। ভোক্তা অধিকার বাস্তবায়নে সোচ্চার হতে হবে। বাজার অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমেই নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাবিধান সম্ভব হবে।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)

back to top