alt

মুক্ত আলোচনা

মায়ের বুকের দুধ পানে অগ্রগতি

নিশাত মাহজাবীন

: রোববার, ১১ জুলাই ২০২১

সদ্য প্রথম সন্তানের মা হয়েছে রাইমা। রাইমা সন্তান প্রসব করেছে মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। এখানে সে নিয়মিত চেকআপ করেছে, ডাক্তার দেখিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার, নার্সদের কাছে নবজাত শিশুর লালনপালন বিষয়ে অনেক কিছুই জেনেছে। শিশু জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে শাল দুধ খাইয়েছে। রাইমা জেনেছে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানো কতটা জরুরি। এখানে প্রসূতি মায়েদের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়মকানুন এবং ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য পরামর্শ দেয়া হয়। পাশাপাশি শিশুকে গুড়ো দুধ খাওয়ানোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা হয়।

সন্তান জন্মদানের পর প্রথম হলুদ ঘন যে দুধ আসে এটাই শালদুধ। পরিমাণে এটি অত্যন্ত কম হলেও নবজাতকের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। শালদুধে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক সব ধরনের উপাদান রয়েছে। শালদুধ পানে শিশুর অপরিণত অন্ত্র পরিপক্ক হয়। শিশুর জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে। তাই শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোতে অবহেলা করা যাবে না। পরিবারের সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। চাকরিজীবী থেকে শুরু করে গৃহিণী প্রত্যেক মাকে তাদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যপারে আগ্রহী ও সচেতন করে তুলতে হবে।

মায়ের বুকের দুধ শিশুর সুস্থতার জন্য শ্রেষ্ঠ খাদ্য হিসেবে স্বীকৃত। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য মায়ের দুধের সমকক্ষ হবার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা রাখে না। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ইন্টারন্যাশনাল কোড অব ব্রেস্ট সাবস্টিটিউট অনুমোদিত হয়। এরপর থেকে মায়ের দুধের গুরুত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে বিকল্প খাদ্যের প্রচার বন্ধে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা শুরু হয়। তারপরও অনেক মা অসচেতনতার কারণে দুধের বিকল্প হিসেবে প্রচলিত বেশ কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবার শিশুকে খাওয়ান। ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, শিশু জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ালে মৃত্যুঝুঁকি ৩১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

প্রতিটি মায়ের জন্য সন্তান জন্মদান একটি বিশেষ মুহূর্ত। মায়ের জন্য সবচেয়ে মানসিক প্রশান্তির মুহূর্তটিও হলো যখন তিনি সন্তানকে বুকের দুধ পান করান। এর মধ্য দিয়ে মা ও শিশুর মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন তৈরি হয়। পাশাপাশি জন্মের পর থেকে যেসব শিশু বিকল্প দুধ পান করে, মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর তুলনায় তাদের ডায়রিয়ার আক্রান্তের হার ২৫ গুণ এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে মৃত্যুর আশঙ্কা চারগুণ বেশি। এতে বোঝা যায়, জন্মের পর শিশুর জন্য মায়ের দুধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিশুকে মায়ের দুধ না খাওয়ানোর কারণে শিশুর স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগে প্রতিবছর বিশ্বে ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে এই ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এটি উন্নয়নশীল দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে (জিডিপি) নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি সুস্থ-সবল স্বনির্ভর জাতি গঠনে ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মায়ের দুধ খাওয়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্য একটি সম্পূর্ণ খাবার। এতে শিশুর দেহের উপযোগী উপাদানগুলো যে পরিমাণে থাকে, তাতে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত অন্য কোনো খাবার এমনকি পানিরও প্রয়োজন হয় না। মায়ের দুধের সব উপাদান শিশুর দেহে সহজে হজম ও শোষিত হয়। মাতৃদুগ্ধ শিশুর মস্তিষ্কের গঠন ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মায়ের বুকের দুধ পানকারী শিশুদের জন্ম-পরবর্তী নানাধরনের ইনফেকশন হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। মায়ের বুকের দুধে ভিটামিন ‘এ’ থাকায় শিশু অন্ধত্বের শিকার হয় না; ক্যালসিয়ামের শোষণ বাড়িয়ে দিয়ে হাড়ের গঠন মজবুত করে। মায়ের বুকের দুধে রয়েছে বিশেষ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা শিশুর বুদ্ধিদীপ্ততা ও দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। মায়ের দুধ শৈশবে লিউকোমিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করে, ডায়াবেটিস টাইপ-১ এবং উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়। মায়ের দুধে প্রায় ১০০ ধরনের উপাদান রয়েছে, যার প্রতিটি উপাদানই শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী।

সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো মায়ের জন্যও বিশেষ উপকারী। সন্তান প্রসবের পর পরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হলে গর্ভফুল তাড়াতাড়ি পড়ে। জরায়ু খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায় এবং প্রসব-পরবর্তী ব্লিডিং কম হয়। ফলে মায়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় না। শিশুকে বুকের দুধ পান করালে স্তন ক্যানসার ও জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস পায়। বুকের দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে মা ও শিশুর মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, শিশু অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করে।

প্যাকেটজাত দুধ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের বোতলে খাওয়ানো হয়। প্লাস্টিক শিশু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কৌটাজত দুধে মায়ের দুধের তুলনায় শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম, ফলে শিশুর ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিকল্প দুধে লৌহ জাতীয় পদার্থ (আয়রন) কম থাকায় শিশু রক্তস্বল্পতায় ভোগে। বুকের দুধ অপেক্ষা বিকল্প দুধের পুষ্টি উপাদানগুলো শিশুর শরীরে সহজে শোষিত হয় না, ফলে শিশু অপুষ্টির শিকার হয়। কৌটার দুধ সহজে হজম হয় না, ফলে শিশু কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে। তাছাড়া বিকল্প দুধের বড় অসুবিধা হলো এটি ব্যয়বহুল, সঠিক নিয়মে খাওয়াতে হলে মাসে প্রচুর টাকা খরচ হয়, যা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রসূতি মায়ের মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে মায়ের বুকের দুধ একান্তভাবে পাওয়া না গেলে বিকল্প কোনো প্রক্রিয়াজাত খাদ্যকে ওই শিশুর জন্য স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষাকারী অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো মায়ের দুধ খাওয়ানোর সঠিক চর্চা বা ধাপ অনুসরণ করা হয় না। ফলে শিশুর পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার জন্যই ক্ষতি হয়।

মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশ কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ানো ও বিকল্প শিশুখাদ্যের কমাতে সরকারও অনেক দিন ধরে ইতিমধ্যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ রহিত করে ইতিমধ্যে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। আইনে গর্ভবতী এবং দুগ্ধদানকারী মায়েদেরকে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো, ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো, দুই বছর পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি ঘরে তৈরি খাবার খাওয়ানোর উপকারিতা জানানোর কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও শিশুকে ফরমুলা খাবার খাওয়ানোর কুফলসহ অভিভাবকদের শিশুর খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কিত সচেতনতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

আইনে ফরমুলা খাবার বা মাতৃদুগ্ধের বিকল্প যেকোনো শিশুখাদ্য সম্পর্কে প্রকাশ্যে প্রচারণা এবং বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ধারা ৪ অনুযায়ী শিশুর জীবন রক্ষা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসকরণে একান্তভাবে অপরিহার্য বিবেচিত না হলে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী মাতৃদুগ্ধের বিকল্প কোনো খাদ্যের ব্যবস্থাপত্র প্রদান করতে পারবেন না। আইনের ধারা ১২(১) অনুযায়ী এই আইনের কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। এ জন্য তিন বছর কারাদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে। এই আইনের যে কোনো অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ অনুসারে বিচারযোগ্য বিবেচিত হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকার মা ও শিশুর পুষ্টি উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে গত দশ বছরে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বেতনসহ ছয় মাসে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি বেসরকারি অফিসে ব্রেস্টফিডিং কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে। কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল থেকে কর্মজীবী মায়েদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রতি জেলায় একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫শ ৯৪টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে শিশুবান্ধব হাসপাতাল করার জন্য প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে।

শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি লক্ষণীয়। ইতোমধ্যে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই হার ৪০ শতাংশ। সবার সচেতনতায় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। করোনাকালেও মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোতে উদ্বুদ্ধ করতে স্বাস্থ্যখাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মাতৃদুগ্ধ শুধু পুষ্টির উৎস নয়, শিশুর স্বাস্থ্যের সুষম বিকাশের জন্য এটি অপরিহার্য। মায়ের সুস্থতার জন্য সমান উপকারী। শিশুর সুস্বাস্থ্য এবং রোগমুক্ত জীবনের জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই। মায়ের বুকের দুধ পানে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা আরো এগিয়ে নিতে হবে। প্রত্যেক মাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা ও সুফল সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)

ত্রৈমাসিক ‘অঙ্ক ভাবনা’

‘ই-এডুকেশন এন্ড লার্নিং’ এ বাংলাদেশের “গ্লোবাল আইসিটি এক্সসেলেন্স এওয়ার্ড” অর্জন ও করণীয়

ছবি

শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজের ৫৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

ছবি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: গৌরবের ৫৫ বছর

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দিবস

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে গ্লোকোমিটারের সঠিক ব্যবহার জরুরি

ডায়াবেটিস অতিমারিতে বিশ্ব: রুখতে প্রয়োজন সচেতনতা

ছবি

বাংলায় প্রথম বিজ্ঞান বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা অক্ষয়কুমার দত্ত

ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন: বস্তুনিষ্ঠ নয়, ব্যক্তিনিষ্ঠ

গবেষণাতেই মিলবে জটিল রোগের সঠিক সমাধান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দিবস

ছবি

হুদুড় দুর্গা : হিন্দুত্ব ও ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে সুপ্ত প্রতিবাদ

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস

ব্যাংক ইন্টারেস্ট কি সুদ, আরবিতে যা রিবা?

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও শিক্ষা পুনরুদ্ধারে শিক্ষকদের চ্যালেঞ্জ

তথ্য আমার অধিকার, জানা আছে কী সবার’- প্রেক্ষিত পর্যালোচনা

ছবি

ডিজিটাল বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনার এক সফল উন্নয়ন দর্শন

ছবি

ফুসফুসের সুরক্ষা এবং সুস্বাস্থ্যের উন্নয়ন

ছবি

চার সন্তান হত্যার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত এক মা

নোভাভ্যাক্সের টিকাই এ মুহূর্তে সেরা

ছবি

বাংলাদেশে ফল উৎপাদন ও সম্ভাবনাময় বিদেশি ফল

ছবি

স্মরণ : তারেক মাসুদ, ‘ছবির ফেরিওয়ালা’

স্বাধীনতা সংগ্রামের অফুরান প্রেরণার উৎস মহীয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

ছবি

২১ বছরে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মার্কেটিং মাইওপিয়া

মানসিক সুস্থতা কতটা জরুরি?

ছবি

সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিকিম

ছবি

গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে নারীর ক্ষমতায়ন

মাটি দূষণ ও প্রতিকার ভাবনা

ছবি

আলাউদ্দিন আল আজাদ

ছবি

অনিরাপদ খাদ্য সুস্থ জীবনের অন্তরায়

সাঁওতাল বিদ্রোহ

হিন্দু সম্পত্তি দখলের অপচেষ্টা

ছবি

করোনাকালে নিরাপদ মাতৃত্ব

ছবি

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধ করতে চাই সচেতনতা

tab

মুক্ত আলোচনা

মায়ের বুকের দুধ পানে অগ্রগতি

নিশাত মাহজাবীন

রোববার, ১১ জুলাই ২০২১

সদ্য প্রথম সন্তানের মা হয়েছে রাইমা। রাইমা সন্তান প্রসব করেছে মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। এখানে সে নিয়মিত চেকআপ করেছে, ডাক্তার দেখিয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার, নার্সদের কাছে নবজাত শিশুর লালনপালন বিষয়ে অনেক কিছুই জেনেছে। শিশু জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে শাল দুধ খাইয়েছে। রাইমা জেনেছে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানো কতটা জরুরি। এখানে প্রসূতি মায়েদের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়মকানুন এবং ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য পরামর্শ দেয়া হয়। পাশাপাশি শিশুকে গুড়ো দুধ খাওয়ানোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা হয়।

সন্তান জন্মদানের পর প্রথম হলুদ ঘন যে দুধ আসে এটাই শালদুধ। পরিমাণে এটি অত্যন্ত কম হলেও নবজাতকের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। শালদুধে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক সব ধরনের উপাদান রয়েছে। শালদুধ পানে শিশুর অপরিণত অন্ত্র পরিপক্ক হয়। শিশুর জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে। তাই শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোতে অবহেলা করা যাবে না। পরিবারের সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। চাকরিজীবী থেকে শুরু করে গৃহিণী প্রত্যেক মাকে তাদের সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যপারে আগ্রহী ও সচেতন করে তুলতে হবে।

মায়ের বুকের দুধ শিশুর সুস্থতার জন্য শ্রেষ্ঠ খাদ্য হিসেবে স্বীকৃত। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য মায়ের দুধের সমকক্ষ হবার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা রাখে না। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ইন্টারন্যাশনাল কোড অব ব্রেস্ট সাবস্টিটিউট অনুমোদিত হয়। এরপর থেকে মায়ের দুধের গুরুত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে বিকল্প খাদ্যের প্রচার বন্ধে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা শুরু হয়। তারপরও অনেক মা অসচেতনতার কারণে দুধের বিকল্প হিসেবে প্রচলিত বেশ কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবার শিশুকে খাওয়ান। ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, শিশু জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ালে মৃত্যুঝুঁকি ৩১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

প্রতিটি মায়ের জন্য সন্তান জন্মদান একটি বিশেষ মুহূর্ত। মায়ের জন্য সবচেয়ে মানসিক প্রশান্তির মুহূর্তটিও হলো যখন তিনি সন্তানকে বুকের দুধ পান করান। এর মধ্য দিয়ে মা ও শিশুর মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন তৈরি হয়। পাশাপাশি জন্মের পর থেকে যেসব শিশু বিকল্প দুধ পান করে, মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর তুলনায় তাদের ডায়রিয়ার আক্রান্তের হার ২৫ গুণ এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে মৃত্যুর আশঙ্কা চারগুণ বেশি। এতে বোঝা যায়, জন্মের পর শিশুর জন্য মায়ের দুধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিশুকে মায়ের দুধ না খাওয়ানোর কারণে শিশুর স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন রোগে প্রতিবছর বিশ্বে ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশে এই ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এটি উন্নয়নশীল দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে (জিডিপি) নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি সুস্থ-সবল স্বনির্ভর জাতি গঠনে ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মায়ের দুধ খাওয়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্য একটি সম্পূর্ণ খাবার। এতে শিশুর দেহের উপযোগী উপাদানগুলো যে পরিমাণে থাকে, তাতে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত অন্য কোনো খাবার এমনকি পানিরও প্রয়োজন হয় না। মায়ের দুধের সব উপাদান শিশুর দেহে সহজে হজম ও শোষিত হয়। মাতৃদুগ্ধ শিশুর মস্তিষ্কের গঠন ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মায়ের বুকের দুধ পানকারী শিশুদের জন্ম-পরবর্তী নানাধরনের ইনফেকশন হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। মায়ের বুকের দুধে ভিটামিন ‘এ’ থাকায় শিশু অন্ধত্বের শিকার হয় না; ক্যালসিয়ামের শোষণ বাড়িয়ে দিয়ে হাড়ের গঠন মজবুত করে। মায়ের বুকের দুধে রয়েছে বিশেষ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা শিশুর বুদ্ধিদীপ্ততা ও দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। মায়ের দুধ শৈশবে লিউকোমিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করে, ডায়াবেটিস টাইপ-১ এবং উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়। মায়ের দুধে প্রায় ১০০ ধরনের উপাদান রয়েছে, যার প্রতিটি উপাদানই শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী।

সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো মায়ের জন্যও বিশেষ উপকারী। সন্তান প্রসবের পর পরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হলে গর্ভফুল তাড়াতাড়ি পড়ে। জরায়ু খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায় এবং প্রসব-পরবর্তী ব্লিডিং কম হয়। ফলে মায়ের রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় না। শিশুকে বুকের দুধ পান করালে স্তন ক্যানসার ও জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস পায়। বুকের দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে মা ও শিশুর মধ্যে একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, শিশু অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করে।

প্যাকেটজাত দুধ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের বোতলে খাওয়ানো হয়। প্লাস্টিক শিশু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কৌটাজত দুধে মায়ের দুধের তুলনায় শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম, ফলে শিশুর ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিকল্প দুধে লৌহ জাতীয় পদার্থ (আয়রন) কম থাকায় শিশু রক্তস্বল্পতায় ভোগে। বুকের দুধ অপেক্ষা বিকল্প দুধের পুষ্টি উপাদানগুলো শিশুর শরীরে সহজে শোষিত হয় না, ফলে শিশু অপুষ্টির শিকার হয়। কৌটার দুধ সহজে হজম হয় না, ফলে শিশু কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে। তাছাড়া বিকল্প দুধের বড় অসুবিধা হলো এটি ব্যয়বহুল, সঠিক নিয়মে খাওয়াতে হলে মাসে প্রচুর টাকা খরচ হয়, যা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রসূতি মায়ের মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে মায়ের বুকের দুধ একান্তভাবে পাওয়া না গেলে বিকল্প কোনো প্রক্রিয়াজাত খাদ্যকে ওই শিশুর জন্য স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষাকারী অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো মায়ের দুধ খাওয়ানোর সঠিক চর্চা বা ধাপ অনুসরণ করা হয় না। ফলে শিশুর পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার জন্যই ক্ষতি হয়।

মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশ কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ানো ও বিকল্প শিশুখাদ্যের কমাতে সরকারও অনেক দিন ধরে ইতিমধ্যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ রহিত করে ইতিমধ্যে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করেছে। আইনে গর্ভবতী এবং দুগ্ধদানকারী মায়েদেরকে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো, ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো, দুই বছর পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি ঘরে তৈরি খাবার খাওয়ানোর উপকারিতা জানানোর কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও শিশুকে ফরমুলা খাবার খাওয়ানোর কুফলসহ অভিভাবকদের শিশুর খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কিত সচেতনতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

আইনে ফরমুলা খাবার বা মাতৃদুগ্ধের বিকল্প যেকোনো শিশুখাদ্য সম্পর্কে প্রকাশ্যে প্রচারণা এবং বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ধারা ৪ অনুযায়ী শিশুর জীবন রক্ষা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসকরণে একান্তভাবে অপরিহার্য বিবেচিত না হলে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী মাতৃদুগ্ধের বিকল্প কোনো খাদ্যের ব্যবস্থাপত্র প্রদান করতে পারবেন না। আইনের ধারা ১২(১) অনুযায়ী এই আইনের কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। এ জন্য তিন বছর কারাদণ্ড এবং অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে। এই আইনের যে কোনো অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ অনুসারে বিচারযোগ্য বিবেচিত হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকার মা ও শিশুর পুষ্টি উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে গত দশ বছরে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বেতনসহ ছয় মাসে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি বেসরকারি অফিসে ব্রেস্টফিডিং কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে। কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল থেকে কর্মজীবী মায়েদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রতি জেলায় একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে একজন করে পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫শ ৯৪টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে শিশুবান্ধব হাসপাতাল করার জন্য প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করা হয়েছে।

শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি লক্ষণীয়। ইতোমধ্যে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই হার ৪০ শতাংশ। সবার সচেতনতায় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। করোনাকালেও মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোতে উদ্বুদ্ধ করতে স্বাস্থ্যখাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মাতৃদুগ্ধ শুধু পুষ্টির উৎস নয়, শিশুর স্বাস্থ্যের সুষম বিকাশের জন্য এটি অপরিহার্য। মায়ের সুস্থতার জন্য সমান উপকারী। শিশুর সুস্বাস্থ্য এবং রোগমুক্ত জীবনের জন্য মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই। মায়ের বুকের দুধ পানে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা আরো এগিয়ে নিতে হবে। প্রত্যেক মাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা ও সুফল সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।

(পিআইডি-শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম ফিচার)

back to top