alt

মুক্ত আলোচনা

বিদায় রানা,বিদায় কাজী দা

কাজী রওনাক হোসেন : মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২

আমার চাচাতো ভাই, বড় চাচা কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে। ’৬২ সালে আমরা ঢাকায় আসি এবং একই বাড়িতে দীর্ঘদিন ছিলাম। সে কারণে বড়দা (কাজী আনোয়ার হোসেন) কে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ওঁনার অনেক কথা সবাই জানেন না। ১৯ জুলাই, ১৯৩৬ সালে তাঁর জন্ম। আর ১৯শে জানুয়ারি ২০২২ সালে অনন্তের পথে তাঁর যাত্রা।

সব সময়ই কাজী আনোয়ার হোসেন ছিলেন কিছুটা ঘরকুনো এবং নিভৃতচারী কিন্তু কাজের বেলায় পারফেকশনিস্ট। ওনার মৃত্যুর পর সারা পৃথিবী থেকে সামাজিক মাধ্যমে এবং আমার কাছে যে শোক বার্তাগুলো এসেছে তার বেশীর ভাগেরই মূল কথা হল- কাজীদার কাছে আমরা ঋণী। প্রায় সবাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে যখন বিপদে পড়েছিলেন বা আটকে গিয়েছিলেন তখন সেই সমস্যা থেকে তারা মুক্তিলাভ করেছিলেন মাসুদ রানার কথা চিন্তা করে। যখনই কেউ কোন বিপদে পড়েছেন তখন চিন্তা করেছেন মাসুদ রানা এ জায়গায় থাকলে কী করত। এবং এই চিন্তাই তাদের সহযোগিতা করেছে সফল হওয়ার জন্য। আমি জানিনা, মৃত্যুর পর আর কারো জন্য এরকম শোকাবার্তা ও পাঠক সম্মাননা আর কেউ পেয়েছেন কিনা।

শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সংগীত চর্চা করেছেন। বেতারে ও প্লেব্যাকে নিয়মিত গান করেছেন। বেতারে মূলত তিনি নজরুলসংগীত এবং আধুনিক গান পরিবেশন করতেন। সত্যি কথা বলতে, তাঁর সংগীত জগতটি মানুষের কাছে অতটা পরিচিত নয়, যতটা তাঁর লেখক সত্ত্বা।

তিনি ‘সুতরাং ছবিতে ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস বউ কথা কও সুরে যেন ডেকে যায়’ সৈয়দ শামসুল হকের লেখা এবং সত্য সাহার সুরে এই গানটি গেয়েছিলেন। গানটির অংশবিশেষে আব্দুল আলীমও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। ষাটের দশকে এটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় গান। উর্দু ছবি ‘তালশ’-এ তাঁর গাওয়া ‘ম্যায় হু রিক্সাওয়ালা বেচারা’ গানটিও অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘গোধূলিপ্রেম’ ছবিতে ‘হায় হায় আমায় কেউ চিনলো না’ গানটিও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

তিনি এক সময় চমৎকার বাঁশী বাজাতেন। স্প্যানিশ গিটারেও সুরের ঝংকার তুলতেন। কিন্তু বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত মহলে সুগায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তিনি বুঝেছিলেন শুধু গান নিয়ে তাঁর বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না। তাই তিনি কী করা যায় ভেবে ভেবে বাবার কাছ থেকে দশ হাজার টাকা ধার নিয়ে প্রেস ব্যবসা শুরু করেন। এভাবেই বদলে যায় তাঁর পেশা ও নেশা। কিন্তু এই প্রেস ব্যবসাই তাঁর হাতে যেন লেখনীরও দায়ভার তুলে দিয়েছিল।

১৯৬৬ সালে ‘মাসুদ রানা’র প্রথম ও মৌলিক বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ প্রকাশ করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পায় এই বইটি। এরপর তরুণ প্রজন্মের পাঠকের কাছে ‘মাসুদ রানা’ চরিত্রটি আইকন হয়ে ওঠে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ছয় দশক সময় ধরে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের প্রায় পাঁচশ’ বই প্রকাশিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু নিজে লিখে যাননি, তৈরি করেছেন অনেক নতুন লেখক। এই লেখকরাও তাদের লেখনীর জন্য ‘প্রিয় কাজীদা’র কাছে অকপটে ঋণ স্বীকার করেন। ‘মাসুদ রানা’, ‘কুয়াশা’র পাশাপাশি এখান থেকে বেরিয়েছে ধ্রুপদী বিদেশী সাহিত্যের সুলভ অনুবাদ। বিশ্বের সেরা উপন্যাসগুলি চমৎকার অনুবাদের কারণে এদেশের পাঠকরা পেপারব্যাকে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

কাজী আনোয়ার হোসেন তাঁর বইয়ে যেসব দৃশ্যের বর্ণনা দিতেন তা ছিল নিখুঁত এবং অত্যন্ত সহজেই হৃদয় ছোঁয়া। পাঠক এগুলো পড়তে পড়তে দৃশ্যের ভিতর, বর্ণনার ভিতর এমনভাবে ঢুকে পরে যেন সে নিজেই ওখানে উপস্থিত।

কাজী আনোয়ার হোসেন যেভাবে থ্রিলার সিরিজ বের করে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের বই পড়ায় আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন প্রায় ছয় দশক ধরে তা অবশ্যই এদেশের মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর মনে রাখবে।

কান্ট্রিরোড

ছবি

স্মরণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি

আবদুল গাফফার চৌধুরী: একুশের এক কিংবদন্তি

চুরুট

ছবি

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

নিরন্তর অগ্রযাত্রায় সংবাদ

নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ

‘মতি মামা গেলো ঘরে, রিনি-ঝিনি খেলা করে’

ছবি

বৌদ্ধ সমাজে বৈশাখী পূর্নিমার গুরুত্ব

দ্যা লেডি উইথ দ্যা ল্যাম্প

স্মার্ট প্যারেন্টিং: সন্তানের সেরা রোল মডেল মা

স্বাস্থ্যখাতে নার্সিং সেবায় সমস্যা ও সম্ভাবনা

সমাজসংস্কারক শিবশঙ্কর চক্রবর্ত্তী

জীবনকে পাঠ করার অভ্যাস

ছবি

আমাদের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

ছবি

হে নূতন দেখা দিক আর বার স্বপ্নকল্পে রবীন্ত্রনাথ

ছবি

শুভ জন্মদিন, কবিগুরু ...

আনন্দ বেদনার ঈদ উৎসব

শত অনিশ্চয়তার মধ্যেও ঘরমুখো মানুষগুলোর ভ্রমণ নিরাপদ হোক

মে দিবস ও বাংলাদেশের শ্রম মজুরী

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস

শিপমেন্ট, বোনাস এবং ঈদআনন্দ

ছবি

ক্ষমা করবেন স্যার

পূণ্যময় রজনী শবে ক্বদর

লাইলাতুল ক্বাদ্র

অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী

জ্বিন-ভুত-দৈত্য-দানো

খাপড়া ওয়ার্ড শহীদ দিবস এবং দুই কৃষকের আত্নহত্যা

রমজান মাস ধুমপান ছাড়ার উপযুক্ত সময়

ইউক্রেন সংকটঃ অস্তিত্ব হুমকিতে কি রাশিয়া

পাকিস্তান সামরিক আদালতের নির্দেশ

লালবাগ কেল্লা ও পুরান ঢাকার গলি-ঘুপচি

মুজিবনগর সরকার ও তাজউদ্দীন আহমদ এর ভূমিকা

বাংলাদেশের প্রথম সরকার

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার সুফল

মুজিবনগর সরকার : সকল বিতর্কের অবসান যেখানে

tab

মুক্ত আলোচনা

বিদায় রানা,বিদায় কাজী দা

কাজী রওনাক হোসেন

মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২

আমার চাচাতো ভাই, বড় চাচা কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলে। ’৬২ সালে আমরা ঢাকায় আসি এবং একই বাড়িতে দীর্ঘদিন ছিলাম। সে কারণে বড়দা (কাজী আনোয়ার হোসেন) কে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। ওঁনার অনেক কথা সবাই জানেন না। ১৯ জুলাই, ১৯৩৬ সালে তাঁর জন্ম। আর ১৯শে জানুয়ারি ২০২২ সালে অনন্তের পথে তাঁর যাত্রা।

সব সময়ই কাজী আনোয়ার হোসেন ছিলেন কিছুটা ঘরকুনো এবং নিভৃতচারী কিন্তু কাজের বেলায় পারফেকশনিস্ট। ওনার মৃত্যুর পর সারা পৃথিবী থেকে সামাজিক মাধ্যমে এবং আমার কাছে যে শোক বার্তাগুলো এসেছে তার বেশীর ভাগেরই মূল কথা হল- কাজীদার কাছে আমরা ঋণী। প্রায় সবাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে যখন বিপদে পড়েছিলেন বা আটকে গিয়েছিলেন তখন সেই সমস্যা থেকে তারা মুক্তিলাভ করেছিলেন মাসুদ রানার কথা চিন্তা করে। যখনই কেউ কোন বিপদে পড়েছেন তখন চিন্তা করেছেন মাসুদ রানা এ জায়গায় থাকলে কী করত। এবং এই চিন্তাই তাদের সহযোগিতা করেছে সফল হওয়ার জন্য। আমি জানিনা, মৃত্যুর পর আর কারো জন্য এরকম শোকাবার্তা ও পাঠক সম্মাননা আর কেউ পেয়েছেন কিনা।

শিক্ষাজীবন শেষ করার আগেই কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সংগীত চর্চা করেছেন। বেতারে ও প্লেব্যাকে নিয়মিত গান করেছেন। বেতারে মূলত তিনি নজরুলসংগীত এবং আধুনিক গান পরিবেশন করতেন। সত্যি কথা বলতে, তাঁর সংগীত জগতটি মানুষের কাছে অতটা পরিচিত নয়, যতটা তাঁর লেখক সত্ত্বা।

তিনি ‘সুতরাং ছবিতে ‘এই যে আকাশ এই যে বাতাস বউ কথা কও সুরে যেন ডেকে যায়’ সৈয়দ শামসুল হকের লেখা এবং সত্য সাহার সুরে এই গানটি গেয়েছিলেন। গানটির অংশবিশেষে আব্দুল আলীমও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। ষাটের দশকে এটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় গান। উর্দু ছবি ‘তালশ’-এ তাঁর গাওয়া ‘ম্যায় হু রিক্সাওয়ালা বেচারা’ গানটিও অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘গোধূলিপ্রেম’ ছবিতে ‘হায় হায় আমায় কেউ চিনলো না’ গানটিও যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

তিনি এক সময় চমৎকার বাঁশী বাজাতেন। স্প্যানিশ গিটারেও সুরের ঝংকার তুলতেন। কিন্তু বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত মহলে সুগায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও তিনি বুঝেছিলেন শুধু গান নিয়ে তাঁর বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না। তাই তিনি কী করা যায় ভেবে ভেবে বাবার কাছ থেকে দশ হাজার টাকা ধার নিয়ে প্রেস ব্যবসা শুরু করেন। এভাবেই বদলে যায় তাঁর পেশা ও নেশা। কিন্তু এই প্রেস ব্যবসাই তাঁর হাতে যেন লেখনীরও দায়ভার তুলে দিয়েছিল।

১৯৬৬ সালে ‘মাসুদ রানা’র প্রথম ও মৌলিক বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ প্রকাশ করেন কাজী আনোয়ার হোসেন। অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পায় এই বইটি। এরপর তরুণ প্রজন্মের পাঠকের কাছে ‘মাসুদ রানা’ চরিত্রটি আইকন হয়ে ওঠে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ছয় দশক সময় ধরে ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের প্রায় পাঁচশ’ বই প্রকাশিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু নিজে লিখে যাননি, তৈরি করেছেন অনেক নতুন লেখক। এই লেখকরাও তাদের লেখনীর জন্য ‘প্রিয় কাজীদা’র কাছে অকপটে ঋণ স্বীকার করেন। ‘মাসুদ রানা’, ‘কুয়াশা’র পাশাপাশি এখান থেকে বেরিয়েছে ধ্রুপদী বিদেশী সাহিত্যের সুলভ অনুবাদ। বিশ্বের সেরা উপন্যাসগুলি চমৎকার অনুবাদের কারণে এদেশের পাঠকরা পেপারব্যাকে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

কাজী আনোয়ার হোসেন তাঁর বইয়ে যেসব দৃশ্যের বর্ণনা দিতেন তা ছিল নিখুঁত এবং অত্যন্ত সহজেই হৃদয় ছোঁয়া। পাঠক এগুলো পড়তে পড়তে দৃশ্যের ভিতর, বর্ণনার ভিতর এমনভাবে ঢুকে পরে যেন সে নিজেই ওখানে উপস্থিত।

কাজী আনোয়ার হোসেন যেভাবে থ্রিলার সিরিজ বের করে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের বই পড়ায় আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন প্রায় ছয় দশক ধরে তা অবশ্যই এদেশের মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর মনে রাখবে।

back to top