alt

মুক্ত আলোচনা

জীবনকে পাঠ করার অভ্যাস

লতিফা নিলুফার পাপড়ি

: বুধবার, ১১ মে ২০২২

এমনিতেই জীবন বড় জটিল। তার মধ্যে যদি কোনো কুটিলতা ঢুকে পরে, তখন জীবনে যে কত প্যাচ লাগে তার কোনো ইয়াত্তা নেই। অথচ একটু সহজ হলে, একটু মানিয়ে নিলে জটিল জীবনকে সহজ করা যায়। আমারা ক’জন সেটা বুঝি? বুঝলেও চেষ্টা কী করি? আসুন না জীবনের কিছু বিষয় একটু নাড়াচাড়া করে দেখি।

এক.

টাকা দিলে মানুষ কেনা যায়। টাকার জন্য মানুষ মানুষকে ঠকায়, চুরি করে, মানুষ মারে, হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। টাকার জন্যে জীবনটাকেও গুরুতর হুমকির মুখে ফেলতে পিছপা হয় না। সাধারণত আমরা দেখি, যার যত বেশি টাকা, তার ক্ষমতা তত বেশি; মানুষ তাকে সম্মানও করে সেই অনুপাতে। যে যত বেশি আয় করে তার সাথে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা দেখা যায়। টাকা আনে মান-সম্মান, তোলে জাতে। টাকায় কি না হয়। টাকার কাছে ক্ষমতার পরাজয় হয়। প্রভাবশালীও কুর্নিশ করে টাকার শক্তিকে। টাকার যে কী আশ্চর্য ক্ষমতা তা আমাদের দেশে খুব ভালো ভাবেই বোঝা যায়। টাকার ক্ষমতার কাছে অনেক সময় মানুষের ক্ষমতাও হেরে যায়। বেশির ভাগ মেয়ে টাকাওয়ালা বর পছন্দ করে। তবে একটা প্রশ্ন করি। টাকা কি মানসিক শান্তি দিতে পারে?

দুই.

মানুষের মাঝে একটি প্রবণতা দেখা যায়, যে মানুষ নিজে যেমন, অন্যকেও তেমন দেখা। যদিও স্রষ্টা বৈচিত্রকেই গুরুত্ব দিয়ে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর সাতশকোটি মানুষের মধ্যে হুবুহু একই রকম চেহারার আরেকজনকে পাওয়া যায়না। এমনকি যমজদের মধ্যেও ভিন্নতা থাকে। তাহলে ভিন্নতাকে বিবেচনা না করলে সরলীকরণ করলে তাতে হীতে বিপরীত হতে পারে। বাইরের পার্থক্য শুধু নয়, ভিন্নতা আছে দৃষ্টিভঙ্গিতে, রুচিবোধে, চিন্তাচেতনায়। কেউ যদি ভাবে তার পছন্দের অন্য কেউ তার মত করে হাসবে, হাঁটবে, পোষাক পরবে, খাবে; আর এই চাওয়াটাকে যদি সে চাপিয়ে দিতে অথবা তাকে অনুকরন অনুসরণ করতে বাধ্য করতে চায়, তবে তাতে ব্যক্তিস্বান্ত্রতাকেই অস্বীকার করা হবে, স্বকীয়তাকে অবমূল্যায়ন করা হবে। মানুষ হিসাবে যে মুনষ্যত্ব থাকার কথা, সেটার বড় অভাব আজ আমাদের দেশে।

তিন.

যে জীবন থেকে পাঠ নিতে শিখে, সে যেভাবে এগোয়, অন্যরা সেভাবে পারে না। কিন্তু যে অন্যের কাছ থেকে কিংবা মুরুব্বীদের কাছ থেকে মুখস্থ জীবন চালাতে চায়, তার জীবনে সহজেই ক্লান্তি নেমে আসে। তার জীবনটা সন্ধ্যার মত তটস্থ কাটে, এই বুঝি আলো নিভে গেল বলে। জীবনটা তাদেরকে চিন্তাক্লীষ্ট করে রাখে, যাপন বা উপভোগ নয়, ভাবনা দূর্ভাবনায় জীবন কাটে তাদের।

সমস্যাকে সমস্যা মনে না করে, সেটাকে অভিজ্ঞতা ভাবলে ক্ষতি কি? সব বিষয়ে ক্ষুদ্ধ হওয়ার চেয়ে নিশ্চুপ থাকা অনেক নিরাপদ। রাগ যে থাকবেনা তা নয়। রাগ প্রাণেরই লক্ষন, কিন্তু তার পাল্লায় পড়ে যেতে নেই। ও চোরাবালির মতো। খেয়াল রাখতে হবে। ‘রেগে গেলে তো হেরে গেলে।’

সবচেয়ে বড় কথা হলো যে কোন নতুন সম্পর্ককে মর্যাদা দিতে হবে। আমরা যদি সহজ হতে পারিনা নতুন সম্পর্ক গুলোতে, তা হলে সেইটাতো নিজের লজ্জা। ঘরে নতুন বউ আসবে তাকে আপন করে নিতে হবে। দায়িত্বটা কিন্তু আপনারই। সে যদি তার আচরণে আপনাকে দুঃখ দেয়, তাহলে সেটা তার ব্যার্থতা। তবে আপনাকে উদার হতে হবে। সে আপনার সংসারের উত্তরাধিকারী, তাকে সব বুঝিয়ে দিতে হবে।

আপনার মেয়ের জামাই আপনার ছেলের মতো। তাকে স্নেহমমতা দিবেন। আপনার মেয়েকে এই শিক্ষা দিয়ে তোলেন, সে যেনো স্বামী ও তার পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। একটা কথা মনে রাখবেন যদি অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়েন তাহলে সেই গর্তে একদিন নিজেকেই পড়তে হবে।

সত্যি বলতে কি যাদের জীবনকে পাঠ করার অভ্যাস আছে, তাদের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতাও বেশি। তাই আমি বলি সকল নারীর জীবনকে পাঠ করার অভ্যাস হোক।

চার.

দাম্পত্য সম্পর্কে একটা সময়ের পরে ভালোবাসা হয়তো শুধুই অভ্যেস বা রূপকথা। ভালোবাসা মানেই সংসার। বাসনকোসন, হাড়িপাতিল, চামচের টুংটাং, সকাল বিকেলে চায়ের সাথে টা অথবা দিনশেষে সংসারের খরচা সেরে বাড়ি ফেরা। কেবল রাত নামার প্রতীক্ষা। কথা বলার রীতি না মেনে অকারণে অর্থহীন কথা বলা।

আবার ভোর হয়। সবজি আমিষ কাটাকাটি। আগুনে রান্না চড়ে। বাসনপত্র, তেল-মসলা-নুন ওলটপালট হয়ে যায়। ক্যাটক্যাটে হলদে রঙা দাগ মুছে রান্নাঘর সামলাতে কাজের তাড়া। লবন কম। ভালোবাসার মানুষ চুপচাপ অখাদ্য খেয়ে নেয়। খুঁত ধরতে ভয়। যদি মনে দাগ পড়ে, তখন আবার ঘষে ঘষে তোলা। তারচেয়ে এঁটো বাসনের গাঁয়ে যেটুকু জড়িয়ে থাকে সেটুকু দেখেও না দেখার ভান করা।

বিকালে বাড়ি ফেরা। বিশ্রাম নিতে নিতে চোখে ঘুম জড়িয়ে আসা। ভালোবাসা বড় অদ্ভুত! সম্পর্ক হলেই বাসা বাঁধা যায়? নাকি ভালবাসা আছে বলেই সম্পর্ক ভালো হয়ে যায়। অস্বাভাবিক অস্বস্তিকর জটিলতা ভুলে যাওয়া। পরষ্পরকে এড়িয়ে যাই, কিন্তু পেরিয়ে যেতে পারি কী? জটিলতাগুলো অকাতরে অতিক্রম করে যাওয়ার নাম ‘ভালোবাসা’ ছাড়া আর কিছুনয়। নারীকে জীবনের পাঠ নিয়ে ভালোবাসা ধরে রেখে জীবন কাটাতে হয়। কাটিয়ে দেনও।

পাঁচ.

হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে মহিলাদের একটা বয়সে সহ্যশক্তি একেবারেই কমে য়ায়। এটা মেনোপজের সময়টাতে বেশি হয়। সবার হয় না, তবে বেশিরভাগ মহিলার হয়। এ সময়টায় মনখারাপ ও মুডঅফ থাকে। হঠাৎ করেই কোনো কারণ ছাড়াই মন-মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আবার এমনিতেই ভালোও হয়ে যায়। হঠাৎ হঠাৎ মেজাজ ওঠানামায় অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। ঝেকে বসে বিষণ্নতা, হতাশা, অস্থিরতাবোধ।

তবে যারা সব পেয়েছির রাজ্যে (বলার আগে পেয়ে যান) বাস করে তাদের মেনোপজে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। যেসব মহিলারা ক্ষমতা বিস্তারে পারদর্শী, নিজের সম্পূর্ণ প্রভাব পরিবারে বিস্তার করে রাখে, তাদের খুব একটা অসুবিধা হয় না।

যারা সবসময় সবকিছু থেকে বঞ্চিত তারা এই মেনোপজের সময়টাতে খুব বেশি সমস্যায় পড়ে। একধরনের হতাশা এসে চেপে ধরে। না পাওয়ার যন্ত্রণা তাকে তিলে তিলে গ্রাস করে ফেলে। এরকম একজন মহিলার সাথে কয়েকদিন আগে আলাপ হয়। জানতে পারি তার জীবনের কথা। এখানে নাই বললাম সেই কথাগুলো।

তবে আমি মনে করি আজ অপরিচিত কারো জীবনে যে ঘটনা ঘটেছে এমন অনেক ঘটনা আমার নিজের কারো মাঝে হতে পারে। তাই প্রতিটি মহিলার স্বামী সন্তান জীবনের কোন একটা সময় তার পাশে দাঁড়ান। তাকে সমস্যা থেকে উত্তোলন করার চেষ্টা করুন।

ছয়.

কেউ দেখতে চায় বিশ্বজগৎ। কেউ নিজের আপন সংসারে আবদ্ধ থাকতে চায়। বিশ্বজগৎ তাকে টানে না। যার যার দৃষ্টিভঙ্গি যেমন। যার যার ভালো লাগা আলাদা বিষয়। প্রতিটা মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু বিশেষ গুণ বিদ্যমান। সেই বিশেষ গুণই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। কখনো সেটি আমরা বুঝি নিজেই, আবার কখনো অন্যের সাহায্যে।

প্রত্যেকেরই উচিত নিজের অনন্য গুণকে সামনে রেখে এগিয়ে চলা। যদিও পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে সেটা অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠে না। অনেকে তার কাজ কথাবার্তা দ্বারা অন্যের কাছে নিজেই নিজেকে অসম্মান করে থাকেন। নিজের প্রাপ্য সম্মানটুকু যদি আপনি নিজেই নিজেকে না দেন, তাহলে অন্যরা কীভাবে দেবে?

সব কথাতেই হ্যাঁ বলা বা রাজি হওয়াটা নিজের জন্য অনেক সময় চাপের বিষয় হয়ে উঠে। নিজের ইচ্ছা নেই, এমন কোনো কাজে শুধু অন্যের সামনে ভালো হওয়ার জন্য রাজি হওয়া মানে, আপনি আসলে নিজেই নিজেকে অপমান করছেন।

এমনও তো হয় যেটা আপনি না, সেটার অভিনয় করা: সুবিধা পাওয়ার আশায় নিজের স্বভাববিরুদ্ধ কিছু করা। অন্যের সামনে নিজেকে জাহির করার জন্য আপনি যেমনটা আসলে নন, সেটা দেখানো। এতে হয়তো আপনি প্রশংসা পাচ্ছেন বা ভালো হচ্ছেন অন্যের চোখে, কিন্তু এর মাধ্যমে অসম্মান করছেন নিজেকেই। কেননা নিজেকে আপনি নিজেই গ্রহণ করতে পারছেন না, আপনি আসলে যেমনটা।

নিজের মতে সঙ্গে অন্যের মতামত মিলে গেলে, সেটাতে সমর্থন করাটা স্বাভাবিক। অথচ নিজের মতবিরুদ্ধ হওয়ার পরও প্রতিপত্তি বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখে অন্যের মতামতের সঙ্গে তাল মেলানোর অর্থ নিজেকে আপনি দুর্বল মনে করেন। আপনি চাচ্ছেন না মাথা উঁচু করে চলতে। নিজেকে অসম্মান করছেন।

যাচাই না করে অন্যের কথানুসারে কাজ করাটা এক্কেবারে ঠিক নয়। কেননা এর মানেটা হচ্ছে, নিজের ওপর আপনার বিশ্বাস নেই এবং আপনার নিজস্ব কোনো মতামত নেই। আপনি নিজেই সেই সুযোগটা আসলে দেন, যাতে অন্যরা আপনাকে ব্যবহার করতে পারে।

মনের কথা চেপে রাখা নিজের জন্যই অসম্মানজনক। মনে যেটা রয়েছে, সেটা প্রকাশ করুন সবার সামনে। কে কী ভাববে, নাকি মজা ওড়াবে, এটা ভেবে মনের আবেগ বা কথা চেপে রাখা উচিত নয়। এজন্য বিড়ম্বনায় পড়লে, লড়াই করুন পরিস্থিতির সামনে। নিজেকে প্রমাণ করুন, আপনি কেবল নারী নন, একজন মানুষও।

নিজের পক্ষে আওয়াজ না তুলে যখন শুধু অন্যদের আরাম, খুশির খেয়াল রাখেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সবাই আপনাকে পেয়ে বসে। পাত্তা দেয় না। আপনার খারাপ লাগা, ভালো লাগা অন্যের কাছে গুরুত্ব পায় না। তাই অন্যদের পাশাপাশি নিজের দিকটাও ভাবুন। নিজের ভালো লাগা মন্দলাগাকে সমান গুরুত্ব দিন। দেখবেন আপনি অনেক উৎরে যাবেন, যাবেনই।

[লেখক: শিক্ষক]

বাঙালি সংস্কৃতিতে লুঙ্গির আগমন

মনসামঙ্গলঃ মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রধান মঙ্গলকাব্য

ফুটবল ফুটবল

সন্তানের শিক্ষার মাধ্যম কি হবে তা অভিভাবককেই ভাবতে হয়

আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস

রেলগাড়ি ঝমাঝম

বিশ্ববাসী আমেরিকার অস্ত্র ও চক্রান্ত ধ্বংস করে পৃথিবীকে বাঁচাবে

ইংলিশ মিডিয়ামে শিক্ষার্থীর পছন্দ CAIE নাকি EDEXCEL

ছবি

মেরী কুরী: এক মহীয়সী বিজ্ঞান সাধিকা)

পদ্মা সেতু বাঙালির সক্ষমতার প্রতীক

আমি দেখবো

অপরাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের বলি হচ্ছেন শিক্ষকসমাজ

মানুষের মস্তিক এক সুপার কম্পিউটার

পদ্মা সেতু শুধুই আবেগ নয়

ছবি

অবশেষে পদ্মার জয়

নিজের অর্জনের রেকর্ড নিজেই বারবার ভেঙেছে যে দল

আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা ও আজকের বাংলাদেশ

ছবি

স্বপ্নের পদ্মাসেতু

আওয়ামী লীগের ইতিহাস
সংগ্রাম ও উন্নয়নের ইতিহাস

শিকারের শিকারী বধ

কলম্বিয়া সরকার ও ফার্ক গেরিলা গোষ্ঠী

ছবি

প্রধানমন্ত্রীর সততা ও সাহসিকতার প্রতীক পদ্মা সেতু

বেত

কমন-সেন্সের বাইরে...

এস এস সি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের জন্য কতিপয় পরামর্শ

আর্তি

৬ দফা : বাঙালির মুক্তির সনদ

বিশ্ব দুগ্ধ দিবসের ভাবনা

পরিবেশ বিপর্যয়ে তামাক-এর নেতিবাচক প্রভাব

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের নৈতিকতা

বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস

শক্তিমানের বিদায়

কান্ট্রিরোড

ছবি

স্মরণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি

আবদুল গাফফার চৌধুরী: একুশের এক কিংবদন্তি

চুরুট

tab

মুক্ত আলোচনা

জীবনকে পাঠ করার অভ্যাস

লতিফা নিলুফার পাপড়ি

বুধবার, ১১ মে ২০২২

এমনিতেই জীবন বড় জটিল। তার মধ্যে যদি কোনো কুটিলতা ঢুকে পরে, তখন জীবনে যে কত প্যাচ লাগে তার কোনো ইয়াত্তা নেই। অথচ একটু সহজ হলে, একটু মানিয়ে নিলে জটিল জীবনকে সহজ করা যায়। আমারা ক’জন সেটা বুঝি? বুঝলেও চেষ্টা কী করি? আসুন না জীবনের কিছু বিষয় একটু নাড়াচাড়া করে দেখি।

এক.

টাকা দিলে মানুষ কেনা যায়। টাকার জন্য মানুষ মানুষকে ঠকায়, চুরি করে, মানুষ মারে, হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। টাকার জন্যে জীবনটাকেও গুরুতর হুমকির মুখে ফেলতে পিছপা হয় না। সাধারণত আমরা দেখি, যার যত বেশি টাকা, তার ক্ষমতা তত বেশি; মানুষ তাকে সম্মানও করে সেই অনুপাতে। যে যত বেশি আয় করে তার সাথে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা দেখা যায়। টাকা আনে মান-সম্মান, তোলে জাতে। টাকায় কি না হয়। টাকার কাছে ক্ষমতার পরাজয় হয়। প্রভাবশালীও কুর্নিশ করে টাকার শক্তিকে। টাকার যে কী আশ্চর্য ক্ষমতা তা আমাদের দেশে খুব ভালো ভাবেই বোঝা যায়। টাকার ক্ষমতার কাছে অনেক সময় মানুষের ক্ষমতাও হেরে যায়। বেশির ভাগ মেয়ে টাকাওয়ালা বর পছন্দ করে। তবে একটা প্রশ্ন করি। টাকা কি মানসিক শান্তি দিতে পারে?

দুই.

মানুষের মাঝে একটি প্রবণতা দেখা যায়, যে মানুষ নিজে যেমন, অন্যকেও তেমন দেখা। যদিও স্রষ্টা বৈচিত্রকেই গুরুত্ব দিয়ে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর সাতশকোটি মানুষের মধ্যে হুবুহু একই রকম চেহারার আরেকজনকে পাওয়া যায়না। এমনকি যমজদের মধ্যেও ভিন্নতা থাকে। তাহলে ভিন্নতাকে বিবেচনা না করলে সরলীকরণ করলে তাতে হীতে বিপরীত হতে পারে। বাইরের পার্থক্য শুধু নয়, ভিন্নতা আছে দৃষ্টিভঙ্গিতে, রুচিবোধে, চিন্তাচেতনায়। কেউ যদি ভাবে তার পছন্দের অন্য কেউ তার মত করে হাসবে, হাঁটবে, পোষাক পরবে, খাবে; আর এই চাওয়াটাকে যদি সে চাপিয়ে দিতে অথবা তাকে অনুকরন অনুসরণ করতে বাধ্য করতে চায়, তবে তাতে ব্যক্তিস্বান্ত্রতাকেই অস্বীকার করা হবে, স্বকীয়তাকে অবমূল্যায়ন করা হবে। মানুষ হিসাবে যে মুনষ্যত্ব থাকার কথা, সেটার বড় অভাব আজ আমাদের দেশে।

তিন.

যে জীবন থেকে পাঠ নিতে শিখে, সে যেভাবে এগোয়, অন্যরা সেভাবে পারে না। কিন্তু যে অন্যের কাছ থেকে কিংবা মুরুব্বীদের কাছ থেকে মুখস্থ জীবন চালাতে চায়, তার জীবনে সহজেই ক্লান্তি নেমে আসে। তার জীবনটা সন্ধ্যার মত তটস্থ কাটে, এই বুঝি আলো নিভে গেল বলে। জীবনটা তাদেরকে চিন্তাক্লীষ্ট করে রাখে, যাপন বা উপভোগ নয়, ভাবনা দূর্ভাবনায় জীবন কাটে তাদের।

সমস্যাকে সমস্যা মনে না করে, সেটাকে অভিজ্ঞতা ভাবলে ক্ষতি কি? সব বিষয়ে ক্ষুদ্ধ হওয়ার চেয়ে নিশ্চুপ থাকা অনেক নিরাপদ। রাগ যে থাকবেনা তা নয়। রাগ প্রাণেরই লক্ষন, কিন্তু তার পাল্লায় পড়ে যেতে নেই। ও চোরাবালির মতো। খেয়াল রাখতে হবে। ‘রেগে গেলে তো হেরে গেলে।’

সবচেয়ে বড় কথা হলো যে কোন নতুন সম্পর্ককে মর্যাদা দিতে হবে। আমরা যদি সহজ হতে পারিনা নতুন সম্পর্ক গুলোতে, তা হলে সেইটাতো নিজের লজ্জা। ঘরে নতুন বউ আসবে তাকে আপন করে নিতে হবে। দায়িত্বটা কিন্তু আপনারই। সে যদি তার আচরণে আপনাকে দুঃখ দেয়, তাহলে সেটা তার ব্যার্থতা। তবে আপনাকে উদার হতে হবে। সে আপনার সংসারের উত্তরাধিকারী, তাকে সব বুঝিয়ে দিতে হবে।

আপনার মেয়ের জামাই আপনার ছেলের মতো। তাকে স্নেহমমতা দিবেন। আপনার মেয়েকে এই শিক্ষা দিয়ে তোলেন, সে যেনো স্বামী ও তার পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। একটা কথা মনে রাখবেন যদি অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়েন তাহলে সেই গর্তে একদিন নিজেকেই পড়তে হবে।

সত্যি বলতে কি যাদের জীবনকে পাঠ করার অভ্যাস আছে, তাদের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতাও বেশি। তাই আমি বলি সকল নারীর জীবনকে পাঠ করার অভ্যাস হোক।

চার.

দাম্পত্য সম্পর্কে একটা সময়ের পরে ভালোবাসা হয়তো শুধুই অভ্যেস বা রূপকথা। ভালোবাসা মানেই সংসার। বাসনকোসন, হাড়িপাতিল, চামচের টুংটাং, সকাল বিকেলে চায়ের সাথে টা অথবা দিনশেষে সংসারের খরচা সেরে বাড়ি ফেরা। কেবল রাত নামার প্রতীক্ষা। কথা বলার রীতি না মেনে অকারণে অর্থহীন কথা বলা।

আবার ভোর হয়। সবজি আমিষ কাটাকাটি। আগুনে রান্না চড়ে। বাসনপত্র, তেল-মসলা-নুন ওলটপালট হয়ে যায়। ক্যাটক্যাটে হলদে রঙা দাগ মুছে রান্নাঘর সামলাতে কাজের তাড়া। লবন কম। ভালোবাসার মানুষ চুপচাপ অখাদ্য খেয়ে নেয়। খুঁত ধরতে ভয়। যদি মনে দাগ পড়ে, তখন আবার ঘষে ঘষে তোলা। তারচেয়ে এঁটো বাসনের গাঁয়ে যেটুকু জড়িয়ে থাকে সেটুকু দেখেও না দেখার ভান করা।

বিকালে বাড়ি ফেরা। বিশ্রাম নিতে নিতে চোখে ঘুম জড়িয়ে আসা। ভালোবাসা বড় অদ্ভুত! সম্পর্ক হলেই বাসা বাঁধা যায়? নাকি ভালবাসা আছে বলেই সম্পর্ক ভালো হয়ে যায়। অস্বাভাবিক অস্বস্তিকর জটিলতা ভুলে যাওয়া। পরষ্পরকে এড়িয়ে যাই, কিন্তু পেরিয়ে যেতে পারি কী? জটিলতাগুলো অকাতরে অতিক্রম করে যাওয়ার নাম ‘ভালোবাসা’ ছাড়া আর কিছুনয়। নারীকে জীবনের পাঠ নিয়ে ভালোবাসা ধরে রেখে জীবন কাটাতে হয়। কাটিয়ে দেনও।

পাঁচ.

হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে মহিলাদের একটা বয়সে সহ্যশক্তি একেবারেই কমে য়ায়। এটা মেনোপজের সময়টাতে বেশি হয়। সবার হয় না, তবে বেশিরভাগ মহিলার হয়। এ সময়টায় মনখারাপ ও মুডঅফ থাকে। হঠাৎ করেই কোনো কারণ ছাড়াই মন-মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আবার এমনিতেই ভালোও হয়ে যায়। হঠাৎ হঠাৎ মেজাজ ওঠানামায় অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। ঝেকে বসে বিষণ্নতা, হতাশা, অস্থিরতাবোধ।

তবে যারা সব পেয়েছির রাজ্যে (বলার আগে পেয়ে যান) বাস করে তাদের মেনোপজে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। যেসব মহিলারা ক্ষমতা বিস্তারে পারদর্শী, নিজের সম্পূর্ণ প্রভাব পরিবারে বিস্তার করে রাখে, তাদের খুব একটা অসুবিধা হয় না।

যারা সবসময় সবকিছু থেকে বঞ্চিত তারা এই মেনোপজের সময়টাতে খুব বেশি সমস্যায় পড়ে। একধরনের হতাশা এসে চেপে ধরে। না পাওয়ার যন্ত্রণা তাকে তিলে তিলে গ্রাস করে ফেলে। এরকম একজন মহিলার সাথে কয়েকদিন আগে আলাপ হয়। জানতে পারি তার জীবনের কথা। এখানে নাই বললাম সেই কথাগুলো।

তবে আমি মনে করি আজ অপরিচিত কারো জীবনে যে ঘটনা ঘটেছে এমন অনেক ঘটনা আমার নিজের কারো মাঝে হতে পারে। তাই প্রতিটি মহিলার স্বামী সন্তান জীবনের কোন একটা সময় তার পাশে দাঁড়ান। তাকে সমস্যা থেকে উত্তোলন করার চেষ্টা করুন।

ছয়.

কেউ দেখতে চায় বিশ্বজগৎ। কেউ নিজের আপন সংসারে আবদ্ধ থাকতে চায়। বিশ্বজগৎ তাকে টানে না। যার যার দৃষ্টিভঙ্গি যেমন। যার যার ভালো লাগা আলাদা বিষয়। প্রতিটা মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু বিশেষ গুণ বিদ্যমান। সেই বিশেষ গুণই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। কখনো সেটি আমরা বুঝি নিজেই, আবার কখনো অন্যের সাহায্যে।

প্রত্যেকেরই উচিত নিজের অনন্য গুণকে সামনে রেখে এগিয়ে চলা। যদিও পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে সেটা অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠে না। অনেকে তার কাজ কথাবার্তা দ্বারা অন্যের কাছে নিজেই নিজেকে অসম্মান করে থাকেন। নিজের প্রাপ্য সম্মানটুকু যদি আপনি নিজেই নিজেকে না দেন, তাহলে অন্যরা কীভাবে দেবে?

সব কথাতেই হ্যাঁ বলা বা রাজি হওয়াটা নিজের জন্য অনেক সময় চাপের বিষয় হয়ে উঠে। নিজের ইচ্ছা নেই, এমন কোনো কাজে শুধু অন্যের সামনে ভালো হওয়ার জন্য রাজি হওয়া মানে, আপনি আসলে নিজেই নিজেকে অপমান করছেন।

এমনও তো হয় যেটা আপনি না, সেটার অভিনয় করা: সুবিধা পাওয়ার আশায় নিজের স্বভাববিরুদ্ধ কিছু করা। অন্যের সামনে নিজেকে জাহির করার জন্য আপনি যেমনটা আসলে নন, সেটা দেখানো। এতে হয়তো আপনি প্রশংসা পাচ্ছেন বা ভালো হচ্ছেন অন্যের চোখে, কিন্তু এর মাধ্যমে অসম্মান করছেন নিজেকেই। কেননা নিজেকে আপনি নিজেই গ্রহণ করতে পারছেন না, আপনি আসলে যেমনটা।

নিজের মতে সঙ্গে অন্যের মতামত মিলে গেলে, সেটাতে সমর্থন করাটা স্বাভাবিক। অথচ নিজের মতবিরুদ্ধ হওয়ার পরও প্রতিপত্তি বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখে অন্যের মতামতের সঙ্গে তাল মেলানোর অর্থ নিজেকে আপনি দুর্বল মনে করেন। আপনি চাচ্ছেন না মাথা উঁচু করে চলতে। নিজেকে অসম্মান করছেন।

যাচাই না করে অন্যের কথানুসারে কাজ করাটা এক্কেবারে ঠিক নয়। কেননা এর মানেটা হচ্ছে, নিজের ওপর আপনার বিশ্বাস নেই এবং আপনার নিজস্ব কোনো মতামত নেই। আপনি নিজেই সেই সুযোগটা আসলে দেন, যাতে অন্যরা আপনাকে ব্যবহার করতে পারে।

মনের কথা চেপে রাখা নিজের জন্যই অসম্মানজনক। মনে যেটা রয়েছে, সেটা প্রকাশ করুন সবার সামনে। কে কী ভাববে, নাকি মজা ওড়াবে, এটা ভেবে মনের আবেগ বা কথা চেপে রাখা উচিত নয়। এজন্য বিড়ম্বনায় পড়লে, লড়াই করুন পরিস্থিতির সামনে। নিজেকে প্রমাণ করুন, আপনি কেবল নারী নন, একজন মানুষও।

নিজের পক্ষে আওয়াজ না তুলে যখন শুধু অন্যদের আরাম, খুশির খেয়াল রাখেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সবাই আপনাকে পেয়ে বসে। পাত্তা দেয় না। আপনার খারাপ লাগা, ভালো লাগা অন্যের কাছে গুরুত্ব পায় না। তাই অন্যদের পাশাপাশি নিজের দিকটাও ভাবুন। নিজের ভালো লাগা মন্দলাগাকে সমান গুরুত্ব দিন। দেখবেন আপনি অনেক উৎরে যাবেন, যাবেনই।

[লেখক: শিক্ষক]

back to top