Warning: Undefined array key "sess_sangbad_bna_id" in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 9

Warning: Undefined array key "sess_sangbad_bna_userid" in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 10

Warning: Undefined array key "sess_sangbad_bna_password" in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 11

Warning: Undefined array key "sess_sangbad_bna_fullname" in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 12

Warning: Undefined array key "sess_sangbad_bnpage_list" in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 13

Warning: Undefined array key "sess_sangbad_bna_usertype" in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 14

Warning: Undefined array key "sess_sangbad_bna_block" in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 15

Deprecated: Function strftime() is deprecated in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 209
অপরিকল্পিত বাঁধ-শিল্পায়নে বিপর্যস্ত বরেন্দ্র কৃষি : সংবাদ অনলাইন সংবাদ অনলাইন » অপরিকল্পিত বাঁধ-শিল্পায়নে বিপর্যস্ত বরেন্দ্র কৃষি
alt

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

অপরিকল্পিত বাঁধ-শিল্পায়নে বিপর্যস্ত বরেন্দ্র কৃষি

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


Deprecated: Function strftime() is deprecated in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 209
: শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫

বরেন্দ্র হলো উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক অঞ্চল, যা বর্তমানে বাংলাদেশের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অংশ। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান হলো-গঙ্গা ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী এই জনপদটি বর্তমানে বাংলাদেশের রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর এবং ভারতের উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহ জেলার অংশ নিয়ে গঠিত।

এই অঞ্চলের মাটির ধরন মূলত দোআঁশ, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপন্ন হয় এবং এটি প্লাইস্টোসিন যুগের পলল দ্বারা গঠিত। রাজশাহী জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের অধীন ভূমি প্রধানত তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার। এই দুই উপজেলা ধান উৎপাদনে দেশের অন্যতম।

তবে চলতি আমন মৌসুমে অকালবৃষ্টিতে এখানকার ধানের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। আধাপাকা ধানগাছ ঝড়ো হাওয়ায় জমিতে পড়ে যায় এবং তা ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে। এবারের আমন ফলনে কৃষকরা বাম্পার ফলনের আশা করেছিলেন, কিন্তু এই বৃষ্টির কারণে তারা আশাহত হয়েছেন।

গোদাগাড়ী উপজেলায় চলতি বছরের (২০২৫) আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪,৯৭৫ হেক্টর জমিতে, যা অর্জিত হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৫০ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২-২৩ সালে ধান উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখা ৮৬ হাজার ১৪৫ মেট্রিক টন। এই উপজেলায় কৃষিজমি কমছে-এ তথ্য থেকেই অনুমান করা যায় যে তিন বছর আগে যেখানে ৮০ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হতো, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাষ হচ্ছে মাত্র ২৪ হাজার ৯৭৫ হেক্টরে। এই জমিগুলোর কী হচ্ছে তা বিশদভাবে জানা প্রয়োজন।

অপরদিকে তানোর উপজেলার চলতি মৌসুমে আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ হাজার ৬৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রিড ২৮ হেক্টর, উফশী জাত ২২ হাজার ১১৭ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের চাষ হয়েছে ৫৫০ হেক্টর। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ২৯৮ মেট্রিক টন।

এই দুই উপজেলার কৃষকেরা অকালবৃষ্টিতে বিপাকে পড়েছেন। গত ত্রিশ বছরে এই প্রথম এ ধরনের বড় বৃষ্টি হলো। গত ২৯ ও ৩০ অক্টোবর ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার আমন ধানের পাকা গাছ নুয়ে পড়েছে। ২৮ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ২২৮ মিলিমিটার।

বৃষ্টির পর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থায় বাধা থাকায় তানোর-গোদাগাড়ীর ফসলের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রায় তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত বৃষ্টির পানি জমে থাকে জমির ওপর, যার ফলে শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। গ্রামের উঁচু ভিটেতেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বহু মাটির ঘর এই কারণে ধসে পড়ে।

এই বৃষ্টিতে গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার প্রান্তিক কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়াবিদ সূত্রে জানা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হজার ৩০০ মিলিমিটার, অপরদিকে দেশের গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটার। অর্থাৎ সারা দেশের তুলনায় বরেন্দ্রর বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্থান ও বছরভেদে পরিবর্তিত হয়-যেমন দিনাজপুরে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১ হাজার ৮১৩ মিমি, রংপুরে ২ হাজার ৩২৪ মিমি এবং রাজশাহীতে ১ হাজার ৭০৫ মিমি। এখানকার জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র। কিন্তু এ বছর অকালবৃষ্টিতে কৃষকেরা আতঙ্কে ভুগছেন।

তানোর-গোদাগাড়ীতে পুকুর খনন, বিলে মাছ চাষের জন্য বাঁধ, ছোট-বড় খাড়িতে (খাল) অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া শিল্পায়নের কারণে পানি নিষ্কাশন ও শস্য উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে রিশিকুল, দেওপাড়া ও পাকড়ি ইউনিয়নে কিছু শিল্পকারখানার বর্জ্য দূষিত পানি কৃষিজমিতে পড়ে জমিগুলো অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারি হিসাবে দেখা যায়, গোদাগাড়ী উপজেলায় বিলের সংখ্যা ১৬টি, পুকুর/দিঘীর সংখ্যা ৫,০৩৮টি, খালের সংখ্যা ৫টি। পদ্মা ও মহানন্দা নদী উপজেলার বৃহৎ অংশ জুড়ে প্রবাহিত এবং এর সীমানা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এছাড়া রিশিকুল নদী গোদাগাড়ীর একটি স্থানীয় নদী, যা ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং শিব নদীর অংশ। প্রধান পাঁচটি খাল ছাড়াও আছে অসংখ্য ছোট খাল।

তানোর উপজেলায় পুকুর ৫ হাজার ৩৮৪টি এবং শিব নদী এ উপজেলার একমাত্র নদী। নদীটি নওগাঁ ও রাজশাহী জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। নদীটির দৈর্ঘ্য ৭১ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৭ মিটার এবং প্রকৃতি সর্পিলাকার। এ নদীর সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য ছোট খাল।

অপরিকল্পিত মাছ চাষ, মুরগি-হাঁস-গরু পালনের খামার গড়ে ওঠায় এসব জলাশয় এখন আর সঠিকভাবে কাজ করছে না।

গোদাগাড়ী উপজেলায় নতুন বড় শিল্পকারখানা হিসেবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের একটি ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠছে বিভিন্ন কুটির ও হস্তশিল্প-ম্যাঙ্গো পাল্প, ফুড প্রসেসিং, রেশম, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প ও বিড়ি শিল্প। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ আমনাতপুরে বরেন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে একটি কারখানা স্থাপন করেছে, যেখানে প্রাথমিকভাবে আম ও মৌসুমী ফল প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ভবিষ্যতে এখানে ফ্রোজেন ফুডস, নুডলসসহ নানা খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

উপজেলার সীমানা ঘেঁষে রয়েছে পবা উপজেলার দামকুড়া। গোদাগাড়ী দিয়ে প্রবাহিত নদী এসে পড়েছে দামকুড়া ইউনিয়নে। এসিআই ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান গোদরেজ ১৫২ কোটি টাকা বিনিয়োগে সেখানে ফিশ ফিড শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। নাহার অটোমোবাইল কারখানা ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে উৎপাদনে এসেছে। নাবিল গ্রুপ গোদাগাড়ীর ঝিকরাপাড়ায় ৪০ একর জমির ওপর কারখানা স্থাপন করেছে। নাবিল গ্রুপের আরেকটি সফল উদ্যোগ ‘নাবা ক্রপ কেয়ার’ উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ ও উৎপাদন করছে এ এলাকায়।

দেখা যাচ্ছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের অপরিকল্পিত বাঁধ ও শিল্পায়নের কারণে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এর ফলে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা ও খরা দেখা দিচ্ছে। মাছ চাষের উদ্দেশ্যে নির্মিত অপরিকল্পিত বাঁধ নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে ভাটি অঞ্চলে পানিপ্রবাহ কমে যায় বা জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে বহু জমিতে ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে শিল্পকারখানার বর্জ্য ও অপরিকল্পিত স্থাপনা পরিবেশ ও মাটিকে দূষিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষির জন্য বড় হুমকি। বরেন্দ্র এলাকায় অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তার কারণে বহু কৃষিজমি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। এই দুই উপজেলায় অনেক বাঁধ উজানের পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে অঞ্চলে পানির সরবরাহ কমে যায় এবং খরা দেখা দেয়।

গোদাগাড়ীর কিছু এলাকায় শিল্পকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ বিল, খাল ও কৃষিজমিকে দূষিত করছে। এতে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যাবে। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে দ্রুত কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই দুই উপজেলার সামগ্রিক বিষয়টি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ শিল্পায়ন, মাছ চাষ, পুকুর খনন, মাটি সমতলকরণ, বাগানবাড়ি নির্মাণ এবং পশুপাখি পালনের খামার কতটা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলছে-তা যাচাই করা জরুরি।

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

Warning: Undefined variable $offsetq in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1133

নারীর অধিকার নিশ্চিত হলে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব

কৃষিঋণ মওকুফ: কৃষকের স্বস্তি, বাস্তবায়নে দরকার সুশাসন

‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস!’

ইরানে হামলা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও পরিণতি


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

ঈদবাজারে ভোক্তার অসহায়ত্ব

নবযাত্রায় কেমন বাংলাদেশ চাই

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

নতুন গভর্নর অপরিহার্য ছিল

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের বিবাহের রীতি ও প্রথা

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদ: বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কী?

না হয় রহিতে কাছে!


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ভূমি কমিশন কেন জরুরি?

উৎসবে মূল্যবৃদ্ধির চিত্র

জোর যার, মুল্লুক তার: সাম্রাজ্যের নতুন পোশাক

‘পানিয়ালীর পোলার বইমেলা’


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

নিঃশব্দ আর্তনাদ শোনার সময় এখনই

ইরান ইস্যুতে মহাশক্তির পরীক্ষা

ক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা: রাজনীতির নতুন পরীক্ষা


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

এলডিসি থেকে উত্তরণে কেন এত সংশয়

আক্রান্ত ইরান ও সভ্যতার সংকট

প্রসঙ্গ: পরশ্রীকাতরতা ও আমিত্ব

চাঁদাবাজি কি ‘সমঝোতা’?


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

গ্রেপ্তার করতে হলে তো দু’জনকেই করতে হবে!

উড়াল দিচ্ছি চাঁদে

আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত

জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অস্বস্তি


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

নেশার কবলে গ্রামবাংলা

পুরনো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা আর চলিবে না!

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার ছায়া ও সমাজের আয়না


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

বই মেলার বোল কুমড়া

প্রসঙ্গ: খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল

নতুন সরকারের কঠিন সমীকরণ

ভাষাপ্রকৌশল ও কালচারাল হেজিমনি: শব্দের আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

tab

মতামত » উপ-সম্পাদকীয়

অপরিকল্পিত বাঁধ-শিল্পায়নে বিপর্যস্ত বরেন্দ্র কৃষি

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


Deprecated: Function strftime() is deprecated in /home/sangbadn/public_html/functions/core.php on line 209
শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫

বরেন্দ্র হলো উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক অঞ্চল, যা বর্তমানে বাংলাদেশের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অংশ। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান হলো-গঙ্গা ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী এই জনপদটি বর্তমানে বাংলাদেশের রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর এবং ভারতের উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহ জেলার অংশ নিয়ে গঠিত।

এই অঞ্চলের মাটির ধরন মূলত দোআঁশ, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপন্ন হয় এবং এটি প্লাইস্টোসিন যুগের পলল দ্বারা গঠিত। রাজশাহী জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের অধীন ভূমি প্রধানত তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার। এই দুই উপজেলা ধান উৎপাদনে দেশের অন্যতম।

তবে চলতি আমন মৌসুমে অকালবৃষ্টিতে এখানকার ধানের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। আধাপাকা ধানগাছ ঝড়ো হাওয়ায় জমিতে পড়ে যায় এবং তা ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে। এবারের আমন ফলনে কৃষকরা বাম্পার ফলনের আশা করেছিলেন, কিন্তু এই বৃষ্টির কারণে তারা আশাহত হয়েছেন।

গোদাগাড়ী উপজেলায় চলতি বছরের (২০২৫) আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪,৯৭৫ হেক্টর জমিতে, যা অর্জিত হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৫০ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২-২৩ সালে ধান উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখা ৮৬ হাজার ১৪৫ মেট্রিক টন। এই উপজেলায় কৃষিজমি কমছে-এ তথ্য থেকেই অনুমান করা যায় যে তিন বছর আগে যেখানে ৮০ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হতো, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাষ হচ্ছে মাত্র ২৪ হাজার ৯৭৫ হেক্টরে। এই জমিগুলোর কী হচ্ছে তা বিশদভাবে জানা প্রয়োজন।

অপরদিকে তানোর উপজেলার চলতি মৌসুমে আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ হাজার ৬৩৫ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রিড ২৮ হেক্টর, উফশী জাত ২২ হাজার ১১৭ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের চাষ হয়েছে ৫৫০ হেক্টর। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ২৯৮ মেট্রিক টন।

এই দুই উপজেলার কৃষকেরা অকালবৃষ্টিতে বিপাকে পড়েছেন। গত ত্রিশ বছরে এই প্রথম এ ধরনের বড় বৃষ্টি হলো। গত ২৯ ও ৩০ অক্টোবর ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার আমন ধানের পাকা গাছ নুয়ে পড়েছে। ২৮ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ২২৮ মিলিমিটার।

বৃষ্টির পর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থায় বাধা থাকায় তানোর-গোদাগাড়ীর ফসলের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। প্রায় তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত বৃষ্টির পানি জমে থাকে জমির ওপর, যার ফলে শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। গ্রামের উঁচু ভিটেতেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বহু মাটির ঘর এই কারণে ধসে পড়ে।

এই বৃষ্টিতে গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলার প্রান্তিক কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়াবিদ সূত্রে জানা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হজার ৩০০ মিলিমিটার, অপরদিকে দেশের গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটার। অর্থাৎ সারা দেশের তুলনায় বরেন্দ্রর বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্থান ও বছরভেদে পরিবর্তিত হয়-যেমন দিনাজপুরে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১ হাজার ৮১৩ মিমি, রংপুরে ২ হাজার ৩২৪ মিমি এবং রাজশাহীতে ১ হাজার ৭০৫ মিমি। এখানকার জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র। কিন্তু এ বছর অকালবৃষ্টিতে কৃষকেরা আতঙ্কে ভুগছেন।

তানোর-গোদাগাড়ীতে পুকুর খনন, বিলে মাছ চাষের জন্য বাঁধ, ছোট-বড় খাড়িতে (খাল) অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া শিল্পায়নের কারণে পানি নিষ্কাশন ও শস্য উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। বিশেষ করে রিশিকুল, দেওপাড়া ও পাকড়ি ইউনিয়নে কিছু শিল্পকারখানার বর্জ্য দূষিত পানি কৃষিজমিতে পড়ে জমিগুলো অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারি হিসাবে দেখা যায়, গোদাগাড়ী উপজেলায় বিলের সংখ্যা ১৬টি, পুকুর/দিঘীর সংখ্যা ৫,০৩৮টি, খালের সংখ্যা ৫টি। পদ্মা ও মহানন্দা নদী উপজেলার বৃহৎ অংশ জুড়ে প্রবাহিত এবং এর সীমানা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এছাড়া রিশিকুল নদী গোদাগাড়ীর একটি স্থানীয় নদী, যা ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং শিব নদীর অংশ। প্রধান পাঁচটি খাল ছাড়াও আছে অসংখ্য ছোট খাল।

তানোর উপজেলায় পুকুর ৫ হাজার ৩৮৪টি এবং শিব নদী এ উপজেলার একমাত্র নদী। নদীটি নওগাঁ ও রাজশাহী জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। নদীটির দৈর্ঘ্য ৭১ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৭ মিটার এবং প্রকৃতি সর্পিলাকার। এ নদীর সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য ছোট খাল।

অপরিকল্পিত মাছ চাষ, মুরগি-হাঁস-গরু পালনের খামার গড়ে ওঠায় এসব জলাশয় এখন আর সঠিকভাবে কাজ করছে না।

গোদাগাড়ী উপজেলায় নতুন বড় শিল্পকারখানা হিসেবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের একটি ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠছে বিভিন্ন কুটির ও হস্তশিল্প-ম্যাঙ্গো পাল্প, ফুড প্রসেসিং, রেশম, নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প ও বিড়ি শিল্প। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ আমনাতপুরে বরেন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে একটি কারখানা স্থাপন করেছে, যেখানে প্রাথমিকভাবে আম ও মৌসুমী ফল প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ভবিষ্যতে এখানে ফ্রোজেন ফুডস, নুডলসসহ নানা খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

উপজেলার সীমানা ঘেঁষে রয়েছে পবা উপজেলার দামকুড়া। গোদাগাড়ী দিয়ে প্রবাহিত নদী এসে পড়েছে দামকুড়া ইউনিয়নে। এসিআই ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান গোদরেজ ১৫২ কোটি টাকা বিনিয়োগে সেখানে ফিশ ফিড শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। নাহার অটোমোবাইল কারখানা ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে উৎপাদনে এসেছে। নাবিল গ্রুপ গোদাগাড়ীর ঝিকরাপাড়ায় ৪০ একর জমির ওপর কারখানা স্থাপন করেছে। নাবিল গ্রুপের আরেকটি সফল উদ্যোগ ‘নাবা ক্রপ কেয়ার’ উন্নত জাতের বীজ সংগ্রহ ও উৎপাদন করছে এ এলাকায়।

দেখা যাচ্ছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের অপরিকল্পিত বাঁধ ও শিল্পায়নের কারণে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এর ফলে কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা ও খরা দেখা দিচ্ছে। মাছ চাষের উদ্দেশ্যে নির্মিত অপরিকল্পিত বাঁধ নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে ভাটি অঞ্চলে পানিপ্রবাহ কমে যায় বা জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে বহু জমিতে ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে শিল্পকারখানার বর্জ্য ও অপরিকল্পিত স্থাপনা পরিবেশ ও মাটিকে দূষিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষির জন্য বড় হুমকি। বরেন্দ্র এলাকায় অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তার কারণে বহু কৃষিজমি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। এই দুই উপজেলায় অনেক বাঁধ উজানের পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে অঞ্চলে পানির সরবরাহ কমে যায় এবং খরা দেখা দেয়।

গোদাগাড়ীর কিছু এলাকায় শিল্পকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ বিল, খাল ও কৃষিজমিকে দূষিত করছে। এতে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যাবে। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে দ্রুত কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই দুই উপজেলার সামগ্রিক বিষয়টি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ শিল্পায়ন, মাছ চাষ, পুকুর খনন, মাটি সমতলকরণ, বাগানবাড়ি নির্মাণ এবং পশুপাখি পালনের খামার কতটা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলছে-তা যাচাই করা জরুরি।

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]


Warning: Undefined array key "archive" in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1128

Warning: Undefined variable $offsetq in /home/sangbadn/public_html/functions/news.php on line 1133
back to top