মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
বাংলাদেশের বড় শহরে বাস করা মানেই সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। মনে হয়-আজ কি বাস পাওয়া যাবে? আবার কি ভিড়ে ঠেলাঠেলি করতে হবে? নাকি দেরি করে অফিস বা ক্লাসে পৌঁছে বিব্রত হতে হবে? এতদিনে এসব পরিস্থিতি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেলেও সমস্যাগুলো কখনোই সহনীয় হয়ে ওঠে না।
বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানোও যেন আলাদা এক যাত্রা। কেউ কয়েক মিনিট পরই বুঝতে পারেন-এত ভিড় যে বাসে ওঠা প্রায় অসম্ভব। কয়েকটা বাস চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়, কোনওটাই দাঁড়ায় না। আবার দাঁড়ালেও ভেতরে ভিড় দেখে ওঠার সাহস হারিয়ে যায়। কিন্তু কারও কারও কাছে সময়ই সবচেয়ে বড় বিষয়; অফিসে দেরি হলে বসের অসন্তোষ, ক্লাসে দেরি হলে উপস্থিতি কমে যাওয়ার ভয়-সব মিলিয়ে অনেকেই ভিড় ঠেলে উঠে পড়েন।
ট্রাফিক জ্যাম তো এই শহরের চিরচেনা সঙ্গী। পাঁচ মিনিটের পথ চললে কখনো কখনো চল্লিশ মিনিট লেগে যায়।
গরমের দিনে জ্যামে আটকে থাকা যেন আরও কষ্টের-গরম বাস, অস্বস্তিকর ভিড়, দীর্ঘশ্বাস আর হতাশা-সব মিলে এই যাত্রা ক্লান্তিকে দ্বিগুণ করে। তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে প্রশ্ন জাগে-এ জীবন কি সত্যিই জীবনের মতো? প্রতিদিনই কি এমন কষ্ট সয়ে চলতে হবে?
বাসচালকদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ কম নয়। কখনো দ্রুত গতি, কখনো হঠাৎ ব্রেক, কখনো রূঢ় আচরণ-যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। অবশ্য চালকদেরও চাপ আছে-এক ট্রিপ শেষ করে দ্রুত আরেক ট্রিপ ধরতে হবে। কিন্তু এই তাড়াহুড়ো অনেক সময় মানুষকে জীবনঝুঁকিতে ফেলে।
নারী যাত্রীদের দুর্ভোগ আলাদা করেই উল্লেখ করতে হয়। ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তিকর স্পর্শ, বাজে মন্তব্য, নিরাপত্তার অভাব-এসব সহ্য করা অত্যন্ত কঠিন। নারীদের জন্য নির্ধারিত আসন থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তা দখল করে বসে পুরুষ যাত্রীরা। ফলে নারীরা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন, অনেকে ভিড়ের ভয়ে বাসেই উঠতে চান না।
প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ যাত্রীদের অবস্থা আরও কঠিন। অনেক বাসে ওঠার সিঁড়ি এত উঁচু যে তারা উঠতেই পারেন না। ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তো আরও কষ্টকর। তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকার কথা হলেও বাস্তবে তা বিরল।
ছাত্রছাত্রীদের ভোগান্তিও কম নয়। ভোরে ক্লাসে যাওয়ার সময় অনেক বাসচালক ছাত্র দেখে দাঁড়াতেই চান না। এতে অনেকেই ক্লাসের প্রথম ঘণ্টা বা গুরুত্বপূর্ণ লেকচার মিস করেন, মনেও জমে বিরক্তি ও হতাশা।
গণপরিবহনের এই বিশৃঙ্খলা শুধু যাত্রীদের নয়, শহরের পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। জ্যামে আটকে থাকা অসংখ্য গাড়িতে জ্বালানি অপচয় হয়, দূষণ বাড়ে, শব্দদূষণ বাড়তে থাকে। মানুষের সময় নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে যায়-শহর যেন ক্রমেই ভারী ও ধীর হয়ে পড়ে।
তবে সমাধান অসম্ভব নয়। আধুনিক ও পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুললে পরিস্থিতি অনেক বদলাতে পারে। রুটভিত্তিক পর্যাপ্ত বাস চালু করা, সময়মতো বাস ছাড়ার ব্যবস্থা করা, উন্নত মানের নিরাপদ বাস বাড়ানো, ট্রাফিক সিগন্যাল সঠিকভাবে পরিচালনা করা, নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল টিকিট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাস ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা, উন্নত বাসস্ট্যান্ড ও চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ-এসব বাস্তবায়ন করলে পরিবর্তন চোখে পড়বে।
ব্যবস্থা ভালো হলে শুধু যাত্রা নয়, মানুষের মনও ভালো থাকে। সকালে ঝামেলাহীন যাত্রা মানে দিনজুড়ে ভালো মেজাজ, বাড়তি মনোযোগ, কম চাপ, পরিবারের সঙ্গে বেশি সময়। গণপরিবহন শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মাধ্যম নয়-এটা শহরের হৃদস্পন্দন। শহরকে সচল রাখতে চাইলে, মানুষের জীবন সহজ করতে চাইলে, শহরের গতি ফিরিয়ে আনতে চাইলে-গণপরিবহনের উন্নয়নই একমাত্র পথ।
ভালো গণপরিবহন মানে স্বস্তির জীবন-যেখানে প্রতিদিন রাস্তায় বের হওয়াটাও যুদ্ধ মনে হয় না।
আরশী আক্তার সানী
ঢাকা
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের বড় শহরে বাস করা মানেই সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। মনে হয়-আজ কি বাস পাওয়া যাবে? আবার কি ভিড়ে ঠেলাঠেলি করতে হবে? নাকি দেরি করে অফিস বা ক্লাসে পৌঁছে বিব্রত হতে হবে? এতদিনে এসব পরিস্থিতি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেলেও সমস্যাগুলো কখনোই সহনীয় হয়ে ওঠে না।
বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানোও যেন আলাদা এক যাত্রা। কেউ কয়েক মিনিট পরই বুঝতে পারেন-এত ভিড় যে বাসে ওঠা প্রায় অসম্ভব। কয়েকটা বাস চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়, কোনওটাই দাঁড়ায় না। আবার দাঁড়ালেও ভেতরে ভিড় দেখে ওঠার সাহস হারিয়ে যায়। কিন্তু কারও কারও কাছে সময়ই সবচেয়ে বড় বিষয়; অফিসে দেরি হলে বসের অসন্তোষ, ক্লাসে দেরি হলে উপস্থিতি কমে যাওয়ার ভয়-সব মিলিয়ে অনেকেই ভিড় ঠেলে উঠে পড়েন।
ট্রাফিক জ্যাম তো এই শহরের চিরচেনা সঙ্গী। পাঁচ মিনিটের পথ চললে কখনো কখনো চল্লিশ মিনিট লেগে যায়।
গরমের দিনে জ্যামে আটকে থাকা যেন আরও কষ্টের-গরম বাস, অস্বস্তিকর ভিড়, দীর্ঘশ্বাস আর হতাশা-সব মিলে এই যাত্রা ক্লান্তিকে দ্বিগুণ করে। তখন জানালার বাইরে তাকিয়ে প্রশ্ন জাগে-এ জীবন কি সত্যিই জীবনের মতো? প্রতিদিনই কি এমন কষ্ট সয়ে চলতে হবে?
বাসচালকদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ কম নয়। কখনো দ্রুত গতি, কখনো হঠাৎ ব্রেক, কখনো রূঢ় আচরণ-যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। অবশ্য চালকদেরও চাপ আছে-এক ট্রিপ শেষ করে দ্রুত আরেক ট্রিপ ধরতে হবে। কিন্তু এই তাড়াহুড়ো অনেক সময় মানুষকে জীবনঝুঁকিতে ফেলে।
নারী যাত্রীদের দুর্ভোগ আলাদা করেই উল্লেখ করতে হয়। ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তিকর স্পর্শ, বাজে মন্তব্য, নিরাপত্তার অভাব-এসব সহ্য করা অত্যন্ত কঠিন। নারীদের জন্য নির্ধারিত আসন থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তা দখল করে বসে পুরুষ যাত্রীরা। ফলে নারীরা দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হন, অনেকে ভিড়ের ভয়ে বাসেই উঠতে চান না।
প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ যাত্রীদের অবস্থা আরও কঠিন। অনেক বাসে ওঠার সিঁড়ি এত উঁচু যে তারা উঠতেই পারেন না। ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তো আরও কষ্টকর। তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকার কথা হলেও বাস্তবে তা বিরল।
ছাত্রছাত্রীদের ভোগান্তিও কম নয়। ভোরে ক্লাসে যাওয়ার সময় অনেক বাসচালক ছাত্র দেখে দাঁড়াতেই চান না। এতে অনেকেই ক্লাসের প্রথম ঘণ্টা বা গুরুত্বপূর্ণ লেকচার মিস করেন, মনেও জমে বিরক্তি ও হতাশা।
গণপরিবহনের এই বিশৃঙ্খলা শুধু যাত্রীদের নয়, শহরের পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। জ্যামে আটকে থাকা অসংখ্য গাড়িতে জ্বালানি অপচয় হয়, দূষণ বাড়ে, শব্দদূষণ বাড়তে থাকে। মানুষের সময় নষ্ট হয়, উৎপাদনশীলতা কমে যায়-শহর যেন ক্রমেই ভারী ও ধীর হয়ে পড়ে।
তবে সমাধান অসম্ভব নয়। আধুনিক ও পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুললে পরিস্থিতি অনেক বদলাতে পারে। রুটভিত্তিক পর্যাপ্ত বাস চালু করা, সময়মতো বাস ছাড়ার ব্যবস্থা করা, উন্নত মানের নিরাপদ বাস বাড়ানো, ট্রাফিক সিগন্যাল সঠিকভাবে পরিচালনা করা, নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল টিকিট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাস ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা, উন্নত বাসস্ট্যান্ড ও চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ-এসব বাস্তবায়ন করলে পরিবর্তন চোখে পড়বে।
ব্যবস্থা ভালো হলে শুধু যাত্রা নয়, মানুষের মনও ভালো থাকে। সকালে ঝামেলাহীন যাত্রা মানে দিনজুড়ে ভালো মেজাজ, বাড়তি মনোযোগ, কম চাপ, পরিবারের সঙ্গে বেশি সময়। গণপরিবহন শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মাধ্যম নয়-এটা শহরের হৃদস্পন্দন। শহরকে সচল রাখতে চাইলে, মানুষের জীবন সহজ করতে চাইলে, শহরের গতি ফিরিয়ে আনতে চাইলে-গণপরিবহনের উন্নয়নই একমাত্র পথ।
ভালো গণপরিবহন মানে স্বস্তির জীবন-যেখানে প্রতিদিন রাস্তায় বের হওয়াটাও যুদ্ধ মনে হয় না।
আরশী আক্তার সানী
ঢাকা