মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
ঢাকা, কোটি মানুষের প্রাণের শহর। এই শহরের রাস্তাগুলো যেন এক জীবনপ্রবাহ, যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অবিরাম ছুটে চলে মানুষ আর যানবাহন। কিন্তু এই প্রবহমান রাস্তার নিচেই লুকিয়ে আছে এক নীরব বিপদ, যা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে-খোলা ম্যানহোল। ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে খোলা ম্যানহোল যেন একটি মরণফাঁদ, যা কেবল প্রাণহানিই নয়, শহরের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
ঢাকার রাস্তাঘাটে হাঁটাচলা করা এখন এক দুঃসাহসিক অভিযান। একদিকে দ্রুতগতির যানবাহন, অন্যদিকে হুটহাট করে গজিয়ে ওঠা গর্ত আর খানাখন্দ। এরই মাঝে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো খোলা ম্যানহোল। এগুলোর কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নেই; যেকোনো ব্যস্ত সড়কের পাশে, ফুটপাতে, এমনকি মূল রাস্তার মাঝখানেও এগুলো দেখা যায়। প্রায়শই এগুলো কোনো সতর্কীকরণ চিহ্ন ছাড়াই অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। সামান্য বৃষ্টিতে বা জলাবদ্ধতায় এই ম্যানহোলগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কারণ তখন বোঝা মুশকিল হয়ে যায় কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত।
০১৫ সালের নভেম্বরে শিশু জিহাদের ম্যানহোলে পড়ে মৃত্যুর ঘটনাটি হয়তো অনেকের মনে এখনো দগদগে। কিছুদিন আগেও এক মহিলা ম্যানহোলে পরে মারা গেলো। এমন আরও অসংখ্য ঘটনা আছে যা হয়তো গণমাধ্যমের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, রিকশাচালক, এমনকি হেঁটে চলা পথচারীরাও এই মরণফাঁদের শিকার হচ্ছেন। রাতে আলো কম থাকে বলে এই বিপদ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। হঠাৎ করে ম্যানহোলে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কখনো কখনো এই দুর্ঘটনা প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একটি আধুনিক শহরের জন্য এই ধরনের অব্যবস্থাপনা অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই ম্যানহোলগুলো খোলা থাকে? এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে:
চুরি: ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো সাধারণত ভারী লোহার তৈরি হওয়ায় এগুলোর বাজারমূল্য অনেক। কিছু অসাধু চক্র এগুলো চুরি করে বিক্রি করে দেয়। কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি না থাকায় এই চুরি বন্ধ করা সম্ভব হয় না।
অবহেলা ও উদাসীনতা: ওয়াসার মতো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব একটি বড় কারণ। কোনো ম্যানহোল চুরি হয়ে গেলে বা ভেঙে গেলে সেগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপন করার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। বছরের পর বছর ধরে একটি ম্যানহোল অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে, আর এর দায় কেউ নিতে চায় না।
অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ: ঢাকা শহরে প্রায়শই দেখা যায় বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, যেমন গ্যাস, টেলিফোন, বিদ্যুৎ বা ওয়াসা, তাদের কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে। কাজ শেষে তারা ম্যানহোলগুলো সঠিকভাবে বন্ধ করে যায় না বা কোনো অস্থায়ী ঢাকনা দিয়ে দায় সারে। পরে সেই ঢাকনাটি সরে গেলে ম্যানহোল খোলা থেকে যায়।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতা: সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তখন ম্যানহোলগুলোর ঢাকনা সরিয়ে দেওয়া হয় যাতে পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে। এটি একটি ভুল পদ্ধতি, কারণ এতে তাৎক্ষণিক জলাবদ্ধতা কিছুটা কমলেও এটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
ৃআধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: লোহার ঢাকনার বদলে কংক্রিট বা এমন কোনো উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে যা চুরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। একইসাথে, উন্নতমানের ম্যানহোল কভার ব্যবহার করা উচিত যা সহজেই ভেঙে যাবে না।
নিয়মিত তদারকি: সিটি কর্পোরেশন বা ওয়াসাকে নিয়মিতভাবে তাদের আওতাধীন এলাকার ম্যানহোলগুলো পরিদর্শন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচার চালানো যেতে পারে।
কঠোর আইন প্রয়োগ: যারা ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
জনগণের অংশগ্রহণ: জনগণকে এই বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। কোনো ম্যানহোল খোলা দেখতে পেলে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে।
খোলা ম্যানহোল শুধু একটি ছোটখাটো সমস্যা নয়, এটি ঢাকার অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার এক বড় উদাহরণ। এটি এক নীরব মরণফাঁদ, যা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। আমরা চাই না আমাদের প্রিয় শহরের রাস্তাগুলো আরও কোনো শিশুর বা মানুষের মৃত্যুর কারণ হোক। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে ঢাকা শহরের রাস্তাগুলো আবার নিরাপদ হয়ে ওঠে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
রোববার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
ঢাকা, কোটি মানুষের প্রাণের শহর। এই শহরের রাস্তাগুলো যেন এক জীবনপ্রবাহ, যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অবিরাম ছুটে চলে মানুষ আর যানবাহন। কিন্তু এই প্রবহমান রাস্তার নিচেই লুকিয়ে আছে এক নীরব বিপদ, যা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে-খোলা ম্যানহোল। ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে খোলা ম্যানহোল যেন একটি মরণফাঁদ, যা কেবল প্রাণহানিই নয়, শহরের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
ঢাকার রাস্তাঘাটে হাঁটাচলা করা এখন এক দুঃসাহসিক অভিযান। একদিকে দ্রুতগতির যানবাহন, অন্যদিকে হুটহাট করে গজিয়ে ওঠা গর্ত আর খানাখন্দ। এরই মাঝে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো খোলা ম্যানহোল। এগুলোর কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নেই; যেকোনো ব্যস্ত সড়কের পাশে, ফুটপাতে, এমনকি মূল রাস্তার মাঝখানেও এগুলো দেখা যায়। প্রায়শই এগুলো কোনো সতর্কীকরণ চিহ্ন ছাড়াই অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। সামান্য বৃষ্টিতে বা জলাবদ্ধতায় এই ম্যানহোলগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কারণ তখন বোঝা মুশকিল হয়ে যায় কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত।
০১৫ সালের নভেম্বরে শিশু জিহাদের ম্যানহোলে পড়ে মৃত্যুর ঘটনাটি হয়তো অনেকের মনে এখনো দগদগে। কিছুদিন আগেও এক মহিলা ম্যানহোলে পরে মারা গেলো। এমন আরও অসংখ্য ঘটনা আছে যা হয়তো গণমাধ্যমের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, রিকশাচালক, এমনকি হেঁটে চলা পথচারীরাও এই মরণফাঁদের শিকার হচ্ছেন। রাতে আলো কম থাকে বলে এই বিপদ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। হঠাৎ করে ম্যানহোলে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কখনো কখনো এই দুর্ঘটনা প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একটি আধুনিক শহরের জন্য এই ধরনের অব্যবস্থাপনা অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই ম্যানহোলগুলো খোলা থাকে? এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে:
চুরি: ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো সাধারণত ভারী লোহার তৈরি হওয়ায় এগুলোর বাজারমূল্য অনেক। কিছু অসাধু চক্র এগুলো চুরি করে বিক্রি করে দেয়। কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি না থাকায় এই চুরি বন্ধ করা সম্ভব হয় না।
অবহেলা ও উদাসীনতা: ওয়াসার মতো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব একটি বড় কারণ। কোনো ম্যানহোল চুরি হয়ে গেলে বা ভেঙে গেলে সেগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপন করার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। বছরের পর বছর ধরে একটি ম্যানহোল অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে, আর এর দায় কেউ নিতে চায় না।
অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ: ঢাকা শহরে প্রায়শই দেখা যায় বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, যেমন গ্যাস, টেলিফোন, বিদ্যুৎ বা ওয়াসা, তাদের কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে। কাজ শেষে তারা ম্যানহোলগুলো সঠিকভাবে বন্ধ করে যায় না বা কোনো অস্থায়ী ঢাকনা দিয়ে দায় সারে। পরে সেই ঢাকনাটি সরে গেলে ম্যানহোল খোলা থেকে যায়।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থতা: সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তখন ম্যানহোলগুলোর ঢাকনা সরিয়ে দেওয়া হয় যাতে পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে। এটি একটি ভুল পদ্ধতি, কারণ এতে তাৎক্ষণিক জলাবদ্ধতা কিছুটা কমলেও এটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
ৃআধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: লোহার ঢাকনার বদলে কংক্রিট বা এমন কোনো উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে যা চুরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। একইসাথে, উন্নতমানের ম্যানহোল কভার ব্যবহার করা উচিত যা সহজেই ভেঙে যাবে না।
নিয়মিত তদারকি: সিটি কর্পোরেশন বা ওয়াসাকে নিয়মিতভাবে তাদের আওতাধীন এলাকার ম্যানহোলগুলো পরিদর্শন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচার চালানো যেতে পারে।
কঠোর আইন প্রয়োগ: যারা ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
জনগণের অংশগ্রহণ: জনগণকে এই বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। কোনো ম্যানহোল খোলা দেখতে পেলে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে।
খোলা ম্যানহোল শুধু একটি ছোটখাটো সমস্যা নয়, এটি ঢাকার অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার এক বড় উদাহরণ। এটি এক নীরব মরণফাঁদ, যা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। আমরা চাই না আমাদের প্রিয় শহরের রাস্তাগুলো আরও কোনো শিশুর বা মানুষের মৃত্যুর কারণ হোক। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে ঢাকা শহরের রাস্তাগুলো আবার নিরাপদ হয়ে ওঠে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়