alt

মতামত » চিঠিপত্র

ইজি বাইক থেকে খাবারের থালা: সিসার ছায়া আমাদের চারপাশে

: শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন

দূষণের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। এই দেশে দূষণ আজকাল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে বায়ু দূষণের মান অনুযায়ী বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল, যদিও বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবুও এটি নিরাপদ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি ঘনমিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রামের কম অতি ক্ষুদ্র কণিকা (পিএম ২.৫) থাকা উচিত। ২০২২ সালে বাংলাদেশের গড় মান ছিল ৬৫.৮ মাইক্রোগ্রাম, যা বিপজ্জনক। রাজধানী ঢাকার বাতাস আরও দূষিত, যেখানে পিএম ২.৫ এর মান ৭৮ মাইক্রোগ্রাম। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে দুই লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ। দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতাও বিরাজ করছে, যেমন শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, ফুসফুসে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শিশুদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ।

সম্প্রতি সিসা দূষণ নতুনভাবে হুমকি হয়ে উঠেছে। সিসা দূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ বাংলাদেশ গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৩৬ মিলিয়ন শিশুতে উচ্চমাত্রায় সিসার উপস্থিতি রয়েছে। এই সিসা শিশুর বুদ্ধি ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, হৃদরোগ এবং বুদ্ধিবৃদ্ধি পঙ্গুত্বের মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

সিসা দূষণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের উপর। শিশুর আইকিউ লেভেল কমে যাচ্ছে এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। খেলনাতেও সিসার উপস্থিতি রয়েছে। ইডিডিওর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিশুদের ৭০ শতাংশ খেলনায় অতিরিক্ত সিসা রয়েছে।

প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে আমরা প্যাডেল রিকশা থেকে ইজি বাইক ও ব্যাটারি চালিত রিকশাকে পরিবেশবান্ধব ভেবেছিলাম, কিন্তু এদের ব্যাটারিতেও রয়েছে বিষাক্ত সিসা। একটি ইজি বাইকের ব্যাটারিতে থাকা সিসার পরিমাণ একটি গাড়ির স্টার্টার ব্যাটারির চেয়ে ১৫ গুণ বেশি। ব্যাটারির গড় আয়ু ৮ থেকে ১১ মাস, এরপর ফেলে দিতে হয়। বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন সিসা বর্জ্য তৈরি হয়। এর প্রায় ৭০ শতাংশ খোলা ভাটিতে পুনর্ব্যবহার হয়, যেখানে আগুনে পুড়িয়ে নতুন ব্যাটারি তৈরি করা হয়, কোন নিয়ন্ত্রণ বা সুরক্ষা ছাড়া। ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে সিসা, মাটিতে ও পানিতে মিশে যাচ্ছে খাবারে, গর্ভবতী মায়েদের শরীরে পৌঁছে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মের কারণ হচ্ছে। গ্রামীণ চর এলাকাতেও রাতে ব্যাটারি পোড়ানো হয়, যার কালো ধোঁয়া মানুষ ও পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর।

সিসা দূষণ শুধু খেলনা বা ব্যাটারিতে সীমাবদ্ধ নয়, রান্নার থালা-বাসন, দেয়ালের রং, পুরনো পানির পাইপ এমনকি কাচের পণ্যেও আছে। আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা ৬৭ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণের বেশি। ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা পাওয়া গেছে। শুধু মানবদেহে নয়, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও ক্ষতি হচ্ছে; বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সিসা দূষণের কারণে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।

সিসা আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেওয়ার আগে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব্যাটারি পোড়ানোর সময় সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে, শিশুদের খেলনায় সিসা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, এবং সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ কমানোয় সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পেছনে আমরা দায়ী, তাই পদক্ষেপও ব্যক্তির দিক থেকে রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে আসা উচিত। বুদ্ধিহীন প্রজন্ম থেকে বাঁচাতে সবার সচেতন উদ্যোগ অপরিহার্য।

জেবিন আক্তার পিয়া

রাজনীতি হোক মানুষের জন্য, মানুষ নিয়ে নয়

দূরদর্শী সিদ্ধান্তে রক্ষা পেতে পারে শিক্ষাব্যবস্থা

সামাজিক আন্দোলন: প্রতিবাদ নাকি ট্রেন্ড?

নগর সভ্যতায় নিঃসঙ্গতার মহামারি

আবাসন সংকট

নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হোক কর্মসংস্থান

জেন্ডার-নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার দরকার

নারী-পুরুষ বৈষম্য:সমাজে লুকানো চ্যালেঞ্জ

শিক্ষক নিয়োগে প্রশ্নফাঁস

রাজনীতিতে সুবিধাবাদীদের দূরীকরণ এবং সঠিক সঙ্গী নির্বাচনের দাবি

ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহে জনভোগান্তি

ভাষার মাসে বাংলা চর্চার অঙ্গীকার

মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য-সচেতনতা হোক দায়িত্ব

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিঃসঙ্গ জীবন

একটা মোড়ের কত নাম

শহরের পানিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি

র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট ও জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ

রেলপথ কি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে?

বাস্তবতার এক গল্প

কীর্তনখোলার আর্তনাদ

ভ্যাট-কর ও সাধারণ মানুষ

অযৌক্তিক ‘হ্যাঁ’ বনাম আত্মমর্যাদার ‘না’

নদীভাঙন ও গ্রামীণ উদ্বাস্তু জীবনের গল্প

চারদিকে যুদ্ধের দামামা ভবিষ্যৎ শিশুদের জন্য কি পৃথিবী নিরাপদ

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ

শহরে বৃক্ষনিধন : এক শ্বাসরুদ্ধকর ভবিষ্যৎ

জলবায়ু পরিবর্তন: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভয়াবহ প্রভাব

ই-ফাইলিং কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা

মূল্যস্ফীতি ও মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের লড়াই

টেন্ডার দুর্নীতি ও করণীয়

জমির দলিলে ঘুষের অমানবিক চক্র

পরিত্যক্ত সরকারি গোডাউন

অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা রোধে কঠোর উদ্যোগ জরুরি

জামিন নিয়ে পলাতক থাকা মানেই ‘খুনি’ নয়

প্রাথমিক শিক্ষায় অবহেলার ধারা: তাড়াইলের বিদ্যালয়গুলোর চিত্র

সাগরভিত্তিক কৃষি: উপকূলীয় মানুষের অংশগ্রহণেই টেকসই সম্ভাবনা

tab

মতামত » চিঠিপত্র

ইজি বাইক থেকে খাবারের থালা: সিসার ছায়া আমাদের চারপাশে

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন

শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬

দূষণের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। এই দেশে দূষণ আজকাল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে বায়ু দূষণের মান অনুযায়ী বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল, যদিও বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবুও এটি নিরাপদ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি ঘনমিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রামের কম অতি ক্ষুদ্র কণিকা (পিএম ২.৫) থাকা উচিত। ২০২২ সালে বাংলাদেশের গড় মান ছিল ৬৫.৮ মাইক্রোগ্রাম, যা বিপজ্জনক। রাজধানী ঢাকার বাতাস আরও দূষিত, যেখানে পিএম ২.৫ এর মান ৭৮ মাইক্রোগ্রাম। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে দুই লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ। দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতাও বিরাজ করছে, যেমন শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, ফুসফুসে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শিশুদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ।

সম্প্রতি সিসা দূষণ নতুনভাবে হুমকি হয়ে উঠেছে। সিসা দূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ বাংলাদেশ গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৩৬ মিলিয়ন শিশুতে উচ্চমাত্রায় সিসার উপস্থিতি রয়েছে। এই সিসা শিশুর বুদ্ধি ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, হৃদরোগ এবং বুদ্ধিবৃদ্ধি পঙ্গুত্বের মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

সিসা দূষণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের উপর। শিশুর আইকিউ লেভেল কমে যাচ্ছে এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। খেলনাতেও সিসার উপস্থিতি রয়েছে। ইডিডিওর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিশুদের ৭০ শতাংশ খেলনায় অতিরিক্ত সিসা রয়েছে।

প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে আমরা প্যাডেল রিকশা থেকে ইজি বাইক ও ব্যাটারি চালিত রিকশাকে পরিবেশবান্ধব ভেবেছিলাম, কিন্তু এদের ব্যাটারিতেও রয়েছে বিষাক্ত সিসা। একটি ইজি বাইকের ব্যাটারিতে থাকা সিসার পরিমাণ একটি গাড়ির স্টার্টার ব্যাটারির চেয়ে ১৫ গুণ বেশি। ব্যাটারির গড় আয়ু ৮ থেকে ১১ মাস, এরপর ফেলে দিতে হয়। বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন সিসা বর্জ্য তৈরি হয়। এর প্রায় ৭০ শতাংশ খোলা ভাটিতে পুনর্ব্যবহার হয়, যেখানে আগুনে পুড়িয়ে নতুন ব্যাটারি তৈরি করা হয়, কোন নিয়ন্ত্রণ বা সুরক্ষা ছাড়া। ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে সিসা, মাটিতে ও পানিতে মিশে যাচ্ছে খাবারে, গর্ভবতী মায়েদের শরীরে পৌঁছে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মের কারণ হচ্ছে। গ্রামীণ চর এলাকাতেও রাতে ব্যাটারি পোড়ানো হয়, যার কালো ধোঁয়া মানুষ ও পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর।

সিসা দূষণ শুধু খেলনা বা ব্যাটারিতে সীমাবদ্ধ নয়, রান্নার থালা-বাসন, দেয়ালের রং, পুরনো পানির পাইপ এমনকি কাচের পণ্যেও আছে। আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা ৬৭ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণের বেশি। ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা পাওয়া গেছে। শুধু মানবদেহে নয়, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও ক্ষতি হচ্ছে; বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সিসা দূষণের কারণে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।

সিসা আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেওয়ার আগে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব্যাটারি পোড়ানোর সময় সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে, শিশুদের খেলনায় সিসা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, এবং সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ কমানোয় সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পেছনে আমরা দায়ী, তাই পদক্ষেপও ব্যক্তির দিক থেকে রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে আসা উচিত। বুদ্ধিহীন প্রজন্ম থেকে বাঁচাতে সবার সচেতন উদ্যোগ অপরিহার্য।

জেবিন আক্তার পিয়া

back to top