মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
দূষণের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। এই দেশে দূষণ আজকাল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে বায়ু দূষণের মান অনুযায়ী বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল, যদিও বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবুও এটি নিরাপদ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি ঘনমিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রামের কম অতি ক্ষুদ্র কণিকা (পিএম ২.৫) থাকা উচিত। ২০২২ সালে বাংলাদেশের গড় মান ছিল ৬৫.৮ মাইক্রোগ্রাম, যা বিপজ্জনক। রাজধানী ঢাকার বাতাস আরও দূষিত, যেখানে পিএম ২.৫ এর মান ৭৮ মাইক্রোগ্রাম। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে দুই লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ। দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতাও বিরাজ করছে, যেমন শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, ফুসফুসে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শিশুদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ।
সম্প্রতি সিসা দূষণ নতুনভাবে হুমকি হয়ে উঠেছে। সিসা দূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ বাংলাদেশ গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৩৬ মিলিয়ন শিশুতে উচ্চমাত্রায় সিসার উপস্থিতি রয়েছে। এই সিসা শিশুর বুদ্ধি ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, হৃদরোগ এবং বুদ্ধিবৃদ্ধি পঙ্গুত্বের মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
সিসা দূষণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের উপর। শিশুর আইকিউ লেভেল কমে যাচ্ছে এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। খেলনাতেও সিসার উপস্থিতি রয়েছে। ইডিডিওর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিশুদের ৭০ শতাংশ খেলনায় অতিরিক্ত সিসা রয়েছে।
প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে আমরা প্যাডেল রিকশা থেকে ইজি বাইক ও ব্যাটারি চালিত রিকশাকে পরিবেশবান্ধব ভেবেছিলাম, কিন্তু এদের ব্যাটারিতেও রয়েছে বিষাক্ত সিসা। একটি ইজি বাইকের ব্যাটারিতে থাকা সিসার পরিমাণ একটি গাড়ির স্টার্টার ব্যাটারির চেয়ে ১৫ গুণ বেশি। ব্যাটারির গড় আয়ু ৮ থেকে ১১ মাস, এরপর ফেলে দিতে হয়। বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন সিসা বর্জ্য তৈরি হয়। এর প্রায় ৭০ শতাংশ খোলা ভাটিতে পুনর্ব্যবহার হয়, যেখানে আগুনে পুড়িয়ে নতুন ব্যাটারি তৈরি করা হয়, কোন নিয়ন্ত্রণ বা সুরক্ষা ছাড়া। ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে সিসা, মাটিতে ও পানিতে মিশে যাচ্ছে খাবারে, গর্ভবতী মায়েদের শরীরে পৌঁছে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মের কারণ হচ্ছে। গ্রামীণ চর এলাকাতেও রাতে ব্যাটারি পোড়ানো হয়, যার কালো ধোঁয়া মানুষ ও পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর।
সিসা দূষণ শুধু খেলনা বা ব্যাটারিতে সীমাবদ্ধ নয়, রান্নার থালা-বাসন, দেয়ালের রং, পুরনো পানির পাইপ এমনকি কাচের পণ্যেও আছে। আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা ৬৭ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণের বেশি। ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা পাওয়া গেছে। শুধু মানবদেহে নয়, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও ক্ষতি হচ্ছে; বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সিসা দূষণের কারণে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।
সিসা আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেওয়ার আগে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব্যাটারি পোড়ানোর সময় সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে, শিশুদের খেলনায় সিসা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, এবং সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ কমানোয় সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পেছনে আমরা দায়ী, তাই পদক্ষেপও ব্যক্তির দিক থেকে রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে আসা উচিত। বুদ্ধিহীন প্রজন্ম থেকে বাঁচাতে সবার সচেতন উদ্যোগ অপরিহার্য।
জেবিন আক্তার পিয়া
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
শনিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২৬
দূষণের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। এই দেশে দূষণ আজকাল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে বায়ু দূষণের মান অনুযায়ী বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল, যদিও বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবুও এটি নিরাপদ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি ঘনমিটারে পাঁচ মাইক্রোগ্রামের কম অতি ক্ষুদ্র কণিকা (পিএম ২.৫) থাকা উচিত। ২০২২ সালে বাংলাদেশের গড় মান ছিল ৬৫.৮ মাইক্রোগ্রাম, যা বিপজ্জনক। রাজধানী ঢাকার বাতাস আরও দূষিত, যেখানে পিএম ২.৫ এর মান ৭৮ মাইক্রোগ্রাম। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে দুই লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ। দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতাও বিরাজ করছে, যেমন শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, ফুসফুসে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শিশুদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ।
সম্প্রতি সিসা দূষণ নতুনভাবে হুমকি হয়ে উঠেছে। সিসা দূষণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছে। ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ বাংলাদেশ গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৩৬ মিলিয়ন শিশুতে উচ্চমাত্রায় সিসার উপস্থিতি রয়েছে। এই সিসা শিশুর বুদ্ধি ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, হৃদরোগ এবং বুদ্ধিবৃদ্ধি পঙ্গুত্বের মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
সিসা দূষণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশুদের উপর। শিশুর আইকিউ লেভেল কমে যাচ্ছে এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। খেলনাতেও সিসার উপস্থিতি রয়েছে। ইডিডিওর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের শিশুদের ৭০ শতাংশ খেলনায় অতিরিক্ত সিসা রয়েছে।
প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে আমরা প্যাডেল রিকশা থেকে ইজি বাইক ও ব্যাটারি চালিত রিকশাকে পরিবেশবান্ধব ভেবেছিলাম, কিন্তু এদের ব্যাটারিতেও রয়েছে বিষাক্ত সিসা। একটি ইজি বাইকের ব্যাটারিতে থাকা সিসার পরিমাণ একটি গাড়ির স্টার্টার ব্যাটারির চেয়ে ১৫ গুণ বেশি। ব্যাটারির গড় আয়ু ৮ থেকে ১১ মাস, এরপর ফেলে দিতে হয়। বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন সিসা বর্জ্য তৈরি হয়। এর প্রায় ৭০ শতাংশ খোলা ভাটিতে পুনর্ব্যবহার হয়, যেখানে আগুনে পুড়িয়ে নতুন ব্যাটারি তৈরি করা হয়, কোন নিয়ন্ত্রণ বা সুরক্ষা ছাড়া। ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে সিসা, মাটিতে ও পানিতে মিশে যাচ্ছে খাবারে, গর্ভবতী মায়েদের শরীরে পৌঁছে বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মের কারণ হচ্ছে। গ্রামীণ চর এলাকাতেও রাতে ব্যাটারি পোড়ানো হয়, যার কালো ধোঁয়া মানুষ ও পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর।
সিসা দূষণ শুধু খেলনা বা ব্যাটারিতে সীমাবদ্ধ নয়, রান্নার থালা-বাসন, দেয়ালের রং, পুরনো পানির পাইপ এমনকি কাচের পণ্যেও আছে। আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা ৬৭ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণের বেশি। ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা পাওয়া গেছে। শুধু মানবদেহে নয়, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও ক্ষতি হচ্ছে; বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সিসা দূষণের কারণে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।
সিসা আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেওয়ার আগে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব্যাটারি পোড়ানোর সময় সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে, শিশুদের খেলনায় সিসা ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, এবং সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ কমানোয় সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পেছনে আমরা দায়ী, তাই পদক্ষেপও ব্যক্তির দিক থেকে রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে আসা উচিত। বুদ্ধিহীন প্রজন্ম থেকে বাঁচাতে সবার সচেতন উদ্যোগ অপরিহার্য।
জেবিন আক্তার পিয়া