মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
বাংলাদেশে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর প্রায় ১৫-২০ শতাংশ খাদ্যপণ্য ফসলের পরিমাণ অনুযায়ী নষ্ট হয়। জেলা–উপজেলা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই পেঁয়াজ, আলু, টমেটো, ধান ইত্যাদি নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে কোটি কোটি টাকা কৃষকের কাছ থেকে চলে যায়, বাজারে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহও ব্যাহত হয়। তাছাড়া, বর্ষা বা শীতকালীন বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবনযাত্রা, এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলে এই অবহেলিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ কৃষক তাদের উৎপাদিত শস্যের সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা তাপমাত্রা–নিয়ন্ত্রিত গোডাউনের অভাবে ফসল শুকিয়ে, পচে বা পোড়া অবস্থায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়। বেশিরভাগ কৃষকের ঘরে সঠিক পরিমাণে চিলিং বা শীতলীকরণ সুবিধা নেই। গ্রামাঞ্চলে প্রায়শই দেখা যায়, শস্যকে ঢাকার জন্য ভাঙা গাছা পুরোনো থলিতে রাখা হয়, যা ম্লান হওয়া বা সেচের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। বিপরীতভাবে, বড় শহরে খাদ্যপণ্য সরবরাহের চেইনে সঠিক সংরক্ষণ না থাকায় বাজারে পণ্য প্রায়ই ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।
কেন এই সংকট আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ঠিকমত অন্তর্ভুক্ত হয় না, তা নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে। একদিকে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে, বীজ, সার, এবং যন্ত্রপাতি প্রদানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদিত ফসলের সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, শীতলীকরণ, এবং স্থানীয় বাজারে নিরাপদ পরিবহনের মতো মৌলিক দিকগুলো প্রায়ই অবহেলিত থাকে। এর ফলে উৎপাদন যতই বাড়–ক না কেন, ক্ষতির পরিমাণও সমানভাবে বাড়ে। সমীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, সংরক্ষণ ও পরিবহনের উন্নতি না হলে কৃষির পুরো উন্নয়ন পরিকল্পনা বৃথা।
সংরক্ষণ সংকটের মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো অবকাঠামোর অভাব। দেশের বহু অঞ্চলে আধুনিক গোডাউন নেই। যেখানে আছে, সেখানে জমি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ও কীটনাশক ব্যবস্থার সমস্যা দেখা দেয়। অর্থনৈতিক কারণে ছোট কৃষক এই সুবিধাগুলো ব্যবহার করতে পারেন না। এছাড়া, শিক্ষার অভাবও এক বড় বাধা। অনেক কৃষক জানেন না, শস্য সংরক্ষণে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বাতাসের সঠিক নিয়ন্ত্রণ কতটা জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতার অভাবও সমস্যা বাড়ায়।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণের আরও একটি বড় সমস্যা হলো বাজারের চাপ। বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পৌঁছানোর জন্য দ্রুত বিক্রির প্রয়োজন থাকে। তাড়াহুড়োতে কৃষক তাদের ফসল বিক্রি করেন, যা সঠিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। দূরবর্তী বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সময় পরিবহনের মান অপর্যাপ্ত থাকায় ফসল নষ্ট হয়। ফলে, উৎপাদনের পরেও অর্থনৈতিক ক্ষতি অপরিহার্য হয়।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণের এই সংকট শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। যদি উৎপাদিত খাদ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষিত না হয়, তা দেশের মানুষের জন্য চাহিদা অনুযায়ী পৌঁছাতে পারবে না। সরকার ও নীতি নির্ধারকদের উচিত, উন্নয়ন পরিকল্পনায় সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। শুধু উৎপাদনের দিকে নজর দিলে সমস্যার সমাধান অসম্পূর্ণ থাকে।
মানুষের জীবন ও দেশের অর্থনীতির জন্য খাদ্য নিরাপত্তা অপরিহার্য। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের দিকে যথাযথ নজর দিলে, কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। কৃষক উৎপাদন বাড়ালেও যদি ফসল নষ্ট হয়, তবে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। আমাদের উচিত, উৎপাদনের সঙ্গে সংরক্ষণের সমন্বয় তৈরি করা, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো বৃদ্ধি করা এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। এতে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে না, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
বাংলার ধানের মাঠ, আলুর কচি খুঁটি, পেঁয়াজের সোনালি বেল, এসব যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তবে দেশের কৃষি উন্নয়ন হবে স্থায়ী ও কার্যকর। শুধু উৎপাদনের স্বপ্ন নয়, তার ফল যথাযথভাবে মানুষের ভোজের মেঝে পর্যন্ত পৌঁছানো এটাই প্রকৃত উন্নয়নের প্রতীক। কৃষিপণ্য সংরক্ষণে অবহেলা ত্যাগ না করলে উন্নয়ন পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হওয়া সম্ভব নয়। তাই সময় এসেছে, সংরক্ষণের সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার। বাংলার কৃষকের ঘরে লাল-সবুজ শস্যের সঙ্গে যুক্ত হোক সোনালি নিরাপত্তা, যাতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়।
রিশাদ আহমেদ
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬
বাংলাদেশে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর প্রায় ১৫-২০ শতাংশ খাদ্যপণ্য ফসলের পরিমাণ অনুযায়ী নষ্ট হয়। জেলা–উপজেলা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই পেঁয়াজ, আলু, টমেটো, ধান ইত্যাদি নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে কোটি কোটি টাকা কৃষকের কাছ থেকে চলে যায়, বাজারে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহও ব্যাহত হয়। তাছাড়া, বর্ষা বা শীতকালীন বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবনযাত্রা, এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলে এই অবহেলিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ কৃষক তাদের উৎপাদিত শস্যের সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা তাপমাত্রা–নিয়ন্ত্রিত গোডাউনের অভাবে ফসল শুকিয়ে, পচে বা পোড়া অবস্থায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়। বেশিরভাগ কৃষকের ঘরে সঠিক পরিমাণে চিলিং বা শীতলীকরণ সুবিধা নেই। গ্রামাঞ্চলে প্রায়শই দেখা যায়, শস্যকে ঢাকার জন্য ভাঙা গাছা পুরোনো থলিতে রাখা হয়, যা ম্লান হওয়া বা সেচের কারণে নষ্ট হয়ে যায়। বিপরীতভাবে, বড় শহরে খাদ্যপণ্য সরবরাহের চেইনে সঠিক সংরক্ষণ না থাকায় বাজারে পণ্য প্রায়ই ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়।
কেন এই সংকট আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ঠিকমত অন্তর্ভুক্ত হয় না, তা নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে। একদিকে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে, বীজ, সার, এবং যন্ত্রপাতি প্রদানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদিত ফসলের সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, শীতলীকরণ, এবং স্থানীয় বাজারে নিরাপদ পরিবহনের মতো মৌলিক দিকগুলো প্রায়ই অবহেলিত থাকে। এর ফলে উৎপাদন যতই বাড়–ক না কেন, ক্ষতির পরিমাণও সমানভাবে বাড়ে। সমীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, সংরক্ষণ ও পরিবহনের উন্নতি না হলে কৃষির পুরো উন্নয়ন পরিকল্পনা বৃথা।
সংরক্ষণ সংকটের মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো অবকাঠামোর অভাব। দেশের বহু অঞ্চলে আধুনিক গোডাউন নেই। যেখানে আছে, সেখানে জমি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ও কীটনাশক ব্যবস্থার সমস্যা দেখা দেয়। অর্থনৈতিক কারণে ছোট কৃষক এই সুবিধাগুলো ব্যবহার করতে পারেন না। এছাড়া, শিক্ষার অভাবও এক বড় বাধা। অনেক কৃষক জানেন না, শস্য সংরক্ষণে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং বাতাসের সঠিক নিয়ন্ত্রণ কতটা জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতার অভাবও সমস্যা বাড়ায়।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণের আরও একটি বড় সমস্যা হলো বাজারের চাপ। বাজারে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পৌঁছানোর জন্য দ্রুত বিক্রির প্রয়োজন থাকে। তাড়াহুড়োতে কৃষক তাদের ফসল বিক্রি করেন, যা সঠিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। দূরবর্তী বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সময় পরিবহনের মান অপর্যাপ্ত থাকায় ফসল নষ্ট হয়। ফলে, উৎপাদনের পরেও অর্থনৈতিক ক্ষতি অপরিহার্য হয়।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণের এই সংকট শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। যদি উৎপাদিত খাদ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষিত না হয়, তা দেশের মানুষের জন্য চাহিদা অনুযায়ী পৌঁছাতে পারবে না। সরকার ও নীতি নির্ধারকদের উচিত, উন্নয়ন পরিকল্পনায় সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। শুধু উৎপাদনের দিকে নজর দিলে সমস্যার সমাধান অসম্পূর্ণ থাকে।
মানুষের জীবন ও দেশের অর্থনীতির জন্য খাদ্য নিরাপত্তা অপরিহার্য। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের দিকে যথাযথ নজর দিলে, কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। কৃষক উৎপাদন বাড়ালেও যদি ফসল নষ্ট হয়, তবে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। আমাদের উচিত, উৎপাদনের সঙ্গে সংরক্ষণের সমন্বয় তৈরি করা, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো বৃদ্ধি করা এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। এতে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে না, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
বাংলার ধানের মাঠ, আলুর কচি খুঁটি, পেঁয়াজের সোনালি বেল, এসব যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তবে দেশের কৃষি উন্নয়ন হবে স্থায়ী ও কার্যকর। শুধু উৎপাদনের স্বপ্ন নয়, তার ফল যথাযথভাবে মানুষের ভোজের মেঝে পর্যন্ত পৌঁছানো এটাই প্রকৃত উন্নয়নের প্রতীক। কৃষিপণ্য সংরক্ষণে অবহেলা ত্যাগ না করলে উন্নয়ন পরিকল্পনা পুরোপুরি সফল হওয়া সম্ভব নয়। তাই সময় এসেছে, সংরক্ষণের সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার। বাংলার কৃষকের ঘরে লাল-সবুজ শস্যের সঙ্গে যুক্ত হোক সোনালি নিরাপত্তা, যাতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়।
রিশাদ আহমেদ
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়