মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
খবরটি ছড়ালেই যেন আকাশে আতশবাজি ফুটল ‘অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে। খবরের শিরোনাম পড়েই একদল পুরুষের মুখে এমন হাসি ফুটল, যেন বহুদিনের বকেয়া বেতন একসঙ্গে হাতে এসেছে। চা-দোকান, অফিসের করিডোর, ফেইসবুকের কমেন্ট বক্স সবখানেই একটাই আলোচনার ঢেউ। কেউ বলছে, “দেখেছো, অবশেষে স্বাধীনতা!” কেউ আবার গর্বের সঙ্গে ঘোষণা দিচ্ছে, “এটাই প্রকৃত পুরুষত্বের স্বীকৃতি।” কিন্তু এই আনন্দোৎসবের মাঝখানে হঠাৎ প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায়-স্ত্রীজাতির কী হলো?
এই খবরে তাদের কপালে কি একফোঁটা হাসিও জুটল? নাকি তারা আবারও নীরব দর্শক হয়ে রইল পুরুষ আনন্দের মঞ্চে?
আইন যখন বলে, “অনুমতি লাগবে না”, তখন সেটি কেবল কাগজে লেখা একটি বাক্য নয়-এটি সমাজকে একটি বার্তা দেয়। সেই বার্তাটি কী? বার্তাটি যেন এমন “পুরুষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, নারীর অনুভূতি পরিশিষ্ট।”
প্রথম বিয়েতে স্ত্রী ছিলেন ভালোবাসার প্রতীক, দ্বিতীয় বিয়েতে তিনি হয়ে গেলেন এক ধরনের আইনি জটিলতা-যার অনুমতি নিলে ঝামেলা, না নিলে সুবিধা।
এই সুবিধার তালিকায় কোথাও কি স্ত্রীর সম্মান, নিরাপত্তা, মানসিক স্থিতি বা আত্মমর্যাদার কথা লেখা আছে? দুঃখজনক হলেও সত্য-তালিকাটি সেখানে এসে হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়।
পুরুষ সমাজ আনন্দে আত্মহারা-এ যেন নতুন করে শ্বাস নেয়ার লাইসেন্স। কিন্তু স্ত্রীজাতির আনন্দ কোথায়? একজন স্ত্রী যখন এই খবর শোনেন, তার মাথায় কি কোনো উৎসবের ঢোল বাজে? নাকি প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে ভিড় করে -আমি কি যথেষ্ট নই? আমার মতামতের কি কোনো মূল্য নেই? আমার জীবনের নিরাপত্তা কি এখন আরও অনিশ্চিত? রম্য হলেও বাস্তব বড়ই কঠিন একজন পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করলে সমাজ তাকে বলে, “পুরুষ তো!” আর একজন নারী প্রশ্ন তুললে সমাজ তাকে বলে, “সহ্য করতে শিখো।” আইন যদি বলে পুরুষ অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে তাহলে প্রশ্ন ওঠে, নারী কি পারবে? এই প্রশ্নটি তুললেই সমাজ যেন হঠাৎ রেগে যায়। “এটা কী বলছো!” “নারীর আবার দ্বিতীয় বিয়ে!” “সংসার ভাঙবে!” অদ্ভুত না?
সংসার ভাঙে তখনই, যখন নারী কিছু বলে। কিন্তু পুরুষ নীরবে দ্বিতীয় সংসার গড়লে সেটি হয়ে যায় সমাধান। এই আইন অনুযায়ী সংসার যেন এক ধরনের পরীক্ষাগার। প্রথম স্ত্রী প্রথম সংস্করণ দ্বিতীয় স্ত্রী আপডেটেড ভার্সন। যদি প্রথম সংস্করণে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে আপডেট নামাও। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই আপডেটে কি প্রথম সংস্করণের অনুভূতিগুলো ডিলিট হয়ে যায়? নাকি সেগুলো এমনিতেই গুরুত্বহীন বলে ধরে নেয়া হয়? ন্যায়বিচার মানে কি শুধু পুরুষের সুবিধা নিশ্চিত করা? নারীর জীবনে যে মানসিক নিরাপত্তা, সম্মান, অংশীদারিত্ব এসব কি ন্যায়বিচারের আওতায় পড়ে না?
একজন স্ত্রী শুধু রান্নাঘরের দায়িত্বশীল নন, তিনি একজন মানুষ-নিজস্ব স্বপ্ন, ভয়, আত্মসম্মান নিয়ে। কিন্তু এই আইনি আনন্দের গল্পে তিনি যেন একটি অদৃশ্য চরিত্র-যার অনুভূতির সাবটাইটেলও নেই। রম্যরচনার নিয়ম অনুযায়ী হাসতে হয়।
আমরাও হাসলাম- পুরুষ সমাজের উল্লাসে, আইনের ভাষার চাতুর্যে, সমাজের দ্বিচারিতায়। কিন্তু এই হাসির আড়ালে যে কান্না লুকানো থাকে সেটা শোনার মতো কান কজনের আছে? যে সমাজ পুরুষের আনন্দে উৎসব করে আর নারীর কষ্টে নীরব থাকে- সে সমাজে আইন বদলালেও ন্যায়বিচার এখনো অনেক দূরে। অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করা গেলে
পুরুষের স্বাধীনতা বাড়তে পারে, কিন্তু নারীর নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায্যতা সেখানে প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়। আর যেখানে প্রশ্ন থেকেই যায়-সেখানে আনন্দের খবর রম্য হয়ে উঠলেও ন্যায়বিচার হয়ে ওঠে না।
মেশকাতুন নাহার
প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর।
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
খবরটি ছড়ালেই যেন আকাশে আতশবাজি ফুটল ‘অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে। খবরের শিরোনাম পড়েই একদল পুরুষের মুখে এমন হাসি ফুটল, যেন বহুদিনের বকেয়া বেতন একসঙ্গে হাতে এসেছে। চা-দোকান, অফিসের করিডোর, ফেইসবুকের কমেন্ট বক্স সবখানেই একটাই আলোচনার ঢেউ। কেউ বলছে, “দেখেছো, অবশেষে স্বাধীনতা!” কেউ আবার গর্বের সঙ্গে ঘোষণা দিচ্ছে, “এটাই প্রকৃত পুরুষত্বের স্বীকৃতি।” কিন্তু এই আনন্দোৎসবের মাঝখানে হঠাৎ প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায়-স্ত্রীজাতির কী হলো?
এই খবরে তাদের কপালে কি একফোঁটা হাসিও জুটল? নাকি তারা আবারও নীরব দর্শক হয়ে রইল পুরুষ আনন্দের মঞ্চে?
আইন যখন বলে, “অনুমতি লাগবে না”, তখন সেটি কেবল কাগজে লেখা একটি বাক্য নয়-এটি সমাজকে একটি বার্তা দেয়। সেই বার্তাটি কী? বার্তাটি যেন এমন “পুরুষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, নারীর অনুভূতি পরিশিষ্ট।”
প্রথম বিয়েতে স্ত্রী ছিলেন ভালোবাসার প্রতীক, দ্বিতীয় বিয়েতে তিনি হয়ে গেলেন এক ধরনের আইনি জটিলতা-যার অনুমতি নিলে ঝামেলা, না নিলে সুবিধা।
এই সুবিধার তালিকায় কোথাও কি স্ত্রীর সম্মান, নিরাপত্তা, মানসিক স্থিতি বা আত্মমর্যাদার কথা লেখা আছে? দুঃখজনক হলেও সত্য-তালিকাটি সেখানে এসে হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়।
পুরুষ সমাজ আনন্দে আত্মহারা-এ যেন নতুন করে শ্বাস নেয়ার লাইসেন্স। কিন্তু স্ত্রীজাতির আনন্দ কোথায়? একজন স্ত্রী যখন এই খবর শোনেন, তার মাথায় কি কোনো উৎসবের ঢোল বাজে? নাকি প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে ভিড় করে -আমি কি যথেষ্ট নই? আমার মতামতের কি কোনো মূল্য নেই? আমার জীবনের নিরাপত্তা কি এখন আরও অনিশ্চিত? রম্য হলেও বাস্তব বড়ই কঠিন একজন পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করলে সমাজ তাকে বলে, “পুরুষ তো!” আর একজন নারী প্রশ্ন তুললে সমাজ তাকে বলে, “সহ্য করতে শিখো।” আইন যদি বলে পুরুষ অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে তাহলে প্রশ্ন ওঠে, নারী কি পারবে? এই প্রশ্নটি তুললেই সমাজ যেন হঠাৎ রেগে যায়। “এটা কী বলছো!” “নারীর আবার দ্বিতীয় বিয়ে!” “সংসার ভাঙবে!” অদ্ভুত না?
সংসার ভাঙে তখনই, যখন নারী কিছু বলে। কিন্তু পুরুষ নীরবে দ্বিতীয় সংসার গড়লে সেটি হয়ে যায় সমাধান। এই আইন অনুযায়ী সংসার যেন এক ধরনের পরীক্ষাগার। প্রথম স্ত্রী প্রথম সংস্করণ দ্বিতীয় স্ত্রী আপডেটেড ভার্সন। যদি প্রথম সংস্করণে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে আপডেট নামাও। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই আপডেটে কি প্রথম সংস্করণের অনুভূতিগুলো ডিলিট হয়ে যায়? নাকি সেগুলো এমনিতেই গুরুত্বহীন বলে ধরে নেয়া হয়? ন্যায়বিচার মানে কি শুধু পুরুষের সুবিধা নিশ্চিত করা? নারীর জীবনে যে মানসিক নিরাপত্তা, সম্মান, অংশীদারিত্ব এসব কি ন্যায়বিচারের আওতায় পড়ে না?
একজন স্ত্রী শুধু রান্নাঘরের দায়িত্বশীল নন, তিনি একজন মানুষ-নিজস্ব স্বপ্ন, ভয়, আত্মসম্মান নিয়ে। কিন্তু এই আইনি আনন্দের গল্পে তিনি যেন একটি অদৃশ্য চরিত্র-যার অনুভূতির সাবটাইটেলও নেই। রম্যরচনার নিয়ম অনুযায়ী হাসতে হয়।
আমরাও হাসলাম- পুরুষ সমাজের উল্লাসে, আইনের ভাষার চাতুর্যে, সমাজের দ্বিচারিতায়। কিন্তু এই হাসির আড়ালে যে কান্না লুকানো থাকে সেটা শোনার মতো কান কজনের আছে? যে সমাজ পুরুষের আনন্দে উৎসব করে আর নারীর কষ্টে নীরব থাকে- সে সমাজে আইন বদলালেও ন্যায়বিচার এখনো অনেক দূরে। অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করা গেলে
পুরুষের স্বাধীনতা বাড়তে পারে, কিন্তু নারীর নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায্যতা সেখানে প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়। আর যেখানে প্রশ্ন থেকেই যায়-সেখানে আনন্দের খবর রম্য হয়ে উঠলেও ন্যায়বিচার হয়ে ওঠে না।
মেশকাতুন নাহার
প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর।