মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
সভ্যতার চাকা যখনই নতুন কোনো মোড় নিয়েছে, মানুষ বারবার থমকে দাঁড়িয়েছে। এক সময় লাঙল ছেড়ে ট্রাক্টর ধরার সময় চারদিকে হাহাকার উঠেছিল। স্টিম ইঞ্জিনের বাষ্পে যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল, তখন শ্রমজীবী মানুষ ভেবেছিল তাদের দিন বুঝি শেষ হয়ে এল। আজ সেই একই শঙ্কা জেঁকে বসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। ঘরে, বাইরে, আড্ডায় বা সেমিনারে একটি আশঙ্কার সুর আজ বেশ জোরালো যে, যন্ত্র শেষ পর্যন্ত মানুষের রুটি রুজিতে ভাগ বসাবে। এই জটিল পরিস্থিতির গভীরতা যেমন অনেক, তেমনই এর সমাধান একবারে নেতিবাচক নয়।
বিষয়টি আসলে টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং নিজেকে বদলে নেওয়ার এক মহাযুদ্ধ। আমরা এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল গবেষণাগারের বিষয় নয়। এটি আমাদের পকেটের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অফিসের ডেস্কেও পৌঁছে গেছে। তথ্য বিন্যাস থেকে শুরু করে জটিল কোডিং, কিংবা শিল্পীর তুলির ছোঁয়া, সবখানেই এই প্রযুক্তি তার অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছে। মানুষের মনে ভয় আসাটা তাই অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যেসব কাজ বারবার একই নিয়মে করতে হয়, কিংবা যেগুলোতে সৃজনশীলতার চেয়ে কায়িক শ্রম বেশি, সেই পেশাগুলো এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখি, প্রযুক্তি সবসময় পুরনো কাজ কেড়ে নিয়ে নতুন নতুন কাজের পথ খুলে দিয়েছে। কম্পিউটার যখন এল, তখন টাইপিস্টরা ভেবেছিলেন তারা পথে বসবেন, কিন্তু বাস্তবে কম্পিউটার কয়েক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের জন্ম দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই উত্থানকে আমাদের দেখতে হবে সহযোগিতার চশমায়। এটি মানুষের প্রতিযোগী নয়, বরং এক অনন্য সহকারী। একজন ডাক্তার যখন শত শত এক্স-রে রিপোর্ট দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন এই প্রযুক্তি কয়েক সেকেন্ডে সেখানে নিখুঁত রোগ শনাক্ত করে দিতে পারে।
এতে ডাক্তারের গুরুত্ব কমে না, বরং তার কাজের নির্ভুলতা বৃদ্ধি পায়। একইভাবে একজন লেখক বা সাংবাদিকের সৃজনশীলতাকে এটি সংকুচিত করে না, বরং গবেষণার সময় বাঁচিয়ে তাকে আরও গভীর চিন্তার সুযোগ করে দেয়। মূল সমস্যা প্রযুক্তির বিবর্তন নয়, বরং আমাদের মানিয়ে নেয়ার গতি। যারা নিজেদের দক্ষতাকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত করতে পারবেন না, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ অবশ্যই অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টাতে হবে। এখন আর কেবল গতানুগতিক ডিগ্রি দিয়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এখন প্রয়োজন আজীবন শেখার মানসিকতা। যন্ত্রের যা নেই, তা হলো আবেগ এবং মানবিক বিচারবোধ। যন্ত্র যুক্তি দিতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো সহানুভূতি দেখাতে পারে না। তাই ভবিষ্যতে এমন সব কাজের চাহিদা বাড়বে, যেখানে মানুষের সরাসরি স্পর্শ প্রয়োজন। যেমন মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, কিংবা উচ্চতর নেতৃত্ব প্রদান। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাই কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং সূক্ষ্ম চিন্তাভাবনা এবং মানবিক গুণাবলীর ওপর অনেক বেশি জোর দিতে হবে। অনেকেই মনে করেন এই পরিবর্তন শুধু কারিগরি পেশার ওপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর প্রভাব অত্যন্ত সর্বজনীন।
প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে আইন পেশা, কিংবা ব্যাংকিং খাত, সবখানেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। তবে এই পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক দিক হলো, এটি কাজের মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। মানুষ যখন রুটিন মাফিক একঘেয়ে কাজ থেকে মুক্তি পাবে, তখন সে তার মেধাকে আরও সৃজনশীল কাজে লাগাতে পারবে। ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য এই প্রযুক্তি এখন আশীর্বাদ স্বরূপ। বড় বড় কোম্পানির মতো অনেক বেশি কর্মী না থাকলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে একজন সাধারণ মানুষও এখন বিশ্বমানের সেবা প্রদান করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে মেধা থাকলে যন্ত্রের সাহায্যে আকাশ ছোঁয়া সম্ভব। সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সামনে কোনো ধ্বংসের বার্তা নিয়ে আসেনি। এটি মূলত মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি নতুন এবং শক্তিশালী হাতিয়ার। আদিম মানুষ যেমন পাথর থেকে আগুনের ব্যবহার শিখেছিল, তেমনই আধুনিক মানুষ প্রজ্ঞা দিয়ে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শিখছে। কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টাবে ঠিকই, তবে কাজের ক্ষেত্র কখনো ফুরিয়ে যাবে না। বরং মানুষ আরও সম্মানজনক এবং বুদ্ধিদীপ্ত কাজের সুযোগ পাবে। আমরা যদি ভয় পেয়ে গুটিয়ে না থেকে নতুন এই শক্তিকে আলিঙ্গন করতে পারি, তবে ভবিষ্যৎ হবে আরও সমৃদ্ধ। যন্ত্রের বুদ্ধিবৃত্তি আর মানুষের প্রজ্ঞা যখন হাতে হাত রেখে চলবে, তখনই সভ্যতার প্রকৃত জয় হবে। ভয় নয়, বরং প্রস্তুতির মাধ্যমেই গড়ে উঠবে আগামীর নতুন এবং সুন্দর এক পৃথিবী।
শাম্মী শফিক জুঁই
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬
সভ্যতার চাকা যখনই নতুন কোনো মোড় নিয়েছে, মানুষ বারবার থমকে দাঁড়িয়েছে। এক সময় লাঙল ছেড়ে ট্রাক্টর ধরার সময় চারদিকে হাহাকার উঠেছিল। স্টিম ইঞ্জিনের বাষ্পে যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল, তখন শ্রমজীবী মানুষ ভেবেছিল তাদের দিন বুঝি শেষ হয়ে এল। আজ সেই একই শঙ্কা জেঁকে বসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। ঘরে, বাইরে, আড্ডায় বা সেমিনারে একটি আশঙ্কার সুর আজ বেশ জোরালো যে, যন্ত্র শেষ পর্যন্ত মানুষের রুটি রুজিতে ভাগ বসাবে। এই জটিল পরিস্থিতির গভীরতা যেমন অনেক, তেমনই এর সমাধান একবারে নেতিবাচক নয়।
বিষয়টি আসলে টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং নিজেকে বদলে নেওয়ার এক মহাযুদ্ধ। আমরা এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল গবেষণাগারের বিষয় নয়। এটি আমাদের পকেটের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অফিসের ডেস্কেও পৌঁছে গেছে। তথ্য বিন্যাস থেকে শুরু করে জটিল কোডিং, কিংবা শিল্পীর তুলির ছোঁয়া, সবখানেই এই প্রযুক্তি তার অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছে। মানুষের মনে ভয় আসাটা তাই অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যেসব কাজ বারবার একই নিয়মে করতে হয়, কিংবা যেগুলোতে সৃজনশীলতার চেয়ে কায়িক শ্রম বেশি, সেই পেশাগুলো এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখি, প্রযুক্তি সবসময় পুরনো কাজ কেড়ে নিয়ে নতুন নতুন কাজের পথ খুলে দিয়েছে। কম্পিউটার যখন এল, তখন টাইপিস্টরা ভেবেছিলেন তারা পথে বসবেন, কিন্তু বাস্তবে কম্পিউটার কয়েক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের জন্ম দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই উত্থানকে আমাদের দেখতে হবে সহযোগিতার চশমায়। এটি মানুষের প্রতিযোগী নয়, বরং এক অনন্য সহকারী। একজন ডাক্তার যখন শত শত এক্স-রে রিপোর্ট দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন এই প্রযুক্তি কয়েক সেকেন্ডে সেখানে নিখুঁত রোগ শনাক্ত করে দিতে পারে।
এতে ডাক্তারের গুরুত্ব কমে না, বরং তার কাজের নির্ভুলতা বৃদ্ধি পায়। একইভাবে একজন লেখক বা সাংবাদিকের সৃজনশীলতাকে এটি সংকুচিত করে না, বরং গবেষণার সময় বাঁচিয়ে তাকে আরও গভীর চিন্তার সুযোগ করে দেয়। মূল সমস্যা প্রযুক্তির বিবর্তন নয়, বরং আমাদের মানিয়ে নেয়ার গতি। যারা নিজেদের দক্ষতাকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত করতে পারবেন না, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ অবশ্যই অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টাতে হবে। এখন আর কেবল গতানুগতিক ডিগ্রি দিয়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এখন প্রয়োজন আজীবন শেখার মানসিকতা। যন্ত্রের যা নেই, তা হলো আবেগ এবং মানবিক বিচারবোধ। যন্ত্র যুক্তি দিতে পারে, কিন্তু মানুষের মতো সহানুভূতি দেখাতে পারে না। তাই ভবিষ্যতে এমন সব কাজের চাহিদা বাড়বে, যেখানে মানুষের সরাসরি স্পর্শ প্রয়োজন। যেমন মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, কিংবা উচ্চতর নেতৃত্ব প্রদান। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাই কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং সূক্ষ্ম চিন্তাভাবনা এবং মানবিক গুণাবলীর ওপর অনেক বেশি জোর দিতে হবে। অনেকেই মনে করেন এই পরিবর্তন শুধু কারিগরি পেশার ওপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর প্রভাব অত্যন্ত সর্বজনীন।
প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে আইন পেশা, কিংবা ব্যাংকিং খাত, সবখানেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। তবে এই পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক দিক হলো, এটি কাজের মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। মানুষ যখন রুটিন মাফিক একঘেয়ে কাজ থেকে মুক্তি পাবে, তখন সে তার মেধাকে আরও সৃজনশীল কাজে লাগাতে পারবে। ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য এই প্রযুক্তি এখন আশীর্বাদ স্বরূপ। বড় বড় কোম্পানির মতো অনেক বেশি কর্মী না থাকলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে একজন সাধারণ মানুষও এখন বিশ্বমানের সেবা প্রদান করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে মেধা থাকলে যন্ত্রের সাহায্যে আকাশ ছোঁয়া সম্ভব। সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সামনে কোনো ধ্বংসের বার্তা নিয়ে আসেনি। এটি মূলত মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি নতুন এবং শক্তিশালী হাতিয়ার। আদিম মানুষ যেমন পাথর থেকে আগুনের ব্যবহার শিখেছিল, তেমনই আধুনিক মানুষ প্রজ্ঞা দিয়ে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শিখছে। কর্মসংস্থানের ধরন পাল্টাবে ঠিকই, তবে কাজের ক্ষেত্র কখনো ফুরিয়ে যাবে না। বরং মানুষ আরও সম্মানজনক এবং বুদ্ধিদীপ্ত কাজের সুযোগ পাবে। আমরা যদি ভয় পেয়ে গুটিয়ে না থেকে নতুন এই শক্তিকে আলিঙ্গন করতে পারি, তবে ভবিষ্যৎ হবে আরও সমৃদ্ধ। যন্ত্রের বুদ্ধিবৃত্তি আর মানুষের প্রজ্ঞা যখন হাতে হাত রেখে চলবে, তখনই সভ্যতার প্রকৃত জয় হবে। ভয় নয়, বরং প্রস্তুতির মাধ্যমেই গড়ে উঠবে আগামীর নতুন এবং সুন্দর এক পৃথিবী।
শাম্মী শফিক জুঁই
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা