alt

মতামত » চিঠিপত্র

নদী বাণিজ্য: শক্তি ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ

: সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন

সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই নদী কেবল জলের আধার নয়, বরং এটি ছিল এক একটি সমৃদ্ধ জনপদের জীবনীশক্তি। মেসোপটেমিয়া থেকে শুরু করে সিন্ধু নদ কিংবা আমাদের এই পলিবিধৌত গাঙ্গেয় বদ্বীপ- সবখানেই মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পেছনে প্রধান কারিগর ছিল নদী। কিন্তু আধুনিক যুগে নদী আর কেবল কৃষিকাজের উৎস বা সহজ যাতায়াত পথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতির এক শক্তিশালী হাতিয়ার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ‘নদী বাণিজ্য’ শব্দবন্ধটি শুনতে যতটা সাধারণ মনে হয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার লড়াই, আধিপত্য বিস্তার এবং অর্থনীতির এক বিশাল জটিল সমীকরণ।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, যে জাতি নদীপথকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, তারাই বাণিজ্যে ও শক্তিতে বিশ্বকে শাসন করেছে। নদী ছিল পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানের বিশ্ব ব্যবস্থায় নদী আর কেবল একটি উন্মুক্ত পথ নয়, বরং এটি সার্বভৌমত্বের এক বড় অংশ। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখন একটি কৌশলগত অবস্থান। যখন একটি উজানের দেশ কোনো নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে বা বাঁধ নির্মাণ করে, তখন সেটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে ভাটির দেশের ওপর এক ধরণের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ। পানির এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের ওপর যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়, তাকেই আধুনিক বিশ্লেষকরা ‘হাইড্রো-পলিটিক্স’ বা পানিনীতি বলে অভিহিত করেন।

আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশে অভ্যন্তরীণ নদী বাণিজ্য এক সময় অর্থনীতির মেরুদ- ছিল। বড় বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা গঞ্জ গড়ে উঠেছিল নদীর কোলঘেঁষেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা আর প্রভাবশালী মহলের ‘কালো হাত’ আজ সেই বাণিজ্যকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নদী দখল এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের মাধ্যমে একদল মানুষ আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের সঠিক তদারকির অভাবে নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে। নদীকে শাসন করার নামে যে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, তা অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল নদীর স্বাভাবিক জীবন বজায় রেখে তাকে বাণিজ্যের উপযোগী করা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিয়ন্ত্রণ মানেই হলো একচেটিয়া দখলদারি।

অন্যদিকে, নদীর ওপর রাষ্ট্রীয় আধিপত্য কেবল সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে বড় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চলে নীরব প্রতিযোগিতা। নদীপথের মাধ্যমে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর যে প্রবেশাধিকার, তা কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করে। এই লাইফলাইন যখন রাষ্ট্রীয় দরকষাকষির গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সাধারণ মানুষের স্বার্থ গৌণ হয়ে পড়ে। নদীর সম্পদ যেমন- মৎস্য, খনিজ এবং পরিবহনের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ যদি জনবান্ধব না হয়ে পুঁজিবান্ধব হয়, তবে তা বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নদীকে পুঁজি করে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান যখন পরিবেশের তোয়াক্কা না করে শিল্পায়ন চালায়, তখন রাষ্ট্রকে সেই ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়।

নদী কোনো জড় বস্তু নয় যে তাকে কেবল বাণিজ্যের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই নদী বাণিজ্যের শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেবল মুনাফার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নদীর অধিকার রক্ষা করে, তার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করে যে বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেটাই হবে দীর্ঘস্থায়ী ও কল্যাণকর। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, নদীর মৃত্যু মানে কেবল একটি জলপথের বিনাশ নয়, বরং একটি সভ্যতার নিঃশব্দ অবসান। তাই নদী নিয়ন্ত্রণ হোক সংরক্ষণের জন্য, লুণ্ঠনের জন্য নয়।

হেনা শিকদার

রাস্তা সংস্কার চাই

যন্ত্রের মেধা মানুষের হাত

দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সফট পাওয়ার’ মডেলে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশি ফলের ভূমিকা

রাজনীতি হোক মানুষের জন্য, মানুষ নিয়ে নয়

দূরদর্শী সিদ্ধান্তে রক্ষা পেতে পারে শিক্ষাব্যবস্থা

সামাজিক আন্দোলন: প্রতিবাদ নাকি ট্রেন্ড?

নগর সভ্যতায় নিঃসঙ্গতার মহামারি

আবাসন সংকট

নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হোক কর্মসংস্থান

জেন্ডার-নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার দরকার

নারী-পুরুষ বৈষম্য:সমাজে লুকানো চ্যালেঞ্জ

শিক্ষক নিয়োগে প্রশ্নফাঁস

রাজনীতিতে সুবিধাবাদীদের দূরীকরণ এবং সঠিক সঙ্গী নির্বাচনের দাবি

ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহে জনভোগান্তি

ভাষার মাসে বাংলা চর্চার অঙ্গীকার

মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য-সচেতনতা হোক দায়িত্ব

রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিঃসঙ্গ জীবন

একটা মোড়ের কত নাম

শহরের পানিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি

র‌্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট ও জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ

রেলপথ কি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে?

বাস্তবতার এক গল্প

কীর্তনখোলার আর্তনাদ

ভ্যাট-কর ও সাধারণ মানুষ

অযৌক্তিক ‘হ্যাঁ’ বনাম আত্মমর্যাদার ‘না’

নদীভাঙন ও গ্রামীণ উদ্বাস্তু জীবনের গল্প

চারদিকে যুদ্ধের দামামা ভবিষ্যৎ শিশুদের জন্য কি পৃথিবী নিরাপদ

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ নিয়োগ

শহরে বৃক্ষনিধন : এক শ্বাসরুদ্ধকর ভবিষ্যৎ

জলবায়ু পরিবর্তন: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভয়াবহ প্রভাব

ই-ফাইলিং কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা

মূল্যস্ফীতি ও মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের লড়াই

টেন্ডার দুর্নীতি ও করণীয়

জমির দলিলে ঘুষের অমানবিক চক্র

পরিত্যক্ত সরকারি গোডাউন

tab

মতামত » চিঠিপত্র

নদী বাণিজ্য: শক্তি ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন

সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই নদী কেবল জলের আধার নয়, বরং এটি ছিল এক একটি সমৃদ্ধ জনপদের জীবনীশক্তি। মেসোপটেমিয়া থেকে শুরু করে সিন্ধু নদ কিংবা আমাদের এই পলিবিধৌত গাঙ্গেয় বদ্বীপ- সবখানেই মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পেছনে প্রধান কারিগর ছিল নদী। কিন্তু আধুনিক যুগে নদী আর কেবল কৃষিকাজের উৎস বা সহজ যাতায়াত পথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতির এক শক্তিশালী হাতিয়ার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ‘নদী বাণিজ্য’ শব্দবন্ধটি শুনতে যতটা সাধারণ মনে হয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার লড়াই, আধিপত্য বিস্তার এবং অর্থনীতির এক বিশাল জটিল সমীকরণ।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, যে জাতি নদীপথকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, তারাই বাণিজ্যে ও শক্তিতে বিশ্বকে শাসন করেছে। নদী ছিল পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানের বিশ্ব ব্যবস্থায় নদী আর কেবল একটি উন্মুক্ত পথ নয়, বরং এটি সার্বভৌমত্বের এক বড় অংশ। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখন একটি কৌশলগত অবস্থান। যখন একটি উজানের দেশ কোনো নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে বা বাঁধ নির্মাণ করে, তখন সেটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে ভাটির দেশের ওপর এক ধরণের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ। পানির এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের ওপর যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়, তাকেই আধুনিক বিশ্লেষকরা ‘হাইড্রো-পলিটিক্স’ বা পানিনীতি বলে অভিহিত করেন।

আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশে অভ্যন্তরীণ নদী বাণিজ্য এক সময় অর্থনীতির মেরুদ- ছিল। বড় বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা গঞ্জ গড়ে উঠেছিল নদীর কোলঘেঁষেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা আর প্রভাবশালী মহলের ‘কালো হাত’ আজ সেই বাণিজ্যকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নদী দখল এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের মাধ্যমে একদল মানুষ আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, অথচ রাষ্ট্রের সঠিক তদারকির অভাবে নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাচ্ছে। নদীকে শাসন করার নামে যে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, তা অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল নদীর স্বাভাবিক জীবন বজায় রেখে তাকে বাণিজ্যের উপযোগী করা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিয়ন্ত্রণ মানেই হলো একচেটিয়া দখলদারি।

অন্যদিকে, নদীর ওপর রাষ্ট্রীয় আধিপত্য কেবল সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে বড় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চলে নীরব প্রতিযোগিতা। নদীপথের মাধ্যমে সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর যে প্রবেশাধিকার, তা কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করে। এই লাইফলাইন যখন রাষ্ট্রীয় দরকষাকষির গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সাধারণ মানুষের স্বার্থ গৌণ হয়ে পড়ে। নদীর সম্পদ যেমন- মৎস্য, খনিজ এবং পরিবহনের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ যদি জনবান্ধব না হয়ে পুঁজিবান্ধব হয়, তবে তা বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নদীকে পুঁজি করে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান যখন পরিবেশের তোয়াক্কা না করে শিল্পায়ন চালায়, তখন রাষ্ট্রকে সেই ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়।

নদী কোনো জড় বস্তু নয় যে তাকে কেবল বাণিজ্যের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই নদী বাণিজ্যের শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেবল মুনাফার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। নদীর অধিকার রক্ষা করে, তার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করে যে বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেটাই হবে দীর্ঘস্থায়ী ও কল্যাণকর। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, নদীর মৃত্যু মানে কেবল একটি জলপথের বিনাশ নয়, বরং একটি সভ্যতার নিঃশব্দ অবসান। তাই নদী নিয়ন্ত্রণ হোক সংরক্ষণের জন্য, লুণ্ঠনের জন্য নয়।

হেনা শিকদার

back to top