alt

উপ-সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন

শারফুদ্দিন আহমেদ

: সোমবার, ১৩ মার্চ ২০২৩
image

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলার মানুষের স্বাস্থ্য সেবার সর্বোচ্চ সংস্থাই নয়, এটি দেশের স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের গবেষণা, শিক্ষা আর প্রশিক্ষণেরও সর্বোৎকৃষ্ট বিদ্যাপীঠ। প্রতিদিন যেমন আমরা হাজারো রোগীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করি, তেমনি প্রতি বছর শত শত মৌলিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এরকম বিদ্যাপীঠে লেখাপড়ার সুযোগ পাওয়া স্বপ্নের, আর লেখাপড়া শেষ করে ডিগ্রি নেয়া স্বপ্নপূরণের। শিক্ষার্থীদের সেই স্বপ্নপূরণের মহাক্ষণকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়াসে আয়োজন করা হয় চতুর্থ সমাবর্তন।

চিকিৎসা শিক্ষায় স্নাতকোত্তর কোর্সে অধ্যয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার প্রথম তিন তারকা শাহবাগ হোটেলের জায়গায় ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমএন্ডআর) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও এই প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতা ছিল না। ডিগ্রি প্রদান করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আইপিজিএম এন্ড আর কার্যক্রমসহ অনেকগুলো চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের এমবিবিএস ডিগ্রি প্রদান করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জনগণের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং দেশের চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে তৎকালীন আইপিজিএম এন্ড আর কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উন্নীত করার মধ্যে দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রথম স্বতন্ত্র পাবলিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজ এ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মানুষের আকাক্সক্ষার জায়গায় পৌঁছেছে।

জাতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম পাবলিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজ আন্তর্জাতিক মান অর্জন করে দেশের আপামর জনসাধারণের সুচিকিৎসায় নিয়োজিত হবেন এ আকাক্সক্ষা নিয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ বিশ্বসেরা সেবা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্পেনের সিমাগো এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্কপাস এ দুটো বিশ্বখ্যাত জরিপ সংস্থা মানসম্মত চিকিৎসা এবং গবেষণার জন্য অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ার মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানের মর্যাদা দিয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০৫টি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্স পরিচালনা করা হচ্ছে অন্যান্য ৪১টি মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে- এর মধ্যে ৬২টি রেসিডেন্সি কোর্স রয়েছে। চালু হয়েছে এমএসসি নার্সিং কোর্স। বাংলাদেশের ছাত্রদের বাইরেও ভারত, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, সোমালিয়া, কানাডা, ইয়েমেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ১১টি দেশের প্রায় ৩৫০ বিদেশি ছাত্র বিভিন্ন কোর্সে লেখাপড়া করছেন।

প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৮০০০ রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করে সন্তুষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে এখন বিভিন্ন ইউনিটসহ ৫৭টি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ। আরো সুশৃঙ্খল এবং ডিজিটাল করা হয়েছে আর্থিক ব্যবস্থাপনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এখন দেশের সব মানুষের কাছে পরিগণিত হয়েছে চিকিৎসার নির্ভরযোগ্য আস্থাস্থল হিসেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ ঘন্টা ল্যাবরেটরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি বিভাগে রোগীর ল্যাবরেটরি রিপোর্ট অনলাইনে মাধ্যমে প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা এবং একুশে গ্রেনেড হামলায় আহত রোগীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছায় করোনা মহামারীতে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানসহ ভ্যাক্সিনেশন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম এবং বিশে^ পঞ্চম স্থান অর্জন করেছে। এই চিকিৎসাসেবা কাযক্রমে এই বিশ্ববিদ্যালয় সংযুক্ত হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ ও কোরিয়া সরকারের যৌথ অর্থায়নে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। ফলে দেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে না গিয়ে কম খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া দেশে প্রথমবারের মতো ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। লিভারসহ অন্যান্য অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রমও সমন্তরালভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র। বেসরকারি রেসিডেন্টদের জন্য সরকার থেকে মাসিক ২০ হাজার টাকা সম্মানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস। শিক্ষা, সেবাসহ সব পর্যায়ের মান উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি)। সব শিক্ষক, কনসালট্যান্ট, কর্মকর্তা, নার্সদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা।

বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল এখন নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে দেশের প্রথম সারির জার্নাল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। গত তিন বছরে ১৫০০টি গবেষণা কর্মসম্পন্ন হয়েছে। প্রতি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সংবাদসহ নিউজ লেটার নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর প্রকাশনা, সব জাতীয় আন্তর্জাতিক দিবসসমূহকে সঠিকভাবে উদযাপন করা হয়েছে। প্রতি মাসে সাইন্টিফিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণে শিক্ষক, চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রতি বছর ‘বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা দিবস’ উদযাপিত হচ্ছে।

গত তিন বছরে ২৪০ জন শিক্ষক এবং ৯১০ জন ছাত্রকে গবেষণা অনুদান দেয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্বারক চুক্তি।

আগামী পঞ্চাশ বছরের পরিকল্পনা বিবেচনায় রেখে একটি মাস্টার প্লান নিয়ে চলছে সব উন্নয়ন কার্যক্রম। অচিরেই যুক্ত হতে চলেছে ইমার্জেন্সি সার্ভিস, ওয়ান পয়েন্ট চেকআপ সেন্টার, ডে কেয়ার সেন্টার, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন, ই-টিকেটিং, সর্বক্ষেত্রে স্মার্ট পদ্ধতি।

অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমরা এখানে কার্যক্রম পরিচালনা করি। তারপরও সব শিক্ষক, ছাত্র, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, সেবা কার্যক্রম, গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে সফলতা নিয়ে।

প্রতিদিন এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, দেশি-বিদেশি চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের উপস্থিতিতে। আমাদের ছাত্র এবং তরুণ চিকিৎসকরা এ সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের সমৃদ্ধ করছে নতুন নতুন জ্ঞান/অভিজ্ঞতা নিয়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন সোসাইটির সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চার প্রাণকেন্দ্র।

ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য যা যা করা দরকার তা করব। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশে^র বুকে একটা রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব এই হলো চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভিসি হিসেবে আমার অঙ্গীকার। উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান, শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সংযুক্তির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশা সবার।

[লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

ছবি

ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম

বৈসাবি : ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব

‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইন

উদার-উদ্দাম বৈশাখ চাই

ঈদ নিয়ে আসুক শান্তি ও সমৃদ্ধি, বিস্তৃত হোক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ

প্রসঙ্গ: বিদেশি ঋণ

ছাত্ররাজনীতি কি খারাপ?

জাকাত : বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস : শুরুর কথা

ছবি

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত

প্রবাসীর ঈদ-ভাবনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

ধানের ফলন বাড়াতে ক্লাইমেট স্মার্ট গুটি ইউরিয়া প্রযুক্তি

কমিশন কিংবা ভিজিটে জমি রেজিস্ট্রির আইনি বিধান ও প্রাসঙ্গিকতা

ছবি

ঈদের অর্থনীতি

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে ‘পোস্ট পার্টিশন সিনড্রম’

শিক্ষকের বঞ্চনা, শিক্ষকের বেদনা

নিরাপদ সড়ক কেন চাই

রম্যগদ্য : ‘প্রহরীর সাতশ কোটি টাকা...’

ছবি

অবন্তিকাদের আত্মহনন

শিক্ষাবিষয়ক ভাবনা

অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান নয়

পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে

আত্মহত্যা রোধে নৈতিক শিক্ষা

আউশ ধান : পরিবেশ ও কৃষকবান্ধব ফসল

ছবি

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আতুড়ঘর

চেক ডিজঅনার মামলার অধিক্ষেত্র ও প্রাসঙ্গিকতা

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের কৃষি

ছবি

‘হৃৎ কলমের’ পাখি এবং আমাদের জেগে ওঠা

ছবি

ভূগর্ভস্থ পানি সুরক্ষায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ

প্রসঙ্গ : নিত্যপণ্যের দাম

ছবি

টঙ্ক আন্দোলনের কুমুদিনী হাজং

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে চাই বিকেন্দ্রীকরণ

দূষণমুক্ত পানির বিকল্প নাই

রম্যগদ্য : ‘দুনিয়ার বাঙালি এক হও”

tab

উপ-সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন

শারফুদ্দিন আহমেদ

image

সোমবার, ১৩ মার্চ ২০২৩

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলার মানুষের স্বাস্থ্য সেবার সর্বোচ্চ সংস্থাই নয়, এটি দেশের স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের গবেষণা, শিক্ষা আর প্রশিক্ষণেরও সর্বোৎকৃষ্ট বিদ্যাপীঠ। প্রতিদিন যেমন আমরা হাজারো রোগীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করি, তেমনি প্রতি বছর শত শত মৌলিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এরকম বিদ্যাপীঠে লেখাপড়ার সুযোগ পাওয়া স্বপ্নের, আর লেখাপড়া শেষ করে ডিগ্রি নেয়া স্বপ্নপূরণের। শিক্ষার্থীদের সেই স্বপ্নপূরণের মহাক্ষণকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়াসে আয়োজন করা হয় চতুর্থ সমাবর্তন।

চিকিৎসা শিক্ষায় স্নাতকোত্তর কোর্সে অধ্যয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার প্রথম তিন তারকা শাহবাগ হোটেলের জায়গায় ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমএন্ডআর) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও এই প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতা ছিল না। ডিগ্রি প্রদান করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আইপিজিএম এন্ড আর কার্যক্রমসহ অনেকগুলো চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের এমবিবিএস ডিগ্রি প্রদান করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জনগণের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং দেশের চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে তৎকালীন আইপিজিএম এন্ড আর কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উন্নীত করার মধ্যে দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রথম স্বতন্ত্র পাবলিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজ এ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মানুষের আকাক্সক্ষার জায়গায় পৌঁছেছে।

জাতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম পাবলিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের চিকিৎসক সমাজ আন্তর্জাতিক মান অর্জন করে দেশের আপামর জনসাধারণের সুচিকিৎসায় নিয়োজিত হবেন এ আকাক্সক্ষা নিয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয় আজ বিশ্বসেরা সেবা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্পেনের সিমাগো এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্কপাস এ দুটো বিশ্বখ্যাত জরিপ সংস্থা মানসম্মত চিকিৎসা এবং গবেষণার জন্য অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ার মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানের মর্যাদা দিয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০৫টি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্স পরিচালনা করা হচ্ছে অন্যান্য ৪১টি মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে- এর মধ্যে ৬২টি রেসিডেন্সি কোর্স রয়েছে। চালু হয়েছে এমএসসি নার্সিং কোর্স। বাংলাদেশের ছাত্রদের বাইরেও ভারত, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, সোমালিয়া, কানাডা, ইয়েমেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের ১১টি দেশের প্রায় ৩৫০ বিদেশি ছাত্র বিভিন্ন কোর্সে লেখাপড়া করছেন।

প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৮০০০ রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করে সন্তুষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে এখন বিভিন্ন ইউনিটসহ ৫৭টি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ। আরো সুশৃঙ্খল এবং ডিজিটাল করা হয়েছে আর্থিক ব্যবস্থাপনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এখন দেশের সব মানুষের কাছে পরিগণিত হয়েছে চিকিৎসার নির্ভরযোগ্য আস্থাস্থল হিসেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ ঘন্টা ল্যাবরেটরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি বিভাগে রোগীর ল্যাবরেটরি রিপোর্ট অনলাইনে মাধ্যমে প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা এবং একুশে গ্রেনেড হামলায় আহত রোগীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছায় করোনা মহামারীতে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানসহ ভ্যাক্সিনেশন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম এবং বিশে^ পঞ্চম স্থান অর্জন করেছে। এই চিকিৎসাসেবা কাযক্রমে এই বিশ্ববিদ্যালয় সংযুক্ত হাসপাতাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ ও কোরিয়া সরকারের যৌথ অর্থায়নে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। ফলে দেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে না গিয়ে কম খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া দেশে প্রথমবারের মতো ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্লান্ট সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। লিভারসহ অন্যান্য অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রমও সমন্তরালভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র। বেসরকারি রেসিডেন্টদের জন্য সরকার থেকে মাসিক ২০ হাজার টাকা সম্মানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস। শিক্ষা, সেবাসহ সব পর্যায়ের মান উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি)। সব শিক্ষক, কনসালট্যান্ট, কর্মকর্তা, নার্সদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা।

বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল এখন নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে দেশের প্রথম সারির জার্নাল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। গত তিন বছরে ১৫০০টি গবেষণা কর্মসম্পন্ন হয়েছে। প্রতি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সংবাদসহ নিউজ লেটার নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর প্রকাশনা, সব জাতীয় আন্তর্জাতিক দিবসসমূহকে সঠিকভাবে উদযাপন করা হয়েছে। প্রতি মাসে সাইন্টিফিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণে শিক্ষক, চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। প্রতি বছর ‘বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা দিবস’ উদযাপিত হচ্ছে।

গত তিন বছরে ২৪০ জন শিক্ষক এবং ৯১০ জন ছাত্রকে গবেষণা অনুদান দেয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্বারক চুক্তি।

আগামী পঞ্চাশ বছরের পরিকল্পনা বিবেচনায় রেখে একটি মাস্টার প্লান নিয়ে চলছে সব উন্নয়ন কার্যক্রম। অচিরেই যুক্ত হতে চলেছে ইমার্জেন্সি সার্ভিস, ওয়ান পয়েন্ট চেকআপ সেন্টার, ডে কেয়ার সেন্টার, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন, ই-টিকেটিং, সর্বক্ষেত্রে স্মার্ট পদ্ধতি।

অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমরা এখানে কার্যক্রম পরিচালনা করি। তারপরও সব শিক্ষক, ছাত্র, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, সেবা কার্যক্রম, গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে সফলতা নিয়ে।

প্রতিদিন এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, দেশি-বিদেশি চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের উপস্থিতিতে। আমাদের ছাত্র এবং তরুণ চিকিৎসকরা এ সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের সমৃদ্ধ করছে নতুন নতুন জ্ঞান/অভিজ্ঞতা নিয়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন সোসাইটির সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞান চর্চার প্রাণকেন্দ্র।

ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য যা যা করা দরকার তা করব। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশে^র বুকে একটা রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব এই হলো চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভিসি হিসেবে আমার অঙ্গীকার। উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান, শিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সংযুক্তির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশা সবার।

[লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

back to top