চলতি মাসে ডিমের দাম ‘অস্বাভাবিক’ কমে যাওয়ায় অনেক খামারি মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন। প্রতিবছর ৩ থেকে ৪ বার ডিম-মুরগির দরপতণের কারণে প্রান্তিক খামারিরা অনেকে লোকসানের মুখে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসছেন। খামারিদের সুরক্ষা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে এ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)।
আজ রাজধানীর একটি হোটেলে পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ বীটের সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তারা এমন হতাশার কথা বলেন।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স এসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি) এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। তৃণমূল খামারিদের সুরক্ষায তারা ৬টি প্রস্তাব উপস্থাপন করে। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে: স্বল্পসুদে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে; সরকারিভাবে ডিম-মুরগির সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ; কোল্ডস্টোরে ডিম সংরক্ষণের সরকারি বাধা প্রত্যাহার; অফ-সিজনে তৃণমূল খামারিদের জন্য ভর্তুকীর ব্যবস্থা; ফিডের দাম কমাতে এআইটি, টিডিএস, ভিডিএস হার শূণ্য করা এবং ডিম ও মুরগির উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন বিষয়ক কৌশলপত্র প্রণয়ন।
ওয়াপসা-বাংলাদেশ শাখার সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, ‘রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিটি ডিম ১০ টাকা থেকে সাড়ে ১০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ঢাকা, ময়মনসিংহসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিম বিক্রি হয়েছে গড়ে ৮ টাকা৫০পয়সা; অন্যদিকে টাঙ্গাইল ও নরসিংদিসহ অন্যান্য জেলায় বিক্রি হয়েছে গড়ে প্রায় ৮ টাকায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিটি ডিমের মূল্য নির্ধারণ করেছে- খামার পর্যায়ে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা, পাইকারিতে ১১ টাকা ০১ পয়সা ও খুচরা পর্যায়ে ১১ টাকা ৮৭ পয়সা। সেখানে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ১০ টাকা ১৯ পয়সা। সে হিসাবে প্রতিটি ডিম বিক্রি করে খামারির লোকসান হচ্ছে গড়ে প্রায় ১ টকা ৬৯ পয়সা থেকে ২ টাকা ১৯ পয়সা।’
মসিউর রহমান বলেন, ‘দেশে ডিমের দৈনিক উৎপাদন সাড়ে ৪ কোটি পিস ধরলে, বিগত ২১ দিনে খামারির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৯ থেকে ২০৬ কোটি টাকা। লোকসান সামাল দিতে না পেরে অনেক খামারি মুরগি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন- যা অত্যন্ত আশংকার কারণ। রমজান শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত খুললে চাহিদা বাড়বে আর তখন সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে দাম বাড়বে।’
বাংলাদেশের ফিডের মান ভাল ও ডিমের ওজন বেশি উল্লেখ করে মসিউর রহমান বলেন, ‘সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিমের দাম কম। পাশ্ববর্তী দেশে ডিমের দাম কম বলা হলেও প্রকৃত বিচারে কম নয় কারণ তাদের ডিমের দাম ১০ শতাংশ কম হলে ডিমের ওজনও ১৩ শতাংশ কম। তাছাড়া তারা যে মানের ফিড খাইয়ে ডিম উৎপাদন করে সে তুলনায় বাংলাদেশের ফিডের মান অনেক ভাল।’
ওয়াপসা-বিবি’র সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুমার প্রামাণিক বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আমাদের দেশে উৎপাদিত ডিম অনেক নিরাপদ কারণ ওদের ফিডে এন্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটার ও মিট এন্ড বোনমিল ব্যবহার করা হয় কিন্তু আমাদের দেশে এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ।’
ফিড ইন্ডাষ্ট্রিজ এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব) এর সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবেশি দেশে খামার থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে দামের ব্যবধান থাকে মাত্র এক টাকা; সেখানে আমাদের দেশে ৩ থেকে ৪ টাকা। তাই ডিমের দাম কমাতে হলে মধ্যস্বত্তভোগীর সংখ্যা কমাতে হবে।’
ব্রিডার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) এর সাধারণ সম্পাদক শাহ্ ফাহাদ হাবীব বলেন, ‘চলতি মাসে একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দামেও পতন হয়েছে। সারাবছর জুড়ে ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ধরে রাখা সম্ভব হলে খামারি ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হবেন।’
এনিমেল হেলথ কোম্পানিজ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আহকাব) এর সাধারণ সম্পাদক আফতাব আলম বলেন, ‘ডিম আমদানির অনুমতি দেয়া হলেও এসেছে যতসামান্যই। এখন তো ডিমের চাহিদা কম তাহলে সরকারের উচিত হবে ডিম রপ্তানি করে খামারিদের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করা।’
গাজীপুর মাওনার খামারি তোফাজ্জল হোসেন বলেন,‘ সাড়ে সাত টাকায় ডিম বিক্রি করতে হয়েছে; ডিম সংরক্ষণ করতে পারিনি কারণ সংরক্ষণ করলে অভিযান চালানো হয়, জরিমানা আদায় করা হয়। সরকার খামার পর্যায়ে ডিমের দাম নির্ধারণ করেছে কিন্তু আমরা সে দামে বিক্রি করতে পারছিনা।’
তিনি আরো বলেন, ‘ডিমের দাম বাড়লে আমাদের সাথে এমন আচরণ করা হয় যেন আমরা কোন দাগী আসামী। যৌক্তিক লাভ করার অধিকার আমাদেরও আছে। আমরা নিজের জন্য উৎপাদন করি না বরং ভোক্তার জন্যই উৎপাদন করি।’
ডায়মন্ড এগ্স এর সিইও কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান মেজবাহ বলেন, ‘বছরের ৩-৪ মাস লোকসানে ডিম বিক্রি করতে হয়। শত শত কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। খামারিদের ভয় না দেখিয়ে বরং প্রশংসা করা উচিত তাহলেই ডিমের উৎপাদন বাড়বে।’
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত পোল্ট্রি খামারি ও উদ্যোক্তারা বলেন- আগামী কয়েক বছরে ডিমের চাহিদা আরও বাড়বে। আশাকরা হচ্ছে মাথাপিছু ডিমের চাহিদা ১৩৫ থেকে বেড়ে ৩০০ হবে। সেক্ষেত্রে উৎপাদন আড়াই গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে না পারলে আমদানি করে চাহিদা পূরণ সম্ভব হবেনা।
সোমবার, ২৪ মার্চ ২০২৫
চলতি মাসে ডিমের দাম ‘অস্বাভাবিক’ কমে যাওয়ায় অনেক খামারি মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন। প্রতিবছর ৩ থেকে ৪ বার ডিম-মুরগির দরপতণের কারণে প্রান্তিক খামারিরা অনেকে লোকসানের মুখে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসছেন। খামারিদের সুরক্ষা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে এ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)।
আজ রাজধানীর একটি হোটেলে পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ বীটের সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তারা এমন হতাশার কথা বলেন।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এবং ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স এসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি) এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। তৃণমূল খামারিদের সুরক্ষায তারা ৬টি প্রস্তাব উপস্থাপন করে। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে: স্বল্পসুদে ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে; সরকারিভাবে ডিম-মুরগির সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ; কোল্ডস্টোরে ডিম সংরক্ষণের সরকারি বাধা প্রত্যাহার; অফ-সিজনে তৃণমূল খামারিদের জন্য ভর্তুকীর ব্যবস্থা; ফিডের দাম কমাতে এআইটি, টিডিএস, ভিডিএস হার শূণ্য করা এবং ডিম ও মুরগির উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন বিষয়ক কৌশলপত্র প্রণয়ন।
ওয়াপসা-বাংলাদেশ শাখার সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, ‘রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতিটি ডিম ১০ টাকা থেকে সাড়ে ১০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ঢাকা, ময়মনসিংহসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিম বিক্রি হয়েছে গড়ে ৮ টাকা৫০পয়সা; অন্যদিকে টাঙ্গাইল ও নরসিংদিসহ অন্যান্য জেলায় বিক্রি হয়েছে গড়ে প্রায় ৮ টাকায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিটি ডিমের মূল্য নির্ধারণ করেছে- খামার পর্যায়ে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা, পাইকারিতে ১১ টাকা ০১ পয়সা ও খুচরা পর্যায়ে ১১ টাকা ৮৭ পয়সা। সেখানে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ১০ টাকা ১৯ পয়সা। সে হিসাবে প্রতিটি ডিম বিক্রি করে খামারির লোকসান হচ্ছে গড়ে প্রায় ১ টকা ৬৯ পয়সা থেকে ২ টাকা ১৯ পয়সা।’
মসিউর রহমান বলেন, ‘দেশে ডিমের দৈনিক উৎপাদন সাড়ে ৪ কোটি পিস ধরলে, বিগত ২১ দিনে খামারির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৯ থেকে ২০৬ কোটি টাকা। লোকসান সামাল দিতে না পেরে অনেক খামারি মুরগি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন- যা অত্যন্ত আশংকার কারণ। রমজান শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত খুললে চাহিদা বাড়বে আর তখন সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে দাম বাড়বে।’
বাংলাদেশের ফিডের মান ভাল ও ডিমের ওজন বেশি উল্লেখ করে মসিউর রহমান বলেন, ‘সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডিমের দাম কম। পাশ্ববর্তী দেশে ডিমের দাম কম বলা হলেও প্রকৃত বিচারে কম নয় কারণ তাদের ডিমের দাম ১০ শতাংশ কম হলে ডিমের ওজনও ১৩ শতাংশ কম। তাছাড়া তারা যে মানের ফিড খাইয়ে ডিম উৎপাদন করে সে তুলনায় বাংলাদেশের ফিডের মান অনেক ভাল।’
ওয়াপসা-বিবি’র সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুমার প্রামাণিক বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আমাদের দেশে উৎপাদিত ডিম অনেক নিরাপদ কারণ ওদের ফিডে এন্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটার ও মিট এন্ড বোনমিল ব্যবহার করা হয় কিন্তু আমাদের দেশে এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ।’
ফিড ইন্ডাষ্ট্রিজ এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব) এর সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবেশি দেশে খামার থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে দামের ব্যবধান থাকে মাত্র এক টাকা; সেখানে আমাদের দেশে ৩ থেকে ৪ টাকা। তাই ডিমের দাম কমাতে হলে মধ্যস্বত্তভোগীর সংখ্যা কমাতে হবে।’
ব্রিডার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) এর সাধারণ সম্পাদক শাহ্ ফাহাদ হাবীব বলেন, ‘চলতি মাসে একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দামেও পতন হয়েছে। সারাবছর জুড়ে ভারসাম্যপূর্ণ বাজার ধরে রাখা সম্ভব হলে খামারি ও ভোক্তা উভয়ই লাভবান হবেন।’
এনিমেল হেলথ কোম্পানিজ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আহকাব) এর সাধারণ সম্পাদক আফতাব আলম বলেন, ‘ডিম আমদানির অনুমতি দেয়া হলেও এসেছে যতসামান্যই। এখন তো ডিমের চাহিদা কম তাহলে সরকারের উচিত হবে ডিম রপ্তানি করে খামারিদের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করা।’
গাজীপুর মাওনার খামারি তোফাজ্জল হোসেন বলেন,‘ সাড়ে সাত টাকায় ডিম বিক্রি করতে হয়েছে; ডিম সংরক্ষণ করতে পারিনি কারণ সংরক্ষণ করলে অভিযান চালানো হয়, জরিমানা আদায় করা হয়। সরকার খামার পর্যায়ে ডিমের দাম নির্ধারণ করেছে কিন্তু আমরা সে দামে বিক্রি করতে পারছিনা।’
তিনি আরো বলেন, ‘ডিমের দাম বাড়লে আমাদের সাথে এমন আচরণ করা হয় যেন আমরা কোন দাগী আসামী। যৌক্তিক লাভ করার অধিকার আমাদেরও আছে। আমরা নিজের জন্য উৎপাদন করি না বরং ভোক্তার জন্যই উৎপাদন করি।’
ডায়মন্ড এগ্স এর সিইও কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান মেজবাহ বলেন, ‘বছরের ৩-৪ মাস লোকসানে ডিম বিক্রি করতে হয়। শত শত কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। খামারিদের ভয় না দেখিয়ে বরং প্রশংসা করা উচিত তাহলেই ডিমের উৎপাদন বাড়বে।’
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত পোল্ট্রি খামারি ও উদ্যোক্তারা বলেন- আগামী কয়েক বছরে ডিমের চাহিদা আরও বাড়বে। আশাকরা হচ্ছে মাথাপিছু ডিমের চাহিদা ১৩৫ থেকে বেড়ে ৩০০ হবে। সেক্ষেত্রে উৎপাদন আড়াই গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে না পারলে আমদানি করে চাহিদা পূরণ সম্ভব হবেনা।