মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
বাংলাদেশ নামক বদ্বীপটির শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত নদীগুলো যেমন এই জনপদকে উর্বরতা দিয়েছে, তেমনি যুগে যুগে এর করাল গ্রাস কেড়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাজানো সংসার। নদীভাঙন এখানে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি একটি নিঃশব্দ মানচিত্র পরিবর্তনের নাম। প্রতি বছর বর্ষার শুরুতে যখন নদীর জল ফুলতে শুরু করে, তখন উপকূলীয় আর চরাঞ্চলের মানুষের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তাদের কাছে নদীর কলতান কোনো সুর নয়, বরং এক আসন্ন প্রলয়ের সঙ্কেত। এই সর্বনাশা ভাঙনের শিকার হয়ে যারা ঘরবাড়ি হারায়, তাদের জীবনগল্প কোনো মহাকাব্যের চেয়ে কম ট্রাজিক নয়।
একটি সাজানো ভিটেমাটি যখন চোখের পলকে অতল জলরাশিতে বিলীন হয়ে যায়, তখন সেই মাটির সাথে সাথে মানুষের দীর্ঘদিনের স্মৃতি, ঐতিহ্য আর পরিচয়ও ডুবে যায়। যে কৃষক গতকালও তার নিজের জমিতে লাঙল চালিয়ে আগামীর স্বপ্ন বুনেছিল, আজ সে পথের ভিখারি। নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা হলো, এটি মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে তার শিকড় থেকে উপড়ে ফেলে। মানুষের পায়ের নিচ থেকে যখন একখ- জমি সরে যায়, তখন সে শুধু ভূমিহীন হয় না, সে হয়ে পড়ে সমাজবিচ্ছিন্ন এক যাযাবর। এই বাস্তুচ্যুত মানুষেরা যখন পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোনো বাঁধে বা রাস্তার ধারে আশ্রয় নেয়, তখন তাদের জীবনে শুরু হয় এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার অধ্যায়। তাদের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা থাকে না, থাকে না কোনো স্থায়ী সামাজিক পরিচয়।
নদীভাঙনের ফলে সৃষ্ট এই গ্রামীণ উদ্বাস্তুদের জীবনের গল্পগুলো বড় বেশি বিষণœ। একজন গৃহস্থ যখন সর্বস্ব হারিয়ে শহরের কোনো এক ঘিঞ্জি বস্তিতে আশ্রয় নেয়, তখন তার শুধু পেশাই বদলায় না, বদলে যায় তার আত্মসম্মানবোধও। যে মানুষটি গ্রামে মাতব্বর হিসেবে পরিচিত ছিল কিংবা যার উঠোনে ধান শুকানোর ধুম পড়ত, শহরের ইট-পাথরের জঙ্গলে সে আজ স্রেফ একজন নামহীন রিকশাচালক বা দিনমজুর। এই রূপান্তর কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি বিশাল মানসিক বিপর্যয়। মাটির গন্ধ আর খোলা আকাশ ছেড়ে তাদের থাকতে হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, যেখানে প্রতি পদক্ষেপে তাদের দারিদ্রের সাথে লড়াই করতে হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এই পরিবর্তন আরও ভয়াবহ। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশুরা বেড়ে ওঠে অনিশ্চয়তার মাঝে, আর নারীরা হারান তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা।
সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হলো, এই ভাঙন একবারে শেষ হয় না। বাংলার নদীগুলো এতটাই অস্থির যে, একবার ঘর হারিয়ে যারা নতুন চরে বা বাঁধে বসতি গড়ে, কয়েক বছর পর সেই ঠিকানাও নদী টেনে নেয়। এভাবে অনেক পরিবারকে তাদের জীবদ্দশায় ডজনখানেক বার ঘর সরাতে হয়। এই বারবার ঘর হারানোর প্রক্রিয়াটি মানুষকে ক্লান্ত ও নিস্পৃহ করে তোলে। তখন তাদের জীবনে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে না, শুধু কোনোমতে বেঁচে থাকার এক আদিম লড়াই চলতে থাকে। নদী যাদের সব কেড়ে নেয়, সমাজ বা রাষ্ট্র তাদের প্রতি সবসময় সদয় থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই উদ্বাস্তুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটি এখনো অনেক ধীর।
নদীভাঙন ও উদ্বাস্তু জীবনের এই আখ্যান আসলে আমাদের জাতীয় এক বড় ক্ষত। ফেলে আসা ভিটেমাটির প্রতি যে টান, পূর্বপুরুষের কবরের জন্য যে হাহাকার-তা কোনো ত্রাণ বা সাময়িক সাহায্য দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। নদী শাসনের আধুনিক প্রযুক্তি আর টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি এই বিশাল উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে সম্মানের সাথে পুনর্বাসন করা আজ সময়ের দাবি। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা এই নদীভাঙন কবলিত মানুষের কান্নার শব্দ শুনতে পাব, ততক্ষণ আমাদের উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। কারণ একটি দেশের মানচিত্র শুধু ভূখণ্ড দিয়ে নয়, বরং তার মানুষের স্থিরতা ও নিরাপত্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নদীর রুদ্ররূপ আর মানুষের অসহায়ত্বের এই চিরকালীন দ্বন্দ্বের অবসান ঘটা জরুরি, যেন কোনো মানুষের পরিচয় তার পৈতৃক ভিটেমাটির সাথেই টিকে থাকে, কোনো বস্তির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
নদীভাঙন কবলিত মানুষের গল্প কেবল কান্নার গল্প নয়, এটি তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প। প্রকৃতির রুদ্ররূপের কাছে বারবার হেরে গিয়েও তারা আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। আমাদের দায়িত্ব এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের হৃত অধিকার ফিরিয়ে দিতে সোচ্চার হওয়া। নদী যেন আর কারো কান্না না হয়, বরং নদী হোক সমৃদ্ধির প্রতীক।
হেনা শিকদার
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বাংলাদেশ নামক বদ্বীপটির শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত নদীগুলো যেমন এই জনপদকে উর্বরতা দিয়েছে, তেমনি যুগে যুগে এর করাল গ্রাস কেড়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাজানো সংসার। নদীভাঙন এখানে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি একটি নিঃশব্দ মানচিত্র পরিবর্তনের নাম। প্রতি বছর বর্ষার শুরুতে যখন নদীর জল ফুলতে শুরু করে, তখন উপকূলীয় আর চরাঞ্চলের মানুষের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তাদের কাছে নদীর কলতান কোনো সুর নয়, বরং এক আসন্ন প্রলয়ের সঙ্কেত। এই সর্বনাশা ভাঙনের শিকার হয়ে যারা ঘরবাড়ি হারায়, তাদের জীবনগল্প কোনো মহাকাব্যের চেয়ে কম ট্রাজিক নয়।
একটি সাজানো ভিটেমাটি যখন চোখের পলকে অতল জলরাশিতে বিলীন হয়ে যায়, তখন সেই মাটির সাথে সাথে মানুষের দীর্ঘদিনের স্মৃতি, ঐতিহ্য আর পরিচয়ও ডুবে যায়। যে কৃষক গতকালও তার নিজের জমিতে লাঙল চালিয়ে আগামীর স্বপ্ন বুনেছিল, আজ সে পথের ভিখারি। নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা হলো, এটি মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে তার শিকড় থেকে উপড়ে ফেলে। মানুষের পায়ের নিচ থেকে যখন একখ- জমি সরে যায়, তখন সে শুধু ভূমিহীন হয় না, সে হয়ে পড়ে সমাজবিচ্ছিন্ন এক যাযাবর। এই বাস্তুচ্যুত মানুষেরা যখন পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোনো বাঁধে বা রাস্তার ধারে আশ্রয় নেয়, তখন তাদের জীবনে শুরু হয় এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার অধ্যায়। তাদের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা থাকে না, থাকে না কোনো স্থায়ী সামাজিক পরিচয়।
নদীভাঙনের ফলে সৃষ্ট এই গ্রামীণ উদ্বাস্তুদের জীবনের গল্পগুলো বড় বেশি বিষণœ। একজন গৃহস্থ যখন সর্বস্ব হারিয়ে শহরের কোনো এক ঘিঞ্জি বস্তিতে আশ্রয় নেয়, তখন তার শুধু পেশাই বদলায় না, বদলে যায় তার আত্মসম্মানবোধও। যে মানুষটি গ্রামে মাতব্বর হিসেবে পরিচিত ছিল কিংবা যার উঠোনে ধান শুকানোর ধুম পড়ত, শহরের ইট-পাথরের জঙ্গলে সে আজ স্রেফ একজন নামহীন রিকশাচালক বা দিনমজুর। এই রূপান্তর কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি বিশাল মানসিক বিপর্যয়। মাটির গন্ধ আর খোলা আকাশ ছেড়ে তাদের থাকতে হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, যেখানে প্রতি পদক্ষেপে তাদের দারিদ্রের সাথে লড়াই করতে হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এই পরিবর্তন আরও ভয়াবহ। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে শিশুরা বেড়ে ওঠে অনিশ্চয়তার মাঝে, আর নারীরা হারান তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা।
সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হলো, এই ভাঙন একবারে শেষ হয় না। বাংলার নদীগুলো এতটাই অস্থির যে, একবার ঘর হারিয়ে যারা নতুন চরে বা বাঁধে বসতি গড়ে, কয়েক বছর পর সেই ঠিকানাও নদী টেনে নেয়। এভাবে অনেক পরিবারকে তাদের জীবদ্দশায় ডজনখানেক বার ঘর সরাতে হয়। এই বারবার ঘর হারানোর প্রক্রিয়াটি মানুষকে ক্লান্ত ও নিস্পৃহ করে তোলে। তখন তাদের জীবনে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে না, শুধু কোনোমতে বেঁচে থাকার এক আদিম লড়াই চলতে থাকে। নদী যাদের সব কেড়ে নেয়, সমাজ বা রাষ্ট্র তাদের প্রতি সবসময় সদয় থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই উদ্বাস্তুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটি এখনো অনেক ধীর।
নদীভাঙন ও উদ্বাস্তু জীবনের এই আখ্যান আসলে আমাদের জাতীয় এক বড় ক্ষত। ফেলে আসা ভিটেমাটির প্রতি যে টান, পূর্বপুরুষের কবরের জন্য যে হাহাকার-তা কোনো ত্রাণ বা সাময়িক সাহায্য দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। নদী শাসনের আধুনিক প্রযুক্তি আর টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি এই বিশাল উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে সম্মানের সাথে পুনর্বাসন করা আজ সময়ের দাবি। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা এই নদীভাঙন কবলিত মানুষের কান্নার শব্দ শুনতে পাব, ততক্ষণ আমাদের উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। কারণ একটি দেশের মানচিত্র শুধু ভূখণ্ড দিয়ে নয়, বরং তার মানুষের স্থিরতা ও নিরাপত্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নদীর রুদ্ররূপ আর মানুষের অসহায়ত্বের এই চিরকালীন দ্বন্দ্বের অবসান ঘটা জরুরি, যেন কোনো মানুষের পরিচয় তার পৈতৃক ভিটেমাটির সাথেই টিকে থাকে, কোনো বস্তির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
নদীভাঙন কবলিত মানুষের গল্প কেবল কান্নার গল্প নয়, এটি তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প। প্রকৃতির রুদ্ররূপের কাছে বারবার হেরে গিয়েও তারা আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। আমাদের দায়িত্ব এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের হৃত অধিকার ফিরিয়ে দিতে সোচ্চার হওয়া। নদী যেন আর কারো কান্না না হয়, বরং নদী হোক সমৃদ্ধির প্রতীক।
হেনা শিকদার