মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে ‘না’ বলতে পারা কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি নিজের সময়, মেধা এবং মানসিক স্থিরতা রক্ষার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ধরা যাক, আগামীকাল আপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা, যার প্রস্তুতির জন্য প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। এমন সময় কোনো বন্ধু খেলার আমন্ত্রণ জানালে দ্বিধাদ্বন্দ্বে না ভুগে সরাসরি অস্বীকৃতি জানানোই শ্রেয়। একইভাবে অসুস্থ শরীরে বিশ্রামের পরিবর্তে কারো অনুরোধে কেনাকাটায় যাওয়া নিজের স্বাস্থ্যের ওপর অবিচার ছাড়া আর কিছুই নয়। লোকলজ্জার ভয়ে বা কাউকে খুশি করতে গিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলা সাময়িকভাবে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে কোনো কাজেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না এবং আমাদের সৃজনশীলতা ও আগ্রহ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়।
আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় ‘না’ বলাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। শৈশব থেকেই আমাদের শেখানো হয় বড়দের আদেশ-নির্দেশ বিনা বাক্যে মেনে নিতে। ফলে সমাজ, পরিবার কিংবা কর্মক্ষেত্রে কোনো যৌক্তিক কারণেও ‘না’ বললে সেটিকে অনেক সময় ঔদ্ধত্য, অসম্মান বা দায়িত্বহীনতা হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। তথাকথিত ভালো মানুষ হওয়ার এই নিরন্তর চেষ্টায় আমরা নিজেদের ওপরই জুলুম করে ফেলি। উদাহরণস্বরূপ, অফিসে নিজের নির্ধারিত কাজের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্বের পাহাড় যখন বিনাবাক্যে মেনে নেয়া হয়, তখন তা কেবল কর্মদক্ষতাকেই হ্রাস করে না, বরং প্রবল অবসাদ সৃষ্টি করে। এর ফলে একজন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সীমানা হারিয়ে ফেলেন।
সঠিক সময়ে ‘না’ বলার সক্ষমতা আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতার পরিচায়ক। এটি মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে। একজন ব্যক্তি যখন জানেন তিনি ঠিক কতটুকু চাপ নিতে পারবেন এবং কোন কাজটিকে অগ্রাধিকার দেবেন, তখন তার জন্য জীবন সহজ হয়ে ওঠে। যিনি নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন এবং বাস্তবতাকে সাহসের সাথে গ্রহণ করতে পারেন, তিনিই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সফলতা অর্জন করতে পারেন।
অনেক সময় আমরা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে সরাসরি ‘না’ বলতে সংকোচ বোধ করি। অস্পষ্ট বা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উত্তর দেওয়ার ফলে তৈরি হয় অনাকাক্সিক্ষত ভুল বোঝাবুঝি। অথচ স্পষ্ট ও মার্জিত ভাষায় নিজের অপারগতা প্রকাশ করাই সবচেয়ে কার্যকর এবং সম্মানজনক পদ্ধতি। যেমন নিজের জরুরি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয়ার চাপের মুখে বন্ধুর কাজ করে দেয়ার আবদার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
তবে সব ক্ষেত্রে সরাসরি প্রত্যাখান না করে ক্ষেত্রবিশেষে বিকল্প প্রস্তাব দেয়া যেতে পারে। এতে যেমন নিজের সীমাবদ্ধতা রক্ষা হয়, তেমনি বজায় থাকে সৌহার্দ্য। সহকর্মীর কোনো জরুরি কাজে তাৎক্ষণিক সাহায্য করতে না পারলে বলা যেতে পারে, ‘আজ আমার কাজের চাপ অনেক বেশি, আমি কি আগামীকাল তোমাকে সাহায্য করতে পারি?’ এমন আচরণে পেশাদারিত্ব ও সৌজন্য উভয়ই বজায় থাকে। সেই সাথে মনে রাখা জরুরি যে, সবসময় দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই, সংক্ষিপ্ত ও যৌক্তিক কারণ দর্শানোই সময় ও মর্যাদা রক্ষার জন্য যথেষ্ট।
‘না’ বলতে পারা কেবল একটি কৌশল নয়, বরং এটি আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ় চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে এই দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। জীবনের অপ্রয়োজনীয় জায়গায় ‘না’ বলার সাহস সঞ্চয় করেই আমরা প্রকৃত সাফল্য এবং মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারি।
মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন স্নেহা
মার্কেটিং বিভাগ
রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে ‘না’ বলতে পারা কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি নিজের সময়, মেধা এবং মানসিক স্থিরতা রক্ষার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ধরা যাক, আগামীকাল আপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা, যার প্রস্তুতির জন্য প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। এমন সময় কোনো বন্ধু খেলার আমন্ত্রণ জানালে দ্বিধাদ্বন্দ্বে না ভুগে সরাসরি অস্বীকৃতি জানানোই শ্রেয়। একইভাবে অসুস্থ শরীরে বিশ্রামের পরিবর্তে কারো অনুরোধে কেনাকাটায় যাওয়া নিজের স্বাস্থ্যের ওপর অবিচার ছাড়া আর কিছুই নয়। লোকলজ্জার ভয়ে বা কাউকে খুশি করতে গিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলা সাময়িকভাবে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে কোনো কাজেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না এবং আমাদের সৃজনশীলতা ও আগ্রহ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়।
আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় ‘না’ বলাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। শৈশব থেকেই আমাদের শেখানো হয় বড়দের আদেশ-নির্দেশ বিনা বাক্যে মেনে নিতে। ফলে সমাজ, পরিবার কিংবা কর্মক্ষেত্রে কোনো যৌক্তিক কারণেও ‘না’ বললে সেটিকে অনেক সময় ঔদ্ধত্য, অসম্মান বা দায়িত্বহীনতা হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। তথাকথিত ভালো মানুষ হওয়ার এই নিরন্তর চেষ্টায় আমরা নিজেদের ওপরই জুলুম করে ফেলি। উদাহরণস্বরূপ, অফিসে নিজের নির্ধারিত কাজের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্বের পাহাড় যখন বিনাবাক্যে মেনে নেয়া হয়, তখন তা কেবল কর্মদক্ষতাকেই হ্রাস করে না, বরং প্রবল অবসাদ সৃষ্টি করে। এর ফলে একজন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সীমানা হারিয়ে ফেলেন।
সঠিক সময়ে ‘না’ বলার সক্ষমতা আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতার পরিচায়ক। এটি মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে। একজন ব্যক্তি যখন জানেন তিনি ঠিক কতটুকু চাপ নিতে পারবেন এবং কোন কাজটিকে অগ্রাধিকার দেবেন, তখন তার জন্য জীবন সহজ হয়ে ওঠে। যিনি নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন এবং বাস্তবতাকে সাহসের সাথে গ্রহণ করতে পারেন, তিনিই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সফলতা অর্জন করতে পারেন।
অনেক সময় আমরা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে সরাসরি ‘না’ বলতে সংকোচ বোধ করি। অস্পষ্ট বা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে উত্তর দেওয়ার ফলে তৈরি হয় অনাকাক্সিক্ষত ভুল বোঝাবুঝি। অথচ স্পষ্ট ও মার্জিত ভাষায় নিজের অপারগতা প্রকাশ করাই সবচেয়ে কার্যকর এবং সম্মানজনক পদ্ধতি। যেমন নিজের জরুরি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয়ার চাপের মুখে বন্ধুর কাজ করে দেয়ার আবদার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
তবে সব ক্ষেত্রে সরাসরি প্রত্যাখান না করে ক্ষেত্রবিশেষে বিকল্প প্রস্তাব দেয়া যেতে পারে। এতে যেমন নিজের সীমাবদ্ধতা রক্ষা হয়, তেমনি বজায় থাকে সৌহার্দ্য। সহকর্মীর কোনো জরুরি কাজে তাৎক্ষণিক সাহায্য করতে না পারলে বলা যেতে পারে, ‘আজ আমার কাজের চাপ অনেক বেশি, আমি কি আগামীকাল তোমাকে সাহায্য করতে পারি?’ এমন আচরণে পেশাদারিত্ব ও সৌজন্য উভয়ই বজায় থাকে। সেই সাথে মনে রাখা জরুরি যে, সবসময় দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই, সংক্ষিপ্ত ও যৌক্তিক কারণ দর্শানোই সময় ও মর্যাদা রক্ষার জন্য যথেষ্ট।
‘না’ বলতে পারা কেবল একটি কৌশল নয়, বরং এটি আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ় চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে এই দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। জীবনের অপ্রয়োজনীয় জায়গায় ‘না’ বলার সাহস সঞ্চয় করেই আমরা প্রকৃত সাফল্য এবং মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারি।
মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন স্নেহা
মার্কেটিং বিভাগ
রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী