মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
কবি ভবানী প্রসাদ মজুমদারের বিখ্যাত কবিতা ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’র কয়েকটা লাইন আজকের যুগে বড় বেশি প্রাসঙ্গিক।
“ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক
হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক
বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।”
আজকের যুগে এসে বাংলাদেশিরা তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে ভুলে যাচ্ছে, তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য করছে। আমাদের মনোভাব এরকম যে বাংলা কোনো ভাষাই নয়! আমরা ইংরেজি বড় পছন্দ করি কারণ ও ভাষায় কথা বললে আমাদের পশ লাগে! আমরা আরবি কিংবা সংস্কৃত স্বাচ্ছন্দ্যে শিখি কারণ আমাদের ধর্মীয় ভাষা। কিন্তু বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমরা এই ভাষাকে অবহেলা করি।
অথচ আমরা ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। মাতৃভাষা যে কত প্রিয় তা আমরা প্রমাণ করেছি। কিন্তু আজকে এই আধুনিকতার যুগে এসে আমরা মাতৃভাষায় কথা বলতে লজ্জা পাই! এই জন্য বলে উপনিবেশিকতা এখনো আমাদের মস্তিষ্কে রয়ে গেছে। লর্ড মেকলে তার মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশনে এমন এক জাতি তৈরির কথা বলেছিলেন, যারা রক্তে ভারতীয় হলেও শিক্ষায় ও রুচিতে ইংরেজ।
এই অংশ থেকে আমরাও বাদ যাই না। কারণ তখন ভারতবর্ষ এক ছিল। তাই আমরা ছিলাম তৎকালীন ভারতীয় জাতি। এখন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশি। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ইংরেজ সিভিলাইজেশ্যন এর ভূত যায়নি। আজও আমরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারাকেই সভ্যতার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখি। আমরা মুখে বলি বাংলাই আমাদের মাতৃভাষা, কিন্তু আমাদের সকল বড় বড় চাকরির পরীক্ষায় ইংরেজি না জানলে চাকরি হয় না। কেন? ইংরেজিও তো বাংলার মতো একটা ভাষাই, অন্যকিছু তো নয়! ইংরেজি ভাষা শেখা খারাপ তা আমি কোনোদিন বলি না। যত ভাষা শিখতে পারি তত ভালো। কিন্তু তাই বলে নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে বিদেশি ভাষায় কথা বলায় গর্ববোধ করাকে আমি সভ্যতা বলি না, এটা দাসত্ব। এখন সময় এসেছে বাংলা ভাষাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানোর। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ভাষার অমূল্যতা বোঝাতে হবে। তারা কেপপ সংস্কৃতি আর পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে এতটাই ব্যস্ত যে ভুলে যাচ্ছে, বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আছেন, নজরুল আছেন, জীবনানন্দ দাশ আছেন। তাদের বাংলা ভাষা বাংলা সংস্কৃতিমুখী করতে হবে। নাহলে আমাদের ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিস্থির শিকার হতে হবে।
এখনই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো বাংলায় কথা বলতে পারে না, জন্মের পর শিক্ষিত বাবা মায়েরা বাচ্চার সামনে ইংরেজিতে কথা বলেন যেন তার ইংরেজি ভিত্তিটা পাকা হয়।
ছোট ছোট বাচ্চারা অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলছে তা শুনে আমরা পুলকিত হই হ্যাঁ হওয়ারই কথা, কিন্তু আমাদের লজ্জিত হওয়ার কথা যখন শুনি ওই বাচ্চাটা বাংলা জানে না। কিন্তু আমরা এটাকে সহজভাবে গ্রহণ করেছি। আমাদের ভাবটা এরকম, ‘বাংলা জেনে কি লাভ? ওই ইংরেজিতেই তো উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হবে!’ তবে কি আমার মাতৃভাষার মূল্য এই? আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের মানসিকতা! অথচ একদিন আমরাই এই মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। সময় এসেছে মানুষকে বোঝাতে হবে, আমাদের বাংলা ভাষা সংস্কৃতির ইতিহাস, ঐতিহ্য আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জানাতে হবে, এমনকি বর্তমান প্রজন্মকেও বাংলা সংস্কৃতিমুখী করতে হবে। আর এর জন্য দরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ইংলিশ মিডিয়ামেও বাধ্যতামূলক বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা করা। বাংলা ভাষা সংকটে পড়েছে আমাদেরি জন্য। কেউ ব্যস্ত ইংরেজি শিখে বিদেশে যেতে, তো কেউ ব্যস্ত ধর্মীয় ভাষা আরবি বা সংস্কৃত শিখতে। এর মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সহজাত মাতৃভাষা বাংলা। আমাদের আপত্তি নেই আপনারা আপনাদের সন্তানকে যে ভাষা ইচ্ছে শেখাতে পারেন। কিন্তু মাতৃভাষার অবমাননা আপনারা করতে পারেন না। নিজের সন্তানকে মাতৃভাষা বাংলার মহিমা জানানো আপনার কর্তব্য। আসুন এই ভাষার মাসে আমরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় একত্রিত হই। বাংলা বই পড়ি, বাংলা গান শুনি, বাংলায় কথোপকথন করি। তখন আমরা জোর গলায় বলব, ‘আমার সন্তানের বাংলাটা আসে, সে গর্বিত নিজের মাতৃভাষা নিয়ে।’ এই ভাষার মাসে ভাষাশহীদদের জানাই অগণিত শ্রদ্ধা। বাংলা ভাষা অমর হোক।
সেঁজুতি মুমু
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
কবি ভবানী প্রসাদ মজুমদারের বিখ্যাত কবিতা ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’র কয়েকটা লাইন আজকের যুগে বড় বেশি প্রাসঙ্গিক।
“ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক
হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক
বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।”
আজকের যুগে এসে বাংলাদেশিরা তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে ভুলে যাচ্ছে, তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য করছে। আমাদের মনোভাব এরকম যে বাংলা কোনো ভাষাই নয়! আমরা ইংরেজি বড় পছন্দ করি কারণ ও ভাষায় কথা বললে আমাদের পশ লাগে! আমরা আরবি কিংবা সংস্কৃত স্বাচ্ছন্দ্যে শিখি কারণ আমাদের ধর্মীয় ভাষা। কিন্তু বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমরা এই ভাষাকে অবহেলা করি।
অথচ আমরা ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। মাতৃভাষা যে কত প্রিয় তা আমরা প্রমাণ করেছি। কিন্তু আজকে এই আধুনিকতার যুগে এসে আমরা মাতৃভাষায় কথা বলতে লজ্জা পাই! এই জন্য বলে উপনিবেশিকতা এখনো আমাদের মস্তিষ্কে রয়ে গেছে। লর্ড মেকলে তার মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশনে এমন এক জাতি তৈরির কথা বলেছিলেন, যারা রক্তে ভারতীয় হলেও শিক্ষায় ও রুচিতে ইংরেজ।
এই অংশ থেকে আমরাও বাদ যাই না। কারণ তখন ভারতবর্ষ এক ছিল। তাই আমরা ছিলাম তৎকালীন ভারতীয় জাতি। এখন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশি। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ইংরেজ সিভিলাইজেশ্যন এর ভূত যায়নি। আজও আমরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারাকেই সভ্যতার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখি। আমরা মুখে বলি বাংলাই আমাদের মাতৃভাষা, কিন্তু আমাদের সকল বড় বড় চাকরির পরীক্ষায় ইংরেজি না জানলে চাকরি হয় না। কেন? ইংরেজিও তো বাংলার মতো একটা ভাষাই, অন্যকিছু তো নয়! ইংরেজি ভাষা শেখা খারাপ তা আমি কোনোদিন বলি না। যত ভাষা শিখতে পারি তত ভালো। কিন্তু তাই বলে নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে বিদেশি ভাষায় কথা বলায় গর্ববোধ করাকে আমি সভ্যতা বলি না, এটা দাসত্ব। এখন সময় এসেছে বাংলা ভাষাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানোর। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ভাষার অমূল্যতা বোঝাতে হবে। তারা কেপপ সংস্কৃতি আর পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে এতটাই ব্যস্ত যে ভুলে যাচ্ছে, বাংলায় রবীন্দ্রনাথ আছেন, নজরুল আছেন, জীবনানন্দ দাশ আছেন। তাদের বাংলা ভাষা বাংলা সংস্কৃতিমুখী করতে হবে। নাহলে আমাদের ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিস্থির শিকার হতে হবে।
এখনই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো বাংলায় কথা বলতে পারে না, জন্মের পর শিক্ষিত বাবা মায়েরা বাচ্চার সামনে ইংরেজিতে কথা বলেন যেন তার ইংরেজি ভিত্তিটা পাকা হয়।
ছোট ছোট বাচ্চারা অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলছে তা শুনে আমরা পুলকিত হই হ্যাঁ হওয়ারই কথা, কিন্তু আমাদের লজ্জিত হওয়ার কথা যখন শুনি ওই বাচ্চাটা বাংলা জানে না। কিন্তু আমরা এটাকে সহজভাবে গ্রহণ করেছি। আমাদের ভাবটা এরকম, ‘বাংলা জেনে কি লাভ? ওই ইংরেজিতেই তো উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হবে!’ তবে কি আমার মাতৃভাষার মূল্য এই? আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের মানসিকতা! অথচ একদিন আমরাই এই মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। সময় এসেছে মানুষকে বোঝাতে হবে, আমাদের বাংলা ভাষা সংস্কৃতির ইতিহাস, ঐতিহ্য আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জানাতে হবে, এমনকি বর্তমান প্রজন্মকেও বাংলা সংস্কৃতিমুখী করতে হবে। আর এর জন্য দরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ইংলিশ মিডিয়ামেও বাধ্যতামূলক বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা করা। বাংলা ভাষা সংকটে পড়েছে আমাদেরি জন্য। কেউ ব্যস্ত ইংরেজি শিখে বিদেশে যেতে, তো কেউ ব্যস্ত ধর্মীয় ভাষা আরবি বা সংস্কৃত শিখতে। এর মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সহজাত মাতৃভাষা বাংলা। আমাদের আপত্তি নেই আপনারা আপনাদের সন্তানকে যে ভাষা ইচ্ছে শেখাতে পারেন। কিন্তু মাতৃভাষার অবমাননা আপনারা করতে পারেন না। নিজের সন্তানকে মাতৃভাষা বাংলার মহিমা জানানো আপনার কর্তব্য। আসুন এই ভাষার মাসে আমরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় একত্রিত হই। বাংলা বই পড়ি, বাংলা গান শুনি, বাংলায় কথোপকথন করি। তখন আমরা জোর গলায় বলব, ‘আমার সন্তানের বাংলাটা আসে, সে গর্বিত নিজের মাতৃভাষা নিয়ে।’ এই ভাষার মাসে ভাষাশহীদদের জানাই অগণিত শ্রদ্ধা। বাংলা ভাষা অমর হোক।
সেঁজুতি মুমু
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।