মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
পোস্টারের রঙ শুকায় রাতের বাতাসে, স্লোগান ভাসে হ্যাশট্যাগের ঢেউয়ে প্রতিবাদ কি আগুন, নাকি ক্ষণিকের আলো?
সময় বদলেছে, বদলেছে প্রতিবাদের ভাষা। একসময় রাস্তায় নামা মানেই ছিল সামাজিক আন্দোলন। হাতে প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে স্লোগান, সামনে অনিশ্চয়তা- তবু দৃঢ় অবস্থান। আজ সেই দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা : সোশ্যাল মিডিয়া। একটি পোস্ট, একটি হ্যাশট্যাগ, একটি ভাইরাল ভিডিও মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- আজকের সামাজিক আন্দোলন কি সত্যিকার প্রতিবাদ, নাকি কেবল একটি ট্রেন্ড?
সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস বলছে, পরিবর্তন কখনও সহজে আসেনি। অধিকার, ন্যায়বিচার কিংবা সমতার দাবিতে মানুষকে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। আন্দোলন মানে ছিল সংগঠন, ত্যাগ, ঝুঁকি এবং ধৈর্য। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের আন্দোলন অনেক সময় দ্রুত শুরু হয় এবং দ্রুত থেমেও যায়। কোনো ঘটনা ঘটলেই সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, প্রোফাইল ছবি বদলে যায়, স্ট্যাটাসে রাগ প্রকাশ পায়। কয়েক দিন পর অন্য একটি ইস্যু এসে আগেরটিকে সরিয়ে দেয়। তখন প্রশ্ন জাগে- এই ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনাকে কি প্রকৃত আন্দোলন বলা যায়?
ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদের একটি বড় শক্তি হলো এর বিস্তার। আগে কোনো অন্যায়ের খবর সীমিত পরিসরে থাকত; এখন তা মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সচেতনতা বাড়ে, মানুষ দ্রুত সংগঠিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন আন্দোলন বাস্তব পরিবর্তনও এনেছে। সুতরাং সামাজিক মাধ্যমকে পুরোপুরি খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কণ্ঠস্বর তুলনামূলকভাবে সহজ।
তবে সমস্যা শুরু হয় যখন আন্দোলন কেবল দৃশ্যমানতার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। কে বেশি জোরে কথা বলছে, কে বেশি ভাইরাল হচ্ছে- এই প্রতিযোগিতায় অনেক সময় মূল ইস্যু আড়ালে চলে যায়। প্রতিবাদ তখন হয়ে ওঠে পরিচয় প্রদর্শনের মাধ্যম। নিজের অবস্থান জানানো যেন একটি সামাজিক দায়িত্বের চেয়ে সামাজিক ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবণতা আন্দোলনের গভীরতা কমিয়ে দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধারাবাহিকতার অভাব। সত্যিকারের সামাজিক আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদি। এটি কেবল ক্ষোভ প্রকাশ নয়; এটি সমাধানের পথ খোঁজারও প্রক্রিয়া। কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি, অনলাইন ক্ষোভ দ্রুত ছড়ালেও তা বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ নেয় না। কয়েক দিন উত্তেজনা থাকে, তারপর নীরবতা। এই নীরবতাই প্রশ্ন তোলে- আমাদের প্রতিবাদ কতটা স্থায়ী?
তবে তরুণ প্রজন্মকে পুরোপুরি দোষ দেয়াও অন্যায়। তারা এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যেখানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়া স্বাভাবিক। তাদের হাতের স্মার্টফোনই তাদের প্রধান মাধ্যম। তারা ডিজিটাল ভাষায় কথা বলে, ডিজিটালভাবে সংগঠিত হয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। বরং প্রয়োজন হলো এই শক্তিকে গঠনমূলক পথে ব্যবহার করা।
সামাজিক আন্দোলন যদি কেবল ট্রেন্ড হয়ে যায়, তবে তা সমাজে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে না। কিন্তু যদি সেই ট্রেন্ড সচেতনতা তৈরি করে, আলোচনা উসকে দেয় এবং বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়- তবে সেটিই প্রকৃত প্রতিবাদে পরিণত হয়। মূল প্রশ্ন তাই মাধ্যম নয়, উদ্দেশ্য ও ধারাবাহিকতা।
প্রতিবাদ মানে শুধু উচ্চস্বরে কথা বলা নয়; প্রতিবাদ মানে দায়িত্ব নেওয়া। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা যেমন জরুরি, তেমনি সমস্যার সমাধানে যুক্ত হওয়াও জরুরি। সামাজিক আন্দোলন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা ব্যক্তিগত আবেগ ছাড়িয়ে সামষ্টিক চেতনায় রূপ নেয়।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গভীরতা রক্ষা করা। দ্রুতগতির এই যুগে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী- খবর, আলোচনার বিষয়, এমনকি ক্ষোভও। কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কখনও ক্ষণস্থায়ী নয়। তাই সামাজিক আন্দোলনকে ট্রেন্ডের সীমা ছাড়িয়ে যেতে হবে। প্রতিবাদকে হতে হবে সচেতন, ধারাবাহিক এবং মানবিক।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, সামাজিক আন্দোলন নিজে কখনও ট্রেন্ড নয়; ট্রেন্ড হয়ে যায় আমাদের মনোভাব। আমরা যদি প্রতিবাদকে ফ্যাশন বানাই, তবে তা ফ্যাশনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর যদি একে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করি, তবে তা পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হবে। সিদ্ধান্ত আমাদের- আমরা কি কেবল হ্যাশট্যাগ তুলব, নাকি ইতিহাসে রেখাপাত করব?
ওম্মে হাবিবা তৃষা
দর্শন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
পোস্টারের রঙ শুকায় রাতের বাতাসে, স্লোগান ভাসে হ্যাশট্যাগের ঢেউয়ে প্রতিবাদ কি আগুন, নাকি ক্ষণিকের আলো?
সময় বদলেছে, বদলেছে প্রতিবাদের ভাষা। একসময় রাস্তায় নামা মানেই ছিল সামাজিক আন্দোলন। হাতে প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে স্লোগান, সামনে অনিশ্চয়তা- তবু দৃঢ় অবস্থান। আজ সেই দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা : সোশ্যাল মিডিয়া। একটি পোস্ট, একটি হ্যাশট্যাগ, একটি ভাইরাল ভিডিও মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- আজকের সামাজিক আন্দোলন কি সত্যিকার প্রতিবাদ, নাকি কেবল একটি ট্রেন্ড?
সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস বলছে, পরিবর্তন কখনও সহজে আসেনি। অধিকার, ন্যায়বিচার কিংবা সমতার দাবিতে মানুষকে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। আন্দোলন মানে ছিল সংগঠন, ত্যাগ, ঝুঁকি এবং ধৈর্য। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের আন্দোলন অনেক সময় দ্রুত শুরু হয় এবং দ্রুত থেমেও যায়। কোনো ঘটনা ঘটলেই সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, প্রোফাইল ছবি বদলে যায়, স্ট্যাটাসে রাগ প্রকাশ পায়। কয়েক দিন পর অন্য একটি ইস্যু এসে আগেরটিকে সরিয়ে দেয়। তখন প্রশ্ন জাগে- এই ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনাকে কি প্রকৃত আন্দোলন বলা যায়?
ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদের একটি বড় শক্তি হলো এর বিস্তার। আগে কোনো অন্যায়ের খবর সীমিত পরিসরে থাকত; এখন তা মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সচেতনতা বাড়ে, মানুষ দ্রুত সংগঠিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন আন্দোলন বাস্তব পরিবর্তনও এনেছে। সুতরাং সামাজিক মাধ্যমকে পুরোপুরি খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কণ্ঠস্বর তুলনামূলকভাবে সহজ।
তবে সমস্যা শুরু হয় যখন আন্দোলন কেবল দৃশ্যমানতার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। কে বেশি জোরে কথা বলছে, কে বেশি ভাইরাল হচ্ছে- এই প্রতিযোগিতায় অনেক সময় মূল ইস্যু আড়ালে চলে যায়। প্রতিবাদ তখন হয়ে ওঠে পরিচয় প্রদর্শনের মাধ্যম। নিজের অবস্থান জানানো যেন একটি সামাজিক দায়িত্বের চেয়ে সামাজিক ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবণতা আন্দোলনের গভীরতা কমিয়ে দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধারাবাহিকতার অভাব। সত্যিকারের সামাজিক আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদি। এটি কেবল ক্ষোভ প্রকাশ নয়; এটি সমাধানের পথ খোঁজারও প্রক্রিয়া। কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি, অনলাইন ক্ষোভ দ্রুত ছড়ালেও তা বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ নেয় না। কয়েক দিন উত্তেজনা থাকে, তারপর নীরবতা। এই নীরবতাই প্রশ্ন তোলে- আমাদের প্রতিবাদ কতটা স্থায়ী?
তবে তরুণ প্রজন্মকে পুরোপুরি দোষ দেয়াও অন্যায়। তারা এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যেখানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেয়া স্বাভাবিক। তাদের হাতের স্মার্টফোনই তাদের প্রধান মাধ্যম। তারা ডিজিটাল ভাষায় কথা বলে, ডিজিটালভাবে সংগঠিত হয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। বরং প্রয়োজন হলো এই শক্তিকে গঠনমূলক পথে ব্যবহার করা।
সামাজিক আন্দোলন যদি কেবল ট্রেন্ড হয়ে যায়, তবে তা সমাজে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে না। কিন্তু যদি সেই ট্রেন্ড সচেতনতা তৈরি করে, আলোচনা উসকে দেয় এবং বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়- তবে সেটিই প্রকৃত প্রতিবাদে পরিণত হয়। মূল প্রশ্ন তাই মাধ্যম নয়, উদ্দেশ্য ও ধারাবাহিকতা।
প্রতিবাদ মানে শুধু উচ্চস্বরে কথা বলা নয়; প্রতিবাদ মানে দায়িত্ব নেওয়া। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা যেমন জরুরি, তেমনি সমস্যার সমাধানে যুক্ত হওয়াও জরুরি। সামাজিক আন্দোলন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা ব্যক্তিগত আবেগ ছাড়িয়ে সামষ্টিক চেতনায় রূপ নেয়।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গভীরতা রক্ষা করা। দ্রুতগতির এই যুগে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী- খবর, আলোচনার বিষয়, এমনকি ক্ষোভও। কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন কখনও ক্ষণস্থায়ী নয়। তাই সামাজিক আন্দোলনকে ট্রেন্ডের সীমা ছাড়িয়ে যেতে হবে। প্রতিবাদকে হতে হবে সচেতন, ধারাবাহিক এবং মানবিক।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, সামাজিক আন্দোলন নিজে কখনও ট্রেন্ড নয়; ট্রেন্ড হয়ে যায় আমাদের মনোভাব। আমরা যদি প্রতিবাদকে ফ্যাশন বানাই, তবে তা ফ্যাশনেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর যদি একে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করি, তবে তা পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হবে। সিদ্ধান্ত আমাদের- আমরা কি কেবল হ্যাশট্যাগ তুলব, নাকি ইতিহাসে রেখাপাত করব?
ওম্মে হাবিবা তৃষা
দর্শন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়