শেখর ভট্টাচার্য
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ
মাঝে মাঝে মানসিকভাবে যখন কোন কারণে ভেঙে পড়ি, আত্মবিশ্বাসে কিছুটা চিড় ধরে তখন আশ্রয় নেই একটি অসাধারণ প্রামাণ্য গ্রন্থে। বারবার পড়তে থাকি গ্রন্থটি। মনের ভেতরে জমে থাকা বেদনাবোধ খুব দ্রুত প্রশমিত হতে থাকে, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে খুব বেশি সময় লাগে না। যে গ্রন্থটি পাঠ করি সেটি হলো ২০০৯ সালে প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘একাত্তরের চিঠি’। রণাঙ্গন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতের লেখা চিঠির সংকলন। প্রায় ৮২টি চিঠি, প্রতিটি চিঠি ‘হৃৎ কলম’ দিয়ে লেখা একেকটি কবিতা। কী অসাধারণ দেশপ্রেমের প্রতিফলন। মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু ছিল বিশ্ব ইতিহাসের একটি অমর এবং তাৎপর্যপূর্ণ জনযুদ্ধ তাই সকল শ্রেণীর মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অল্প শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত থেকে সকলেই অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। চিঠিগুলোর ভাষাতে ছিল দুর্দমনীয় আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা একই সাথে ছিল বজ্র কঠিন শপথ, দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খল মোচনের প্রতিজ্ঞা। আবেগ মিশ্রিত এই প্রতিজ্ঞাটি ছিল এতো দৃঢ়, সেই দৃঢ়তা দিয়ে তৈরি হয়েছিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অস্ত্র যা দিয়ে উচ্চমানের প্রশিক্ষিত নিয়মিত শত্রু বাহিনীকে মাত্র নয় মাসে পরাভূত করতে সমর্থ হয়েছিলো গাঙ্গেয় বদ্বীপের পলির মতো কোমল মুক্তির জন্য তৃষ্ণার্থ যোদ্ধারা। প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, কামার, কুমোর, ছাত্র, পেশাদার সৈনিক, সাংবাদিক কোন পেশার লোক ছিলেন না এ জনযুদ্ধে? অপার দেশপ্রেম, মায়ের প্রতি অসীম মমতা, তাদের শক্তি জুগিয়েছিলো দেশের জন্য জীবনকে বাজি রাখার সিদ্ধান্ত নিতে উপনীত হতে।
‘একাত্তরের চিঠিতে’ রণাঙ্গন থেকে মুক্তি যোদ্ধারা যতগুলো চিঠি লিখেছেন তার অধিকাংশই মায়ের কাছে লেখা! জাতিগত ভাবে অনাদিকাল থেকে আমরা মনে করি মায়ের কোল হলোÑ পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত আশ্রয় আর মায়ের কাছে দুঃখ, বেদনা আনন্দের বার্তা বিনিময় হলো অপার্থিব এক প্রশান্তি। চিঠিগুলো পাঠ করলে বিস্মিত হতে হয়। মনে হয় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও অকুতোভয় বীর যোদ্ধারা মায়ের সাথে অবলীলা-ক্রমে কবিতার ভাষায় মনের গহীনে থাকা অন্তরের কথা গুলো প্রকাশ করে প্রশান্তিতে মগ্ন হতে পারতেন। জানি না পৃথিবীতে আর কোন জাতি মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত মানসিক শক্তি দিয়ে মা এবং মাতৃভূমিকে একাকার করতে পারেন কিনা। রণাঙ্গন থেকে নুরুল হক অনানুষ্ঠানিক, মায়াময় ভঙ্গিতে লিখেছিলেনÑ
‘আমার মা, আশা করি ভালোই আছ; কিন্তু আমি ভালো নাই। তোমায় ছাড়া কীভাবে ভালো থাকি। তোমার কথা শুধু মনে হয়। আমরা ১৭ জন। তার মধ্যে ৬ জন মারা গেছে। তবু যুদ্ধ চালাচ্ছি। শুধু তোমার কথা মনে হয়, তুমি বলেছিলে, ‘খোকা মোরে দেশটা স্বাধীন আইনা দে, তাই আমি পিছুপা হই নাই, হবো না, দেশটাকে স্বাধীন করবই। রাত শেষে সকাল হইব, নতুন সূর্য উঠব, নতুন একটা বাংলাদেশ হইব...। (১৯ নভেম্বর, ১৯৭১, ‘যুদ্ধ খানা হইতে তোমার পোলা’ নুরুল হক)।’
ছয়জন সহযোদ্ধা ইতোমধ্যে শহীদ হয়ে গেছেন, তারপরও ভয় হয় না শুধু মায়ের কথা মনে হয়, কি আশ্চর্য ভালোবাসা মা ও মাটিকে। এই দু’হাজার পঁচিশ সালে আমরা যখন নানা কারনে অসহায় বোধ করি, তখন মনে হয় মৃত্যুকে হাতের মুঠে নিয়ে যারা লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন, শত্রুকে পরাভুত করার জন্য দেশপ্রেমের হাতিয়ার দিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন তারা তো নুতন সূর্যের প্রতীক্ষায় কামানের গোলার সামনে আত্মাহুতি দিতে ভয় পাননি, আমরা কেন, আপাত কালো অন্ধকারের চাদরকে ভেদ করতে ভয় পাবো।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং ৭ মার্চ ৭১-এর ভাষণের নেপথ্যে থেকে বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ, সাহস, উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়েছেন আমাদের জননীরা; বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন তারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে। ইতিহাসের ধারাবাহিক পরিক্রমায় সভ্যতার সূচনাকারী কৃষির গোড়াপত্তন করে নারী সমাজ। স্বাধীনতা প্রাপ্তির ব্যাপার সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না।
দেশপ্রেমিক মহান জননী, জায়া, কন্যারা দেশকে ভালোবেসে পুরুষের পাশাপাশি নিজের জীবনকে বিপন্ন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের অবদানের কথা বাংলাদেশের মানুষ ভুলবে কী করে! স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা, রওশন আরার মতো অনেক নারী পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধ করেছেন। কলকাতার পার্ক সার্কাস ও পদ্মপুকুরের মাঝামাঝি গোবরা নামক স্থানে শুধু নারী যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। নারী যোদ্ধাদের জন্য অনুরূপ আরও তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে।
গোবরা ক্যাম্পে মেয়েদের দেওয়া হতো তিন রকম ট্রেনিংÑ ১. সিভিল ডিফেন্স, ২. নার্সিং এবং ৩. অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ। সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষক ছিলেন শিপ্রা সরকার ও সেবা চৌধুরী। নার্সিং শেখাতেন ডা. মীরালাল ও ডা. দেবী ঘোষ। অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ কৌশল শেখাতেন ক্যাপ্টেন এসএম তারেক এবং মেজর জয়দীপ সিং। ভারতে শরণার্থী শিবিরে ডাক্তার, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অসংখ্য নারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদের সেবা দিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে আড়াই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছেন; কিন্তু ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তাদের গবেষণায় বলছে, এ সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার। এমনকি ৯ মাসে যে ৩০ লাখ বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের ২০ শতাংশই নারী। নির্যাতনের ধরন ছিল বর্বরোচিত, অমানুষিক। ঘাতকরা ৭০ শতাংশ ধর্ষিতার সামনে হত্যা বা নির্যাতন করেছে তাদের স্বামী কিংবা নিকট আত্মীয়দের। নির্যাতিত নারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ নারীকে স্পট ধর্ষণ ও স্পট গণধর্ষণ, ১৮ শতাংশ নারীকে কারাগার এবং ক্যাম্পে নির্যাতন করা হয়েছে। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এমএ হাসান গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীদের ৫৬ দশমিক ৫০ শতাংশ মুসলমান, ৪১ দশমিক ৪৪ শতাংশ হিন্দু এবং ২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ছিল অন্যান্য ধর্মের।
যুদ্ধের প্রেরণা দিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে অংশ নিয়েছেন অনেক নারী শিল্পী। পথে-প্রান্তরে, অলি-গলিতে গান গেয়ে তারা অর্থ সংগ্রহ করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় ব্যয় করেছেন। আবার দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এ দেশের গ্রাম-গঞ্জ ও শহর-বন্দরে অসংখ্য নারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া, খাদ্য দেওয়া, অস্ত্র বহন করা, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, গোপন সংবাদ আনা-নেওয়া করেছেন। দেশমাতার জন্য নিজের সন্তান, স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধার সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ নারী হয়তো এই শ্রেণিতে পড়েন। অথচ স্বাধীন দেশে এই বীর নারীরা তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা এখনো পাননি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের করা হয়েছে সমাজচ্যুত যেন ধর্ষিত আর নির্যাতিত হওয়াটা তাদেরই ‘অপরাধ’ ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য ভাগীরথীকে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সৈন্যরা। অথচ শহীদ ভাগীরথী স্বাধীন দেশে পাননি তার প্রাপ্য স্বীকৃতি।
প্রয়াত ড. নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইয়ের পাতায় রয়েছে এই বীর নারীদের সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী তার সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করেছিল স্বাধীনতার মতো একটি বড় অর্জনে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর জীবন বাজি রাখার ঘটনাও বিরল নয়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি আজও।
‘বীরের রক্ত স্রোত, মায়ের অশ্রুধারায়’ অর্জিত স্বাধীনতা, দীর্ঘ ৫৪ বছরে অর্জিত উন্নয়নকে আমাদের সংহত করার সময় এসেছে। জাতীয়ভাবে সকলক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিয়ে আসার সময় এসেছে। আমাদের বিশ্বাস জাতি হিসেবে সেই যোগ্যতা আমরা রাখি, মৃত্যুকে পরম মমতায় আলিঙ্গন করে, স্বাধীনতার সূর্যকে যে জাতি বরণ করতে পিছু হটে না, সেই জাতির পক্ষে মায়ের অশ্রুধারা মোছার ক্ষমতা আছে। আমরা অবশ্যই পারবো অরুণোদয় ছিনিয়ে আনতে; কারণ ঘন অমানিশার কোল থেকে আমরা তো নতুন সূর্যের সোনালি আলোয় নিজেদের বারবার আলোকিত করেছি। ইতিহাস তার সাক্ষী আছে, আমরাই তো ইতিহাস রচনা করেছি অসংখ্যবার।
[লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজ গবেষক]
শেখর ভট্টাচার্য
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ
বুধবার, ২৬ মার্চ ২০২৫
মাঝে মাঝে মানসিকভাবে যখন কোন কারণে ভেঙে পড়ি, আত্মবিশ্বাসে কিছুটা চিড় ধরে তখন আশ্রয় নেই একটি অসাধারণ প্রামাণ্য গ্রন্থে। বারবার পড়তে থাকি গ্রন্থটি। মনের ভেতরে জমে থাকা বেদনাবোধ খুব দ্রুত প্রশমিত হতে থাকে, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে খুব বেশি সময় লাগে না। যে গ্রন্থটি পাঠ করি সেটি হলো ২০০৯ সালে প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘একাত্তরের চিঠি’। রণাঙ্গন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতের লেখা চিঠির সংকলন। প্রায় ৮২টি চিঠি, প্রতিটি চিঠি ‘হৃৎ কলম’ দিয়ে লেখা একেকটি কবিতা। কী অসাধারণ দেশপ্রেমের প্রতিফলন। মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু ছিল বিশ্ব ইতিহাসের একটি অমর এবং তাৎপর্যপূর্ণ জনযুদ্ধ তাই সকল শ্রেণীর মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অল্প শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত থেকে সকলেই অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। চিঠিগুলোর ভাষাতে ছিল দুর্দমনীয় আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম, দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা একই সাথে ছিল বজ্র কঠিন শপথ, দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খল মোচনের প্রতিজ্ঞা। আবেগ মিশ্রিত এই প্রতিজ্ঞাটি ছিল এতো দৃঢ়, সেই দৃঢ়তা দিয়ে তৈরি হয়েছিলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অস্ত্র যা দিয়ে উচ্চমানের প্রশিক্ষিত নিয়মিত শত্রু বাহিনীকে মাত্র নয় মাসে পরাভূত করতে সমর্থ হয়েছিলো গাঙ্গেয় বদ্বীপের পলির মতো কোমল মুক্তির জন্য তৃষ্ণার্থ যোদ্ধারা। প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, কামার, কুমোর, ছাত্র, পেশাদার সৈনিক, সাংবাদিক কোন পেশার লোক ছিলেন না এ জনযুদ্ধে? অপার দেশপ্রেম, মায়ের প্রতি অসীম মমতা, তাদের শক্তি জুগিয়েছিলো দেশের জন্য জীবনকে বাজি রাখার সিদ্ধান্ত নিতে উপনীত হতে।
‘একাত্তরের চিঠিতে’ রণাঙ্গন থেকে মুক্তি যোদ্ধারা যতগুলো চিঠি লিখেছেন তার অধিকাংশই মায়ের কাছে লেখা! জাতিগত ভাবে অনাদিকাল থেকে আমরা মনে করি মায়ের কোল হলোÑ পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত আশ্রয় আর মায়ের কাছে দুঃখ, বেদনা আনন্দের বার্তা বিনিময় হলো অপার্থিব এক প্রশান্তি। চিঠিগুলো পাঠ করলে বিস্মিত হতে হয়। মনে হয় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও অকুতোভয় বীর যোদ্ধারা মায়ের সাথে অবলীলা-ক্রমে কবিতার ভাষায় মনের গহীনে থাকা অন্তরের কথা গুলো প্রকাশ করে প্রশান্তিতে মগ্ন হতে পারতেন। জানি না পৃথিবীতে আর কোন জাতি মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত মানসিক শক্তি দিয়ে মা এবং মাতৃভূমিকে একাকার করতে পারেন কিনা। রণাঙ্গন থেকে নুরুল হক অনানুষ্ঠানিক, মায়াময় ভঙ্গিতে লিখেছিলেনÑ
‘আমার মা, আশা করি ভালোই আছ; কিন্তু আমি ভালো নাই। তোমায় ছাড়া কীভাবে ভালো থাকি। তোমার কথা শুধু মনে হয়। আমরা ১৭ জন। তার মধ্যে ৬ জন মারা গেছে। তবু যুদ্ধ চালাচ্ছি। শুধু তোমার কথা মনে হয়, তুমি বলেছিলে, ‘খোকা মোরে দেশটা স্বাধীন আইনা দে, তাই আমি পিছুপা হই নাই, হবো না, দেশটাকে স্বাধীন করবই। রাত শেষে সকাল হইব, নতুন সূর্য উঠব, নতুন একটা বাংলাদেশ হইব...। (১৯ নভেম্বর, ১৯৭১, ‘যুদ্ধ খানা হইতে তোমার পোলা’ নুরুল হক)।’
ছয়জন সহযোদ্ধা ইতোমধ্যে শহীদ হয়ে গেছেন, তারপরও ভয় হয় না শুধু মায়ের কথা মনে হয়, কি আশ্চর্য ভালোবাসা মা ও মাটিকে। এই দু’হাজার পঁচিশ সালে আমরা যখন নানা কারনে অসহায় বোধ করি, তখন মনে হয় মৃত্যুকে হাতের মুঠে নিয়ে যারা লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন, শত্রুকে পরাভুত করার জন্য দেশপ্রেমের হাতিয়ার দিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন তারা তো নুতন সূর্যের প্রতীক্ষায় কামানের গোলার সামনে আত্মাহুতি দিতে ভয় পাননি, আমরা কেন, আপাত কালো অন্ধকারের চাদরকে ভেদ করতে ভয় পাবো।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং ৭ মার্চ ৭১-এর ভাষণের নেপথ্যে থেকে বুদ্ধিদীপ্ত পরামর্শ, সাহস, উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়েছেন আমাদের জননীরা; বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন তারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে। ইতিহাসের ধারাবাহিক পরিক্রমায় সভ্যতার সূচনাকারী কৃষির গোড়াপত্তন করে নারী সমাজ। স্বাধীনতা প্রাপ্তির ব্যাপার সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না।
দেশপ্রেমিক মহান জননী, জায়া, কন্যারা দেশকে ভালোবেসে পুরুষের পাশাপাশি নিজের জীবনকে বিপন্ন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের অবদানের কথা বাংলাদেশের মানুষ ভুলবে কী করে! স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা, রওশন আরার মতো অনেক নারী পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধ করেছেন। কলকাতার পার্ক সার্কাস ও পদ্মপুকুরের মাঝামাঝি গোবরা নামক স্থানে শুধু নারী যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। নারী যোদ্ধাদের জন্য অনুরূপ আরও তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে।
গোবরা ক্যাম্পে মেয়েদের দেওয়া হতো তিন রকম ট্রেনিংÑ ১. সিভিল ডিফেন্স, ২. নার্সিং এবং ৩. অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ। সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষক ছিলেন শিপ্রা সরকার ও সেবা চৌধুরী। নার্সিং শেখাতেন ডা. মীরালাল ও ডা. দেবী ঘোষ। অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ কৌশল শেখাতেন ক্যাপ্টেন এসএম তারেক এবং মেজর জয়দীপ সিং। ভারতে শরণার্থী শিবিরে ডাক্তার, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অসংখ্য নারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদের সেবা দিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে আড়াই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছেন; কিন্তু ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তাদের গবেষণায় বলছে, এ সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার। এমনকি ৯ মাসে যে ৩০ লাখ বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছেন, তাদের ২০ শতাংশই নারী। নির্যাতনের ধরন ছিল বর্বরোচিত, অমানুষিক। ঘাতকরা ৭০ শতাংশ ধর্ষিতার সামনে হত্যা বা নির্যাতন করেছে তাদের স্বামী কিংবা নিকট আত্মীয়দের। নির্যাতিত নারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ নারীকে স্পট ধর্ষণ ও স্পট গণধর্ষণ, ১৮ শতাংশ নারীকে কারাগার এবং ক্যাম্পে নির্যাতন করা হয়েছে। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এমএ হাসান গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীদের ৫৬ দশমিক ৫০ শতাংশ মুসলমান, ৪১ দশমিক ৪৪ শতাংশ হিন্দু এবং ২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ছিল অন্যান্য ধর্মের।
যুদ্ধের প্রেরণা দিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে অংশ নিয়েছেন অনেক নারী শিল্পী। পথে-প্রান্তরে, অলি-গলিতে গান গেয়ে তারা অর্থ সংগ্রহ করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় ব্যয় করেছেন। আবার দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এ দেশের গ্রাম-গঞ্জ ও শহর-বন্দরে অসংখ্য নারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া, খাদ্য দেওয়া, অস্ত্র বহন করা, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, গোপন সংবাদ আনা-নেওয়া করেছেন। দেশমাতার জন্য নিজের সন্তান, স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধার সারিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ নারী হয়তো এই শ্রেণিতে পড়েন। অথচ স্বাধীন দেশে এই বীর নারীরা তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা এখনো পাননি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের করা হয়েছে সমাজচ্যুত যেন ধর্ষিত আর নির্যাতিত হওয়াটা তাদেরই ‘অপরাধ’ ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য ভাগীরথীকে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সৈন্যরা। অথচ শহীদ ভাগীরথী স্বাধীন দেশে পাননি তার প্রাপ্য স্বীকৃতি।
প্রয়াত ড. নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইয়ের পাতায় রয়েছে এই বীর নারীদের সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী তার সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করেছিল স্বাধীনতার মতো একটি বড় অর্জনে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর জীবন বাজি রাখার ঘটনাও বিরল নয়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি আজও।
‘বীরের রক্ত স্রোত, মায়ের অশ্রুধারায়’ অর্জিত স্বাধীনতা, দীর্ঘ ৫৪ বছরে অর্জিত উন্নয়নকে আমাদের সংহত করার সময় এসেছে। জাতীয়ভাবে সকলক্ষেত্রে শৃঙ্খলা নিয়ে আসার সময় এসেছে। আমাদের বিশ্বাস জাতি হিসেবে সেই যোগ্যতা আমরা রাখি, মৃত্যুকে পরম মমতায় আলিঙ্গন করে, স্বাধীনতার সূর্যকে যে জাতি বরণ করতে পিছু হটে না, সেই জাতির পক্ষে মায়ের অশ্রুধারা মোছার ক্ষমতা আছে। আমরা অবশ্যই পারবো অরুণোদয় ছিনিয়ে আনতে; কারণ ঘন অমানিশার কোল থেকে আমরা তো নতুন সূর্যের সোনালি আলোয় নিজেদের বারবার আলোকিত করেছি। ইতিহাস তার সাক্ষী আছে, আমরাই তো ইতিহাস রচনা করেছি অসংখ্যবার।
[লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজ গবেষক]