মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
শহর যেন এক বিশাল কংক্রিটের সাগর, যেখানে মানুষ ঢেউয়ের মতো উপচে পড়ছে, অথচ প্রতিটি মানুষ তার নিজের ছোট নৌকায় একাকী ভেসে বেড়াচ্ছে। আকাশের নীল রঙ কাঁচের আর্দ্রতায় মিশে গেছে, সূর্যের আলো কংক্রিটের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে মানুষকে অদৃশ্য ছায়ার মতো আলোকিত করছে। রাস্তার আলো জ্বলছে, গাড়ির হর্ন কোলাহল করছে, কিন্তু হৃদয় নিঃশব্দ একাকিত্বের মধ্যে আটকে আছে। চোখের সামনে অনেক মুখ, তবু প্রতিটি স্পর্শ অচেনা। শহরের জোয়ারে মানুষ আছে, কিন্তু মানবিক উপস্থিতি নেই।
নগর সভ্যতার নিঃসঙ্গতা কেবল মানসিক অভাব নয়, এটি এক অদৃশ্য মহামারী। গবেষণা দেখিয়েছে শহরের মানুষ তার নিজের সঙ্গে সম্পর্ক হারাচ্ছে। ডিজিটাল যুগে মানুষ সংযুক্ত মনে হলেও, প্রকৃত সংযোগের ন্যূনতম স্পর্শ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে পর্দার আড়ালে মানুষ একাকী। বন্ধু আছে, পরিবার আছে, তবু অন্তরের দূরত্ব গভীর। কথার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় না অনুভূতির তরণী।
শহরের শারীরিক পরিবেশও মানুষের একাকীত্বকে শক্তিশালী করছে। আকাশছোঁয়া ভবন, ব্যস্ত রাস্তাঘাট, অপ্রতিরোধ্য শব্দ দূষণ এগুলো মানুষের মনের জন্য এক অদৃশ্য কারাগার। প্রকৃতির স্পর্শ এখানে নগণ্য। মাটির গন্ধ, বাতাসের কোলাহল, বৃক্ষের ছায়া সবই কংক্রিটের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। শহর যেখানে মানুষের স্বপ্ন বিকাশের মঞ্চ, সেখানে প্রকৃতির অভাব মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করছে।
দীর্ঘ একাকিত্ব ডিপ্রেশন, উদ্বেগ এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণ। শহরের মানুষ কষ্টের সঙ্গে বসবাস করছে, অথচ তার কণ্ঠ ম্লান। হৃদয় চিৎকার করছে, তবু কেউ তা শোনে না। একা মানুষে আত্মার জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে, হৃদয় শুষ্ক হয়ে আসছে। শহরের নিঃসঙ্গতা পরিবারেও প্রবেশ করেছে। বাবা-মায়ের মাঝে কথাবার্তা কমে যাচ্ছে। সন্তানরা ঘরে থাকলেও একে অপরের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে। চোখের দেখা আছে, হৃদয়ের স্পর্শ নেই। এই ফাটল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করছে।
এই নিঃসঙ্গতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও শহর কেন্দ্রিক গবেষণা দেখাচ্ছে, শহরে একা থাকা মানুষের সংখ্যা দশ বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজধানী, চট্টগ্রাম, খুলনা সব শহরে মানুষ ভিড়ে থাকলেও নিঃসঙ্গতার মাত্রা চরম। শিল্প, সাহিত্য ও কাব্যও এই নিঃসঙ্গতার গল্প বলছে। নগরের কংক্রিট, কাচ, ধুলো সবই মানুষের অন্তরের অন্ধকারের প্রতীক। শহরের গল্পে মানুষ ঘরবন্দি, চোখের দেখা ভরে, তবু হৃদয় নিঃশব্দ।
তবু সমাধান আছে। নিঃসঙ্গতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়, তবে হ্রাস করা যায়। সামাজিক মিলন বৃদ্ধি, খোলা জায়গা, উদ্যান সৃষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত করা এসব কার্যকর। পরিবার ও বন্ধুত্বকে গুরুত্বপূর্ণ করা, প্রতিবেশীর সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা, নিজের সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করা এগুলো মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
শেষে, শহরের ভিড়ে নিঃসঙ্গতার মাঝেও আশার আলো জ্বলছে। প্রতিটি মানুষ যদি সংযোগের জন্য এক মুহূর্ত সময় দেয়, হৃদয় খুলে দেয়, প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে দেয় নগর সভ্যতা কেবল কংক্রিটের জগত নয়, মানুষের মানবিকতার মহাকাব্য হবে। শহর যেখানে মানুষের আত্মাকে নিঃশব্দ করে, সেখানে সম্পর্কের শক্তি মানুষকে মুক্তি দিতে পারে। নিঃসঙ্গতার মহামারী আমাদের শিখিয়ে যাচ্ছে সংযোগ, সহানুভূতি এবং মানবিকতা কখনও হারায় না।
শহরের কংক্রিটের সাগর যতই ঝরঝরে হোক, মানুষকে বাঁচাবে তার অন্তরের আলো। শহর হতে পারে ঝলমলে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা প্রতিরোধ করতে পারে শুধু মানবিকতা। শেষ পর্যন্ত মানুষ টিকে থাকে হৃদয়ের শক্তিতে, সম্পর্কের উষ্ণতায়, এবং অভ্যন্তরীণ সংযোগের জৌলুসে।
জান্নাতি খাতুন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ইপেপার
জাতীয়
সারাদেশ
আন্তর্জাতিক
নগর-মহানগর
খেলা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
শিক্ষা
অর্থ-বাণিজ্য
সংস্কৃতি
ক্যাম্পাস
মিডিয়া
অপরাধ ও দুর্নীতি
রাজনীতি
শোক ও স্মরন
প্রবাস
নারীর প্রতি সহিংসতা
বিনোদন
সম্পাদকীয়
উপ-সম্পাদকীয়
মুক্ত আলোচনা
চিঠিপত্র
পাঠকের চিঠি
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন
শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
শহর যেন এক বিশাল কংক্রিটের সাগর, যেখানে মানুষ ঢেউয়ের মতো উপচে পড়ছে, অথচ প্রতিটি মানুষ তার নিজের ছোট নৌকায় একাকী ভেসে বেড়াচ্ছে। আকাশের নীল রঙ কাঁচের আর্দ্রতায় মিশে গেছে, সূর্যের আলো কংক্রিটের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে মানুষকে অদৃশ্য ছায়ার মতো আলোকিত করছে। রাস্তার আলো জ্বলছে, গাড়ির হর্ন কোলাহল করছে, কিন্তু হৃদয় নিঃশব্দ একাকিত্বের মধ্যে আটকে আছে। চোখের সামনে অনেক মুখ, তবু প্রতিটি স্পর্শ অচেনা। শহরের জোয়ারে মানুষ আছে, কিন্তু মানবিক উপস্থিতি নেই।
নগর সভ্যতার নিঃসঙ্গতা কেবল মানসিক অভাব নয়, এটি এক অদৃশ্য মহামারী। গবেষণা দেখিয়েছে শহরের মানুষ তার নিজের সঙ্গে সম্পর্ক হারাচ্ছে। ডিজিটাল যুগে মানুষ সংযুক্ত মনে হলেও, প্রকৃত সংযোগের ন্যূনতম স্পর্শ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে পর্দার আড়ালে মানুষ একাকী। বন্ধু আছে, পরিবার আছে, তবু অন্তরের দূরত্ব গভীর। কথার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় না অনুভূতির তরণী।
শহরের শারীরিক পরিবেশও মানুষের একাকীত্বকে শক্তিশালী করছে। আকাশছোঁয়া ভবন, ব্যস্ত রাস্তাঘাট, অপ্রতিরোধ্য শব্দ দূষণ এগুলো মানুষের মনের জন্য এক অদৃশ্য কারাগার। প্রকৃতির স্পর্শ এখানে নগণ্য। মাটির গন্ধ, বাতাসের কোলাহল, বৃক্ষের ছায়া সবই কংক্রিটের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। শহর যেখানে মানুষের স্বপ্ন বিকাশের মঞ্চ, সেখানে প্রকৃতির অভাব মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করছে।
দীর্ঘ একাকিত্ব ডিপ্রেশন, উদ্বেগ এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণ। শহরের মানুষ কষ্টের সঙ্গে বসবাস করছে, অথচ তার কণ্ঠ ম্লান। হৃদয় চিৎকার করছে, তবু কেউ তা শোনে না। একা মানুষে আত্মার জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে, হৃদয় শুষ্ক হয়ে আসছে। শহরের নিঃসঙ্গতা পরিবারেও প্রবেশ করেছে। বাবা-মায়ের মাঝে কথাবার্তা কমে যাচ্ছে। সন্তানরা ঘরে থাকলেও একে অপরের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে। চোখের দেখা আছে, হৃদয়ের স্পর্শ নেই। এই ফাটল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করছে।
এই নিঃসঙ্গতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও শহর কেন্দ্রিক গবেষণা দেখাচ্ছে, শহরে একা থাকা মানুষের সংখ্যা দশ বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজধানী, চট্টগ্রাম, খুলনা সব শহরে মানুষ ভিড়ে থাকলেও নিঃসঙ্গতার মাত্রা চরম। শিল্প, সাহিত্য ও কাব্যও এই নিঃসঙ্গতার গল্প বলছে। নগরের কংক্রিট, কাচ, ধুলো সবই মানুষের অন্তরের অন্ধকারের প্রতীক। শহরের গল্পে মানুষ ঘরবন্দি, চোখের দেখা ভরে, তবু হৃদয় নিঃশব্দ।
তবু সমাধান আছে। নিঃসঙ্গতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়, তবে হ্রাস করা যায়। সামাজিক মিলন বৃদ্ধি, খোলা জায়গা, উদ্যান সৃষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত করা এসব কার্যকর। পরিবার ও বন্ধুত্বকে গুরুত্বপূর্ণ করা, প্রতিবেশীর সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা, নিজের সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করা এগুলো মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
শেষে, শহরের ভিড়ে নিঃসঙ্গতার মাঝেও আশার আলো জ্বলছে। প্রতিটি মানুষ যদি সংযোগের জন্য এক মুহূর্ত সময় দেয়, হৃদয় খুলে দেয়, প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে দেয় নগর সভ্যতা কেবল কংক্রিটের জগত নয়, মানুষের মানবিকতার মহাকাব্য হবে। শহর যেখানে মানুষের আত্মাকে নিঃশব্দ করে, সেখানে সম্পর্কের শক্তি মানুষকে মুক্তি দিতে পারে। নিঃসঙ্গতার মহামারী আমাদের শিখিয়ে যাচ্ছে সংযোগ, সহানুভূতি এবং মানবিকতা কখনও হারায় না।
শহরের কংক্রিটের সাগর যতই ঝরঝরে হোক, মানুষকে বাঁচাবে তার অন্তরের আলো। শহর হতে পারে ঝলমলে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা প্রতিরোধ করতে পারে শুধু মানবিকতা। শেষ পর্যন্ত মানুষ টিকে থাকে হৃদয়ের শক্তিতে, সম্পর্কের উষ্ণতায়, এবং অভ্যন্তরীণ সংযোগের জৌলুসে।
জান্নাতি খাতুন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়