alt

সাময়িকী

মোম জোছনার সিলসিলা

দিলারা মেসবাহ

: বৃহস্পতিবার, ০১ জুলাই ২০২১

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

আল্লাহর কিরা! ভরা পূর্ণিমা রাইত আমারে ডাকে ‘আয় আয় তুতু... তু!... যেমন গেরামের বৌ-ঝিরা তাগরে পাতি হাঁসগুলারে জলের তামেশা থেকে ডাঙ্গায় আনতে হরফর করে। আবার দেহেন, গেন্দু পাগলার বশ সেই সরাইল সারমেয়টারেও সে দিবানিশি ডাকে, ‘কই গেলি মানিক, আয় আয় তু... তু ...তু! এই দ্যাখ পিন্টুর দোকান থেকা আস্তা একখান পাউরুটি আনছি। শালা সুমুন্দির পুত, হারামখোর অমনে কি দেয় রে? হাতসাফাই কইর‌্যা আনছি।’ সরাইল কুত্তাটা গেন্দু পাগলার গলা শুনলেই মাতোয়ালা! হ্যাচর প্যাচর কইর‌্যা সে আইসা পড়বো! একটু খানিক তফাতে দাঁড়াইয়া সে জিবলা ঝুলাইয়া দেয়। লোল পড়ে! চক্ষু দুইডা বুঝি চকমকায়। হের পর এক্কু লম্ফে গেন্দুর গান্ধা লুঙ্গির প্যাঁচে ঢুইকা কুঁই কুঁই করে। দুই পাগলে কী ঝিলিম ঝিলিম তামেশা করে গো। ঢং-এর উপরে ঢং! স¹ল বায়োস্কোপ দেখছি! দুনিয়াডা এমন রংবাজ? ...

আমার মহামহিম আব্বাজান, এক্কেবারে ময়দা-ময়ান নরম দিলের মানুষ। কেরানিগিরি চাকরিখান বগলে নিয়া সংসারের চাক্কা ঘুরান। মা মানুষটাও কুলফি বরফ। জোড়াতালির সংসারডা কেমন হাইস্যা খেইলা কাটান! মায়ে আমার নাম রাখছিলেন নিশি! হাসিদা খাতুন, মা আমার অষ্টম শ্রেণিতক পড়াশোনা।

আমার মায়ে আমার আব্বাজানরে আবোলতাবোল ভালবাসে! আমি কিঞ্চিত বুঝি! আমার তো বৌ সাজনের বয়সডা, বিলকুল। মনে হয় উন্নিশ টুন্নিশ হইবো। ইন্টার পড়ি। ভরা কাটালের রাত আমার, গোপন বাসরের বাহানা!

আমার মায়ে মাঝে মধ্যে আব্বাজানরে কয়, ‘আবিত্তা মাইয়ারে নিয়া আমি থাকি নিদহারা। বাপের ইহজন্মে হইবে না দিশা! মেয়ারে তুলুতুলু কইরা পাঞ্জরের খোপে রাইখ্যা দিছে! কথাগুলো কয় মা জননী যেন বা একটুখানিক গোস্বা-গোস্বা ধমক! কিন্তু বিষয়ডা ঐ রকম, কিঞ্চিৎ মধুর। আমার জননীর ব্রেইনও এক্কেবারে ডাবের পানি। মায় তো কাকবন্ধ্যা। তাইলে বুঝেন! আমার মতো উন্নিশ-টুন্নিশ বয়স্থা কন্যার হারাই হারাই দশা। বাপে মায়ে আমারে গলার তাবিজখান বানাইয়া রাখছে। দিনরাইত তারা কইতে থাকে, ‘মা গাওগোছল দেও। মা খাইয়া লও, বেলা বাড়লে পিত্তি পড়বোনে। নিশি গো, আমাগর ময়না পক্ষীডা পুত্লাডা, নিদানের সম্বল। সাত রাজার ধান।’... বাপে কোন সময় ডাকে, আমার হীরামন, আমার হরবোলা-আমার মিউ বিলাইডা!

বাপের নিশা পুঁথি পাঠের। গাজী-কালু-চম্মাবতীর পুঁথি পড়তে পড়তে বেহুঁশ। বাপের পরদাদা সুন্দরবনের বাউয়াল আছিলেন। আমার দাদা ভিটা নাড়া দিয়া উত্তরবঙ্গে দিকে চইল্যা আসেন। আমার দাদার ভাই মৌয়াল ছিলেন, তারে বাঘে টাইন্যা নিছিল! বাপে যখন তাঁর ভিটিমাটির কথা কইতে থাকে, তখন সে একটা ফান্দে পড়া বগাডার মতো ডানা ঝাপটায়। গাজীর অলীক কাহিনী কইতে কইতে বাজানের গলা শুকায়! গাজী অমনি কামেল মানুষ, যার ডরে বাঘ মুকখান লুকাইছে, কুম্ভীরে পলাইছে! বাদাবনের জনমানুষ গাজীর নামে মান্নত করে শিরনি দেয়, পাঠা বলি দেয় আইজও। হিন্দু মুসলমান জাতপাত নাই! মায় মাঝে মধ্যে মিছরির ছুরিডা ছুইরা মারেন, ‘অখ্খন নিস্তার দেও। ছাড়ান দেও। মাসকালাইয়ের ডাইলে মাছে মুড়া, লেন্জা দিয়া পাক করছি। ভাত জুড়াইয়া গেলে স্বাদ থাকে না।’

এক বচ্ছর হইলো আমরা বদলগাছি বদলি হইয়া আসছি। আমগো তেমুন লটবহর নাই। মায়ে আমার নতুন কইর‌্যা কেরানীর সংসারখান সাজাইছে। গরিবী হালে। কিন্তু ভালোবাসার যাদু দিয়া! একখান গামছাও চার পাট্টা ভাঁজ কইর‌্যা রাহেন মায়। আর হান্ডি, পাতিল, খুন্তি, কড়াই- এমন ঝলমলা, যেমুন মনে হয় আজই মাত্র খরিদ করা হইছে। মায়ে আবার দেহত্তত্ত্ব, মরমি গান জানে, গলায় মধুর চাক। উঠানে জোছনা খেলে যেদিন, সেদিন-রাতজাগা নিশাচর মায়ে, বাপে আর আমি কন্যা-উনিশ টুন্নিশ! তিন পাগলের মজমা জমে!... জোনাকগুলা টিপ টিপ কইর‌্যা চায়- বাদুড় রাতচরা পাখি ডানায় মেলা দিয়া ওড়াওড়ি করে। চাঁন্দের বক্ষ থেকা টপটপাইয়া মধু ঝরে? আমার বাউলামি বহুত মাতেলা। মায়ের কণ্ঠ যেন বা মিছরি। আমার নানাজান আসলাম মৃধা নামজাদা গায়েন। মায়ে গায়, দেহতত্ত! ‘অচেনা নদীতে কেউ কোরোনা স্নান।’... আমাদের উঠানে যেন শত শত চম্পক ফুল ফোটে! ... ভাব হইলো সত্য- মনের মইধ্যে টগবগায়- তারই ভাপে ভাব লাগে শরীরে, মনডার গহিন ভিতরে!...

আমার কী জানি হয়, শুনবেন? ভরা কাটালের রাইত-পূর্ণিমার আছর। দুনিয়াবি মায়া প্রপঞ্চ। আমি ইন্টার পড়ি। কিছু আউট বুকও মুখোস্তো! মানে বদলগাছির বই পুস্তক যোগাড় করা নিদারুণ কষ্টের

আমরা দৈনিক রুহিত মাছের পেটি, মহাশোলের ব্যাঞ্জন খাইনা অবশ্যই। তাইলে কী হয়! ঐ এক কড়াই মিষ্টিকুমড়া কয়েক চিম্টি কালাজিরা রসুন পিঁয়াজ মজায় মা। মাঝে মাঝে বাচা মাছ, তিল ভর্তা এসবই মধুর লাগে। ভাবনদীর ঝাপুর ঝুপুর খেলাটাই খালি আসল? বাপে কইতেই থাকে তার দাদা পরদাদার কাহিনি। দাদার আছিল ইয়া বুকের সিনা। চম্পাকলা পাক ধরলে যেমুন রঙ হয় তেমন রঙা। এক বিরাট পুরুষ। দিলে সাহসের সমুদ্দুর। ছিলেন বাউয়ালি। কিন্তু বাপের চাচারে বাঘ্রই ঘাড় কামড়াইয়া নিয়া গেছে সুন্দরবনের গহিন জঙ্গলে।

আমার কী জানি হয়, শুনবেন? ভরা কাটালের রাইত-পূর্ণিমার আছর। দুনিয়াবি মায়া প্রপঞ্চ। আমি ইন্টার পড়ি। কিছু আউট বুকও মুখোস্তো! মানে বদলগাছির বই পুস্তক জোগাড় করা নিদারুণ কষ্টের। আমার নতুন বান্ধবী মরিয়ম, ওর চাচাতো ভাই সোলেমান-প-িতের বাপ- সেই মরিয়মরে দেয় মাঝে মধ্যে। আমি ‘দেবদাস’ ‘শ্রীকান্ত’, ‘কবি’ পড়ছি। পড়ছি আর কান্দন পাইছে, কী যে -ণডা জানি না সত্য।

জোছনা আমার মরণদশা বানায়। গলার কাছে থোক থোক কান্দন ওঠে! ‘আরে ফকফকা পূর্ণিমা তিথি। তুমি মাইয়া উন্নিশ টুন্নিশ তুমি ভরা কাটালের দিনে ভাইসা বেড়াও! কিসের তিয়াসে কান্দো নিশি কন্যা?’ নিজেরেই বকাবাদ্য করি। আর একলা মনে হাসি। আসলে আমার জটিল দশা ঘটে। প্যাঁচাল... প্যাঁচাল? আমার গেন্দু পাগলার দশা ঘটছে। আমার ভিত্তর থেকে গুনগুনানি ওঠে ‘তা না না নারে নারে নারে না। খেঁজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো, মন, নইলে রস পড়িলে গোড়া পচে। অকালে হবে মরণ!’

বদলগাছির বোগলে পাহাড়পুর গ্রাম। বারদুই আসছি মরিয়মের সাথে পাহাড়পুর বিহারে। জোছনা রাতে! আমি যেন পায়ে হাঁটি না, মনপবনের পাল্কিত চড়ি! যেনবা আমি কেরানীর ঝি নিশি না, রাজরানি কোন। বাতাসে গুনগুনানি, হুমহুমাহুম! ছয় বেহারা।... সেই দিন মইরমের চাচাতো ভাই সোলেমান সফররাজ সেই মানুষটা রাজার কুমার। রূপবান পুরুষ -ে কয়!... সেই মানুষটা বদলগাছির একটা ইশ্কুলে ইতিহাস পড়ান। তিনি পণ্ডিতজাতের, পাগলা ছাঁটের। ইনার সাথে আমার পয়লা প্রথম দেখা হয়ছিল নওগাঁয় বলিহার রাজবাড়ির সামনে। সোনালু ফুলগাছটা হলুদ ঝড়বাতি নিয়া খাড়া। সেই সময় তেনার সাথে চোখাচোখি? হায় হায় এমন রূপবান মানুষ আমারে ভাসাইয়া নিয়া যায় কহরদবিয়ায়ু! পড়ে শুনছি মানুষটা মহা বিদ্যাধর, ভাবের পাগল! ঐ রকম এক মানুষ চোক্ষের মইধ্যে সাত সাগরের ছলাৎ ছলাৎ নিয়া নজর করে, তাইলে আমার করনীয় কী হয়? কন তো? আমি তখন- মতো আমার মধ্যে নাই। ভাসতাছি... পদ্ম দীঘির ঢেউয়ের ছলনা। এইডা মনে হয়, উন্নিশ টুন্নিশ বছরের যাদু বিস্তার, তিন ভুবনের!...

সারাদিন মায়ের পাকঘরের সব কাম করছি। মায়েরে ভজাইতে হয় তো! কই, ‘মা জননী আইজ রাইতে মরিয়ম গো বাড়িত থাকবো ওর ছোট ভাইডা চিন্টু, তারে তুমি দেখছ, হেই ছেঁড়ার মুসলমানি। আমারে গীত গাইতে হইবো।’ মা প্রথম থম-মাইর‌্যা থাকে। বাপ গেছে নওগাঁ সদরে, কামে। খানিক গোস্বাভাব নিয়া কইলেন, ‘যাও, কিন্তুক মাইয়া আইজ ভরা পূর্ণিমা ফাল্গুন মাসের দোল-পূর্ণিমা। আসমান থেইক্যা যুবতী কন্যাগো উপর আছর পড়তে পারে। সুরা নাছ পইড়্যা বুকে ফুঁ দিয়া যাইস। বিহারেও যাবি মন কয়। সাবধান, তুমি তো ভাবের পাগল-বাপ দাদার তরিকা পাইছ না? মায়ালোকের কলঙ্ক হইতে সুময় লাগে না মেয়া।’ মায়ে তার সুন্দর আঙুলগুলো নাচাইয়া বাইগুন ভর্তা বানাইতেছেন। চুলায় ভাতের বলক। কী সুবাস। পাবদা মাছের লাল টকটকা সালুন। দপদপাইয়া পাত পাইতা বসি আমি। ভাতের দানাগুলো লাসা লাসা। গায়ে একটু ফেন লাইগা আছে। তাতেই বহুত মোলায়েম। খাইলামও বেহেশ্তি খানা। শেষমেশ বুড়া আঙুলে টাইনা মধুভাত খাইলাম?

আমরা তখন পাহাড়পুর বিহারে। সোলেমান সফলরাজ চাঁদের ভরা যৌবন টেক্কা দিয়া বসেছেন মইধ্যে খানে। মরিয়মের পাশে আমি খানিক শরমিন্দা ভাব। চাঁদটা হাসতাছে। মাথার উপর এতোবড় একখান পাপড়ভাজা। ঐ সোমপুর বিহারে যেজন জোছনা রাতের লীলানৃত্য দেখছেন, সেতো জোছনার বশ, গোলাম। তার বুঝি মুক্তি নাই। সোমপুর মানে চাঁন্দপুর আপনে তো জানেনই। সোম মানে চাঁদ!

আল্লাহর কসম, ‘জোছনা আমারে ডাকে, আয় আয় তু... তু... তু? অযুত নিযুত বছর আগে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এই বিহারে পাঠ নিত- ধ্যানজ্ঞান, ধর্মকর্ম এই মহাভিটায় হইত। গা বারবার শিউরে ওঠে। খানাঘর, শয়নঘর, পাঠাগারের নমুনা। কোন ঘরে কুলুঙ্গি আছে। দেওয়ালে টেরাকোটা ফলক! এখানে দেশ দেশান্তর থেকা ভিক্ষুরা আসতো। জ্ঞানর্জনের অছিলায়। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানও ছিলেন এইখান- আচার্য। নালন্দা বিহারের সমান-সারা দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠা সোমপুর বিহার। এই ‘জলদ গম্ভীর’ শব্দডা জানি। সেই সুরে সেই রূপকুমার এইসব ইতিহাস বয়ান করেন। আমি ইতিহাস শুনি, আর মানুষের কণ্ঠে অচিন বাণী শুনি। আমি আর পারি না। কতো কিসিমের উলাঝুলা ভাবনা মনটারে বিহবল বেহাত করে দেয়! আমি পারি না আল্লাহর কিরা এমন চাঁদভাসা ফাল্গুন রাতে আমার মাথাডা ফের আমার থাকে না! পুরা আউলা বাউলা দশা?

কিঞ্চিত আনমনা কম কথার সফররাজ কয়েছিল আমার দিক আঙুলের ইশারায়, জোছনা নিশিচারিনী নিশি কন্যা?...

আমারে দেখায় কেমুন, বলা হয় নাই। উন্নিশ টুন্নিশ বছরের আমি হালকা পাতলা গড়নের শ্যামলা মেয়ে। বয়সের খানিক জেল্লা ছিল মনে হয় স্বপ্নভরা জোছনাকুসুম ফোটা দুই চক্ষু আমার নাকি উত্তম অতি উত্তম!... আমার এই যাদুকালের ঢেউ ভাঙ্গা বুকের অতলে আমি যেমুন ডুব-পাড়ি। কূল কিনারা পাই না...?

ঐ সেই অন্যমনা রূপকুমার সোলেমান মাস্টার আর একবার কয়েছিল, ‘কালো? তা সে যতোই কালো হোক। দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।’ আমি ‘কৃষ্ণকলি’ কবিতা সেই -ণে পুরা ঠা ঠা মুখস্তো করে ফেলছি। খোদার কসম, আমার বুক ধড়ফড় করে।

ফাল্গুনী পূর্ণিমা, আমার বান্ধবী রাধারানি কয়, দোল পূর্ণিমা! সেইরকম রাতভরা মোম জোছনা! সেই অযুত নিযুত বছরের প্রতœ সোমপুর বিহার। হলুদ রঙা সোনাজলে ঝলমল ঝিলিক! বাতাস আসে চুপি চুপি দখিনা বাতাস, অচিনা ফুলগন্ধে তেলেসমাত! ...

আমি, মরিয়ম আর আনমনা মাস্টার সোলেমান!... কী সুন্দর গো... চোখের সামনে ভাসে বায়োস্কোপ... এক ঝাঁক কমলা বসন গায়ে বেলমাথা ভিক্ষু ‘বন্ধুং স্মরনং গচ্ছামি’... জপতে জপতে হাঁইটা যায় দূরে... আবছা! চন্দ্রাহত মানুষেরা কতো কী না দেখে গো? আপনি দেখছেন না পাহাড়পুর বিহার? না দেখলে অক্ষন টিকিট কাটেন!...

সোলেমান ভাইরে মরিয়ম যতো চেনে আমি তো ভাবের পাগলি, ততো চিনা উঠবার টাইম পাইলাম কই? অথচ আমার মনডার ভেতরে সেই কুমার গ্যাঁট হইয়া বইসা রইছে। কী তার আলো জোছনার ঢল। জোছনা কুমার?... সোলেমান ভাইয়ের কথা উঠলে সই মরিয়ম কয়, ‘ওয়ালী সোলেমান ভাইরে আমি বহুতই ডরাই!’ ওয়ালী? আমি হাসি ফটিক!

তিনি তো অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানরে নিয়া গবেষণা করতাছেন। পুস্তক রচনায় মন দিছেন। বিশাল জানেওয়ালা মানুষ-মইরম কয়! আমি কী কম বুঝি? কিন্তু রূপবান জোছনা কুমারের মনডার রঙ কেমুন টকটকা লাল, কমলা না কি ফ্যাকসা?

মোম আলোয় তাঁর মুখখান দেখি একখান হল্দা বসরাই গোলাপ ফুল যেমন! মরিয়ম সই আচমকা উঠে যায়- এক তোড়া সুগন্ধি ডাঁটফুল তুলে আনে। আমার মোটা মোটা বেনীর মইধ্যে গাঁথে। কী যতনে। দেখি আনমনা কুমারের কমলাকোয়া ঠোঁটের কোনে এক বিন্দু হাসির রেখা! মরিয়ম খানিক বাদে আবার উধাও। ওয়ালী সোলেমান দুধকুমার উবু হয়ে একমুঠ দূর্বাঘাস তুলে আনে। আমি চোখ সরাই না। সোলেমানি যাদু একখান ঘাসের আংটি বানায়া ফেলায় কুমার। আমার শ্যামল বরন অনামিকায় পরায়া দেন অচিন সাধক রূপকুমার। আমি জোছনা রাতের তামেশা দেখি! আমার উন্নিশ টুন্নিশ বছরের কলিজাটায় কে খানি জাফরানি রঙ লাগাইয়া দিল! আল্লার কসম আমি আর নাই! ...

বিহারের একটা কক্ষের ভিতরে কুলুঙ্গিতে রাখছিলাম মাছের বড়া। কলাপাতায় প্যাঁচ দিয়া। আমার কলিজা কাঁপে হাতখানাও কাঁপে। দখিনা বাতাসে যেমন কচি কলাপাতা থরথরায়! আমার ঘোর কাটে না। একখান বড়া তুলে সেই সোলেমান সফররাজের মুখে। সে চক্ষু বন্ধ করে কয়, ‘আহা কী স্বাদ!’ আমি পাখনা গজান পিপীলি- মতো উড়ি এদিক সেদিক। যেনবা জন্মের কালা বোবা অন্ধ এক উনিশ টুন্নিশ বয়স্থা কন্যা! আচমকা মরিয়ম সেই অযুত নিযুত বচ্ছরের কোঠায় ঢোকে। আর আরো আচমকা ‘আচার্য’ সোলেমান হাঁটা ধরে। কী তার পৌরুষ গো? তার ঝাঁকড়া চুল ঝলমল করে। তার সে ভঙ্গিমার তুলনা আমি দিবার পারি না। সইয়ের হাতে কয়েকটা দাদমর্দন হলুদ ফুল। আমি সইরে বুকে জাঁপটে জনমের ক্রন্দনে ঢলে পড়ি। আমার নিয়াস বন্ধ হয়া আসে।

এই দ্যাখ, সই গো সোলেমান সফরবাজ আমার আঙুলে ঘাসের আঙুটি পরাইয় দিছেন। তাইলে কী আমাদের বিবাহ!...

মরিয়ম একটা কথাও কয় না! তার দুই চক্ষু কহরদরিয়া!

না-না-না সই- সোলেমান ভাই ফানাফিল্লাহ্ বাকাবিল্লাহ তরি- ওয়ালী। কল্বের কলুষ সাফ করেন তিনি প্রতিরাতে, অজিফায়, সিজদায়। মোরাকাবায় দুনিয়ারী দুমড়াইয়া আসমান ছুঁইতে চান। তিনি তো জিকিরে জিকিরে রাইত কাবার করেন। নিশি সই তিনি সুফি-তাসাওউফ? দুনিয়ার মায়া থেকে মুক্তির জন্যে মুরশিদ ধরছেন। সই আমারে জাঁপটে ধরে। আমি খাড়া হইয়া সোমপুর বিহারের উঁচা গাঁথনির উপর দাঁড়াই। পাতকী! ভরা জোছনার ভুলভুলাইয়া আমার কলিজার বাত্তি নিভাইয়া দিল! কুলুঙ্গির কোন ভিতর থেকে এক ঝাঁক বাদুড় উড়া গেল, পাহাড়পুর বিহারের সকল গরিমার উপর দিয়ে। আমার অন্ধ- জোছনা রাতে কানে ভেসে আসে মায়ের দেহতত্ত্ব- যেন মিছরি চাকভাঙ্গা মধু ‘অচেনা নদীতে কেউ কোরোনা স্নান’।

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

তাপস গায়েনের কবিতা

ছবি

চির অন্তরালে বশীর আলহেলাল

ছবি

“জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান”

ছবি

শব্দহীন শোকের ভেলায় চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ!

ছবি

শোকার্ত পুষ্পাঞ্জলি

ছবি

মনন-মেধা আর বিনোদনের ত্রিবেণী সঙ্গম

ছবি

বিস্ময় না কাটে

ছবি

বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ছবি

কাজী নজরুল ও কাজী আব্দুল ওদুদ প্রসঙ্গ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

লকডাউন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

রাজবন্দি নজরুল

ছবি

তাঁর তৃতীয় জীবন

ছবি

নজরুল ইসলাম ও উন্মুক্ত পথ

ছবি

শহরের শেষ রোদ

ছবি

একজন মায়াতরুর গল্প

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

মোম জোছনার সিলসিলা

দিলারা মেসবাহ

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

বৃহস্পতিবার, ০১ জুলাই ২০২১

আল্লাহর কিরা! ভরা পূর্ণিমা রাইত আমারে ডাকে ‘আয় আয় তুতু... তু!... যেমন গেরামের বৌ-ঝিরা তাগরে পাতি হাঁসগুলারে জলের তামেশা থেকে ডাঙ্গায় আনতে হরফর করে। আবার দেহেন, গেন্দু পাগলার বশ সেই সরাইল সারমেয়টারেও সে দিবানিশি ডাকে, ‘কই গেলি মানিক, আয় আয় তু... তু ...তু! এই দ্যাখ পিন্টুর দোকান থেকা আস্তা একখান পাউরুটি আনছি। শালা সুমুন্দির পুত, হারামখোর অমনে কি দেয় রে? হাতসাফাই কইর‌্যা আনছি।’ সরাইল কুত্তাটা গেন্দু পাগলার গলা শুনলেই মাতোয়ালা! হ্যাচর প্যাচর কইর‌্যা সে আইসা পড়বো! একটু খানিক তফাতে দাঁড়াইয়া সে জিবলা ঝুলাইয়া দেয়। লোল পড়ে! চক্ষু দুইডা বুঝি চকমকায়। হের পর এক্কু লম্ফে গেন্দুর গান্ধা লুঙ্গির প্যাঁচে ঢুইকা কুঁই কুঁই করে। দুই পাগলে কী ঝিলিম ঝিলিম তামেশা করে গো। ঢং-এর উপরে ঢং! স¹ল বায়োস্কোপ দেখছি! দুনিয়াডা এমন রংবাজ? ...

আমার মহামহিম আব্বাজান, এক্কেবারে ময়দা-ময়ান নরম দিলের মানুষ। কেরানিগিরি চাকরিখান বগলে নিয়া সংসারের চাক্কা ঘুরান। মা মানুষটাও কুলফি বরফ। জোড়াতালির সংসারডা কেমন হাইস্যা খেইলা কাটান! মায়ে আমার নাম রাখছিলেন নিশি! হাসিদা খাতুন, মা আমার অষ্টম শ্রেণিতক পড়াশোনা।

আমার মায়ে আমার আব্বাজানরে আবোলতাবোল ভালবাসে! আমি কিঞ্চিত বুঝি! আমার তো বৌ সাজনের বয়সডা, বিলকুল। মনে হয় উন্নিশ টুন্নিশ হইবো। ইন্টার পড়ি। ভরা কাটালের রাত আমার, গোপন বাসরের বাহানা!

আমার মায়ে মাঝে মধ্যে আব্বাজানরে কয়, ‘আবিত্তা মাইয়ারে নিয়া আমি থাকি নিদহারা। বাপের ইহজন্মে হইবে না দিশা! মেয়ারে তুলুতুলু কইরা পাঞ্জরের খোপে রাইখ্যা দিছে! কথাগুলো কয় মা জননী যেন বা একটুখানিক গোস্বা-গোস্বা ধমক! কিন্তু বিষয়ডা ঐ রকম, কিঞ্চিৎ মধুর। আমার জননীর ব্রেইনও এক্কেবারে ডাবের পানি। মায় তো কাকবন্ধ্যা। তাইলে বুঝেন! আমার মতো উন্নিশ-টুন্নিশ বয়স্থা কন্যার হারাই হারাই দশা। বাপে মায়ে আমারে গলার তাবিজখান বানাইয়া রাখছে। দিনরাইত তারা কইতে থাকে, ‘মা গাওগোছল দেও। মা খাইয়া লও, বেলা বাড়লে পিত্তি পড়বোনে। নিশি গো, আমাগর ময়না পক্ষীডা পুত্লাডা, নিদানের সম্বল। সাত রাজার ধান।’... বাপে কোন সময় ডাকে, আমার হীরামন, আমার হরবোলা-আমার মিউ বিলাইডা!

বাপের নিশা পুঁথি পাঠের। গাজী-কালু-চম্মাবতীর পুঁথি পড়তে পড়তে বেহুঁশ। বাপের পরদাদা সুন্দরবনের বাউয়াল আছিলেন। আমার দাদা ভিটা নাড়া দিয়া উত্তরবঙ্গে দিকে চইল্যা আসেন। আমার দাদার ভাই মৌয়াল ছিলেন, তারে বাঘে টাইন্যা নিছিল! বাপে যখন তাঁর ভিটিমাটির কথা কইতে থাকে, তখন সে একটা ফান্দে পড়া বগাডার মতো ডানা ঝাপটায়। গাজীর অলীক কাহিনী কইতে কইতে বাজানের গলা শুকায়! গাজী অমনি কামেল মানুষ, যার ডরে বাঘ মুকখান লুকাইছে, কুম্ভীরে পলাইছে! বাদাবনের জনমানুষ গাজীর নামে মান্নত করে শিরনি দেয়, পাঠা বলি দেয় আইজও। হিন্দু মুসলমান জাতপাত নাই! মায় মাঝে মধ্যে মিছরির ছুরিডা ছুইরা মারেন, ‘অখ্খন নিস্তার দেও। ছাড়ান দেও। মাসকালাইয়ের ডাইলে মাছে মুড়া, লেন্জা দিয়া পাক করছি। ভাত জুড়াইয়া গেলে স্বাদ থাকে না।’

এক বচ্ছর হইলো আমরা বদলগাছি বদলি হইয়া আসছি। আমগো তেমুন লটবহর নাই। মায়ে আমার নতুন কইর‌্যা কেরানীর সংসারখান সাজাইছে। গরিবী হালে। কিন্তু ভালোবাসার যাদু দিয়া! একখান গামছাও চার পাট্টা ভাঁজ কইর‌্যা রাহেন মায়। আর হান্ডি, পাতিল, খুন্তি, কড়াই- এমন ঝলমলা, যেমুন মনে হয় আজই মাত্র খরিদ করা হইছে। মায়ে আবার দেহত্তত্ত্ব, মরমি গান জানে, গলায় মধুর চাক। উঠানে জোছনা খেলে যেদিন, সেদিন-রাতজাগা নিশাচর মায়ে, বাপে আর আমি কন্যা-উনিশ টুন্নিশ! তিন পাগলের মজমা জমে!... জোনাকগুলা টিপ টিপ কইর‌্যা চায়- বাদুড় রাতচরা পাখি ডানায় মেলা দিয়া ওড়াওড়ি করে। চাঁন্দের বক্ষ থেকা টপটপাইয়া মধু ঝরে? আমার বাউলামি বহুত মাতেলা। মায়ের কণ্ঠ যেন বা মিছরি। আমার নানাজান আসলাম মৃধা নামজাদা গায়েন। মায়ে গায়, দেহতত্ত! ‘অচেনা নদীতে কেউ কোরোনা স্নান।’... আমাদের উঠানে যেন শত শত চম্পক ফুল ফোটে! ... ভাব হইলো সত্য- মনের মইধ্যে টগবগায়- তারই ভাপে ভাব লাগে শরীরে, মনডার গহিন ভিতরে!...

আমার কী জানি হয়, শুনবেন? ভরা কাটালের রাইত-পূর্ণিমার আছর। দুনিয়াবি মায়া প্রপঞ্চ। আমি ইন্টার পড়ি। কিছু আউট বুকও মুখোস্তো! মানে বদলগাছির বই পুস্তক যোগাড় করা নিদারুণ কষ্টের

আমরা দৈনিক রুহিত মাছের পেটি, মহাশোলের ব্যাঞ্জন খাইনা অবশ্যই। তাইলে কী হয়! ঐ এক কড়াই মিষ্টিকুমড়া কয়েক চিম্টি কালাজিরা রসুন পিঁয়াজ মজায় মা। মাঝে মাঝে বাচা মাছ, তিল ভর্তা এসবই মধুর লাগে। ভাবনদীর ঝাপুর ঝুপুর খেলাটাই খালি আসল? বাপে কইতেই থাকে তার দাদা পরদাদার কাহিনি। দাদার আছিল ইয়া বুকের সিনা। চম্পাকলা পাক ধরলে যেমুন রঙ হয় তেমন রঙা। এক বিরাট পুরুষ। দিলে সাহসের সমুদ্দুর। ছিলেন বাউয়ালি। কিন্তু বাপের চাচারে বাঘ্রই ঘাড় কামড়াইয়া নিয়া গেছে সুন্দরবনের গহিন জঙ্গলে।

আমার কী জানি হয়, শুনবেন? ভরা কাটালের রাইত-পূর্ণিমার আছর। দুনিয়াবি মায়া প্রপঞ্চ। আমি ইন্টার পড়ি। কিছু আউট বুকও মুখোস্তো! মানে বদলগাছির বই পুস্তক জোগাড় করা নিদারুণ কষ্টের। আমার নতুন বান্ধবী মরিয়ম, ওর চাচাতো ভাই সোলেমান-প-িতের বাপ- সেই মরিয়মরে দেয় মাঝে মধ্যে। আমি ‘দেবদাস’ ‘শ্রীকান্ত’, ‘কবি’ পড়ছি। পড়ছি আর কান্দন পাইছে, কী যে -ণডা জানি না সত্য।

জোছনা আমার মরণদশা বানায়। গলার কাছে থোক থোক কান্দন ওঠে! ‘আরে ফকফকা পূর্ণিমা তিথি। তুমি মাইয়া উন্নিশ টুন্নিশ তুমি ভরা কাটালের দিনে ভাইসা বেড়াও! কিসের তিয়াসে কান্দো নিশি কন্যা?’ নিজেরেই বকাবাদ্য করি। আর একলা মনে হাসি। আসলে আমার জটিল দশা ঘটে। প্যাঁচাল... প্যাঁচাল? আমার গেন্দু পাগলার দশা ঘটছে। আমার ভিত্তর থেকে গুনগুনানি ওঠে ‘তা না না নারে নারে নারে না। খেঁজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো, মন, নইলে রস পড়িলে গোড়া পচে। অকালে হবে মরণ!’

বদলগাছির বোগলে পাহাড়পুর গ্রাম। বারদুই আসছি মরিয়মের সাথে পাহাড়পুর বিহারে। জোছনা রাতে! আমি যেন পায়ে হাঁটি না, মনপবনের পাল্কিত চড়ি! যেনবা আমি কেরানীর ঝি নিশি না, রাজরানি কোন। বাতাসে গুনগুনানি, হুমহুমাহুম! ছয় বেহারা।... সেই দিন মইরমের চাচাতো ভাই সোলেমান সফররাজ সেই মানুষটা রাজার কুমার। রূপবান পুরুষ -ে কয়!... সেই মানুষটা বদলগাছির একটা ইশ্কুলে ইতিহাস পড়ান। তিনি পণ্ডিতজাতের, পাগলা ছাঁটের। ইনার সাথে আমার পয়লা প্রথম দেখা হয়ছিল নওগাঁয় বলিহার রাজবাড়ির সামনে। সোনালু ফুলগাছটা হলুদ ঝড়বাতি নিয়া খাড়া। সেই সময় তেনার সাথে চোখাচোখি? হায় হায় এমন রূপবান মানুষ আমারে ভাসাইয়া নিয়া যায় কহরদবিয়ায়ু! পড়ে শুনছি মানুষটা মহা বিদ্যাধর, ভাবের পাগল! ঐ রকম এক মানুষ চোক্ষের মইধ্যে সাত সাগরের ছলাৎ ছলাৎ নিয়া নজর করে, তাইলে আমার করনীয় কী হয়? কন তো? আমি তখন- মতো আমার মধ্যে নাই। ভাসতাছি... পদ্ম দীঘির ঢেউয়ের ছলনা। এইডা মনে হয়, উন্নিশ টুন্নিশ বছরের যাদু বিস্তার, তিন ভুবনের!...

সারাদিন মায়ের পাকঘরের সব কাম করছি। মায়েরে ভজাইতে হয় তো! কই, ‘মা জননী আইজ রাইতে মরিয়ম গো বাড়িত থাকবো ওর ছোট ভাইডা চিন্টু, তারে তুমি দেখছ, হেই ছেঁড়ার মুসলমানি। আমারে গীত গাইতে হইবো।’ মা প্রথম থম-মাইর‌্যা থাকে। বাপ গেছে নওগাঁ সদরে, কামে। খানিক গোস্বাভাব নিয়া কইলেন, ‘যাও, কিন্তুক মাইয়া আইজ ভরা পূর্ণিমা ফাল্গুন মাসের দোল-পূর্ণিমা। আসমান থেইক্যা যুবতী কন্যাগো উপর আছর পড়তে পারে। সুরা নাছ পইড়্যা বুকে ফুঁ দিয়া যাইস। বিহারেও যাবি মন কয়। সাবধান, তুমি তো ভাবের পাগল-বাপ দাদার তরিকা পাইছ না? মায়ালোকের কলঙ্ক হইতে সুময় লাগে না মেয়া।’ মায়ে তার সুন্দর আঙুলগুলো নাচাইয়া বাইগুন ভর্তা বানাইতেছেন। চুলায় ভাতের বলক। কী সুবাস। পাবদা মাছের লাল টকটকা সালুন। দপদপাইয়া পাত পাইতা বসি আমি। ভাতের দানাগুলো লাসা লাসা। গায়ে একটু ফেন লাইগা আছে। তাতেই বহুত মোলায়েম। খাইলামও বেহেশ্তি খানা। শেষমেশ বুড়া আঙুলে টাইনা মধুভাত খাইলাম?

আমরা তখন পাহাড়পুর বিহারে। সোলেমান সফলরাজ চাঁদের ভরা যৌবন টেক্কা দিয়া বসেছেন মইধ্যে খানে। মরিয়মের পাশে আমি খানিক শরমিন্দা ভাব। চাঁদটা হাসতাছে। মাথার উপর এতোবড় একখান পাপড়ভাজা। ঐ সোমপুর বিহারে যেজন জোছনা রাতের লীলানৃত্য দেখছেন, সেতো জোছনার বশ, গোলাম। তার বুঝি মুক্তি নাই। সোমপুর মানে চাঁন্দপুর আপনে তো জানেনই। সোম মানে চাঁদ!

আল্লাহর কসম, ‘জোছনা আমারে ডাকে, আয় আয় তু... তু... তু? অযুত নিযুত বছর আগে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এই বিহারে পাঠ নিত- ধ্যানজ্ঞান, ধর্মকর্ম এই মহাভিটায় হইত। গা বারবার শিউরে ওঠে। খানাঘর, শয়নঘর, পাঠাগারের নমুনা। কোন ঘরে কুলুঙ্গি আছে। দেওয়ালে টেরাকোটা ফলক! এখানে দেশ দেশান্তর থেকা ভিক্ষুরা আসতো। জ্ঞানর্জনের অছিলায়। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানও ছিলেন এইখান- আচার্য। নালন্দা বিহারের সমান-সারা দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠা সোমপুর বিহার। এই ‘জলদ গম্ভীর’ শব্দডা জানি। সেই সুরে সেই রূপকুমার এইসব ইতিহাস বয়ান করেন। আমি ইতিহাস শুনি, আর মানুষের কণ্ঠে অচিন বাণী শুনি। আমি আর পারি না। কতো কিসিমের উলাঝুলা ভাবনা মনটারে বিহবল বেহাত করে দেয়! আমি পারি না আল্লাহর কিরা এমন চাঁদভাসা ফাল্গুন রাতে আমার মাথাডা ফের আমার থাকে না! পুরা আউলা বাউলা দশা?

কিঞ্চিত আনমনা কম কথার সফররাজ কয়েছিল আমার দিক আঙুলের ইশারায়, জোছনা নিশিচারিনী নিশি কন্যা?...

আমারে দেখায় কেমুন, বলা হয় নাই। উন্নিশ টুন্নিশ বছরের আমি হালকা পাতলা গড়নের শ্যামলা মেয়ে। বয়সের খানিক জেল্লা ছিল মনে হয় স্বপ্নভরা জোছনাকুসুম ফোটা দুই চক্ষু আমার নাকি উত্তম অতি উত্তম!... আমার এই যাদুকালের ঢেউ ভাঙ্গা বুকের অতলে আমি যেমুন ডুব-পাড়ি। কূল কিনারা পাই না...?

ঐ সেই অন্যমনা রূপকুমার সোলেমান মাস্টার আর একবার কয়েছিল, ‘কালো? তা সে যতোই কালো হোক। দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।’ আমি ‘কৃষ্ণকলি’ কবিতা সেই -ণে পুরা ঠা ঠা মুখস্তো করে ফেলছি। খোদার কসম, আমার বুক ধড়ফড় করে।

ফাল্গুনী পূর্ণিমা, আমার বান্ধবী রাধারানি কয়, দোল পূর্ণিমা! সেইরকম রাতভরা মোম জোছনা! সেই অযুত নিযুত বছরের প্রতœ সোমপুর বিহার। হলুদ রঙা সোনাজলে ঝলমল ঝিলিক! বাতাস আসে চুপি চুপি দখিনা বাতাস, অচিনা ফুলগন্ধে তেলেসমাত! ...

আমি, মরিয়ম আর আনমনা মাস্টার সোলেমান!... কী সুন্দর গো... চোখের সামনে ভাসে বায়োস্কোপ... এক ঝাঁক কমলা বসন গায়ে বেলমাথা ভিক্ষু ‘বন্ধুং স্মরনং গচ্ছামি’... জপতে জপতে হাঁইটা যায় দূরে... আবছা! চন্দ্রাহত মানুষেরা কতো কী না দেখে গো? আপনি দেখছেন না পাহাড়পুর বিহার? না দেখলে অক্ষন টিকিট কাটেন!...

সোলেমান ভাইরে মরিয়ম যতো চেনে আমি তো ভাবের পাগলি, ততো চিনা উঠবার টাইম পাইলাম কই? অথচ আমার মনডার ভেতরে সেই কুমার গ্যাঁট হইয়া বইসা রইছে। কী তার আলো জোছনার ঢল। জোছনা কুমার?... সোলেমান ভাইয়ের কথা উঠলে সই মরিয়ম কয়, ‘ওয়ালী সোলেমান ভাইরে আমি বহুতই ডরাই!’ ওয়ালী? আমি হাসি ফটিক!

তিনি তো অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানরে নিয়া গবেষণা করতাছেন। পুস্তক রচনায় মন দিছেন। বিশাল জানেওয়ালা মানুষ-মইরম কয়! আমি কী কম বুঝি? কিন্তু রূপবান জোছনা কুমারের মনডার রঙ কেমুন টকটকা লাল, কমলা না কি ফ্যাকসা?

মোম আলোয় তাঁর মুখখান দেখি একখান হল্দা বসরাই গোলাপ ফুল যেমন! মরিয়ম সই আচমকা উঠে যায়- এক তোড়া সুগন্ধি ডাঁটফুল তুলে আনে। আমার মোটা মোটা বেনীর মইধ্যে গাঁথে। কী যতনে। দেখি আনমনা কুমারের কমলাকোয়া ঠোঁটের কোনে এক বিন্দু হাসির রেখা! মরিয়ম খানিক বাদে আবার উধাও। ওয়ালী সোলেমান দুধকুমার উবু হয়ে একমুঠ দূর্বাঘাস তুলে আনে। আমি চোখ সরাই না। সোলেমানি যাদু একখান ঘাসের আংটি বানায়া ফেলায় কুমার। আমার শ্যামল বরন অনামিকায় পরায়া দেন অচিন সাধক রূপকুমার। আমি জোছনা রাতের তামেশা দেখি! আমার উন্নিশ টুন্নিশ বছরের কলিজাটায় কে খানি জাফরানি রঙ লাগাইয়া দিল! আল্লার কসম আমি আর নাই! ...

বিহারের একটা কক্ষের ভিতরে কুলুঙ্গিতে রাখছিলাম মাছের বড়া। কলাপাতায় প্যাঁচ দিয়া। আমার কলিজা কাঁপে হাতখানাও কাঁপে। দখিনা বাতাসে যেমন কচি কলাপাতা থরথরায়! আমার ঘোর কাটে না। একখান বড়া তুলে সেই সোলেমান সফররাজের মুখে। সে চক্ষু বন্ধ করে কয়, ‘আহা কী স্বাদ!’ আমি পাখনা গজান পিপীলি- মতো উড়ি এদিক সেদিক। যেনবা জন্মের কালা বোবা অন্ধ এক উনিশ টুন্নিশ বয়স্থা কন্যা! আচমকা মরিয়ম সেই অযুত নিযুত বচ্ছরের কোঠায় ঢোকে। আর আরো আচমকা ‘আচার্য’ সোলেমান হাঁটা ধরে। কী তার পৌরুষ গো? তার ঝাঁকড়া চুল ঝলমল করে। তার সে ভঙ্গিমার তুলনা আমি দিবার পারি না। সইয়ের হাতে কয়েকটা দাদমর্দন হলুদ ফুল। আমি সইরে বুকে জাঁপটে জনমের ক্রন্দনে ঢলে পড়ি। আমার নিয়াস বন্ধ হয়া আসে।

এই দ্যাখ, সই গো সোলেমান সফরবাজ আমার আঙুলে ঘাসের আঙুটি পরাইয় দিছেন। তাইলে কী আমাদের বিবাহ!...

মরিয়ম একটা কথাও কয় না! তার দুই চক্ষু কহরদরিয়া!

না-না-না সই- সোলেমান ভাই ফানাফিল্লাহ্ বাকাবিল্লাহ তরি- ওয়ালী। কল্বের কলুষ সাফ করেন তিনি প্রতিরাতে, অজিফায়, সিজদায়। মোরাকাবায় দুনিয়ারী দুমড়াইয়া আসমান ছুঁইতে চান। তিনি তো জিকিরে জিকিরে রাইত কাবার করেন। নিশি সই তিনি সুফি-তাসাওউফ? দুনিয়ার মায়া থেকে মুক্তির জন্যে মুরশিদ ধরছেন। সই আমারে জাঁপটে ধরে। আমি খাড়া হইয়া সোমপুর বিহারের উঁচা গাঁথনির উপর দাঁড়াই। পাতকী! ভরা জোছনার ভুলভুলাইয়া আমার কলিজার বাত্তি নিভাইয়া দিল! কুলুঙ্গির কোন ভিতর থেকে এক ঝাঁক বাদুড় উড়া গেল, পাহাড়পুর বিহারের সকল গরিমার উপর দিয়ে। আমার অন্ধ- জোছনা রাতে কানে ভেসে আসে মায়ের দেহতত্ত্ব- যেন মিছরি চাকভাঙ্গা মধু ‘অচেনা নদীতে কেউ কোরোনা স্নান’।

back to top